বুড়ি ও রবিন পাখি - আদিবাসী লোককথা

      সে অনেক অনেককাল আগের কথা। সেবার বরফ পড়ছে। প্রত্যেক বছর শীতকালেই এমনটা হয়। কিন্তু এবারে এমন ঘন আর পুরু হয়ে বরফ পড়েছে যে পাহাড়ের গাছপালার ডগাও দেখা যাচ্ছে না। শুধু সাদা বরফ আর বরফ।
      পাহাড়ের কোলে এক ছোট গ্রাম । তার নাম তাওস | সেই গ্রামে সেই শীতের দিনে এমন বরফ পড়ল যে আগুন জ্বালাবার মতো এক টুকরো শক্ত পাথরও তাওসরা খুঁজে পেল না। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে সবাই ভেতরে বসে রইল। কিন্তু ভেতরেও এত ঠান্ডা যে তারা ঠকঠক করে কাপতে লাগল। সেই কনকনে শীতে এবার বুঝি তারা মারাই পড়বে।
       এমনি করে খুব কষ্টে কয়েক দিন কেটে গেল। শেষকালে বাদামি রঙের এক ছোট রবিন পাখি উড়ে এল সেই গ্রামে। তার বুক বাদামি রঙের নরম পালকে ঢাকা। ভীষণ ঠান্ডায় রবিন থরথর করে কাঁপছে, তার ঠোঁটদুটো কষ্টে অল্প অল্প নড়ছে, পায়ে যেন কোন জোর নেই।
       চারপাশে লোকজনের বাড়ি, মধ্যিখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। আনন্দের দিনে গ্রামবাসী সেখানে গান গায়, নাচে; আর দুঃখের দিনে সেখানে সবাই মিলে দুঃখ থেকে বাঁচবার কথা ভাবে। সেই ফাঁকা জায়গায় কোন ঘর নেই, নেই কোন গাছগাছালি। রবিন কাঁপতে কাঁপতে ধপ করে সেখানে পড়ে গেল। নরম দেহে বড় লাগল। এমন সময় সেখানে এল এক পাহাড়ি ভালুক। এসেই মুখটা আকাশের দিকে তুলে বলল, আর বেশি দেরি নেই। যা বরফ পড়ছে না! এই শীতেই ঠান্ডায় জমে গাঁয়ের সব লোক মরে যাবে। আর আমি হব তখন এই দেশের সর্দার। মজা করে শাসন করব এই দেশ, আমি হব রাজা।
       ক্লান্ত দেহে রবিন আরও বেশি কাঁপছে। গলা উচিয়ে রবিন বলল, “আমি যদি সাহায্য করি, তাহলে কিন্তু তুমি তা পারবে না। আমি তাওসদের বাঁচাবই। যেমন করে পারি। তাতে যদি আমার প্রাণ যায় যাক।
       এই কথা বলে রবিন দেহে শক্তি আনল, মনে সাহস আনল, তারপরে অনেক কষ্টে উড়ে চলল। সে দক্ষিণমুখে উড়ছে, আরও দক্ষিণে, আরও দক্ষিণে। উড়তে উড়তে সে এসে পৌঁছল আর একটি গাঁয়ে। সেখানে থাকে তাওসদের জ্ঞাতিভাইরা। রবিন দেখল, চারিদিকে সুন্দর সুন্দর বাড়ি, মাঝখানে বিরাট খোলা উঠোন। আর সেই উঠোনে জ্বলছে দাউ দাউ করে কাঠের আগুন। রবিন তার ছোট ঠোঁটে তুলে নিল এক টুকরো জ্বলন্ত কাঠ। উড়ে চলল তাওসদের গাঁয়ের পথে।
       আকাশে বড় দমকা হাওয়া। আগুন নিভে যেতে চায়। ছোট ক্লান্ত ডানা দুটোয় আড়াল করে সে উড়ে চলল। আগুনটাকে জিইয়ে রাখতেই যে হবে। এ আগুন বাঁচাবে তাওসদের।
      �গাঁয়ে নেমেই ছোট ছোট্ট পায়ের নখে সে বরফ সরিয়ে ফেলল, একটা ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল ঠোঠের আগুন। উড়ে গেল একটা শুকনো গাছে। ছোট্ট ডাল ভেঙে উড়ে এল আগুনের কাছে। গুজে দিল শুকনো ডাল। আবার উড়ে গেল সেই গাছে, বয়ে নিয়ে এল আরেকটা শুকনো ডাল। আগুন জ্বলে উঠল লাল শিখা বেয়ে। রবিন ছুটলো আরও ডাল আনতে।
       এমন সময় আগুন দেখে ভালুক ছুটে এল। খুব জোরে এক নিঃশ্বাস ফেলল আগুনের গর্তে। এ আগুন নেভাতে না পারলে তাওসরা বেঁচে যাবে, তারা ঠান্ডায় জমে মারা পড়বে না, সেই-বা কেমন করে সর্দার হবে  আগুন গেল নিভে, ধোয়ার মধ্যে রইল আগুনের কয়েকটা ফুলকি।
       রবিন একটা ডাল নিয়ে ফিরে এল। ধোঁয়া দেখে চমকে উঠল। শুকনো ডাল গুজে দিয়ে ছোট্ট দুটো ডানায় আস্তে আস্তে পাখা করতে আরম্ভ করল। মনে মনে বলল, ‘আগুন, তুমি জ্বলে ওঠো। নইলে যে তাওসরা জমে মরে যাবে। তুমি নিভে যেও না আগুন।
