ঝলমলে বাজ ফিনিস্ত - রাশিয়ার উপকথা

      এক যে ছিল চাষী। তিন মেয়ে রেখে মারা গেল চাষীর বৌ। চাষী ভাবল একটা ঝি রাখা যাক, সংসারের কাজকম করবে। কিন্তু চাষীর সবচেয়ে ছোট মেয়ে মারুশকা বলল: “ঝি আর রেখো না, বাবা। আমি একাই সংসার দেখব।”
      তাই সই। মারুশকাই সংসার দেখে। সবেতেই তার হাত। সবেতেই সে দড়। মারুশকাকে খুব ভালবাসে চাষী। এমন চালাক চতুর কাজের মেয়ে পেয়ে তার ভারী আনন্দ। দেখতেও পটের সন্দেরী! তার অন্য বোনেরা কিন্তু হিংসুটে আর লোভী। এদিকে রুপ নেই আর ফ্যাশনের ঘটা, সারাক্ষণ রং মাখে, রুজ মাখে, সেজেগজে বসে থাকে। এ সাজ, সে সাজ, এ জুতো, সে জুতো, এ রুমাল, সে রুমাল।

      একদিন বুড়ো চাষী বাজারে যাবে। মেয়েদের ডেকে বলল: তোদের কার জন্যে কী আনব, বাছারা? কী পেলে খুশী হবি? 
       বড় দু'বোন বলল:
      ‘একটা করে শাল এনো — ফুল-তোলা, সোনা-ঝলা।’ মারুশকা কিন্তু চুপ করে থাকে। বাপ জিজ্ঞেস করল:
      ‘আর তোর কী চাই, মারুশকা?’ 
     'আমার জন্যে বাবা, ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের একটা পালক এনো।’ চাষী বাজার থেকে  ‍দুটো শাল নিয়ে ফিরে এল। কিন্তু পালক আর পেল না।
      পরের বার চাষী আবার বাজারে গেল। বলে: ‘কী চাই তোদের, ফরমাশ কর।” 
      বড় দুজন খুশী হয়ে বলল: ‘আমাদের জন্যে এক জোড়া করে রুপোর নাল বসানো জুতো এনো।’ 
      মারুশকা কিন্তু আবার বলে: ‘আমার জন্যে বাবা, ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের একটা পালক এনো।’ 
      সারাদিন বাজারে ঘুরে ঘুরে চাষী দু’জোড়া জুতো কিনলে। কিন্তু ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের পালক কিছুতেই পেল না। পালক ছাড়াই ফিরে এল।
      বারবার তিন বার। চাষী আবার চলল বাজারে। বড় দুই মেয়ে বলে: ‘আমাদের জন্যে দুটো নতুন পোষাক এনো, বাবা।’ 
      কিন্তু মারুশকা আবার বলে: ‘আমার জন্যে বাবা, ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের পালক এনো।’ 
      বেচারী চাষী সারা দিন ঘুরে বেড়াল। কিন্তু পালক কোথাও পেল না। শহর ছেড়ে বেরুতেই এক বুড়োর সঙ্গে দেখা।
      ‘কী দাদু, ভালো তো ?’
     ‘ভালোই বাছা! চললে কোথায়?” 
      বাড়ী ফিরছি দাদু, গ্রামে। কিন্তু ভারী মশকিলে পড়েছি। ছোট মেয়ে বেরবার সময় বলে দিয়েছিল ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের একটা পালক আনতে। তা আমি কোথাও খুজে পেলাম না।’
      ‘তেমন পালক আমার একটা আছে। এ কিন্তু যাদু পালক। তবে ভালো লোককে দিতে বাধা নেই।’
      বুড়ো বের করে চাষীর হাতে দিল পালকটা — সাধারণ পালক। যেতে যেতে চাষী ভাবে, "এর মধ্যে ভালো কী দেখল মারুশকা?”
      বাড়ী পৌঁছে চাষী মেয়েদের জিনিস ভাগ করে দিল। বড় দুই বোন তাদের নতুন সজায় সাজে আর মারুশকাকে দেখে হাসে:
      ‘যা বোকা ছিল সেই বোকাই রয়ে গেল! এবার পালকটি মাথায় গোঁজ, চমৎকার দেখাবে!’
