চোর - নিয়ামত হোসেন

শহরের বড়োলোকরা প্রায় সারাক্ষণই ভিড় করে আছে এই নিউ মার্কেটে।
সব সময়ই গাড়ির ভোঁ বাজছে প্যাঁ-পোঁ। সায়েব-মেমসায়েব আসছে, গাড়ি থামাচ্ছে, প্রায় নাচতে নাচতেই ঢুকে যাচ্ছে বিরাট গেট দিয়ে সারি সারি চোখ-বাঁধানো নিউ মার্কেটের দোকানের গোলক-ধাঁধায়। আর রিকশা, বেবি-ট্যাক্সি, সাইকেল, পথচলা মানুষ, ফুটপাথের দোকানদার, সেসব দোকানের খদ্দের—সবার যেন এক গমগমে ভিড় লেগে আছে সবখানে।
নিউ মার্কেটের পাশেই বাজার। লোকে বলে কাঁচা বাজার। এখানে বিক্রি হয় চাল, ডাল, মরিচ, হলদি থেকে মাছ-মাংস-হাঁস-মুরগি পর্যন্ত।
এখানেও থামে সায়েব-মেম সায়েবদের গাড়ি। তারা নেমে বাজারে ঢুকে বাজার করেন। তারপর আবার গাড়িতে উঠে চলে যান বাড়িতে।
সর্বক্ষণ প্রায় ভিড় এই কাঁচাবাজারেও।
সায়েব-সুবো ছাড়াও নানান ধরণের বড়োলোক, মধ্যবিত্ত ও গরীব মানুষের ভিড় এখানে। এই ভিড়ে একবার মিশে গেলে নিজের কথা আর মনে থাকে না—মানুষের ভিড়ে আর নানান রকম শব্দে মন আনমনা হয়ে যায়—কতো রকম কতো ধরণের অন্য রকম চিন্তা এসে মাথায় ভিড় করে।
ফকির আলিরও ঠিক সেই রকমই হয়।
মাঝে মাঝে এমন ভুল হয়ে যায় যে সে বাজার করতে-আসা সায়েবদের পিছু ধরতেও পারে না। অন্য ছেলেরা ধরে ফেলে।
সে হয়তো হাঁটছেই, হাঁটছেই—একবার মুরগির বাজারের ভিড় ঠেলে ঠেলে, একবার মাছের বাজারের লোকজনের গা ঘেঁসে ঘেঁসে, খেয়ালই নেই। এমন ভিড় যে অনেক সময় নিজের শরীরের উপরও নিয়ন্ত্রণ থাকেনা প্রায়—লোকে ঠেলতে ঠেলতেই এপার থেকে ওপার করে দেয়। তার মধ্যে যদি কারো গায়ের উপর পড়ে যায় অমনি শুনতে হয় খিঁচানি—এই চোখে দেখিস না? গায়ের উপর এসে পড়িস, শালা নবাবের বাচ্চা।
সে সময় ফকির সোজা হয়ে হাঁটতে চেষ্টা করে যদিও, কিন্তু পারে না, কেউ হয়তো এমন ধাক্কা মারলো যে মাথার ঝুড়িটা লাগলো গিয়ে অন্য লোকের ঘাড়ে।
ঘাড়ে লাগা লোকটা ফকিরের মাথায় চটাশ করে এক চাটি মারে, এই হারামজাদা ইবলিসগুলার জ্বালায় বাজারেও আসা মুশকিল।
অন্য ছেলেরা হলে প্রতিবাদ করতো, ফকির লোকটার দিকে করুণভাবে তাকাবার চেষ্টা করে। লোকটা একটা ধাক্কা মারে ঘাড়েঃ ভাগ! ভাগ !
ধাক্কার চোটে আবার হোঁচট খেয়ে সামনের এক লোকের প্রায় কোলের মধ্যেই পড়ে ফকির। কিন্তু আর একদফা মার খাওয়ার আগেই ভয়ে পালিয়ে আসে ভিড়ের বাইরে।
এসে হাঁপায়। দেখে অন্য ছেলেরা ঠিক মতো সায়েব ধরেছে। সায়েবরা বাজার করছে আর তাদের মাথার ঝুড়িতে রাখছে।
নিজের উপর বিতৃষ্ণা আনে ফকির।
ইশ, এতোটা বেলা হলো চার আনার কামও হলো না! অথচ অন্য ছেলেরা হয়তো অনেক পয়সা পেয়েছে! মাকে কি বলবে গিয়ে? মাতো অপেক্ষা করে আছে বাসায় ! কি নিয়ে যাবে ফকির আলি তার মায়ের জন্য !