       আগুন জ্বলে উঠল। রবিনের চোখদুটোয় খুশি-খুশি ভাব। উড়ে চলল শুকনো গাছে, আরও শুকনো ডাল আনতে হবে।
       যেই না রবিন উড়ে গেল, তক্ষুনি ভালুক ফিরে এল আগুনের গর্তের কাছে। জোরে দুবার নিঃশ্বাস ফেলল, আগুন গেল নিভে । ধোয়ার মধ্যে রইল আগুনের কয়েকটি ফুলকি।
       ধনুক থেকে ছাড়া-পাওয়া তীরের মতো গলা বাড়িয়ে পা লম্বা করে উড়ে এল রবিন। মুখে তার শুকনো ডাল, বুকে কাঁপুনি। শুকনো ডাল গর্তে ঢুকিয়েই ছোট্ট দুটো ডানায় হাওয়া করতে লাগল রবিন, হাওয়া দিচ্ছে। বারবার ডানা নাড়ছে, ক্লান্ত তার ডানা। কিন্তু আগুন যে নিভে যায়, তাকে যে জ্বালাতেই হবে। আগুন জ্বলে উঠল।
       আবার উড়ে চলল রবিন। ঝড়ের মতো গতি তার। আরও শুকনো ডাল তার চাই। আগুন জ্বলিয়ে রাখতেই হবে।
আবার ফিরে এল ভালুক। তিনবার খুব জোরে নিঃশ্বাস ফেলল গর্তের মুখে। সব আগুন নিভে গেল, রইল শুধু খুব ছোট্ট একটিমাত্র ফুলকি। আনন্দে মুখ ঘুরিয়ে ভালুক বলল, এবার? এবার আমি হব এই দেশের সর্দার। আগুন নিভেছে।
       পাহাড়ের ওপরের বিদ্যুৎ যেমন করে আছড়ে পড়ে মাঠের গাছের মাথায়, ছোট্ট ডাল মুখে নিয়ে ছোট্ট রবিন নেমে পড়ল গর্তের মুখে। ঢুকিয়ে দিল শুকনো ডাল। ধোঁয়া দেখে বুক ব্যথায় ভরে গেল, চোখে এল জল। তবু সেই ছোট্ট এক টুকরো ফুলকিতে ডানা দিয়ে হাওয়া করল রবিন, কিন্তু ছোট ফুলকি জ্বলে উঠল না।
       কিন্তু রবিন তাতেও আশা ছেড়ে দিল না, চেষ্টা করে যেতে লাগল। মনে মনে বলল, ‘আগুন তুমি জ্বলে ওঠে, দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠো। দোহাই, তাওসদের জন্যই জ্বলে ওঠে?
       যতবার সে ডানা দিয়ে হাওয়া করছে, ততবার আগুনের হলকা এসে লাগছে তার নরম বাদামি বুকে। কষ্ট হচ্ছে, জ্বালা করছে, কিন্তু পাখা বন্ধ করে নি। হঠাৎ দাউ দাউ করে শুকনো ডালের আগুন জ্বলে উঠলো। অনেক শুকনো ডাল জমে উঠেছিল, �ডালগুলো পুরো ছাই হয়ে যায় নি। এমন আগুন জ্বলল, ভালুক আর সহজে তা নিভিয়ে ফেলতে পারবে না। রবিনের বুকে আনন্দ, চোখে খুশি-খুশি ভাব।
       কাঠের ঘরের ফাঁক দিয়ে তাওসরা দেখল সামনের উঠোনে লাল আলো। অবাক হয়ে তারা দরজা খুলে ফেলল, আগুনের শিখা উঁচু উঁঁচু হয়ে নাচছে। তার সামনে ক্লান্ত ডানায় ছোট্ট এক রবিন পাখি হাওয়া দিচ্ছে। শীতে জমে-থাকা তাওসরা সবাই ছুটে এল ঘর থেকে। সবাই তুলে নিল এক টুকরো আগুন। ফিরে গেল ঘরে। শুকনো কাঠে আগুন জ্বেলে মনের খুশিতে উত্তাপ পোয়াতে লাগল।
      কেউ ছোট্ট পাখির কথা ভাবল না –হায় ক্লান্ত ছোট্ট পাখি ! সবাই ভুলে গেল রবিনের কথা। কিন্তু ভোলেনি একজন বুড়ি। সেও ঘরের ফাঁক দিয়ে দেখেছে রবিনকে হাওয়া করে আগুন বাঁচাতে। সেও বড় দুর্বল, বড় ক্লান্ত ।
       সে শুকনো ঠান্ডা হাতে তুলে নিল ছোট্ট রবিনের দেহটি। আদরে বুকের কাছে চেপে ধরল আলতোভাবে। খুব সাবধানে নিয়ে গেল নিজের বাড়িতে। আগুনের পাশে তাকে শুইয়ে দিল, রবিনের সমস্ত পালক যেন বরফ হয়ে গিয়েছে। এখন তার উত্তাপ চাই।
       বড় দেরি হয়ে গিয়েছে ! ছোট ক্লান্ত রবিন মরে গিয়েছে। বরফ-জমা ঠান্ডায় রবিন মরে গিয়েছে।
       কান্না-ভরা চোখে ক্লান্ত বুড়ি দেখল, রবিনের ছোট্ট নরম বুকের মাঝখানটা ওইরকম আগুনের মতো লাল। ফুলকিতে ডানার হাওয়া দেওয়ার সময় যে রবিনের বুকে আগুনের আঁচ লেগেছিল! তাই বুক লাল হয়ে গিয়েছে। আজও সব রবিনের বুক তাই লাল।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য