অজেয় দুই ভাই - আদিবাসী লোককথা

     আদি দেবতা ও আদি দেবীর দুই ছেলে। তারা যমজ ভাই। একজনের নাম হুনহুন-আহপু, আর অন্যজনের নাম ভুকুর-হুনাপু। এই দুজনের মতো অসাধারণ খেলোয়াড় সেই এলাকায় কেউ ছিল না। সেই এলাকায় বলি কেন, গোটা দুনিয়াতেই এমন খেলোয়াড় ছিল না। লাঠি দিয়ে তারা গোল বল খেলত,—সেই খেলাতেই ছিল সবচেয়ে পটু। অন্য খেলাতেও তারা হার মানত না।
     একদিন দুজনে এমন জোরে বল মারল যে সেটা গিয়ে পড়ল পাতালে। সেই এলাকায় রাজত্ব করত দুজন। হুন-কামে আর ভুকুব-কামে। তাদের রাজত্বে বল পড়ার খবর পেয়ে তারা ভাবল, ওদের দুজনকে যদি লোভ দেখিয়ে কিংবা ভুলিয়ে এখানে নিয়ে আসা যায় তবে ওদের মেরে ফেলা যাবে। তারা তখন চারজন দূতকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিল, চারজনেই গেল পেঁচার রূপ ধরে। উড়ে চলেছে চার পেঁচা।
      তারা ভাই দুজনের কাচে গিয়ে বলর,‘পাতালে আমাদের রাজ্য হল জিবালবা। রাজকুমাররা বলখেলায় তোমাদের দুজনকে আহ্বান করেছে। তোমরা তাদের কিছুতেই হারিয়ে দিতে পারবে না।
      কি, এই কথা? যারা বড় খেলোয়াড় তারা কি আর এই কথায় রাজি না হয়ে পারে? পাতালে যাওয়ার জন্য তারা তক্ষুনি তৈরি হয়ে নিল।
     পেঁচারা আগে, পেছনে যমজ ভাই। খাড়া পাহাড়, অন্ধকার গুহা, ঘন বন পেরিয়ে তারা চলেছে। একবার পেরিয়ে গেল এক রক্তনদী। তারপরেই পাতাল রাজ্য জিবালবা।
     তারপরে দুজনে ঢুকল রাজপ্রাসাদে, পাশে রয়েছে চার পেঁচা।
     প্রাসাদে ঢুকে যমজ ভাই দেখল, অতুল ঐশ্বর্যের মধ্যে সিংহাসনে পাশাপাশি বসে রয়েছে পাতালপুরীর দুই রাজকুমার। যমজ ভাই মাথা নিচু করে অভিবাদন জানাল। যাদের কাছে তারা অতিথি হয়ে এসেছে তাদের তো সম্মান জানাতেই হবে।
     মাথা তুলেই যমজ ভাই হাসির শব্দ শুনতে পেল। তাদের দেখে কারা যেন হাসছে, হাসির মধ্যে ঠাট্টার সুর। যমজ ভাই ভালোভাবে সামনে চেয়ে দেখল, সিংহাসনে যে দুজন বসে রয়েছে তারা জীবন্ত রাজকুমার নয়। কাঠখোদাই করে তাতে রং লাগিয়ে ঠিক আসল রাজকুমারদের মতো মূর্তি বানিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পাতালপুরীর লোকেরা তখনও হাসছে।
     দুই ভাই চুপ করে গেল, রাগে লাল হয়ে উঠল, চোখে আগুন ঝরিয়ে তাদের দিকে চাইল। তাদের হাসি থেমে গেল, তারা যমজ ভাইদের আসনে বসতে বলল। সুন্দর দুটি উঁচু আসন পাশাপাশি রয়েছে।
     যমজ ভাই আসনে বসেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। আসন ছেড়ে সামনে লাফিয়ে পড়ল। পাথরের আসন তেতে আগুন হয়ে রয়েছে। অতিথি দুজনের যন্ত্রণা আর দুর্দশা দেখে ওরা হেসে গড়িয়ে পড়ল, আনন্দে লাফিয়ে উঠল, হিহি-হাহা করে পাগলের মতো হাসতে লাগল। ভাই দুজন মেঝেতে তখনও ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তারপরে তারা যমজ দুই ভাইকে অন্ধকার ঘরে নিয়ে গেল, সেখানে তাদের মেরে মাটির তলায় পুতে দিল।
     এদিকে হয়েছে কি, পাতালে জিবালার রাজকন্যা ভালোবেসেছিল হুনতুন-আহপুকে। কাউকে না জানিয়ে তারা বিয়েও করে ফেলেছিল। কেমন করে যেন রাজকন্যার বাবা পাতালরাজ সেটা জেনে ফেললেন।
      রাগে কাপতে কাঁপতে রাজা পেঁচা-দূতদের আদেশ দিলেন, ‘রাজকন্যাকে মেরে ফেলে ওর হৃদপিণ্ড এখুনি নিয়ে এসো।
     পেঁচা-দূতরা রাজকন্যার কাছে গেল। কিন্তু কান্নাভেজা গলায় রাজকন্যা বলল,‘আমায় তোমরা মেরো না, এত নিষ্ঠুর কেন হবে? আমি অন্যায় তো কিছু করিনি!
