রাজপুত্র - রশীদ হায়দার

      যেই দেখুক, চোখ তুলে একবার তাকাবেই। তাকিয়েই যে চোখ নামিয়ে নেবে, এমন নয়; বারবার, খুঁটে খুঁটে মাথার ওপর চুলটা থেকে পায়ের আঙ্গুলের নখ পর্যন্ত দেখে বলবে—রাজপুত্রের মতো চেহারা। এখনই যদি রাজভাণ্ডার থেকে জড়ির জুতো, পাজামা, পাঞ্জাবী, পাগড়ি এনে বলা যায়—সাধন এগুলো পরোতো ! ব্যস, দেখতে দেখতে সাধন প্রিন্স অব জলপাইগুড়ি বা জলপাইগুড়ির কুমার বাহাদুর হয়ে যাবে। দেখে মনেই হবেনা, এই কিছুক্ষণ আগেও ছেঁড়া গেঞ্জি ও ছেঁড়া খাকি হাফপ্যান্ট পরে থাকার জন্যে একটা ভিখিরির মতো চেহারা ছিল ওর।
      সাধনের বাড়ি জলপাইগুড়ি ছিল বলেই জলপাইগুড়ির কুমার বাহাদুর বলে সম্বোধন করলাম। কিন্তু ওর বয়েস বেশি নয়। মনে হবে নয় পার হয়েছে দশ ছুঁই ছুঁই করছে, অথবা কেবল নয়ের গোড়ার দিকে। এই বয়সেই রাজপুত্র হলে সবাই বলতো, ছোট কুমার বাহাদুর, ইয়াংগেস্ট। কিন্তু তা হয়নি। না হয়ে হয়েছে এক কস্ট্রাক্টরের ছেলে। চেহারা পেয়েছে রাজপুত্রের মতো, কিন্তু রাজপুত্র উপাধি পায় নি। পরে ছেড়া গেঞ্জি ও ময়লা খাঁকি প্যান্ট। তাতে তালিও আছে, আবার ছেড়া জায়গায় সেলাইও নেই।
      সাধনরা যেদিন আমাদের পাড়ায় এলো, তখন সবাই একবাক্যে বললো,
      ছেলে তো নয়, হীরের টুকরো।
      সাধনের মা কমলা হেসে বলে,
      আপনারা দোয়া করবেন।
     ‘আপনারা দোয়া করবেন’ কথাটা যত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে লিখলাম, কমলা কিন্তু তত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে বলেনি। তার বাংলা উচ্চারণ ভাঙা ভাঙা, যেমন করে বলতে চায় তেমনটি না হয়ে অন্যভাবে জিবের ফাঁক দিয়ে কথা দুষ্টু ছেলের মতো ছুটে বেরিয়ে যায়। আমরা শুনে হাসি। সাধনের মা বুঝতে পারে, কিন্তু লজ্জা পায়না, মিটমিট করে হাসে।
      আমরা হাসি সাধনের মা ভালো করে কথা বলতে পারে না বলে, আর বড়রা হাসে আজিজ সাহেবের নতুন বউ দেখে। আজিজ সাহেবের আগের বৌ আছে, তার তিনটি ছেলে ও দুটি মেয়ে আছে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, বড় ছেলের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তারা যখন পাবনায় এলেন জলপাইগুড়ি থেকে, তখন কমলা ও সাধনও এলো। ওখানে থাকতেই আজিজ সাহেব কমলাকে বিয়ে করেছিলেন। আর পাবনার শচীন চৌধুরীর সঙ্গে বাড়ি বদল করে যখন চলে এলেন, তখন সাধনের বয়স ওই নয় দশের কোঠায়।
      প্রথমদিনই সাধনের মার মুখে আমি হাসি দেখেছি। খুব যে জোরেসোরে হাসে তা নয়, হাঁসলে দাত কখনো দেখা যায়, কখনো যায়না, মনে হয় খুব গরমের দিনে খানিক ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গেল। বেঁটেখাটো মানুষটি, চোখ ছোট ছোট, গায়ের রং ফরসা ধবধবে এবং চুলগুলো জলপ্রপাতের মতো। এমন মায়ের ছেলে সাধন, গায়ের রং আর চেহারা পেয়েছে বাবার। আজিজ সাহেব দেখতে সুন্দর ও যথেষ্ট লম্বা চওড়া। সাধনকে তাই রাজপুত্র বললে কম বলা হয়না।
       প্রথমদিনই সাধনের মার মুখে যে হাসি দেখেছি, সে হাসি কোনোদিন মিলিয়ে যেতে দেখলাম না। মানুষ আত্মীয় স্বজনের কথা মনে করেও মন খারাপ করে, চোখের পানি ফেলে, নিরালায় মুখ গম্ভীর করে বসে থাকে। কিন্তু কমলা?
