লোকটা - এখলাসউদ্দিন আহমদ

      মাথা ভরা প্রকাণ্ড এক টাক। তেল চকচকে। কপালের সংগে মিলেমিশে একাকার। হঠাৎ করে দেখলে সেখানে কপালটাকে আলাদা করে নেয় সাধ্য কার।
        টাকের তিন পাশ বেযে ঝালরের মত কয়েক গোছা চুল নীচের দিকে নেমে এসেছে। কুতকুতে চোখ। দু'চোখের ঠিক উপর বরাবর সাদা ধবধবে দুই ভুরু যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া দু টুকরো শিমুল তুলো। ভুরু পেরিয়েই কয়েকটা গভীর খাঁজ । মনে হয় রাজ্যির দুরুহ সমস্যাবলী তার উপর ন্যস্ত।
      রোগা, লম্বা টিংটিংযে। পরণে ঝোলা পাঞ্জাবী ও চুড়িদার পায়জামা। মুখে একরাশ চিন্তা ভাবনার মাখামাখি। সামনের দিকে বেশ একটু ঝুঁকে পড়া । এই লোকটাকে আমরা দেখি অহরহ এবং যত্রতত্র।
      একএকদিন দেখতাম, কপালে বাড়তি কতকগুলো ভাঁজ ফেলে, ভুরু দুটোকে গুটিযে কাছাকাছি টেনে নিযে এসে, গম্ভীর মুখে হন হন করে কোথাও হেঁটে যাচ্ছেন, কিম্বা রাস্তার কোন মোড়ে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আঙুলটা ঠোঁটের উপর উঠে এলো। চুপচাপ কাটলো কিছুক্ষণ। ভাবখানা, এই মাত্র কি যেন তিনি ভাবছিলেন এবং ভাবতে ভাবতে ভাবনার খেইটাই হারিয়ে ফেলে আবার ধরার চেষ্টা করছেন।
      এই অবস্থাতেই মাঝে মাঝে আবার দেখা যায়, আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ; তিনি যিনিই হোননা কেন, হাত বাড়িয়ে খপ করে তার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে কি যেন জিজ্ঞেস করছেন। কেউ কেউ উত্তর দেন। কেউ কেউ আবার দেখি বিরক্তির সংগে মুখ ঝামটা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পা বাড়ান।
       লোকটাকে দেখা গেছে, কারো জবাব শুনে মুখটাকে আরও গম্ভীর করে হাত ছেড়ে দিতে।
      আবার কারো কারো জবাবে দেখেছি হঠাৎ করে উৎফুল্ল হয়ে উঠতে। চোখ মুখের এমন ভাব যেন হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া মণি-মাণিক্য হাতের নাগালে পেয়ে গেছেন।
      সব চেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই লোকটার সংগে আমার আলাপ করার সুযোগও কোন দিন হয়নি। এমন একজনও পরিচিত কাউকে দেখি নি, এই লোকটার সংগে মৌখিক আলাপ আছে। অথচ এক পাড়াতেই আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে এক নাগাড়ে বসবাস করছি। প্রতিদিন না হোক, প্রায়ই চোখে পড়ে, দেখি, এই পর্যন্ত, ব্যাস !
       কিন্তু আজ এই ভর দুপুরবেলা সে লোকটা আমাকে প্রায় হকচকিয়ে আমারই বৈঠকখানার প্রায় মাঝখান বরাবর সশরীরে এসে হাজির হবেন তা আমি কস্মিনকালেও ভাবিনি।
     জৈষ্ঠির দুপুর। কাঠ ফাটা রোদ বাইরে। রাস্তা ঘাট কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। খাঁ খাঁ করছে চারদিক। ঘরেও তিষ্টোনোর উপায় নেই গরমে। ভ্যাপসা গুমোট গরম। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনটাকে এক জায়গায় করে গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছি। সকাল থেকেই কাগজ কলম টেবিলে তৈরী। পত্রিকার তাগিদ। যে ভাবেই হোক দু’চার দিনের মধ্যে একখানা গল্প দিতেই হবে। দু’চার দিনের আজই তিনদিন পার হয়ে গেলো বলে। শেষদিন আগামী কাল। যা করার আজই করতে হবে। অথচ এখন পর্যন্ত কোন কিছুই ঠিক করতে পারিনি যে কি লিখবো?