     দূতেরা তাকে ছেড়ে দিল। রাজকন্যা পাতাল ছেড়ে ওপরের পৃথিবীতে পালিয়ে এল। সোজা চলে এল হুনহুন-আহপুর মায়ের কাছে। সেখানে তার যমজ ছেলে হল। ছেলে দুটির নাম রাখা হল হুন-আপু ও জবালানকি।
     হুনতুন-আহপুর আর একটা বউ ছিল। সে এই বউকে আগে বিয়ে করেছিল। এই বউয়েরও দুটো ছেলে হয়েছিল। তাদের নাম হুনবাজ ও হুনচাউয়েন। ছোট যমজ দুই ভাই একই সঙ্গে বড় হতে লাগল। কিন্তু ছোট দুটো ছেলে বড় বেশি কান্নাকাটি করত, চিৎকার-চেঁচামেচিতে বাড়ি মাথায় করে রাখত। ঠাকুমা এত অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছে না, সে-ও রেগে উঠত। শেষকালে আর সহ্য করতে না পেরে দুই নাতিকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। বাইরের দুনিয়ায় রোদে-জলে তারা বেড়ে উঠল আর দিনে দিনে তাদের দেহ হল বিরাট আর শক্তিও খুব। পাহাড়-বনে ঘুরে ঘুরে তারা মস্ত শিকারি হয়ে উঠল। তীর লক্ষ করে যাকেই বিদ্ধ করতে চাইত, ঠিক তার গায়ে লাগত। তারা এক ধরনের ধনুক ব্যবহার করত। মধ্যে ফাঁপা সোজা লম্বা নল, তার মধ্যে বিষমাখানো তীর ঢুকিয়ে পেছন থেকে ফুঁ দিত, আর তীর ভীষণ বেগে বেরিয়ে লক্ষে বিধত।
      গাঁ ও আশেপাশের সবাই ছিল তাদের ভক্ত। সবাই তাদের খুব তারিফ করত। বিপদে পড়লে তাদের সাহায্য চাইত। যমজ ভায়েরা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে অন্যদের সাহায্য করত। তারা আবার ঠাকুমার চোখের মণি।
      ঠাকুমার কাছে থেকে ছোট দুই ভাইকে হিংসে করলেও তারা ছিল খুব ভদ্র, খুব দয়ালু। তারা সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত, মিষ্টি গলায় গান গাইত। ঠাকুমা তাদের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেত। শুধু একটাই দোষ, তাদের মনে খুব হিংসে।
বড় দুই ভাই কিছুতেই সহ্য করতে পারত না, ছোট দুজন কেন এত সুখে শাস্তিতে থাকবে। তারা বারবার ছোট দুজনের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারল না। কেননা, ছোট দুজন মায়ের কাছ থেকে জাদুশক্তি পেয়েছিল, দাদাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। তাদের মা তো ছিল পাতালরাজ্য জিবালবার রাজকন্যা। যমজ ভাই দুজন মায়ের কাছে শিশুবেলাতেই অনেক জাদু শিখেছিল। শেষকালে দাদাদের ওপর বিরক্ত হয়ে তারা জাদু প্রয়োগ করল আর বড় দুই ভাই বানর হয়ে গেল।
      ঠাকুমা যেই শুনল, তার আদরের দুই নাতি বানর হয়ে গিয়েছে, তখন কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, ওগো ছোট দুই নাতি, একবার ওদের দেখতে দাও, দয়া করে ওদের আগের রূপে আসতে দাও। ওদের বানর থেকে মানুষ করে দাও।