মা জিজ্ঞেস করেছিলেন,
      হ্যাঁ কমলা, তোমাদের বাড়ি কি জলপাইগুড়িতেই?
      হ্যাঁ।
      ওখানে তোমার কে কে আছে?
      মা, বাবা, এক ভাই ও তিন বোন।
      মা বাবা ভাই বোনের কথা মনে পড়ে না?
      মনে পড়লে কি করব? ফিরে তো আর যেতে পারব না!
      হয় তো ফিরে যেতে পারবে না মনে করেই কমলা দুঃখ করে না। জলপাইগুড়ির পাহাড়ি এলাকায় তাদের ঘরবাড়ি ছিলো, ঘরের চালে আকাশ ছিলো আর চা বাগানে কাজ ছিলো; তারা সবাই সেখানে কাজ করত, মিলেমিশে, হাসিখুশীভাবে। সেই খুশী ও স্বাধীনতার দিনগুলো তখন সাধনের মার জীবন থেকে হারিয়ে গেলেও কেবল সাধনের দিকে তাকিয়ে বলে,
      আমার সাধন আছে, আমার আর চিন্তা কি? বলেই ফিক করে হেসে ফেলে।
     আমার মনে হয় মানুষের দুঃখ কষ্ট সহ্য করার জন্যে আলাদা একটা মন থাকে। নইলে সাধন হতে পারতো প্রিন্স অব জলপাইগুড়ি, না হয়ে হয়েছে আজিজ কন্ট্রাক্টরের ছেলে, যে লোক ভুলেও বুঝি তার ছেলের দিকে তাকায় না, তার ছেঁড়া ফাটা পোষাকটা বদলে দেবার কথা মনেও আনে না। সাধন কিংবা তার মার এজন্যে কোনো অভিযোগ নেই। সাধন, বলা চলে দিন রাত আমাদের বাসাতেই থাকে, আমার ছোট ভাই রোকনের সাথে খেলা করে।
      একদিন দেখলাম, সাধন একটা ইট মাথায় করে তাতানে রোদে দাঁড়িয়ে আছে। অদূরে, রোকন কাগজের ঠোঙ্গা থেকে কি যেন বের করে করে খাচ্ছে। আমাকে দেখেই রোকন দৌড়ে পালিয়ে গেল। সাধনকে জিজ্ঞেস করলাম,
      কি রে, তুই ইট মাথায় করে দাঁড়িয়ে কেন?
      রোকন আমাকে চানাচুর খাওয়াবে।
      চানাচুর খাওয়ার জন্যে ইট মাথায় করে দাঁড়িয়ে? আমার এ প্রশ্নের জবাব সাধন দিতে পারে না। ইটটা তাড়াতাড়ি ফেলে দিয়ে, চুপ করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলো। কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করি,
       রোকন তোকে আজকেই না আরো এমনভাবে কষ্ট দিয়েছে? মনে হলো, আমারই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস হারিয়ে ফেলেছে সাধন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো, চোখ দুটো টানা টানা, মণি দুটো কালোয় কালোয় চক চক করছে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলি,
      কিরে, বললি না তো ?
      আমাকে একদিন পিঁপড়ের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো,একদিন সর্দি  খাইয়েদিয়েছিলো আরেকদিন অনেকক্ষণ চোখ বেঁধে রেখে দিয়েছিলো।
      আচ্ছা, ঠিক আছে। রোকনকে মজা দেখাচ্ছি। আচ্ছা তোকে এমন করে শাস্তি দেয় কেন? আমাকে যে আইসক্রিম খাওয়ায়,চিনেবাদাম খাওয়ায়, চানাচুর দেয়। লক্ষ্য করলাম, খাবার জিনিসের নামগুলো বলার সাথে সাথে একটা ক্ষুধার ছায়া ওর চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন চোখের মণি দুটো অনবরত ঘুরে ঘুরে খাবার জিনিসগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছে।
      সেইদিনই রোকনকে সাধনের মার সামনে শাস্তি দিলাম। কমলা তাড়াতাড়ি ছুটে এসে রোকনকে হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
      ছিঃ বাবা, ওরা ছোট ছেলে, ওদের কি দোষ ধরতে আছে?
      তাই বলে আমন কষ্ট দেবে কেন?
