ঐতিহাসিক প্রেতাত্মা - শ্রীধীরেন্দ্রলাল ধর

      ভূতের গল্প ছেলেবেলা থেকে শুনছি। কত জনের কত রকমের কাহিনি। কারো শোনা কথা আবার কারও-বা নিজের চোখে দেখা। কেউ অপঘাতে মরেছে তারপর ভূত হয়ে দেখা দিয়েছে, গয়ায় পিণ্ডদানের পর আর দেখা যায়নি। কেউ-বা খুন হয়েছে, তারপর হত্যাকারী ফাঁসিতে না ঝোলা পর্যন্ত তার বার বার আবির্ভাব ঘটেছে। কোথাও-বা অতর্কিতে প্রেতাত্মা কারও স্কন্ধে ভর করে অনেক গোপন কথা প্রকাশ করে দিচ্ছে। এমনি কত একক ভূতের কাহিনি। আবার দলবদ্ধ ভূতের আবির্ভাবের কথাও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার সৈনিকের ছায়া দেখা দিয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আণবিক বোমায় নিহত হিরোশিমা শহরের সমস্ত নগরবাসীদের জীবন্ত ছায়া দেখা গেছে, ইত্যাদি। মৃত্যুর পরে যে একটা দুর্বোধ্য লোক আর তার রহস্যের প্রতি মানুষের ঔৎসুক্যের অভাব নেই, প্রেতাত্মার কাহিনি সেই রহস্যলোককে আরও রহস্যময় করে তোলে, মানুষ তাই ভূতের গল্প বলতে ও শুনতে ভালোবাসে।
      সাধারণ ভূতের গল্প আমিও অনেক বলতে পারি, যে সব গল্প সারা রাত ধরে শুনলেও ফুরোবে না। তবে রাজা-বাদশার ভূত নিয়ে একটি গল্প আমি শুনেছি, সেই গল্পটিই বলি।
      ঘটনাটা আজকের নয়, আঠারো শতকের ব্যাপার। মারাঠাদের তখন প্রচণ্ড প্রতাপ, ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমপ্রান্ত থেকে তারা বার বার পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে হানা দিচ্ছে। দিল্লির বাদশা অবধি টাকা দিয়ে তাদের খুশি রাখতে উৎসুক। রাজস্থানের রাজপুতশক্তি ঘরোয়া বিবাদে নিঃস্ব ও শক্তিহীন। মধ্যভারত তখন রীতিমতো একটা অরাজক অঞ্চল। কোন রাজা যে কবে কোন রাজ্য আক্রমণ করবেন, কোন রাজা হেরে যাবেন ও তার রাজধানী লুষ্ঠিত হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। লড়াই ও লুঠের একটা ঝড়ো হাওয়া শান্তি ও স্বস্তি দেশছাড়া করে দিয়েছে।
     জয়পুরের মহারাজার সঙ্গে যোধপুরের মহারানার চলছিল বিবাদ। জয়পুরের মহারাজা ঈশ্বরী সিং কোনোমতেই সবদিক রক্ষা করতে পারছিলেন না। অনেকগুলি যুদ্ধে বার বার তিনি হেরে গেলেন, অনেক টাকার অপচয় হল, খানিকটা রাজ্যও ছেড়ে দিতে হল—মহারাজার মাথা গরম হয়ে গেল। ঈশ্বরী সিং কোনোদিনই খুব বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ছিলেন না। বুদ্ধিহীন বলে তার একটা অখ্যাতি ছিল। এখন সেই বুদ্ধিহীনতা রুক্ষ খামখেয়ালিতে রূপান্তরিত হল। কখন যে কি করে বসেন তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