ছোট দুভাই বলল, “বেশ তাই হবে। কিন্তু একটা কথা, ঠাকুমা, তুমি যদি ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে না হাসো তবে ওরা মানুষ হয়ে যাবে।
      ঠাকুমা ভাবল, ‘এতো খুব সহজ কাজ। ওদের দেখে হাসব কেন? দুই বানর ঠাকুরমার সামনে এল। অদ্ভুত মুখভঙ্গি, হাত বেঁকিয়ে পিঠ চুলকোচ্ছে, একজন আরেকজনকে খোঁচা মারছে, দাঁত খিচিয়ে উঠছে, চোখ পিটপিট করছে। এই বাঁদরামি দেখে ঠাকুমা আর হাসি চাপতে পারলনা, হেসে ফেলল। হেসে গড়িয়ে পড়ল। তিনবার চেষ্টা করল ঠাকুমা, গম্ভীর হয়ে তাকাবার চেষ্টা করল। না, পারল না। তিনবারই ঠাকুমা হেসে ফেলল। ঠাকুমা তার দুই নাতি হুনবাজ ও হুনচাউয়েনকে আর মানুষের রূপে পেল না। তারা বানর হয়েই থাকল। আর মুক্তি পেল যমজ দুই ভাই। তাদের আর কেউ বিরক্ত করবে না, শাস্তি দেবার চেষ্টা করবে না।
     তারা অপূর্ব গান শিখল। তাদের সুরে সবাই অবাক হয়ে যেত। এমন গান কেউ আগে শোনেনি। সবচেয়ে ভালো সুরের নাম হুন আপুর বানর। এই সুরটাই তাদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ।
     তখন থেকে যমজ দুজন ঠাকুমার সব কাজ করে দিত। এছাড়া তারা বনে-পাহাড়ে শিকার করত, খেতে ফসলের কাজ করত, আর জাদুর বলে সব কাজই তাড়াতাড়ি খুব ভালোভাবে করতে পারত। গমের মাঠে খুব পরিশ্রম, কিন্তু যাদের কাছে যাদু রয়েছে, তাদের অল্প সবয়েই সব কাজ হয়ে যেত। বাকি সময়ে তাদের অদ্ভুত তীর-ধনুক নিয়ে তারা শিকার করে বেড়াত। দিনের বেলা তারা যন্ত্রপাতি দিয়ে গাছপালা উপড়ে ফেলত আর রাতের বেলা সব বুনো পশু একসঙ্গে হয়ে আবার সেইসব গাছপালা ঠিকঠাক পুতে দিত। বারবার এরকম হতে দেখে দুই ভাই ফাঁদ পেতে আড়ালে লুকিয়ে থাকল। কিন্তু পশুরাও খুব বুদ্ধি ধরে। কেউ ফাঁদে পড়ল না, শুধু হরিণ আর খরগোশের লেজ কাটা পড়ল আর ফাঁদে পড়ল শুধু একটা ছোট্ট ইঁদুর। দুই ভাই একটা কাপড়ে বঁধিল, কিন্তু এত ছোট্ট প্রাণী দেখে তাদের দয়া হল। তারা ইঁদুরকে বনে ছেড়ে দিল।
      তখন ইঁদুর বলল, “তোমরা যে দয়া দেখালে তার বদলে আমি তোমাদের কিছু বলব। আমি তোমাদের বলব, তোমাদের বাবা আর তার ভাই কি সাহসের সব কাজই না করেছে। আমি তোমাদের জানাব, তাদের কি হয়েছে। তোমাদের যদি সেরকম কিছু ঘটে তবে কীভাবে মুক্ত হতে পারবে তাও আমি তোমাদের জানিয়ে দেব।
      তখন ইঁদুর সব খুলে বলল। তাদের বাবা হুনতুন-আহপু ও তার ভাই ভুকুব-হুনাপুর গল্প। তারা বুঝল, কীভাবে পাতাল রাজ্যের লোকেরা তাদের ভুলিয়ে নিয়ে যায় আর তারপরে তাদের মেরে ফেলে। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে দুই ভাই অনেকক্ষণ ধরে কাঁদল। কান্না থামিয়ে তারা বাবার গোল বল খেলার কথা চিন্তা করতে লাগল। তারাও ওরকম খেলোয়াড় হতে চায়। কিন্তু সে বল আর লাঠি পাবে কোথায়?