       চরম অস্থিরতার মধ্যে ঘরময় পায়চারী করে, “যা হয় একটা কিছু লিখে ফেলি’ এই ভাব নিয়ে সবেমাত্র কাগজপত্র ঠিক করে, কলমটাকে বাগিয়ে ধরে কাগজের উপর ছুঁইয়েছি। ঠিক তখনই, বলা নেই কওয়া নেই দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে বারকয়েক ঘরের চারপাশটা চোখ বুলিয়ে, হঠাৎ করে আমার দিকে তাকিয়ে, চোখ দুটো টান টান করে আঙুলটা ঠোঁটের উপর উঁচিয়ে নিয়ে, ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলেনঃ আচ্ছা, কি যেন ভালছিলাম বলো তো?
      বোঝ ঠালা! আলাপ নেই পরিচয় নেই। কোন দিন কোন রকম বাক্যালাপও হয়নি। হঠাৎ করে এমন ভর দুপুরে, হুড়মুড করে ঘরে ঢুকে দুম করে এ রকম একটা প্রশ্নে অবাক না হয়ে কি কেউ পারে? আমিতো প্রায় হকচকিয়ে গেলাম। বোকার মত বার কয়েক টোক গিলে আমতা আমতা করে বললামঃ আজ্ঞে?
      আরও একটু কাছে সরে এসে চোখ দু’টো মিটমিটিয়ে গলাটা খাটো করে বললেনঃ বলছিলাম কি, খেই হারিয়ে ফেলেছি, বুঝলে? ( খেই হারিয়ে ফেলেছি। সকাল থেকে কি যেন একটা কথা ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে যেই না একটা সমাধান প্রায় পেয়ে গেছি, ঠিক সেই সময়টাই ফেললাম খেই হারিয়ে। যেটা নিয়ে ভাবছিলাম, সেটাই ফেললাম হারিয়ে। এখন সমাধানটা নিয়ে কি করি বলোতো? মূলটাই যখন নেই, সমাধানটা নিয়ে আর কি হবে, এ্যাঁ?
      কিছুক্ষণ থেমে, আবার বলে উঠলেনঃ বুঝলে, সকাল থেকে ভাবনার বিষয়টা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, কিন্তু পাচ্ছি না খুঁজে। রাস্তাঘাটে ক্ৰমন কাউকে পেলাম না যে জিজ্ঞেস করে নেবো বিষয়টা। তাই তোমার কাছে ছুটে এসেছি। আচ্ছা, বলতে পারো ঠিক কি ভাবছিলাম?
      জবাব না দিয়েই শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। ইতিমধ্যে হতচকিত ভাবটা আমার কিছুটা কেটে গেছে। এ লোক নির্ঘাত দার্শনিক না হয়ে যায় না। আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
       বললামঃ বসুন বসুন। তিনি বসলেন। এবং বসার প্রায় সংগে সংগে পুনরায় প্রশ্নটা আমার দিকে ছুড়ে মারলেনঃ কি যেন ...
      অত্যন্ত বিনয়ের সংগে বললামঃ আজ্ঞে, কি যেন একটা বলছিলেন, ‘সমাধান না কি। সেটা শুনলে হয়তো বা সূত্রটা খুঁজে বার করা যাবে। যদি দয়া করে ঐ সমাধানের কথাটা একটু খুলে বলেন। ভদ্রলোক হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, এবং ঠিক তেমনিই উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেনঃ জ্ঞাতিগুষ্ঠি, সাংগপাংগ সববাইকে, হাত পা মুখ বেঁধে, একটা বড় ছালার মধ্যে ভরে হয় বুড়িগংগা না হয় চাটগার কর্ণফুলিতে ভাসিয়ে দিলেই সব ল্যাঠা চুকে যাবে।
      আমার তো চক্ষু চড়ক গাছে। বলে কি লোকটা, এ্যাঁ? জলজ্যান্ত লোকগুলো, সে যেই হোকনা কেন, হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেবে? সর্বনেশে ‘সমাধান দেখি।
      বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে, অবশেষে নাকের ডগা ও মাথাটা বারকয়েক চুলকে নিয়ে বিজ্ঞের মত ধীরে ধীরে বললুমঃ কোন গল্পের প্লট ফ্লট, এই আর কি মানে...