      মারুশকা উত্তর না দিয়ে সরে গেল। তারপর বাড়ীর সকলে যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, মারুশকা তখন পালকটা মেঝেয় ফেলে আস্তে আস্তে বলে কি:
      ‘লক্ষ্মী ফিনিস্ত — ঝলমলে বাজ, পথ চাওয়া বর এসো গো আজ।’ 
      অমনি এক অপরপে সুন্দর কুমার এসে হাজির। ভোর হতেই কুমার মেঝেয় আছাড় খেয়ে আবার বাজপাখি হয়ে গেল। মারুশকা জানলা খুলে দিতেই পাখিটা উড়ে গেল নীল আকাশে।
      পর পর তিন রাত্তির মারুশকা কুমারকে ডেকে আনল। সারাদিন সে বাজপাখি হয়ে নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়, কিন্তু যেই রাত আসে অমনি মারুশকার কাছে এসে দাঁড়ায় অপরূপ এক সুন্দর কুমার।
       চতুর্থ দিন হিংসুটে দুই বোন তা দেখে ফেললে। বাবার কাছে গিয়ে নালিশ করলে।
       চাষী বলল, “তোরা বাপ নিজেদের চরকায় তেল দে তো।” 
       বোনেরা ভাবে, “বেশ, দেখা যাবে কী দাঁড়ায়।” 
       কতগুলো ধারালো ছুরি জানলার বাজুতে পুতে রেখে লুকিয়ে রইল তারা।
      উড়ে এল সেই ঝলমলে বাজপাখি। জানলা অবধি আসে, কিন্তু মারুশকার ঘরে আর ঢুকতে পারে না। জানলার কাঁচে পাখিটা সমানে ঝাপটা মেরে চলে। বুক তার কেটে কেটে যায়। মারুশকা কিন্তু কিছুই জানে না। অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পাখিটা তখন বলে উঠল:
      ‘যে আমায় চায়, সে আমায় পাবে, কিন্তু সহজে নয়। তিনজোড়া লোহার জুতোর তলা ক্ষইয়ে, তিনটে লোহার দণ্ড ভেঙ্গে, তিনটে লোহার টুপি ছিড়ে তবে।”
      এই কথা মারুশকার কানে যেতেই সে লাফিয়ে উঠল, চাইল জানলার দিকে, কিন্তু বাজপাখি নেই, জানলায় শুধু রক্তের দাগ। খুব কাঁদতে লাগল মারুশকা। চোখের জলে রক্তের দাগ মুছে নিল, হয়ে উঠল আরও সুন্দর।
      বাবার কাছে গিয়ে মারাশকা বলল: 
      ‘আমায় বকো না বাবা, আমি চললাম দূরের পথে। বেঁচে থাকি দেখা হবে। না থাকি, তবে সেই আমার নির্বন্ধ।”
      খুব কষ্ট হচ্ছিল তবু শেস পর্যন্ত ছেড়েই দিতে হল তার আদরের মেয়েটিকে।
     মারুশকা তাই তিজোড়া জুতো তিনটে লোহার দন্ড আর তিনটে লোহার টুপি ফরমাশ দিল। তারপর তার চিরবাঞ্ছিত বন্ধু ঝলমলে বাজ ফিনিস্তকে খুঁজতে পাড়ি দিল দূরের পথে। চলল সে খোলা মাঠ ভেঙ্গে, ঘন বন পেরিয়ে, খাঁড়া পাহাড় ডিঙিয়ে। পাখিরা ওকে গান শুনিয়ে খুশী করে, ঝরণা ওর সুন্দর ধবধবে মুখখানি ধুয়ে দেয়, ঘন বন ওকে ঢেকে নেয়। মারুশকার কোনো ক্ষতি কেউ করতে পারে না। পাঁশুটে নেকড়ে, ভালুক, শেয়াল – জঙ্গলের যত জন্তু সবাই ছুটে আসে তার কাছে। হাঁটতে হাঁটতে এক জোড়া লোহার জুতো ক্ষয়ে গেল, একটা লোহার দণ্ড ভাঙ্গল, একটা লোহার টুপি ছিঁড়ল।
       মারুশকা তখন বনের একটা ফাঁকায় এসে দেখে, মুরগীর পায়ের উপর একটা ছোট কুঁড়েঘর ঘরে চলেছে।
      ‘কুঁড়েঘর, ও কুঁড়েঘর, বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াও ! ভেতরে যাব, রুটি খাব।”
      কুঁড়েঘরটা তখন বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে মারুশকার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। মারুশকা ঘরে ঢুকে দেখে, বসে আছে এক ডাইনী, বাবা-ইয়াগা — খেংরাকাঠি পা, বসেছে ড্যাং ড্যাং, ঘর জোড়া তার ঠ্যাং, ঠোঁট উঠেছে তাকে, ছাত ঠেকেছে নাকে।
      ডাইনীটা মারুশকাকে দেখেই বলে উঠল: 'হাউমাউখাউ, রুশীর গন্ধ পাউ! কীরে সুন্দরী, কাজ আছে কি করার, নাকি কাজের ভয়ে ফেরার?’
      ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের খোঁজে বেরিয়েছি, ঠাকুমা।’ 
     ‘সে যে অনেক দূর গো, সন্দরী। তিন নয়ের দেশ পেরিয়ে তিন নয়ের রাজ্যে। রাণী-মায়াবিনী তাকে যাদু করা সরবৎ খাইয়ে বিয়ে করেছে। তবে আমি তোকে সাহায্য করব। এই নে একটা রূপোর পিরিচ আর একটা সোনার ডিম। তিন নয়ের রাজ্যে গিয়ে রাজবাড়ীর দাসীর কাজ নিস। কাজের পর এই ডিমটা রাখিস পিরিচে। নিজে থেকেই ডিমটা ঘুরবে। কিনতে চাইলে এমনিতে দিস না। ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের সঙ্গে দেখা করতে চাইবি।’
      মারুশকা বাবা-ইয়াগাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অাঁধার হয়ে উঠল বন, হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর। পা ফেলতেও ভয় করে মারুশকার। এমন সময় এল এক বেড়াল। লাফিয়ে মারুশকার কোলে উঠে ঘড়ঘড় করে বললে:
      ‘ভয় পেও না মারুশকা, এগিয়ে যেও। যত এগোবে তত ভয়ানক হয়ে উঠবে বনটা। কিন্তু থেমো না আর খবরদার, পিছনদিকে তাকিও না।’
      বেড়ালটা মারুশকার পায়ে গা ঘষে চলে গেল! মারুশকা তো এগিয়ে চলে। যত এগোয় বনও তত গভীর, তত অন্ধকার হয়ে ওঠে। তবু হেঁটেই চলে মারুশকা। আরো এক জোড়া লোহার জুতো ক্ষয়ে গেল, লোহার দন্ড ভেঙ্গে গেল, লোহার টুপিটা ছিঁড়ে গেল। মারুশকা এসে পড়ল একটা কুঁড়েঘরের সামনে। কুঁড়েটা একটা মুরগীর পায়ের উপর বসানো। চারিদিকে বেড়া। আর খুটির ডগায় সব মাথার খুলি, তাতে আগুন জলছে।
      মারুশকা বলল:
      কুঁড়েঘর, ও কুঁড়েঘর, বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াও ! ভেতরে যাব, রুটি খাব।”
     বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে ওর দিকে মাথা করে দাঁড়াল কুঁড়েঘর। মারুশকা ঢুকে গেল ভিতরে। দেখে, ডাইনী, বাবা-ইয়াগা — খেংরাকাঠি পা, বসেছে ড্যাং ড্যাং, ঘর জোড়া তার ঠ্যাং, ঠোঁট উঠেছে তাকে, ছাত ঠেকেছে নাকে।
      মারুশকাকে দেখে ডাইনী বলল: 'হাউমাউখাউ, রুশীর গন্ধ পাউ! কীরে সুন্দরী, কাজ আছে কি করার, নাকি কাজের ভয়ে ফেরার?’
      ‘ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের খোঁজে চলেছি, ঠাকুমা।’ 
      ‘আমার বোনের কাছে গিয়েছিলি?’ 