     একটু কষ্ট পেলেও তো সখের জিনিসগুলো খেতে পায়। আমি তো দিতে পারি নে। কথাগুলো বলতে সাধনের মার মুখে কোনো বেদনাই লক্ষ্য করি নি, বরং একটা মিষ্টি হাসির ছটা তার মুখটাকে যেন আলোকিত করে রেখেছে। অথচ ছেলে খেতে পায় না, এবং পেলেও এভাবে কষ্ট পায় মনে করে কমলার কাঁদা উচিত ছিলো। কিন্তু কি দিয়ে যে ওর মন তৈরী হয়েছে—হয়ত পাহাড়ি এলাকার পাথুরে ছোয়া ওর মন থেকে যায় নি বলে সহজে চোখ দিয়ে পানি বেরোয় না।
      আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে সাধনের মা
     ছোটবেলা থেকে কষ্ট করতে শেখা ভালো। আমাদের জলপাইগুড়ির পাহাড়ে পাহাড়ে কাজ করতে খুব কষ্ট হতো, তাও তো করতে হতো !
      আমরা যারা ওখানে উপস্থিত ছিলাম, কারো মুখ দিয়ে কথা বেরোয়নি। মানুষের মন যে কতোভাবে গঠিত হয়, তা ভেবে ভেবে আকুল হয়ে গেলেও হদিস পাওয়া যায় না। শুনেছি, আজিজ কন্ট্রাকটরের বাসায় একজন ঝি চাকরানীর যতোটা কাজকর্ম করতে হয়, কমলাকেও ঠিক ততটাই, এমন কি বেশিও করতে হয়। প্রায় সবসময়ই রান্নাঘরের ধোয়াকালির মাঝে ডুবে থাকতে হয় তাকে, আর একটু ফুরসৎ পেলেই আমাদের বাসায় চলে আসে, তখন দেখে মনেই হবে না, এইমাত্র কাজে কর্মে তার আর বাইরে বেরুনোর উপায় ছিল না।
      মা জিজ্ঞেস করেন, 
      তোমাকে এতোটা খাটায়, তুমি কিছু বলতে পারো না?
      কৈ খাটায়? যে কাজ করি, তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ দেশে করতে হতো। আর এতো ঘরে বসেই কাজ করি।
      কথাগুলো শেষ করে কমলা সুন্দর দু'পাটি দাঁত বের করে ঝির ঝির করে হেসে ফেলে।
      আচ্ছা কমলা, তুমি যে আমাদের বাসায় আসো ওরা জানে না? 
      জানে। 
      কিছু বলে না তোমাকে? 
     বলে, কিন্তু কানে তুলি না। কানে তুললে যদি ঝগড়া বাঁধে? ঝগড়া হওয়া ভালো? ঝগড়া হলে আমার সাধনকে যদি ভাত না দেয়?
      একটার পর একটা প্রশ্ন তুলে কমলা, হাসিমুখে চেয়ে রইলো, ভাবখানা এত বড় একটা সমস্যার কথা আদৌ চিন্তা না করে মা কথাটি তুলেছিলেন, সে সেটার অতি সহজে সমাধান করে দিলো।
     ঠিক সেই সময় সাধন এলো আইসক্রিম খেতে খেতে। গায়ের গেঞ্জিটা ঝুলে পড়েছে—ময়লা, ছেড়া প্যান্ট আর মাথায় তেলের নেই বালাই—মনে হচ্ছে এইমাত্র কাদামাটির ভেতরে গড়াগড়ি দিয়ে এলো। কমলা হেসে সাধনকে বললো, 
      আইসক্রিম কে দিলো রে?
      আমি কিনেছি।
      তুই কিনেছিস? পয়সা পেলি কোথায়?
      তোমার বিছানার নিচে দুই আনা পয়সা ছিলো, তাই দিয়ে আমি দুটো কিনে একটা রোকনকে দিয়েছি, আর একটা আমি। তাই না রোকন?
      রোকন মাথা নেড়ে সায় দেয়।
      কমলা বেশ জোরে হেসে বলে,
      এখনই যদি চুরি করা শিখিস, বড় তো হসইনি।
      তোমার কাছে পয়সা চাইলে দাও না। আর রোজ রোকনই তো খাওয়ায়। আজকে আমি রোকনকে খাইয়েছি। তাই না রোকন? মা জানো, আজকে যে আইসক্রিমটা কিনেছি, খুব মিষ্টি, খুউব মিষ্টি, না রোকন? আজকে আমি রোকনকে খাইয়েছি।
      সাধন আর কথা বলতে পারছে না। খুশী জোয়ারের পানির মতো তার চোখ মুখ ছাপিয়ে উপচে পড়ছে, আর কমলা ছেলের খুশীর সাথে সাথে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে, কাঁদতে কাঁদতে একসময় সে ফোঁপাতে থাকে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ফোলা-ফোলা চোখ মুখ আরো ফোলা-ফোলা হয়ে যায়, মনে হয় সে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিলো।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য