      কথাটা আমার শেষ না হতে হতেই ঘরের মধ্যে যেন ছোটখাটো একটা বোমা ফাটলো। রীতিমত খেঁকিয়ে উঠলেন তিনিঃ গল্প। গল্পের প্লটের কথা বলছো? আরে ছোঃ ওসব নিয়ে আবার কেউ চিন্তা ভাবনা করে না কি, এ্যাঁ? বলিহারি যাই তোমাদের। গল্প একটা বিষয়, তার আবার চিন্তা ভাবনা করে সমাধান খোঁজা? যত্তোসব।
      গল্প সম্বন্ধে এমন তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যে আমার কান মাথা গরম হয়ে উঠলো। ভিতর ভিতর কোথায় যেন একটু অপমানিত বোধ করতে লাগলুম। বলে কি লোকটা? গল্প লেখা যেন ছেলেখেলা। অথচ এরই তাড়নায় হাতে গোনা চার চারটে দিনের তিন তিনটে দিন কি লিখবো এই অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়ে দিলাম।
      লোকটা হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অনর্গল বকেই চলেছেনঃ হ্যাঁ, কি যেন বলছিলে? গল্প, আরে লেখা আবার কঠিন কাজ নাকি? একটা দুটো কি? হাজারো গল্প আমার জানা আছে। এই যেমন ধরো, একটা লোক। মাস পয়লা মাইনে পেয়ে, পকেটের চিমসে ম্যানি ব্যাগটাকে কোলা ব্যাঙ ফোলা ফুলিয়ে বিশ পদের মাসিক ফর্দটা আঙুলের ফাঁকে নিয়ে বাজারে ঢুকলেন। মিনিট পনেরো পরেই ফর্দের সাত নম্বরে পৌছাতেই, ব্যাঙ ফোলা ব্যাগটা চুপসে একসা। ঘেমে ঘুমে কোন মতে টলতে টলতে বাজারের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। এর পর বেশ কিছুক্ষণ ভদ্রলোক আর কিছুই জানেন না। যখন জ্ঞান হলো, তখন দেখলেন তিনি বাড়ির সামনে দাঁড়ানো, রিক্সাওয়ালা ভাড়া চাচ্ছে। পাঁচ টাকা। ভদ্রলোক জামার প্যান্টের এপাশ ওপাশের সব ক’টা পকেট হাতড়েও রিক্সার ভাড়াটা আর পূরণ করতে পারেন না। বাড়ির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতেই অজানা এক আশংকায় মুখটা কালো হয়ে গেলো। কি আর করেন, অগত্যা পাশের বাড়ীর কাজের ছেলেটাকে চোখ ইশারায় এক পাশে সরিয়ে নিয়ে, মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে ‘বাবারে’, ‘বাছারে ব’লে, অবশেষে নানান শর্তের মৌখিক চুক্তিতে, তার সাহায্যে ভাড়াটা মিটিয়ে ঘরে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ। পর মুহুর্তেই বিচিত্র ধরনের শব্দের বিস্ফোরণ। চকিতে বাতাসে ভর করে গোটা দুই আলু দুএকটা পটল রাস্তার উপর এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। এর পর আর কি? বাকি উনত্রিশটা দিন বাড়িটার প্রতি নজর রাখো আর কান পাতো, লিখে শেষ করতে পারবে না।
