তাঁবুর জগৎ - রাহাত খান

      রাজু কোথায় এসেছে বুঝতে পারলো না। বোধহয় আকাশের কাছাকাছি কোন একটি জায়গা। চারদিকে নীল রঙের জোছনা। এখানে ওখানে শাদা হাসির মতো মেঘ। একটা লাল রঙের পথ নীচ থেকে একটু এঁকে বেঁকে উপরে উঠে গেছে। কে যেন খুব কাছাকাছি থেকে মৃদু স্বরে বললোঃ উপরে উঠে যাও রাজু। আমি তোমার সাথে আছি।
       তুমি কে কথা বলছো ?
       রাজু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। চারপাশে তাকায়। বলেঃ কে তুমি?
       অদৃশ্য লোকটা বললোঃ আমাকে চনো না? আমি মানুষকে স্বপ্ন দেখাই। মানুষকে স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাই।
       কথাগুলি শুনে রাজু আনন্দ অনুভব করলো। বললোঃ নাকি? তা তোমার বয়েস কতো? তুমি কি আমার মতো ছোট ছেলে?
       অদৃশ্য লোকটা আস্তে আস্তে যেন ঘুমের ভেতর থেকে বললোঃ আমার কোন বয়েস নেই। সবুজ রঙের কি কোন বয়েস থাকে? আমি তোমার বন্ধু। যারা তোমার মতো স্বপ্ন দেখে আমি তাদের সবারই বন্ধু।
       আমি তাহলে স্বপ্নের দিকে যাচ্ছি। রাজু ভাবলো। একবার তাকালো চারপাশে। নীল রঙের জোছনা ঝরছে, শীতের সকালে যেমন উদোম কুয়াশা ঝরে। ষ্টিমারের সার্চলাইটের মতো তীব্র আরক্তিম জ্বলছে সুমুখের পথটা। রাজু হাঁটাতে লাগলো। লাল রঙের ভেতর ডুবে গেল। কোথায় যেন টুপটুপ তারা ঝরছে। আস্তে পায়ে নদী বইছে। এমনি শব্দ। এমনি কলতান।
       যেতে যেতে পথ আর ফুরোয় না। শাদা শাদা মেঘগুলি এখন পেছনে। লাল রঙের পথটার দুপাশে নীলরঙের কুয়াশা বৃষ্টি। আমি একবার ড্রয়িং এর খাতায় আকাশ এঁকেছিলাম। রাজুর মনে পড়লো। আমার রঙের বাক্সের নীলের চেয়েও এই আকাশ অনেক বেশী গভীর নীল। তা হবে। আমি তো এখন ঘুমের দেশের স্বপ্নের ভেতর আছি। যে স্বপ্ন দেখায় মানুষকে তার সঙ্গে আছি। রাজু নিচের দিকে তাকালো। বিকেল বেলা পশ্চিমের আকাশ যেমন হয়ে যায় আমি সেরকম রক্তিম হয়ে গেছি। লাল। সিঁদুরের মতো। আগুনের মতো।
       তারপর চোখ ফেরালো আর অবাক হয়ে গেল রাজু। নীল রঙের জোছনা কোথাও নেই। এ আর একটা জায়গা। আর এক ঠাঁই সামনে এক বিশাল মাঠ। মাঠের চার পাশে তাবু। তাবুর পেছনে ধূসর রঙের মরাটে পাহাড়।
       অদৃশ্য লোকটা বললোঃ জায়গাটা চিনতে পারছ রাজু?
       না।
       অনুমান করতে পার ?
       তাও পারি না। এটা কি কোন সার্কাস পার্টির তাঁবু?
       অদৃশ্য লোকটার হাসি শোনা গেল। বললোঃ তুমি সোজা তাঁবুগুলির দিকে হেঁটে চলে যাও। এক একটা তাঁবুতে বসেছে এক এক রকমের দুনিয়া। সার্কাস পার্টিও বলতে পারো। বেশ মজার সার্কাস। ঘুরে ফিরে তুমি তাঁবুগুলি দেখো। বিদেশে বেড়াতে যায় না মানুষ? ভ্রমণ করতে যায় না? মনে করো তুমি ভ্রমণ করছ। তুমি সোজা চলে যাও।
       রাজু চেঁচিয়ে বললঃ তা না হয় যাচ্ছি। কিন্তু এখানে ঢুকতে টিকিট লাগবে না? টিকিট ছাড়া যদি ঢুকতে না দেয়?