হঠাৎ এক সায়েবকে লক্ষ্য করে ফকির।
ছুটে যায় সেদিকে।
সাব কুলি লাগবো?
কোন জবাব নেই তার কথার! সায়েবটি আপন মনেই নিজ পথ হাঁটেন, হয়তো ফকিরের কথার উত্তর দেবার প্রয়োজন অনুভব করেন না।
  সাব কুলি লইবেন ?
  এবার খেঁকিয়ে ওঠে সেই লোকটিঃ না, না, সর, সর, ভাগ—
সাব, লাগলে আমারে লইয়েন, কাতর মিনতি ফকিরের।
আরে লাগবো না তো কইলাম ব্যাটা, ভাগ, লোকটি ফকিরকে এমনভাবে তাড়া করতে উদ্যত হয় যেন মনে হয় স্থানটা তার চৌদ্দপুরুষের কেনা সম্পত্তি !
ফকির ভয়ে ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে এসে আবার কাতরভাবে তাকায় সেই লোকটির দিকেঃ
বকুনি দিয়েও যদি সায়েবের দয়া হয়!
কিন্তু কোথায় দয়া। ফকির দেখে তার-দিকে ফিরেও তাকায় না সায়েব, সোজা ব্যাগহাতে ভিড়ে মিশে যায়।
পিছন থেকে হিরু এসে গুতো দেয় পিঠে।
আরে ফকিরা, পাইলি? ওইসে কিসু?
ফকির মাথা নাড়ে।
শালা তুই কোন কামের না। হাতের মুঠি খুলে দুটাে চকচকে সিকি দেখায় হিরু। এক সাবরে লইসিলাম, হ্যার বাজার উডায়ে দিসি রিকসায়, আর এক সাব, খুব বড়োলোখ, মাঝে মাঝে মডর গাড়ি লইয়া আহে, হেরডা উডায়সি মডর গাড়িতে—চাইর আনা, চাইর আনা—আডানা, এই দ্যাখ।
পয়সা ট্যাকে গুজে রাখে হিরু। বলে, তুই খাড়াইলে খাড়া, আমি দেহি—ওইযে সাব আইতাসে।
ছুটে যায় হিরু।
  বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে ফকির।
  নিজের উপর খুব অভিমান হয়। 
  আজ কি নিয়ে বাড়ি যাবে!
  খুব ভয় হয় তার।
  তার বাপ অনেকদিন ধরেই বাড়িতে বসা। কাম পায় না অনেকদিন হতেই। চেষ্টা করে অবশ্য প্রায়ই, কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে আসে। মাঝে মাঝে তাই চেষ্টা করে ঠেলাগাড়িতে মাল ঠেলবার কাজের। কোনদিন হয়, কোনদিন হয় না। মা-ও তার এক বাসায় কাজ করত, এখন করেনা !
  কোলে ছোট বাচ্চা, সে বাড়ির লোকদের সেজন্য অসুবিধা !
  ফকিরের বাপ বাজারের বোঝা বইবার আশায় কতোদিন ঘুরেছে। হয়নি। লোকে অল্পস্বল্প বাজার করে, দরকার হলে ছোট ছোট ছেলেদের মাথায় বোঝা চাপিয়ে বাড়ি যায়। দুচার আনা যা হয় দেয়। বুড়ো মানুষদের এ কাজে বড় একটা নিতে চায় না কেউ। তাই আসতে হয় ফকির আলিকে।
  আজ ফকির আলি ঠিকমতো সায়েবই ধরতে পারছে না। বাড়িতে একমাত্র নিশ্চিত আয় ধরতে গেলে তারই! অথচ আজ তার এই অবস্থা ! আধ সের আটা কেনার পয়সা যদি কোনমতে জোগাড় করতে পারত ফকির আলি ! তাহলে কোনমতে খাওয়া যেতো ওবেলা ।
  মায়ের কথা মনে হয় ফকিরের।
মা-টা তার কতো ভালো। এমন মানুষ দুনিয়ায় আর হয় না। কোনমতে যদি পাঁচটা রুটি বানাতে পারে তো দুটো বাবাকে দেয়, দুটো তাকে দেয়, একটা দেয় ছোট ভাইকে। কোলের বাচ্চা শরীর বড় শুকনো, পেট ফোলা। সেও দুধের বদলে একটা রুটিই খেয়ে থাকে, বাবাও রুটি খেয়ে বাইরে গিয়ে বসে, যদি কারো কাছ থেকে আধখানা বিড়ি চেয়ে খাওয়া যায় সেই আশায়।
  শুধু ফকির বসে থাকে। সে খেয়াল করে মায়ের কিছু নাই।
  মা তুমি খাইলা না?