      ইঁদুর বলল, “কোন ভাবনা নেই, আমি জানি। সেই বল আর লাঠি আছে তোমাদের ঠাকুমার বাড়িতে। ঠিক কোথায় আছে, কেমন করে তা পাবে আমি বলে দিচ্ছি। মন দিয়ে শুনে নাও।
        ইঁদুর সব বলে দিল। দুই ভাই তক্ষুনি ঠাকুমার বাড়িতে ফিরে এল। খুঁজে পেল বল আর লাঠি। আর তখন থেকেই শুরু করে দিল সেই খেলা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তারা তাদের বাবার মতো মস্ত খেলোয়াড় হয়ে উঠল। খোলা মাঠে পাতাল রাজ্য জিবলবার খুব কাছে তারা খেলত। এখানেই তার বাবা-কাকাও খেলত। খেলার শব্দ শুনতে পেল পাতাল রাজ্যের দুজন রাজা হুন-কামে ও ভুকুব কামে। তারা ঠিক করল, লোভ দেখিয়ে ওদের দুজনকে এখানে নিয়ে আসতে হবে। আর তারপর যেমনভাবে যে জায়গায় বাবা-কাকা গিয়েছে সেখানে পাঠাতে হবে।
        পেঁচা-দূত খবর নিয়ে এল, লড়তে হবে। সঙ্গে সঙ্গে যমজ দুভাই রাজি। জিবালবায যাওয়ার জন্য তারা তৈরি হল।
     ঠাকুমা তো তাদের কিছুতেই ওই সর্বনেশে জায়গায় যেতে দেবে না। ঠাকুমা কাঁদতে লাগল। শেষকালে দুই ভাই উঠোনে একটা বেতগাছ পুতে দিল। বলল, বেতগাছ যদি লকলক করে তবে জানবে আমরা বেঁচে আছি আর গাছ যদি শুকিয়ে ওঠে তাহলে জানবে বিপদে পড়েছি।
      হুন-আপু তার পায়ের একটা লোম ছিড়ে হরিণকে দিল, হরিণ জিবালাবার পথে চলল। সে পৌঁছে গেল পাতালরাজ্যে। সেখানে অল্প কয়েকদিন হরিণ থাকল। সে কৌশল করে একটা কাজ করল। হুন-আপুর দেওয়া লোম সে সব পাতালবাসীর গায়ে কায়দা করে ফুটিয়ে দিত। হরিণ এভাবে বুঝতে পারল, কারা কারা জ্যান্ত আর কারা কারা রংকরা কাঠের মূর্তি। এই রঙ-করা মূর্তিগুলোই হুনতুন-আহপু ও ভুকুব-হুনাপুকে ঠকিয়েছিল। হরিণ এসব জেনে ছুটে এল ওপরের পৃথিবীতে আর সব খুলে বলল দুই ভাইকে।
      এবার রওনা হল যমজ দুই ভাই। জিবালার পথে। সেখানে পৌঁছে তারা কাঠের পুতুলগুলোকে আর অভিবাদন জানাল না। এ সময় তাদের মনে পড়ল ইঁদুরের কথা। ইদুর সাবধান করে দিয়েছিল। তাই তারা পাথরের আসনে বসল না। আসন তো তেতে আগুন হয়ে রয়েছে নিশ্চয়ই। তারা পেরিয়ে গেল অন্ধকার দুঃখের ঘর। এই ঘরেই তাদের বাবা আর কাকাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। তাদের মনে একটুও ভয় নেই, ভয় পেতে তারা শেখেনি। তারপর তারা খেলা শুরু করল। হুন-কামে ও ভুকুব-কামে ভালো খেলল কিন্তু যমজ দুই ভাইয়ের কাছে হেরে গেল। দুই ভাই হল বিজয়ী।
      পাতাল রাজ্যের দুই রাজা রেগে আগুন। তারা যমজ দুই ভাইকে আদেশ দিল, জিবলবার রাজ-উদ্যান থেকে চারটে ফুলের তোড়া নিয়ে এসো।
      এদিকে গোপনে বাগানের মালিদের বলে দিল, যমজ দুই ভাই যেন বাগান থেকে একটাও ফুল তুলতে না পারে। লক্ষ রাখবে।
       যমজ ভাই দুজন কিন্তু বাগানে ফুল তুলতে গেল না! তারা হাজার হাজার পিঁপড়েকে বাগানে পাঠিয়ে দিল, তারাই চারটি ফুলের তোড়ার মতো ফুল তুলে নিয়ে এল।