       অদৃশ্য বন্ধু বললোঃ তোমার ইচ্ছাই তোমার টিকিট। ভুলে যেয়ো না এটা স্বপ্নের জগৎ।
       না ভুলিনি। রাজু বললোঃ কিন্তু স্বপ্ন কি সবই ভালো? ধরো দুঃস্বপ্নের কথা দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ কষ্ট পায়। এখানে এসব কষ্টের ব্যাপার-ট্যাপার নেই তো ?
       থাকবে না কেন? এখানে সব আছে। এখানকার সবকিছু তোমার ইচ্ছার সাথে ভাঙছে, গড়ছে। এখানে তুমি যা খুশী করতে পারো। যা খুশী দেখতে পারো। ভেবো না রাজু। আমি তোমাকে দুটো সুন্দর, সঠিক তাজা চোখ দিয়ে দিচ্ছি।
       চোখ?
       হ্যাঁ গো।
      লোকটি হাসলোঃ আমি যে ফেরীওয়ালা। যারা ঠিক জিনিসটা ঠিক ঠিক দেখতে চায় আমি তাদের কাছে চোখ বিক্রি করি।
       রাজু বললোঃ আচ্ছা আমি যাচ্ছি। তুমি কিন্তু আমাকে ফেলে চলে যেয়ো না।
      রাজু হাঁটতে লাগলো। হাটতে হাটতে একটা গোলাকার তাবুর ভেতর ঢুকলো। ঢুকেই অবাক হয়ে গেল। অপরূপ এক দুনিয়া ভেতরে। এখানে ওখানে উদোম প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, ধুলোর পাহাড়, শেওলা জমা দীঘি, উল্টানো সিংহাসন, স্তব্ধ মিনার, নিশ্চল অশ্ব মূর্তি, জংধরা তলোয়ার আর অগণিত মনুষ্যকৃতি পুতুল। সবকিছুর উপর লেগেছে ঘুম আর ধুলোর ছাপ। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই, এতটুকু জীবন নেই।
       মনুষ্যকৃতি একটা পুতুলের দিকে এগিয়ে গেল রাজু। ভাবলো আহা যদি প্রাণ থাকতো এই পুতুলটার, যদি কথা বলতো।
       ভাবলো, আর আশ্চর্য, পুতুলের ঘোলাটে মৃত চোখজোড়া জীবন্ত, চঞ্চল হয়ে ফুটে উঠলো। রক্তের দীপ্তি এলো মুখে। জীবন এলো শরীরের সর্বত্র। গম্ভীর অথচ মৃদু মন্দ্রিত গলায় পুতুলটা বললোঃ আমার নাম আখতানুন। যেখানে তুমি এসেছ এটা ইতিহাসের রাজা। এখানে যাদের দেখছ সবাই আমরা নিজেদের কীর্তির জন্য বেঁচে আছি।
       রাজু বললোঃ ইতিহাসের রাজ্য? এখানে তাহলে নিশ্চয়ই রাজা সলোমনকে দেখতে পাব? ফেরাউন, দারিয়ুস, সীজার আলেকজাণ্ডার, নেপোলিয়নকে দেখতে পাব?
       হ্যাঁ দেখতে পাবে।
      বাঃ কি মজা! আমি সবার সাথে গল্প করবো জানো আখতানুন, ইতিহাস আমার খুব প্রিয় বিষয়। ভালকথা তুমি ইতিহাসে কোন কীর্তির জন্যে বেঁচে আছো?