  আমি খামু পরে, তুই খা তো ! মা ব্যাপারটা যেন কিছুই না এইভাবে নিজ কাজে মন দেয়।
  আমি খামু না, তুমি একডা লও। ফকিরের চোখ ফেটে পানি আসে।
  কেমন পুলারে, আমার লাগবোনা, তুই খা, সকালে তরে আবার কামে যাওন লাগবো!
  একডা খাইয়াও আমি কামে যাইতে পারুম ! মায়ের কালচে মুখে যেন একটা অপরাধী-অপরাধী ভাব। ছেলের চোখে চোখে তাকাতে পারে না। মুখ না ফিরিয়েই বলেঃ আমি হেই ব্যালা খাইসি, দুখান রুডি তর জন্য কিসু না, খায়া ফালা মানিক আমার, কথা কইস না ।
  বাবা পুনরায় সম্পূর্ণ শরীর নুইয়ে ভেতরে ঢুকে শুধায়, কিরে ফকির কি অইসে? রাগ হয় ফকিরের। বলে ঃ তোমার ক ? তোমার তো খেয়াল নাই আমার মা খাইলো কি না খাইলো! তুমি তোমারডা বুজমতো পাইলেই আইলো !
  রাগ না করেই তবু বলেঃ মায়ে কিসু খাই নাই!  
  হায় আল্লাহ! একি করলো ফকিরের মা ! তুমি তোমারডা না রাইখাই সবটি দিয়া দিলা।
  আপনেরে কে কইলো আমি খাই নাই। হের যতো কথা ! মুখ লুকায় ফকিরের মা।
এমনি অনেক কথাই ফকিরের মনে পড়ছে আজ ! এসব কথা এতো বেশি মনে পড়ছে যে তার আর সায়েব ধরা হচ্ছে না!
  তার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে!
তাদের বস্তির বাড়ির সামনেই হিরণ মিয়ার মুদী দোকান। সেই দোকানের সামনের দিকে একটা কাঁচের বোয়েমে গোল গোল ফুল তোলা বিস্কুট রাখে। দু’পয়সায় একটি। এই বিস্কুটের জন্য এখনো ফুঁপিয়ে কাদে তার ছোট ভাই!
  সেদিন বস্তি থেকে একটু দূরের এক বাড়িতে বিয়ে হল। সকাল থেকেই সে বাড়ির আশেপাশে ঘুর ঘুর করছিল বস্তির অনেক ছেলেমেয়ে। রাত্রে খাওয়ার সময় ফকিরও গিয়েছিল, এতো ছেলেমেয়ের চিৎকার, হৈ চৈ, তবু ছোট ভাইয়ের কান্নায় একটি থালা নিয়ে গিয়েছিল সে ! যদি একমুঠো পোলাও দেয়!