      রাজসভায় চিরদিনই ক্ষমতার লড়াই চলে। যে যতখানি উচ্চপদে উঠতে পারবে তার ক্ষমতা তত বেশি হবে এবং সুযোগ-সুবিধা পেলে রাজাকে হটিয়ে দিয়ে সে-ই রাজসিংহাসনে বসতে পারে। রাজ বিচক্ষণ হলে সবাইকেই আয়ত্তে রাখতে পারেন, কিন্তু ঈশ্বরী সিংয়ের সে তীক্ষ্ণ ধীশক্তি ছিল না। তার রাজকার্য পরিচালনা করতেন প্রধান সামন্ত রাজা আয়ামল্ল ক্ষত্রী। আয়ামল্পের সমকক্ষ যোগ্য রাজনীতিজ্ঞ তখন জয়পুরে ছিল না। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে কেশবদাস ক্ষত্ৰী তার স্থান অধিকার করলেন। কিন্তু বয়স কম, যত বিচক্ষণতাই কেশবদাসের থাক না কেন, দরবারে তার যোগ্যতার সম্মান দেবার মতো স্থৈর্য মহারাজের ছিল না। সামন্ত হরগোবিন্দ মহারাজকে বুঝিয়ে দিলেন—কেশবদাস তার বাপের মতো নয়, যতটা বিশ্বস্ত বলে আপনি তাকে ভাবেন, সে সততা তার নেই। শত্রুপক্ষের সঙ্গে তার চিঠিপত্র চলছে, একটু সুযোগ পেলেই সে আপনাকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেবে।
      তাতে তার লাভ?—মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন—সে কি রাজা হবে নাকি? 
      সে কি হবে তা আমি জানি না, তবে যথেষ্ট অর্থলাভ ঘটবে এ সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ। ঈশ্বরী সিংয়ের সব চেয়ে বেশি ভয় ছিল তার ভাইয়ের কাছ থেকে। ছোটভাই উম্মেদ সিং পৈতৃক রাজ্য আধাআধি ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন। ঈশ্বরী তাতে রাজি হননি। উম্মেদ মারাঠা ও যোধপুরের মহারানার সাহায্যে অর্ধেক রাজ্য কেড়ে নিতে চাইছিলেন। হরগোবিন্দ বললেন–বোধ হয় উম্মেদকেই বসাবে আপনার সিংহাসনে।
      ঈশ্বরী সিং ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন—আমি না মরা অবধি তো আর তা সম্ভব নয়। আপনাকে মারতে আর কতক্ষণ লাগবে! কোনোরকমে আপনার খাদ্যে একটু বিষ মিশিয়ে দিতে পারলেই তো হল। কোনো যুদ্ধ অবধি করতে হবে না।
      মহারাজার ভ্রু কুঁচকে উঠল, বললেন—আমাকে বিষ দিয়ে মারবে, তার আগে আমিই ওকে বিষ খাইয়ে মারি না,—সব চুকে যাক।
      আপনি ভাবতে ভাবতে সে কাজ হাসিল করে ফেলবে। 
      বটে! আমি আজই ব্যবস্থা করছি। শয়তানকে সিংহাসনের পাশে জিইয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।
     মহারাজার আদেশে সেই রাত্রেই কেশবদাসের খাদ্যে বিষপ্রয়োগ করা হল। কেশবদাস মারা গেলেন। হরগোবিন্দের মনস্কাম পূর্ণ হল। তিনিই এবার রাজ্যের সর্বময় কর্তা হলেন। রাজসরকারে কেশবদাস যাদের চাকরি করে দিয়েছিলেন, মহারাজ তাদের মাহিনা দিলেন না। তারা এসে ধরল কেশবদাসের বিধবা-পত্নীকে, বলল-আমরা কেশবদাসের অধীনে চাকরি করতাম, আমাদের মাহিনা আপনাকে দিতে হবে। মহারাজ আমাদের মাহিনা দেবেন না।
     কেশবদাসের বিধবা কোনো বাদ-প্রতিবাদ করলেন না, তাদের মাহিনা দেবার জন্য সর্বস্ব বিক্রি করলেন, একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলেন।
     গোলন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক প্রবীণ সামস্ত শিবনাথ ভায়ার কাছে ব্যাপারটা বড় খারাপ ঠেকল, তিনি বললেন—মহারাজ, কাজটা ভালো করলেন না।