       আখতানুন বললোঃ নীল নদী পাড়ি দেবার জন্য আমি নৌকা তৈরী করেছিলাম।
     সহৃদয় ব্যবহারের জন্য আখতানুনকে ধন্যবাদ জানালো রাজু। ছাড়ের উপর থেকে একটুকরো ঝুলন্ত অন্ধকার দুলতে শুরু করলো এই সময়। দূরে কোথাও ঘন্টা ধ্বনি উঠতে লাগল সুসময় ফুরিয়ে যাওয়ার বিষাদে, কান্নায়।দেখতে দেখতে আলো নিভে যাওয়ার মতো জীবন চলে গেল আখতানুনের চোখ মুখ থেকে, শরীর থেকে। আবার নিশ্চল নির্বাক পুতুল হয়ে গেল আখতানুন।
       রাজু সামনে এগোলো। কিছুদূর এগিয়ে একটা বিশাল দেয়াল-চিত্র দেখতে পেল সে। যুদ্ধের দৃশ্য। দুই দল মানুষ খোলা তলোয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পরস্পরের উপর। কেউ রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত ঘোড়ার পাশে শুয়ে যন্ত্রণায় কাৎরাচ্ছে। লোহার শিরস্ত্রাণ পরা একজন যুবা পুরুষ একটু দূরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ দেখছে আর হাত তুলে ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে সৈন্যদের এগিয়ে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছে।
       এ আবার কি? রাজু ভাবলো আর চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো একজন কঙ্কালসার বৃদ্ধ দেয়াল চিত্রটি দেখছেন মনযোগের সাথে। বৃদ্ধের কাঁধে বসে আছে ঘোরতর কালো রঙের লাল চোখো একটা বাজ পাখী। মাথার উপর নিঃশব্দে উড়ছে কতগুলি ভয়ঙ্কর শকুন।
       কে আপনি, এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করে রাজু বলেঃ দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে কি দেখছেন আপনি?
      বৃদ্ধ ফিরে তাকাল ধীরে ধীরে। অঙ্গারের মতো কালো চোখ তুলে গভীর ব্যথিত কণ্ঠে বললোঃ নিজেকে দেখছি। আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করছিলে না? আমি এক অনুতপ্ত, মৃত সৈনিক। হাজার বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে কৃতকর্মের ফল ভোগ করছি আমি। শকুনিগুলি আমার সুন্দর চিন্তাগুলি খেয়ে ফেলেছে। বাজপাখীটা বুকের ভেতর মুখ ডুবিয়ে তছনছ করছে আমার সুখ ও শান্তি।
       রাজু চেঁচিয়ে বললোঃ তাড়িয়ে দিন না ওগুলো ঢিল মেরে। দাঁড়ান, আমিই তাড়াচ্ছি। বৃদ্ধ বললোঃ না ভাই, ওগুলো তাড়ানো যায় না। চড়া দাম দিয়ে ওগুলো আমিই কিনেছিলাম। ওগুলো আমাকে ছেড়ে যাবে না। তুমি কি ঢিল মেরে তোমার চোখ দুটি তাড়িয়ে দিতে পারো?
       বুঝলাম না, রাজু চেঁচিয়ে বলেঃ আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না। দয়া করে বুঝিয়ে বলুন। বৃদ্ধ বললোঃ শকুনগুলি আমার লোভ। বাজপাখীটা আমার ক্রোধ। আমি এক ইতিহাস বিখ্যাত খুনী। আমার লোভ আর ক্রোধ মানুষের বহু ক্ষতি করেছে। আমি এখন অনুতপ্ত। কিন্তু এখন আমার অনুতাপের কোন মূল্য নেই।
       রাজু বলেঃ ইতিহাসের লোক আপনি? কিন্তু কই, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেঃ ইতিহাসে আমার নাম আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট। আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট। রাজু ভীষণ অবাক হয়ে যায়! তার বিশ্বাসই হয় না এই বৃদ্ধ আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট যার মাথায় ছিল একরাশ কোকড়ানো সোনালী চুল। খাড়া নাক আর কঠিন চিবুকের শক্তিশালী পুরুষ আলেকজাণ্ডারের এ যেন একটা ঠাট্টার ছবি।
       রাজু নিজেকে সামলে নিয়ে বলেঃ আপনি আমার সালাম নিন সম্রাট। আমি আপনার একজন ভক্ত। আপনার বীরত্ব আর দিগ্বিজয়ের কাহিনী নিয়ে পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার বই লেখা হয়েছে। বিস্ময়কর আপনার শক্তি ও সাহস। মেসিডোন থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আপনার রাজ্য। ইতিহাসে আপনি অদ্বিতীয় সম্রাট। আমাদের ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষায় আপনার উপর এবার একটা প্রশ্ন আসবেই। উত্তরগুলি আমার ঝাড়া মুখস্থ। শুনবেন?