বিয়ে বাড়ির অতিথিরা খেতে বসলেন দু দফায়। খাওয়া হল, বিয়েও হল, সববাই চলেও গেল কিন্তু কিছুতেই ফকির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারলো না। দু একবার চেষ্টা করেও অনেকের সাথে তাড়া খেয়ে ফিরে এলো।
কয়েকজন খানসামা কাজ করছিল। তারা টেবিলের কাপড় ঝেড়ে আর আধখাওয়া পোলাও ও মাংস একটা বালতিতে জমা করল। তারপর গেট পেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে ছুড়ে দিল ফেলে। আর ছুটে গেল একগাদা ছেলে মেয়ে। কাড়াকড়ি, খাবলা খাবলি। এক মুহুর্তেই ঐ এটোকাটাও শেষ ।
  ফকির আধো অন্ধকারে দেখতে পেল, কয়েকজন ছেলেমেয়ে কোমরে থালা চেপে ধরে মোটা মোটা হাড় ব্যর্থতার সাথে চুষে খাচ্ছে! সে আবার গেটের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সেখানেও কোন আশা নেই মনে হল তার। একটু পরে এক সায়েব ওদের দেখে বিরক্ত হয়ে একজনকে হুকুম করলেন ওদের কিছু কিছু করে দিয়ে বিদায় করতে ।
  ছেলেদের মধ্যে মহা উৎসাহ পড়ে গেল! কখন আসে কখন আসে এই আশায় সবাই উদগ্রীব। কিছুক্ষণ পর একটা ডিশে করে কিছু পোলাও নিয়ে একজন এল গেটের কাছে। সকলে হা হা করে উঠল। লোকটা ডিশটাকে সযত্নে মাথার সমান উঁচুতে ধরে চিৎকার করে উঠল, লাইন ধর, লাইন ধর, নইলে কারেও দিমুনা—
  কিন্তু কে শোনে কার কথা ! কে ধরে লাইন ! সব্বাই যে যাকে পারে ঠেলে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে আর যতোদূর সম্ভব থালা বাড়িয়ে দেয় সামনে।
লোকটা কোন রকমে এক মুঠি এক মুঠি করে যেই দেয় অমনি সকাতর আবেদন ওঠে, আমারে দ্যান, আমারে দ্যান .....
  কেউ পেয়েও দাড়িয়ে থাকে। কেউ কাপড়ে লুকিয়ে ফেলে। 
  এই ভাগ ভাগ তরে না দিলাম। কেউ হয়তো ধরা পড়ে যায় সেই লোকটার কাছে। তবু সে বলে,আর এটুটু দ্যান। দুগা। ফকির এইসব দেখতে দেখতে এক সময় খেয়াল করে লোকটার দানের কাজ সমাপ্ত হয় এবং সকলের আবেদন নিবেদন সত্বেও সে গেট বন্ধ করে দিয়ে সোজা ভিতরে চলে যায়।
  অগত্যা কি আর করবে। ফকির ফিরে আসে শূন্য থালা নিয়ে। রাত অনেক হয়েছে। এসে দেখে পোলাও-এর আশায় থেকে থেকে তার ছোট ভাই ঘুমিয়ে পড়েছে!
ফকিরের মনটা দুমড়ে-মুচড়ে টনটনিয়ে ওঠে ব্যথায়। যদি সামান্য একটু পোলাও আনতে পারতো, তাহলে তার ভাইটাকে, তার মাকে, বাবাকে খাওয়াতে পারতো! একটু একটু হলেও সব্বাই খুশি হতো খুব।
এইসব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলে ফকির। চারদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখে নতুন সায়েব আসছে কিনা বাজার করতে।
  উহুঁ, কেউ নাই।
  সববার হাতেই নিজের নিজের ব্যাগ। কেউ কেউ কুলি নিয়েই ফেলেছে।
  একজন ভদ্রলোক বেশ ভারী ব্যাগ নিয়ে হাঁটছেন। ফকির আলি কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
  এই বেগুন কতো করে ? ভদ্রলোক বেগুনঅলাকে শুধালেন।
  বেগুনঅলা জবাব দিল ঃ এক টাকা ।
  তিনি চলে যাচ্ছিলেন, লোকটা ডাকলো, শুনেন সাব, এই যে—
  তিনি দাঁড়ালেন।
  তরকারীঅলা শুধায় ঃ আসেন না, কত লইবে ?
  লাগবে না !
  আহা, কতো দিবেন? কইবেন তো!
ভদ্রলোক কি যে ভাবলেন, দাঁড়ালেন না, হাঁটতে সুরু করলেন অন্য তরকারীর দিকে ! সুযোগ বুঝে ফকির আলি পিছনে যেতে সুরু করে।
  সব কুলি লাগবো?
  উহু, উহু!
  লন না সাব—মিনতির মত স্বর ফকিরের।
  লাগবে না, যাঃ ! তিনি ধমক দিলেন।
ফকির এবার নাছোড়বান্দা। তার ভারী ব্যাগটা ধরে মৃদু টান দিয়ে বললোঃ দশডা পাই দিয়েন সাব, আমি লয়ে যাই!