      গিয়েছিলাম, ঠাকুমা।’ বেশ। তবে আমি তোকে সাহায্য করব, সুন্দরী। এই সোনার ছুঁচ রপোর ফ্রেমটা নে। ছুঁচটা নিজে নিজেই লাল মখমলে সোনালি রূপোলি নক্সা তুলবে। কেউ কিনতে চাইলে দিস না। ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের সঙ্গে দেখা করতে চাইবি।’
      বাবা-ইয়াগাকে ধন্যবাদ দিয়ে মারুশকা চলল। বনের মধ্যে মড়মড় করে, দমদাম করে, শনশন করে। ঝোলানো মাথার খুলিগুলো থেকে ঠিকরে ঠিকরে পড়ে ভূতুড়ে আলো। ভয়ে মরে মারুশকা। হঠাৎ কোথা থেকে একটা কুকুর দৌড়ে এল:
      ‘ভেউ, ভেউ, মারুশকা, ভয় করো না লক্ষীটি। এগিয়ে যেও, বন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। পিছনদিকে তাকিও না।’
      এই বলেই কোথায় উধাও। মারুশকা হাঁটে তো হাঁটে। আরো ঘন কালো হয়ে ওঠে বনটা। পা ঠেকে ঠেকে যায়, আস্তিন বেধে বেধে যায় ... হাঁটে আর হাঁটে মারুশকা, পিছনে তাকায় না।
      অনেক দিন, নাকি অল্প দিন, কে জানে। লোহার জুতো ক্ষয়ে গেল, লোহার দণ্ড ভেঙে গেল, লোহার টুপিটা ছিঁড়ে গেল। পৌছল মারুশকা বনের মধ্যে ঘাসে ঢাকা ফাঁকা একটা জায়গায়; দেখে, মুরগীর পায়ের ওপর একটা কুঁড়েঘর। লম্বা লম্বা খাঁটি দিয়ে ঘের দেওয়া। খুটির ডগায় ডগায় আগুনে ধকধক করছে ঘোড়ার মাথার খুলি।
      মারুশকা বলল:
      ‘কুঁড়েঘর, ও কুঁড়েঘর, বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াও!’
      বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে মারুশকার দিকে মুখ করে দাঁড়াল কুঁড়েঘর। মারুশকা ভিতরে ঢুকে গেল। দেখে, ডাইনী, বাবা-ইয়াগা — খেংরাকাঠি পা, বসেছে ড্যাং ড্যাং, ঘর জোড়া তার ঠ্যাং, ঠোঁট উঠেছে তাকে, ছাত ঠেকেছে নাকে। একটি দাঁত শুধু নড়বড় করছে মুখে। মারুশকাকে দেখে গরগর করে উঠল বুড়ীটা:
      ‘হাউমাউখাউ, রুশীর গন্ধ পাউ! কীরে সুন্দরী, কাজ আছে কি করার, নাকি কাজের ভয়ে ফেরার?’
      ‘আমি চলেছি ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের খোঁজে।’
      ‘তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়, সুন্দরী। কিন্তু আমি তোকে সাহায্য করব। এই নে রূপোর তকলি, সোনার টাকু। টাকুটা হাতে ধরলেই নিজে নিজে সোনার সুতো কাটা হবে।’
      ‘অনেক ধন্যবাদ, ঠাকুমা।’
      ধন্যবাদ পরে দিস, এখন কথা শোন! টাকুটা যদি কিনতে চায় দিস না, ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের সঙ্গে দেখা করতে চাইবি।”
      মারুশকা বাবা-ইয়াগাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলল তার পথ ধরে। বনে তখন ঘড়ঘড় গর্জন, গুরগুর ডাক, সাঁইসাঁই আওয়াজ। প্যাঁচারা পাক খেয়ে পড়ে, ইঁদুরেরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে – সবই মারুশকার গায়ে । হঠাৎ একটা পাঁশুটে নেকড়ে কোথা থেকে দৌড়তে দৌড়তে এসে বলল: ‘ভয় নেই মারুশকা, আমার পিঠে চড়ে বসো, পিছনে তাকিও না।’ 
      মারুশকা তখন নেকড়ের পিঠে চড়ে বসতেই এক পলকে উধাও। সামনে তার অঢেল স্তেপ, মখমলী মাঠ, মধুর নদী, হালয়ার পাড়, মেঘ-ছোঁয়া উঁচু পাহাড় । ছুটতে ছুটতে নেকড়ে ওকে নিয়ে এল এক স্ফটিকের পুরীর সামনে। তার জালি-কাজের অলিন্দ, কারু-কাজের জানালা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে রাণী।
       নেকড়ে বলল, তাহলে এবার পিঠ থেকে নামো, মারুশকা, রাজপুরীতে দাসীর কাজ নাও গে।’
     মারুশকা নেকড়ের পিঠ থেকে নেমে পোঁটলাটা নিয়ে নেকড়েকে অনেক ধন্যবাদ দিল। রাণীর কাছে কুর্নিশ করে মারুশকা বলে:
      ‘জানি না কী বলে ডাকব, কী মানে মান্যি করব, আপনার বাড়ীতে কি দাসী লাগবে?’