       ওঃ তাই নাকি? বৃদ্ধ করুণ ব্যথিত সুরে হাসলো। বললোঃ আমাদের আমলে আমরা রাজা-রাজরারা নিজেদের লোক দিয়ে ইতিহাস লেখাতাম। এই নিয়ম পৃথিবীতে এখনো চলছে তাহলে? আশ্চর্য। আমি ভেবেছিলাম ইতিমধ্যে দুনিয়ার মানুষ আমাদের চালাকী ধরে ফেলেছে।
       ব্যাপারটা কি জানো রাজু? নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি টাকা-পয়সা বাহুবল-লোকবল বাড়াবার জন্যেই আমি একটার পর একটা দেশ জয় করেছি, হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ খুন করেছি, শহর গ্রাম লুঠ করেছি। কিন্তু পাছে সাধারণ মানুষ আমাকে ঘৃণা করে এই ভয়ে নিজের লোক দিয়ে আমি নিজের ইতিহাস লিখিয়েছি। কায়দা করে ইতিহাস এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে খুন কে মনে হয় বীরত্ব, লোভকে মনে হয় উচ্চাশা। রাজু আমরা রাজা বাদশার দল নিজেদের স্বার্থেই আইন করতাম, কানুন বানাতাম। কিন্তু ইতিহাসে এইসব মুষ্টিমেয়দের আইন টিকবে না! বর্ষার পাহাড়ী নদী দেখেছ রাজু? ইতিহাস হলো সেইরকম একটা বেগবান নদী। আজ হোক কাল হোক ইতিহাসের তীব্র স্রোতে যুগের ময়লা আবর্জনা ভেসে যাবেই।
       বৃদ্ধ কথাগুলি বলে অল্প অল্প হাঁপাতে লাগলো। বললোঃ ভেল্কিবাজী আর জুলুমবাজী টিকবে না রাজু। বহু মানুষের স্বার্থ, সুখ ও সুবিধার উপর একজন বা কয়েকজন নায়কের শাসন আর মানুষ মানবে না। শীঘ্রই সময় আসছে যখন মানুষ নিজের পাওনা নিজেই আদায় করে নেবে।
       রাজু তাকিয়ে রইলো বৃদ্ধ আলেকজাণ্ডারের দিকে। কঙ্কালসার বৃদ্ধের কাঁধে বসে আছে একটা ভয়ঙ্কর বাজ পাখী। মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছে কতগুলি শকুন। ’
       ছাতের উপর থেকে আবার দুলতে লাগলো ঝুলন্ত অন্ধকারের টুকরোটা। মৃদু গম্ভীর নিনাদে বাজতে লাগলো সময়টা বেদনাময় করে দিয়ে ঘণ্টা-ধ্বনি। দেয়াল-চিত্রের কাছে দাঁড়ানো বৃদ্ধ আলেকজাণ্ডারের ছবিটা দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
       লুপ্ত হয়ে গেছে ইতিহাসের উদাস প্রাচীন রাজ্য। রাজু নিজেকে দেখতে পেল একটা বিচিত্র জায়গায়।
      এবার আমি কোথায় যাই। রাজু ভাবলো আর মনের নিকট থেকে সেই অদৃশ্য বন্ধু বললো এবারে তুমি কালো রঙের তাবুর ভেতরে যাও; রাজু বললো আচ্ছা যাচ্ছি, কিন্তু তুমি আমার সঙ্গেই থেকো। আর কোথাও যেয়ো না। অদৃশ্য লোকটি মিষ্টি হেসে বললো, আমি তোমার চোখের ভেতর থাকি। স্বপ্ন দেখিয়ে বেড়াই। তোমাকে ফেলে আমি কোথায় যাবো?
       রাজু ভরসা পেয়ে কালো রঙের তাবু’র ভেতর ঢুকলো। বিচিত্র এক দেশ। সীসার মতো মিহি কালো রঙের ধোঁয়া উঠছে চারদিক থেকে। সামনে এক নদীর চরা। কতগুলি পালকহীন ঈগল বসে বসে ঝিমুচ্ছে। বাতাসে তাদের পালকগুলি উড়ছে। শো শো আওয়াজ। এখানে ওখানে পত্রহীন বৃক্ষ। নদীটা ভাঙ্গা, শুকনো। ঘরগুলির দেয়াল নেই, রাজু অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখলো। তারপর ঈগলগুলির কাছে গেল। ঈগলগুলি রাজুকে একবার তাকিয়ে দেখলো মাত্র। রাজু বললোঃ তোমাদের গায়ে পালক নেই কেন? ঝিমোচ্ছ কেন তোমরা? তোমাদের কি হয়েছে।
       একটা বুড়ো ঈগল হাঁপাতে হাঁপাতে বললো; আমাদের পালক দিয়ে টুপি বানানো হয়। বিদেশে এই সোনালী পালকের খুব দাম। আমাদের গা থেকে পালক খসানো হচ্ছে বিদেশের বাণিজ্যের জন্য।
       কিন্তু এভাবে গা থেকে পালক খসিয়ে নিলে তোমরা বাঁচবে? রাজু ব্যথিত হয়ে প্রশ্ন করে। 
      নিশ্চয়ই বাঁচবো। বেঁচে তো আছিই। দিব্যি টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। বুড়ো ঈগল জবাব দেয়। বলেঃ তুমি কে হে বাপু ভেজা ভেজা কথা বলছে ? আমাদের পালক নিয়ে আমরা যা খুশী করবো। যাও তুমি এখান থেকে, ভাগো - ,
       আচ্ছা আমি যাচ্ছি।
       রাজু বললোঃ কিন্তু ঈগল দাদু ... টেনে টুনে নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচার নামই বাঁচা নয়। কথাটা মনে রেখো ।
       আরে যা, যা, ফক্কর কাহেকা ...