       এক নাগাড়ে কথাগুলো শেষ করে বার পাঁচেক জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেন তিনি। তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কিছু বলে উঠার আগেই বলতে শুরু করলেনঃ কিম্বা ধরো, সেই লোকটাই। বেশ কিছু বছর পর মাস পয়লা মাইনেটা নিয়ে বাজারে গেছে। বাজারে ঢুকেই দেখে চালের বাজার। বিরাট বিরাট উঁচু করা চালের ঢিপি। তার উপর আসন পিঁড়ি হয়ে তেল চকচকে নাদুস নুদুস কয়েকজন লোক। লোকটা তাদের সামনে মুখটা কাচুমাচু করে, মিনমিনে গলায় বললো, পঞ্চাশ টাকার চাল দাওতো।
      চালওয়ালা আড়চোখে একবার তার দিকে তাকালো, তারপর দু'তিন মুঠো চাল খামচা মেরে লোকটার থলেয় ঢালতে ঢালতে বিনয়ের হাসি হেসে বললোঃ হেঁ হেঁ পঞ্চাশ টাকার চাল মাগার অতো ছোট বাটখারা তো নেই ভাই সাব। তবে কি না কম হবে না। আপনি আমার বাপ দাদার আমল থেকে চাল নিচ্ছেন, আপনাকে কি কম দিয়ে পারি? বরং পুরোপুরি তিন তিন মুঠিতে আমার লোকসানই হয়। হেঁ-হেঁ-হেঁ ........এরপর লোকটার অবস্থাটা একবার চিন্তা করো। যত ভাববে লিখে আর শেষ করতে পারবে না।
      চুপ করলেন তিনি। পকেট থেকে রুমাল বের করে টাকটা একটু মুছে নিলেন। সেই সংগে মুখটাও। পকেটে রুমালটা রাখতে রাখতে বললেনঃ আমায় এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারো? ঠাণ্ডা পানি।
      নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। এটা আর পারবো না, বলেন কি? ছুটলাম তড়ি-ঘড়ি পানি আনতে।
      বড় এক গ্লাস পানি তার হাতে দিতে না দিতেই এক নিঃশ্বাসে ঢক ঢক করে খেয়ে নিয়ে, আবার বলতে শুরু করলেনঃ বুঝলে, মাঝে মাঝে আমার এক মজার কথা মনে হয়। মনে হয় সামনেই বিরাট একটা পাহাড়। যেমন উঁচু তেমনি খাড়াই। সেই পাহাড়টার একেবারে তুঙ্গে নানান রংয়ের জাব্বাজোব্বা পরা বেশ কিছু লোক নরম গালিচায় গা এলিয়ে বসে। প্রত্যেকেরই দুহাতে দুই লালটু লাটিম। কেউ কেউ রং-বেরংয়ের ঝুমঝুমি বাজিয়ে, নিচের দিকে তাকিয়ে সুর করে ডাকছে, আয় আয় আ—য়। আর সেই সুরের তালে তালে, প্রায় নাচতে নাচতে, হাত পা ছাড়াই কতকগুলো প্রায় অসংখ্যই বলা যায়, বোচকার মতো, সব কি যেন সেই পাহাড়চূড়োয় গালিচা পেতে বসে থাকা লোকগুলোর দিকে তরতর করে পাড়ি জমাচ্ছে। প্রত্যেকের পিঠেই সাদা কাগজের উপর বড় বড় করে “চাল” “ডাল” “তেল” “লবণ” ইত্যাদি লেখা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কি, এইগুলোর পিছন পিছনে প্রত্যেকেই, মানে, আমি তুমি এ ও সে আমরা সবাই আমাদের শেষ পুঁজিটা পর্যন্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রাণপণে হাঁপাতে হাঁপাতে হোঁচট খেতে খেতে, হামাগুড়ি দিয়ে ঐ লেবেল আঁটা জিনিসগুলো ধরার চেষ্টায় উপরমুখো উঠতে চেষ্টা করছি। অল্পকিছু লোক ওগুলোর সংগে তাল মিলিয়ে উপরে উঠছে, কেউ কেউ আবার দেখছি, বোঁচকাগুলোর আগেই তরতর করে, গালিচার উপর এলিয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছ বরাবর পৌঁছে যেতে না যেতেই তাদের হাত ধরে গালিচার উপর টেনে তুলে