ভদ্রলোক হ্যাচক টান দিয়ে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিলেন। তারপর আরো জোরে ধমক দেনঃ ভারী মজা তো ! বলছি লাগবেনা তবু—যাঃ ! যাঃ !
  ফকির আলির মেজাজটা ভীষণ বিগড়ে যায় !
দূরে সরে আসে বিড় বিড় করে গাল দিতে দিতে। গাল তো সে বেশী দিতে পারে না। পারে দিতে লতু। কোন সায়েব ধমক দিলে সেও দূরে এসে যতো পারে মনের সুখে গাল দিয়ে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করে।
ফকির আলিও দূরে এসে বিড় বিড় করে গাল দিয়ে ওঠে।
একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক এ সময় হস্তদন্ত হয়েই যেন বাজারে ঢুকলেন। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানের এক পাশে দড়ি দিয়ে ঝোলানো চটের থলি ধরে শুধালেন ঃ ব্যাগগুলো কতো করে ?
  এক টাকা ।
  কতো হবে ঠিক বলেন।
  দুই আনা কম দিয়েন, দোকানদার বলে।
  আট আনায় হবে? ভদ্রলোকের সরাসরি প্রস্তাব।
  কী যে কন সাব !
  তাহলে কতো? দশ আনা?
ঠিক এই সময়ে ছুটে আসছিল আর কয়জন কুলি। তাড়াতাড়ি বলে ফেলল ফকির আলিঃ কুলি লইবেন সাব?
  যাবি? ভদ্রলোক উল্টো প্রশ্ন করলেনঃ কতো লবি? 
  চাইর আনা দিয়েন সাব, মুখটাকে করুণ করল ফকির। 
  হ্যাঁ, চার আনা! দুই আনা পাবি, যাবি? ফকির দেখল এটাও হয়তো ফসকে যাবে, ভয়ে ভয়ে বললঃ বিশ পাই দিয়েন সাব! 
  ভদ্রলোক রাজী হয়ে গেলেন। অন্য কয়েকজন ছুটে এসেছিল। তারা বললো, আমারে লন সাব, আমারে লন সাব ! কিন্তু ভদ্রলোকও সেদিকে খেয়াল করলেন না, ফকির আলিও দৃঢ়ভাবে ব্যাগটা ধরল যাতে হাতছাড়া না হয়।
ভদ্রলোকটির পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে ফকিরের নানা কথা মনে হতে লাগলো। কুড়িটা পয়সা দিয়ে কি কেনা যাবে। তার ছোট ভাই পোলাও খেতে চেয়েছিল সেদিন, খাওয়াতে পারেনি। পারেনি এক টুকরো মাংস খাওয়াতে। কতোদিন যে হয়ে গেছে ওরা মাংস খায় না। সেদিন বিয়ে বাড়িতে ছেলেমেয়েরা ময়লা-ফেলা আস্তাকুড় থেকে খাওয়া হাড় কাড়াকড়ি করে যেভাবে খাচ্ছিল সে কথা ফকিরের মনে পড়ে যায়। বিয়ে বাড়ি থেকে খাওয়ার যে খোশবু পাচ্ছিল সে, ওই শুকনো ফেলে দেয়া হাড়গুলোতে তার খানিকটা কি লেগে ছিল না? অনেক সময় বড়োলোকেরা যেভাবে হাড় খেয়ে ফেলে দেয় তাতে এক-আধ কুচি মাংস লেগে থাকে, আর বিয়ে বাড়ির ভোজের খাওয়ার সময় এঁটো-কাটার পাতে মাঝে মাঝে দু'একটা চর্বিও ফেলে দেয়া হয়। তিনটে হাড়ও যদি সেদিন পেতো ফকির! একটি দিতো মাকে, একটি বাবাকে আর একটি ছোট ভাইটিকে।
ভদ্রলোক মাংসের দোকানে গিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, উলটিয়ে-পালটিয়ে টিপে দেখে অবশেষে একসের মাংস কিনে ব্যাগে পুরে চাপালেন ফকিরের মাথার ঝুড়িতে। তারপর ঢুকলেন তরকারীর দোকানগুলোতে।
ফকিরের মাথায় মাংসের ব্যাগটা বেশ ভারী মনে হচ্ছিল। একসের মাংস, এমন আর কি ! তবু যেন ভারী মনে হচ্ছে। সেদিন বিয়ে বাড়ির এঁটো কুড়িয়ে সবগুলো ছেলেমেয়ে যা পেয়েছিল তার থেকে তো এটা বেশি !