     কী, আমার সামন্ত হয়ে তুমি আমারই কাজের সমালোচনা করবে! আমি রাজপুত, রাজপুতেরা অন্যায়কে কোনোদিন ন্যায় বলে মেনে নিতে পারবে না। ঠিক আছে, রাজদরবারে তোমার আর স্থান নেই। তুমি কারাগারে যাও! শিবনাথ ভায়ার কারাবাসের আদেশ হল। দরবারে আর কেউ কোনো কথা বলল না। কিন্তু সবাই মনে মনে ক্ষুব্ধ হল। এ কী! কিন্তু রাজারাজড়ার অত্যাচার তখন প্রজারা স্বাভাবিক বলেই মেনে নিত। সাধারণ মানুষ জানত রাজাকে মেনে নিলে তার অত্যাচারকেও মেনে নিতে হবে। তার উপর রাজা যদি অস্থিরমতি হন তা হলে তো কথাই নেই। ঈশ্বরী সিংয়ের এই অনাচার অনিবার্য বলেই সবাই ধরে নিলে। কিন্তু মারাঠা রাজা মলহর রাও হোলকার এগিয়ে এলেন সৈন্য নিয়ে। কেশবদাস তার সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন, সেই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী কয়েক লক্ষ টাকা হোলকারের পাওনা। কেশবদাস থাকলে টাকাটা ধীরে ধীরে দেওয়া চলত, কিন্তু এখন টাকাটা একেবারে চাই।
হোলকার জয়পুর নগরের বাইরে এসে ছাউনি ফেললেন। ঈশ্বরী সিং তাকে খুশি করবার জন্য তাড়াতাড়ি দু’লাখ টাকা পাঠিয়ে দিলেন। হোলকার বললেন—দু’লাখ টাকায় কি হবে, সব টাকা চাই।
      দূত বলল—মহারাজ পরে আরো পাঠাচ্ছেন। 
     মহারাজের কথায় আমরা বিশ্বাস করি না। যার কথায় বিশ্বাস করতে পারতাম মহারাজ তাকে বিষ খাইয়ে মেরেছে!
    দূত ফিরে এল। হোলকার টাকা নিলেন না। মহারাজ মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন—কি করা যায়। সন্ধ্যার পর প্রাসাদের এক প্রশস্ত কক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠক বসল। অনেক দিক থেকে অনেক প্রশ্নের আলোচনা হল। শেষে সিদ্ধান্ত হল, পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে দূত যাক হোলকারের কাছে। হোলকার যদি টাকাটা নিয়ে ফিরে যায় তো ভালো কথা, কিন্তু যদি টাকা না নেয়, তাহলে মুখোমুখি লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
    সহসা কেশবদাসের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—হোলকার টাকা নেবেন না, যে টাকা নিয়ে যাবে মারাঠিরা তাকে হত্যা করবে!
      উপস্থিত সকলে চমকে উঠল। দেখা গেল মহারাজের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন কেশবদাস। ছায়া নয়, এ একেবারে অতি স্পষ্ট। সেই সাদা পিরান, সূক্ষ্ম জরির কাজ করা সাদা উত্তরীয়, মাথায় সাদা পাগড়ি, কানে হীরক-কুণ্ডল। সেই চোখ, সেই মুখ! এ যে জীবন্ত কেশবদাস। সবাই বিস্মিত হল, ভয় পেল।
      প্রবীণতম সামস্ত কেশবদাসের পিতৃবন্ধু বিদ্যাধর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিন্তু আর সবাইকার মতো অতটা ভীত হননি, তিনিই প্রথম কথা বললেন—আমরা তাহলে লড়াই করার জন্যই প্রস্তুত হই।
      লড়লে আপনারা হেরে যাবেন। মারাঠিদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিততে পারে এমন শক্তি হিন্দুস্থানের কোনো রাজার নেই। আপনারা যুদ্ধ করলে হেরে যাবেন!
      রাজপুতেরা হেরে যাবে মারাঠিদের কাছে? 