      রাণী বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বাপু, অনেক দিন থেকে একটি দাসী খুঁজছি যে সুতো কাটতে, কাপড় বুনতে, নক্সা তুলতে জানে।’
       মারুশকা বলল, “এ সবই পারি।’ 
      ‘তাহলে এসো, কাজে লেগে যাও!”
       রাজবাড়ীর দাসী হল মারুশকা। দিনভর কাজ করে, তারপর রাত হতেই রূপোর পিরিচ সোনার ডিমটা বের করে বলে:
       রুপোর পিরিচে সোনার ডিম ঘুরে যা, ঘরে যা। দেখিয়ে দে, কোথায় আমার ফিনিস্ত।’
    আর অমনি সোনার ডিমটা ঘোরে আর ঘোরে আর সামনে এসে দাঁড়ায় ঝলমলে বাজ ফিনিস্ত। চেয়ে চেয়ে মারুশকার আর সাধ মেটে না, দু'চোখ তার জলে ভেসে যায়।
      ‘ফিনিস্ত আমার, ফিনিস্ত! কেন ছেড়ে গেলে এই হতভাগিনীকে। কেঁদে যে আর বাঁচি না ...’
       রাণী সে কথা শুনতে পেয়ে বলে: ‘মারুশকা, তোমার রুপোর পিরিচ সোনার ডিম আমায় বেচে দাও।”
      মারুশকা বলল, 'না, এ আমার বিক্রীর নয়, তবে তুমি যদি আমায় ঝলমলে বাজ ফিনিস্তকে দেখতে দাও তাহলে এটা তোমায় এমনিই দিয়ে দেব।”
       রাণী ভেবে চিন্তে বলল: ‘বেশ, তাই হোক। রাতে ও যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন তোমায় দেখতে দেব।”
      রাত হলে মারুশকা ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের ঘরে গেল। দেখে তার আদরের ফিনিন্ত গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। সে ঘুম ভাঙে না। দেখে দেখে মারুশকার আর সাধ মেটে না। তার মধুঢালা মুখে চুম খেল মারুশকা, নিজের ধবধবে বুকের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঘুমিয়েই রইল তার আদরের ধন ফিনিস্ত। কিছুতেই জাগল না। ভোর হয়ে গেল, তবুও মারুশকা তার ফিনিস্তের ঘুম ভাঙাতে পারল না ...