নিচ্ছে। আর আমরা যারা উপরে উঠার চেষ্টায় আঁকপাঁক করছি, তাদের সে এক চরম দুরবস্থা। কেউ মুখ থুবড়ে পড়ে আর উঠছে না। কেউ কেউ আবার জেদের বশে তরতর করে ছুটে উঠতে গিয়ে পা ফসকে একেবারে খাদে পড়ে অক্কা। কারো আবার সারা শরীরে রক্ত ঝরছে ঝরঝর করে। কাউকে দেখা যাচ্ছে ড্যাবড্যাবে চোখ বার করে শুধু ছটফটই করে যাচ্ছে, এগুতে পারছেনা এক পাও। অধিকাংশই খাড়াই পাহাড়টার একেবারে নিচের দিকে মাটিতে বুক বিছিয়ে জিভ বার করে উপর দিকে তাকিয়ে ধুকছে। গলা দিয়ে কোন স্বর বেরুচ্ছে না তাদের। চোখ দুটো দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝরছে। বিশ্বাস করো, সব মিলিয়ে সে যেন এক বীভৎস ব্যাপার স্যাপার। সহ্য করতে পারি না। কোন মতে চোখ বন্ধ করে ফেলি।
       এই পর্যন্ত বলে লোকটা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কোন সাড়াশব্দ নেই। আমিও চুপ। কোন কথা বলতে পারছি না। লোকটা কথাগুলো এমনভাবে বলছিলেন যে, শুনতে শুনতে কেমন যেন নিজেকে বোকা বোকা বলে মনে হচ্ছিলো আমার।
      হঠাৎ করে লোকটা আবার কথা বলে উঠলেনঃ আচ্ছা, হঠাৎ করে তোমার এই গল্পের-প্লটের কথা মনে হলো কেন? গল্প টল্প লেখো বুঝি, এ্যাঁ?
      মাথাটা একটু নেড়ে জবার দিলামঃ তা একটু আধটু মাঝে মাঝে লিখে থাকি।
      কোথায় লেখো? খবরের কাগজে টাগজে লেখো না কি? 
      মাথা নেড়ে স্বীকার করলাম, মাঝে মধ্যে লিখে থাকি।
     শুনে চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেনঃ আচ্ছা, একটা কথা ঠিক করে বলো তো। এই ধরো তোমরা যারা লেখো টেখো তারা কিছু কিছু শব্দ একেবারে কোনকিছু না ভেবেই যত্রতত্র ব্যবহার করো কেন বলো তো?
      কথা শুনে আমি তো প্রায় হতভম্ব। কোন এমন শব্দ রে বাবা, যা না ভেবে চিন্তেই আমরা ব্যবহার করি? ভেবে তো আমি কোন কুল কিনারাই পেলাম না। সঙ্কোচের সংগে জিজ্ঞেস করলামঃ আজ্ঞে কোনটা? কোন শব্দগুলো বলুন তো?
      সঙ্গে সঙ্গে তিনি জবাব দিলেনঃ কেন, আগুন? এই ‘আগুন শব্দটা কি তোমরা ভেবে চিন্তে ব্যবহার করো? প্রতিদিনই কাগজে দেখি, সমস্ত কাগজটা জুড়ে শুধু মাছের বাজারে আগুন ‘চালের বাজারে আগুন, আলু পটলে আগুন মাংসে আগুন'-এই যে শুধু আগুন আর আগুন, এগুলো কি তোমরা ভেবে চিন্তে ব্যবহার করো? আমার তো মনে হয় মোটেই না। ঠাণ্ডা মাথায় একবার একটু ভেবে দেখো তো, ব্যাপারটা যদি সত্যি সত্যি একদিন ঘটে যায়, তা হলে কি এক সাংঘাতিক কাণ্ডটাইনা ঘটে যাবে।
       এই পর্যন্ত বলেই সমস্ত শরীরটা একটু বাকুনি দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর চেয়ারটা দু’হাত দিয়ে ধরে আমার কাছাকাছি সরিয়ে নিয়ে এসে আবার বলতে শুরু করলেনঃ প্রত্যেক জিনিসের একটা সীমারেখা আছে, জানো তো? না কি?