     আগেকার দিন আর নেই—কেশবদাস বললেন—এখন সওয়ারে-সওয়ারে তলোয়ারে-তলোয়ারে লড়াই নয়, এখন কামানের লড়াই। একটা ভালো গোলন্দাজ এখন এক হাজার লোককে শেষ করে দিতে পারে।
      আমাদেরও তো কামান রয়েছে। 
      থাকলেও আপনারা হেরে যাবেন।
      কেন? 
    আমি আপনাদের জিততে দেব না। পুরুষানুক্রমে রাজবংশের সেবা করেছি, তার পুরস্কার আমি কি পেয়েছি? আমাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে, আমার বাড়িঘর, জিনিসপত্র বিক্রি করে সৈন্যদের মাইনে দিতে হয়েছে, আমার স্ত্রীপুত্র আজ পথের ভিখারী! এই অন্যায়ের আমি শেষ করব। মহারাজ ঈশ্বরী সিংকে আমি সিংহাসন থেকে নামিয়ে আনব সাধারণ মানুষে, আমার স্ত্রীপুত্রের সঙ্গে সমপর্যায়ে। যুদ্ধে আপনাদের পরাজয় অনিবার্য।
     তাহলে এখন আমরা কি করব? কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। যাকে প্রশ্ন করা হল, দেখা গেল তার ছায়া মিলিয়ে গেছে। ভয়ে বিস্ময়ে সবাই বিমূঢ় হয়ে রইল কিছুক্ষণ।
     এরপর আর আলোচনা জমল না। মহারাজ কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়লেন, তারপর সহসা আলোচনার মাঝে উঠে পড়ে বললেন—আপনারা আলোচনা করে স্থির করুন। আপনারা যা বলবেন, আমি তাই করব। কাল সকালে আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত আমায় জানাবেন।
     মহারাজ উঠে চলে এলেন প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানে। বাগানের চারিপাশে ছড়ানো শ্বেতপাথরের আসন। মহারাজ একেবারে একপ্রান্তে একটি আসনে গিয়ে বসলেন। সামনে একটা পুষ্পকুঞ্জ। কয়েকটা গোলাপ গাছ। আকাশে পূর্ণচন্দ্র। পৌষমাসের শীতের দমকা হাওয়া চারিপাশ শান্ত স্নিগ্ধ করে তুলেছে। কিন্তু মহারাজার মনে স্নিগ্ধতার কোনো আমেজ নেই। শূন্যদৃষ্টিতে তিনি সামনের পানে তাকিয়ে আছেন, সেখানে নক্ষত্ৰখচিত আকাশ ছাড়া আর কিছু নেই। সেই আকাশের পানে তাকিয়েই মহারাজ বসে আছেন, সামনের সুন্দর রক্তগোলাপগুলির পানেও তার এতটুকু দৃষ্টি নেই। কেশবদাসের প্রেতাত্মার আবির্ভাবে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছেন। প্রেতাত্মা যে এমনভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, এমনভাবে কথা বলতে পারে, এ তো বিশ্বাস করতে মন চায় না। কিন্তু কেশবদাস তো সত্যই আজ এসেছিল, সবাই শুনেছে সবাই দেখেছে।
      সহসা মহারাজ চমকে উঠলেন। বাগানের লাল পথ দিয়ে এগিয়ে আসছে, ও কে? কে ও?
      কেশবদাস?
      ছায়া সামনে এসে দাঁড়াল, মহারাজও আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন। তলোয়ারের হাতলটা চেপে ধরলেন।
     কেশবদাস কিছু বলল না, চুপ করে তাকিয়ে রইল। মহারাজ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সহসা কেঁপে উঠলেন, চিৎকার করে উঠলেন—কি চাও?
      মৃত্যু!
      মৃত্যু?