      সারাদিন সে কাজ করল। তারপর সন্ধ্যাবেলায় সে নিয়ে বসল তার রুপোর ফ্রেম সোনার ছাঁচ। সেলাই হতে থাকে, আর মারুশকা বলে:
      ‘ফুল তুলে যা, ফুল তুলে যা। সেই তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছবে আমার ঝলমলে বাজ ফিনিস্ত।’
       রাণী সে কথা শুনতে পেয়ে বলল: ‘মারুশকা, তোমার সোনার ছুঁচ রূপোর ফ্রেম আমায় বেচে দাও।” 
     মারুশকা বলল, বিক্ৰী আমি করব না। তবে তুমি যদি আমায় ঝলমলে বাজ ফিনিস্তকে দেখতে দাও তাহলে অমনিই দিয়ে দেব।’
      ভাবল রাণী, ভেবে দেখল, তারপর বলল: ‘বেশ, তাই সই। রাত্তিরে এসে ওকে দেখে যেও।” 
      রাত এল। মারুশকা শোবার ঘরে ঢুকে দেখল তার ঝলমলে বাজ ফিনিস্ত অঘোরে ঘুমিয়ে।
     'ওগো ফিনিস্ত, ওগো আমার ঝলমলে বাজ, ওঠো, ওঠো, ঘুম ভেঙে ওঠো!’ ফিনিস্ত কিন্তু অঘোরে ঘুমিয়ে। মারুশকা হাজার চেষ্টা করেও তাকে জাগাতে পারল না।
       ভোর হয়ে গেল। কাজকর্মে লাগল মারুশকা, রূপোর তকলি আর সোনার টাকু নিয়ে বসল। তা দেখে রাণী বলে:
বেচে দাও মারুশকা, বেচে দাও!”
      মারুশকা বলল: ‘বেচার জন্যে বেচব না। তবে যদি তুমি আমায় ঝলমলে বাজ ফিনিস্তের সঙ্গে কেবল এক ঘণ্টা থাকতে দাও তাহলে তোমায় অমনিই দিয়ে দিতে পারি।’
      রাণী বলল, ‘বেশ।’
      মনে মনে ভাবল, “জাগাতে তো আর পারবে না।”
      রাত্তির হল। মারুশকা এসে ঢুকল শোবার ঘরে, কিন্তু ফিনিস্ত আগের মতই অঘোরে ঘুমিয়ে।
      ‘ওগো ফিনিস্ত, ওগো আমার ঝলমলে বাজ, ওঠো, ওঠো, ঘুম থেকে জাগো?
      ফিনিস্ত কিন্তু ঘুমিয়েই রইল। কিছুতেই জাগল না।
      মারুশকা কত চেষ্টা করল তাকে জাগাতে, কিন্তু কিছুতেই পারল না। এদিকে ভোর হয় হয়।
      মারুশকা কেঁদে ফেলল। বলল:
      ‘প্রাণের ফিনিস্ত, ওঠো গো, চোখ মেলে দেখো, দেখো তোমার মারুশকাকে, বুকে তাকে জড়িয়ে ধরো !’
      ফিনিস্তের খোলা কাঁধের ওপর তখন মারাশকার চোখের জল ঝরে পড়ল, সে চোখের জলের ছ্যাঁকা লেগে নড়ে উঠল ঝলমলে বাজ ফিনিস্ত। চোখ মেলে দেখল – মারুশকা! অমনি দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে চুম খেল তাকে। বলল :
একি সত্যিই তুমি আমার মারুশকা! তুমি তবে তিনজোড়া লোহার জযুতো ক্ষইয়ে, তিনটে লোহার দণ্ড ভেঙে, তিনটে টুপি ছিড়ে সত্যিই এলে? আর কেঁদো না। চলো এবার বাড়ী যাই।”
      ওরা বাড়ী যাবার জন্যে তৈরী হতে লাগল। কিন্তু রাণী তা দেখতে পেয়ে হুকুম দিল ঢোঁড়া দিতে, স্বামীর বেইমানী রটিয়ে দিতে।
      রাজরাজড়া সওদাগররা সব জড়ো হল, পরামর্শ করতে লাগল ঝলমলে বাজ ফিনিস্তকে কী দন্ড দেওয়া যায়।
      ঝলমলে বাজ ফিনিন্ত তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলল:
      আপনারাই বলন আসল বৌ কে ? যে আমায় প্রাণ দিয়ে ভালবাসে সে, না যে আমায় বেচতে চায়, ঠকাতে চায়?”
      সবাই তখন মেনে নিয়ে বললে, হ্যাঁ, মারুশকাই তার বৌ।
      তাই সুখেস্বচ্ছন্দে দিন কাটাতে লাগল তারা। নিজেদের দেশে ফিরে গেল। সেখানে বিয়ের দিন তোপের পর তোপ পড়ল, শিঙ্গার পর শিঙ্গা বাজল আর ভোজটা হল এমন জমকালো যে এখনো লোকে তার কথা ভোলেনি।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য