      মাথা নেড়ে সায় দিলামঃ জানি, অবশ্যই জানি। 
     বাজারেরও তো একটা দরদামের সীমরেখা আছে। ধরো চালের সের চার টাকা, সাড়ে চার টাকা-পাঁচ-সাড়ে পাঁচ-পৌণে ছয়-সাড়ে-এ-এ-এ-দপ করে সত্যি সত্যি একদিন চালের বাজারে আগুন লেগে গেলো। ঠিক এমনি ভাবেই তেলের বাজারে বিশ পঁচিশ তিরিশ ছুই ছুই,--দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন।
       মোটা পাইপ নিয়ে দমকল ছুটে না আসতে আসতেই এক এক করে মাছ আলু পটল মাংস মশলাপাতি সাবান সোডা ঘি লংকা ইত্যাদির যাবতীয় হাট বাজার দোকান পাট দেশে যেখানে যতগুলো আছে সবগুলো একসংগে জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে। হুড়হুড় করে যেখানে যত লোক আছে নেমে পড়লো রাস্তায়। উত্তেজনায় সব টগবগ করছে। উত্তেজনা আর সহনশক্তিরও তো একটা সীমারেখা আছে? দেখতে দেখতে লোকগুলোর চোখে মুখে বুকে হুহু করে জ্বলে উঠলো আগুন। এক থেকে আর একজন। সেখান থেকে দশজন। দশ থেকে শ হাজার। লক্ষ। এখান ওখান সেখান। মনে হলো, সমস্ত দেশটাই একটা আগুনের হলকা। নেভায় সাধ্য কার? লোকগুলো উন্মাদের মত ছুটে বেড়াচ্ছে এখান ওখান সেখান। সর্বত্র। যে যেখানে যাচ্ছে পুড়ে ছাই। যেখানে ঢুকছে ভেংগে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে দেখবে, সেই যে খাড়াই পাহাড়টার কথা বলেছিলাম, সেই পাহাড়টার দুধার ঘিরে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। লক্ষ্য তাদের সেই পাহাড়ের চুড়োয় মখমলে শলিচায়, ঝুমঝুমি হাতে গা এলিয়ে থাকা লোকগুলো। সে কি উন্মাদনা। মনে হচ্ছে পাঁজা পাঁজা আগুন পাহাড়ের চার পাশ ঘিরে, হামাগুড়ি দিয়ে চুড়োয় বসে থাকা সেই লোকগুলোর দিকে এগুচ্ছে। আর ......।
      উত্তেজনায় তিনি আর কথা বলতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেনঃ দেখো দেখো, এই কথাটা ভাবতেই আমার সারাটা গা কেমন কাঁটা দিয়ে উঠছে।
       লোকটা দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বহুক্ষণ বসে রইলেন। সত্যি কথা বলতে কি লোকটার কথা শুনে আমারও বুকের মধ্যে যেন, ভয়ে কি উত্তেজনায় ঠিক বলতে পারবো না, একটা বিচ্ছিরি রকমের গুররর-গুররর শব্দ করছিলো। মুখেও কোন রকম রা সরছিলো না।
       লোকটা হঠাৎ আমার হাঁটুতে হাত দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে বলে উঠলেনঃ বুঝলে, এই দিনটার আশায় কবে থেকে যে বসে আছি। আমি দেখতে পাচ্ছি, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, সমস্ত দেশটা একটা মশাল হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই এক একটা আগুনের হলকা। পাহাড়টা ঘিরে ফেলছে ধীরে ধীরে। নেভায় সাধ্য কার।
      কথাগুলো শেষ করেই লোকটা ব্যস্ত সমস্ত হয়ে উঠে পড়লেন। বিরক্তির সংগে বলে উঠলেনঃ দূর ছাই। তোমার সংগে বকবক করে বিষয়ের মত সমস্যার সমাধানটার কথাও ভুলতে বসেছিলাম প্রায়। সব্বোনাশ হতো আর একটু হলে। তুমি তো পারলে না, যাই দেখি রাস্তাঘাটের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে দেখি, তারা কেউ কিছু বলতে পারে কি না। আচ্ছা চলি, কি বলো এ্যাঁ?
      কথাটা শেষ না হতে হতেই, ঝড়ের মত যে ভাবে এসেছিলেন ঠিক সেই ভাবেই হুটপাট করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে, হন হন করে চোখের নিমেষে গেট পেরিয়ে রাস্তায় মিলিয়ে গেলেন।
       কতক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসেছিলাম ঠিক বলতে পারবো না। হঠাৎ টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা কাগজগুলোর দিকে চোখ পড়তেই টনক নড়লো। হাতের দিকে তাকাতে দেখি, কলম তখনও হাতেই ধরা। গল্পতো দূরের কথা। একটা আঁচড়ও কাটা হয়নি কাগজে।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য