      আপনাকে মরতে হবে।
      ছায়া এগিয়ে এল, মহারাজ তাড়াতাড়ি দু’পা পিছিয়ে গেলেন।
      ছায়া আরো এগিয়ে এল, মহারাজ আরো দু’পা পিছিয়ে গেলেন।
      ছায়া আরো এগিয়ে এল, মহারাজ চকিতে তলোয়ারখানি টেনে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলেন। মুহুর্তমধ্যে ছায়াটি মিলিয়ে গেল। মহারাজ আর সেখানে দাঁড়ালেন না, দ্রুতপদে ফিরে এলেন প্রাসাদে ।
     বিদ্যাধর তার জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন, বললেন—এইমাত্র সংবাদ পেলাম হোলকার সসৈন্যে এগিয়ে আসছেন। কাল প্রত্যুষেই তারা নগর-তোরণে এসে পৌছাবেন। যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি নেই। আমি সৈন্যদের প্রস্তুত থাকতে আদেশ দিয়েছি।
     বেশ করেছেন—বলে আর কোনো কথা না শুনে মহারাজ অন্তঃপুরের দিকে চলে গেলেন। সামন্ত বিদ্যাধর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এতবড় গুরুতর বিষয়ে এমন সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি ব্যথিত হলেন।
     নিজের ঘরে গিয়ে মহারাজ শয্যায় শুয়ে পড়লেন। পরিচারককে ডেকে বললেন-রাত্রে আর কিছু খাব না, শরীর খারাপ।
      মহারাজ চুপ করে শুয়ে রইলেন শয্যার উপর।
      সহসা দেয়ালের গায়ে আবার সেই ছায়ামূর্তি। মহারাজ শয্যার উপর উঠে বসলেন। ছায়ামূর্তি বলল—যুদ্ধে তোমার পরাজয় অনিবার্য। হোলকার একবার তোমাকে ধরতে পারলে তোমার মাথা কেটে নেবেন। কেশবদাসের হত্যা তিনি ক্ষমা করবেন না। তার চেয়ে সসম্মানে বিষপানে আত্মহত্যা করা ভালো।
      আমি বিষ খাব? না না, আমি বিষ খেতে পারব না।
      ছায়ামূর্তি হাসল। সাদা দাঁতের পাটি চিক চিক করে উঠল।
      ছায়ামূর্তি মিলিয়ে গেল। মহারাজ অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে পদচারণা করতে শুরু করলেন।
     সহসা কোন একসময় মহারাজ পরিচারককে ডাকলেন, বললেন--একটা কাজ করতে হবে গোপনে, কেউ না জানে।
      আদেশ করুন।
      একটা কেউটে সাপ নিয়ে আসতে হবে।
      এখনই?
      এখনই আজ রাত্রেই এই নাও আমার পাঞ্জা ।
      রাজা তাকে পাঞ্জা দিয়ে দিলেন। পরিচারক চলে গেল।
      পরদিন প্রত্যুষেই হোলকার বাহিনী জয়পুর অবরোধ করল। নগরমধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। সামস্তেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে সমবেত হলেন রাজসভায়। কিন্তু মহারাজ কোথায়? অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও এই আসে এই আসে করে বেলা প্রথম প্রহর অতীত হল, তবু মহারাজের দেখা নেই। শেষে বিদ্যাধর সামস্ত মহারাজকে ডাকতে লোক পাঠালেন। লোক এসে খবর দিল—মহারাজ এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি।
      এখনও ঘুমুচ্ছেন? সে কি? তাকে ডাকতে বল, এখনই লড়াই বেধে যাবে আর তিনি এখনও ঘুমুচ্ছেন!
     এবার দৌবারিক এসে খবর দিল,—মহারাজ আত্মহত্যা করেছেন। কাল রাত্রে কেউটে সাপের কামড়ে তিনি প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন।
      সামন্তেরা সংবাদ শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
     যুদ্ধ আর হল না। দুজন প্রবীণ সামস্ত হরগোবিন্দ ও বিদ্যাধর তখনই ছুটলেন মলহর রাও হোলকারের শিবিরে। হোলকার সংবাদ শুনে বললেন—কেশবদাসের মৃত্যুর প্রতিশোধ হল।
      বিনা বাধায় মারাঠারা জয়পুর অধিকার করল।*
* Fall of Mughal Empire—Jadunath Sarkar. (12th Dec., 1950)

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য