ফকিরের মনে হতে লাগল এ মাংস যেন তারই কেনা! সে-ই যেন বাজারে কেনাকাটা করছে তার বাড়ির জন্য।
ইতিমধ্যে ভদ্রলোকের তরকারী কেনা হয়ে গেছে! সব চাপানো হয়েছে ফকিরের মাথায়। তারপর ভদ্রলোক মাছের বাজারের দিকে এগোলেন। মাছের ঘরটিতে ভীষণ ভীড়। ঢোকা মুশকিল। ফকিরের ঢুকতে ইচ্ছা হলো না।
ভদ্রলোক ঢুকলেন, ফকিরকেও পিছু পিছু যেতে হলো। ওর মনে হল না ঢুকলেই ভালো ছিল।
ভদ্রলোক মাছের দর করছেন। এ-মাছ, সে-মাছ। ভীড় ঠেলে এগোনোও শক্ত। ফকির আলি পিছু পিছু যায় আর ভাবে এই বুঝি মাছ পছন্দ হয়ে যাবে, তারপর ওকে নিয়ে তিনি বাইরে আসবেন, গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাবেন, তারপর কুড়িটি পয়সা দিয়ে চলে যাবেন।… কিন্তু তারপর? তারপর আবার ফকির আলিকে 'কুলি লাগবো', 'কুলি লাগবো করে সায়েব খুঁজতে হবে। যদি কাউকে পায় তবেই আটার পয়সা হবে নইলে এ দিয়ে কি হবে? 
ফকির আলি কি যেন ভাবলো।
একবার উল্টো দিকে একটু গিয়েই আবার সায়েবের কাছে ফিরে আসলো। সায়েবকে ভালোমতো লক্ষ্য করে দ্রুত উল্টো দিকে ভিড় কাটিয়ে একটু গিয়েই ফাঁকা জায়গায় পড়লো এবং সেখান থেকে বুক টগবগ করা উত্তেজনা নিয়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সোজা বাড়ির পথ ধরলো।
বাড়ির কাছাকাছি এসে আর ভেতরে ঢুকতে সাহস হয় না। কী বলবে সে? মা কি খুশী হবে? বাবা কী শুধাবে? ছোট ভাইটি কী করবে?
  কে ফকির, আইছস বাবা? মা শুধালো তাকে।
  হ! মাথার ঝুড়ি ছোট্ট ঘরের ছোট্ট মাটির মেঝেতে নামালো সে।
  আরে একী ! চমকে ওঠে মা! কার এগুলি?
  আমারোই !
  এতো কিছু কই পাইলি? অ্যাঁ?
 দিসে। ফকির বলে, আমারে এক সায়েব দিসে। সায়েব আমাকে খুব বালোবাসে। কইলো কি, যা লয়ে যা, তরে দিলাম !
 হাচা কথা? তরে দিসে? মা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না, কারোরডা লয়ে আসস নাই তো?
  না মা ! আমারে দিসে।
বাবা দেখে তো অবাক। চোখ দুটো তার যেন বেরিয়ে আসে অবাক হয়ে। ছোট ভাইটি খাবলা খাবলা করে ঝুড়ির মাংস তরকারী এলোমেলো করতে থাকে। মা তাড়াতাড়ি সামলে রাখে সব।
ফকিরের বাপ সেদিন নিজে হিরণ মিয়ার দোকানে গিয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কয়েক প্রকার মশলা ধারে কিনে আনলো। তার মাও চেনা কোন বাড়ি থেকে চেয়ে নিয়ে এলো একটা এ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি।
  কৌতুহলী দু’একজন উকি দিল অ ফহিরের মা, পুলায় কি আনছে, এত কি রানতাছ?
  না, এই একডু তরকারী, এমন কিছু না, সামান্যই।
  ফকিরের সায়েব সেদিন অনেক দোয়া পেলেন।
  পরদিন ফকির ঘর থেকে বের হলো না।
  তার বাবা শুধায় ঃ ফহির, বাজারে যাবি না ?