      অচেনা পাতালরাজ্যের সব থেকে কঠিন কঠিন বিপদের কাজ তাদের দেওয়া হল। তারা সব কাজ বুদ্ধি করে অনায়াসে করে ফেলল। তারা কোন বিপদেই পড়ল না। বর্শা হাতে দৈত্যরা পাহারা দিচ্ছে বর্শার ঘর, তারা সে ঘর পেরিয়ে গেল। তারা পেরিয়ে গেল বরফ-ঠান্ডা ঘর, দেবদারু গাছের ফল পুড়িয়ে দেহ গরম রাখল। বাঘের ঘর পেরিয়ে গেল, আগুনের ঘর পেরিয়ে গেল। বাদুড়ের ঘরে হুন-আপু ভীষণভাবে আহত হল, কিন্তু জাদুর বলে সে তাড়াতাড়ি সেরে উঠল।
      শেষকালে রাগে কাপতে কাঁপতে জিবালবার রাজা দুজন বলতে বাধ্য হল, যমজ ভাই দুজন অজেয়। ওদের কেউ কোন বিপদে ফেলতে পারবে না।
     ভাই দুজন বলল, শুধু অজেয় নয়, আমরা অমর। আমরা তারও প্রমাণ দেব। তারা দুজন জাদুকরকে ডাকল। তাদের বলে দিল, তাদের হাড়গুলো দিয়ে কি করতে হবে।
      দুই ভাই চিতা তৈরি করে ওপরে উঠল আর পুড়ে মরে গেল। জাদুকরদের আগেই বলা ছিল। তারা হাড়গুলোকে গুড়ো করে ধুলোর মতো করল। সেগুলো নিয়ে নদীতে ফেলে দিল। অল্পক্ষণ পরে হাড়ের গুড়ো জলের সঙ্গে মিশে গেল।
একদিন যায়, দুদিন যায়। পাঁচদিন পরে যমজ ভাই দুজন আবার ফিরে এল। এক অদ্ভুত প্রাণী হয়ে। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মাছ। আবার তারা জলে ডুব দিল। পরের দিন উঠে এল দুজন হাড় জিরজিরে বুড়ো হয়ে। বুড়ো অনেক মজার মজার খেলা দেখাল। পরের দিন তারা হয়ে গেল হুন-আপু ও জবালানকি।
     অবাক হয়ে গিয়েছিল জিবলবার রাজারা। তারা অনুরোধ করল, আরও জাদু দেখাও। যমজ ভাই দুজন তাই দেখাল। তারা প্রাসাদ পুড়িয়ে দিল, আবার আগের প্রাসাদ ফিরে এল। একটা কুকুরকে মেরে ফেলল, আবার তাকে জ্যান্ত করে তুলল। একটা মানুষকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলল, আবার আস্ত মানুষ করে দিল।
      জিবালবার দুজন বলল, “বেশ আমাদের মেরে আবার বঁচিয়ে তোল তো। দেখি কেমন লাগে।
    যমজ ভাই দুজন তাদের মেরে ফেলল। কিন্তু তাদের জীবিত করে না তুলে বলল, ‘আজ থেকে তোমরা ওপরের পৃথিবীর দুই দেবতা হয়ে থাকবে। আর আজ থেকে পাতালরাজ্যের বাসিন্দাদের শেষ বিচার হয়ে গেল। তারা নিঃশেষ হয়ে গেল!
      যমজ দুই ভাই বলল, জিবালার দুই রাজা, তোমরা কোনদিন মরবে না। তোমরাও অমর হয়ে থাকবে। কিন্তু বেঁচে থাকেব যতসব নিকৃষ্ট কাজ করার জন্য, যেসব কাজ চাকররা করে। শুধুমাত্র বনের পশুরা তোমাদের বশে থাকবে, তোমাদের কথা শুনবে। তোমরা আর কোনদিন বল খেলার মতো সুন্দর খেলা খেলতে পারবে না। তোমরা পেঁচার মতো কুৎসিত দেখতে হবে, তোমাদের মুখের রং হবে কালো আর সাদা। কালো-সাদা মুখ বুঝিয়ে দেবে তোমরা কত শয়তান আর বিশ্বাসঘাতক ছিলে।
     তারপর অজেয় দুই ভাই তাদের বাবা আর কাকার আত্মা নিয়ে এল। জিবালার সেই অন্ধকার থেকে আত্মা নিয়ে এল। আত্মাদুটি আকাশে রেখে দিল,—সেখানে তারা হল সূর্য আর চন্দ্র। ঠাকুমা দুই নাতিকে আবার দেখতে পেয়ে খুব খুশি হল। এতদিন বড় কষ্টে কেটেছে তার। আবার আনন্দও হয়েছে। কষ্ট আর আনন্দে তার দিন কেটেছে। কেননা,
বেতগাছ মাঝে-মধ্যে লকলক করে উঠত, আবার মাঝে-মধ্যে শুকিয়ে যেত। জিবলবার অন্ধকার দুঃখের রাজ্যে দুই ভাই যেভাবে কাটিয়েছে তাই ফুটে উঠত তাদের পোতা বেতগাছে। কখনও জয়, কখনও বিপদ। কখনও আঁধার, কখনও আলো।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য