  ফকির কিছু বলে না।
মা বলেঃ থাক, আজ না-ই গেলো, শরীলডা হয়তো বালা নাই। এসে ছেলের গায়ে হাত দেয়। না। জ্বর নাই।
  তারপর দিনও যায় না ফকির। ঘরে বসে থাকে।
  তিনদিনের দিন আর থাকা গেল না। যেতেই হল।
ভয়ে ভয়ে চারিদিক দেখে রওনা হল সে। কোনরকমে বুক টিপ টিপ করতে করতে বাজার পর্যন্ত গেল সে কিন্তু সায়েব ধরতে পারলো না। শঙ্কিতভাবে এদিক ওদিক চেয়ে বেড়াতে বেড়াতেই অনেক সময় হয়ে গেল। একবার বাজারের দিকে আসে আবার হঠাৎ সেই সায়েবের মতো কাউকে মনে হলে দ্রুত সরে যায়, ভিড়ের আড়ালে বা দোকানপাটের গলি ঘুচিতে লুকিয়ে থাকে। এইভাবে লুকোচুরি খেলে খেলে খালি হাতে সেদিন বাড়ি ফিরল সে।
পরদিন পুনরায় রওনা হয় বাজারে। বেলা অনেক হয়েছে। ছোট ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে ফকিরের মা বসেছিল। হঠাৎ ছুটতে ছুটতে এসে খবর দেয় হিরুঃ ও ফহিরের মা, শীগগীর বাজারে যাও ফহিররে মাইরা ফালাইলো। শীগগীর—
হঠাৎ বুঝতে পারেনি ফহিরের মা। কিন্তু বোঝা মাত্রই পড়ি কি মরি করে ছুটতে লাগলো বাজারের দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে যখন বাজারের ভেতর ছোট্ট জটলার কাছে এলো তখন চিৎকার শুনতে পেলো লোকের ঃ শালা চোর, বদমাশ! এইটুকুন পুলা, গিট্টে শয়তানী !
  মারো শালা মুখে লাথথি! ভূড়ি গলিয়ে দাও কুত্তাটার ! ভিড় ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকলো ফকিরের মা। ধুলোয় গা-হাত-পা মাখামাখি হয়ে মাটিতে অসহায়ের মত পড়ে আছে তার ক্ষীণশক্তির শিশু, একটি কিশোর—ফকির আলি। ঝুড়িটির পাত্ত নেই। ছেড়া প্যান্ট আরো ছিড়ে গেছে, শরীরে প্রহারের চিহ্ন ফুলে ফুলে উঠেছে। শরীরে শক্তি নেই, উঠে দাঁড়াবারও শক্তি নেই, পড়ে পড়েই লাথি খাচ্ছিল। ভিড় ঠেলে ঢুকেই ছেলের বুকে আছড়ে পড়ল ফকিরের মা। তারপর সামলে নিয়ে বুকে চেপে ধরে আশেপাশে তাকাল। ঠিক যেন অনেকগুলো চিল একটি ফুটফুটে মুরগি-ছানাকে ছো মারতে উদ্যত, আর ছানার মা তাকে ডানা দিয়ে ঢেকে রেখেছে !
ভিড়টা একটু পিছিয়ে গেল মেয়ে মানুষ দেখে। কিন্তু সেই সায়েবটি এবং কয়েকজন বীর তখনও ফুসছেনঃ শালার চোর! শয়তান! মাথা ভাইঙ্গা ফালামু!
ফকিরের মা হঠাৎ তীব্র ঝাঁঝ-মেশানো-গলায় ফকিরকে শুধায়ঃ সেদিন তাইলে তুই চুরি করসিলি! এ্যাঁ? তুই চোর!
ফকির তাকালো প্রথমে সকলের দিকে। তারপর মায়ের দিকে। তার মায়ের হাতে লেপটানো ছোট্ট শরীর থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু মা দেখলো তার চোখ মুখ ঠোঁট দৃঢ়ভাবে স্বাভাবিক। সে অভিযোগ অস্বীকার করলো না অথচ তার সমস্ত মুখে দোষ-স্বীকারের কোন চিহ্নও নেই।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য