       বুড়ে ঈগল রেগে যায়ঃ বলে, বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ এভাবে বেঁচে এলাম আর তিনি কোথাকার এগারো বছরের এক ছোড়া এলেন এলেম দিতে !
       দুঃখিত হয়ে রাজু সেখান থেকে চলে এলো। কিছুদূর গিয়ে সে একটা পাথর বাঁধানো পথ দেখতে পেলো। চারদিক থেকে সীসার মতো মিহি কালো ধোঁয়া উঠছে। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। শ্যামল রঙ নেই। নদীগুলি ভাঙ্গা, শুকনো। ধূসর ছায়া বিছিয়ে পাহাড়গুলি দাঁড়িয়ে আছে প্রেতের মতো। রাজু পাথর বাঁধানো পথ ধরে হাটতে লাগলো। কোথা থেকে যেন জল-প্রপাতের শব্দ ভেসে আসতে লাগলো! কিছুদূর গিয়ে ভুল ভাঙ্গলো রাজুর। জল-প্রপাত নয়। একটা বিশাল বটগাছ ঘিরে খেলা করছে বৈশাখের মতো তুমুল বাতাস। চারদিকে খোলা। রাজু বটগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায় আর অমনি কোত্থেকে যেন ছুটে আসে ঢোলা কোত্তা, লম্বা বাঁকানো টুপি আর নৌকার মতো জুতো পরা একদল ছোটখাট মানুষ। না, মানুষ নয়। রাজু তাকিয়ে দেখলো একদল বানর।
       আমাদের নগরে প্রবেশ করুন হুজুর। অনায়াসে প্রবেশ করুন। বানরগুলি কুর্নিশ করে কিচির মিচির করে বলেঃ পথে আসতে কষ্ট হয়নি তো? কি বললেন কষ্ট হয়নি? তাহলে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়নি। আমাদের কি কপালপথে আসতে হুজুরের কষ্ট হয়নি!
       বানরেরা নাচতে লাগলো আনন্দে। রাজু বললোঃ তোমাদের নগর কোথায়? চলো তোমাদের নগরে আমি যাব।
       বানরেরা কলকণ্ঠে বলতে লাগল, নিশ্চয় যাবেন হুজুর, একশো বার যাবেন । হাজার বার যাবেন।
       বানরদের চেঁচামেচিতে একটু বিরক্ত হয় রাজু। বলেঃ কিন্তু তোমরা ভাই যদি এ রকম হৈ চৈ করোতো তোমাদের নগরে আমি নাও যেতে পারি।
       কি মজা কি মজা।
      বানরগুলি উদ্বাহু নৃত্য করতে লাগলোঃ হুজুর আমাদের নগরে নাও যেতে পারেন। চলো হে, আমরা হুজুরের নামে গান গাই। আমাদের কি কপাল যে হুজুর আমাদের নগরে নাও যেতে পারেন!
       বানরেরা কোরাস গান গাইতে লাগলো!
       এ আবার কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম। রাজু ভাবনায় পড়ে। বানরদের গান শেষ হলে সে বলেঃ তোমরা বড় বিচিত্র জীব দেখছি!
       জী হাঁ হুজুর, আমরা বড় বিচিত্র জীব।
       তোমাদের জ্বালায় আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি!
       আমাদের জ্বালায় হুজুর অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন ! চলো হে,
       বানরেরা আবার পরস্পরকে আহ্বান করেঃ চলো হুজুরের নামে আমরা গান গাই। হুজুর আমাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন!
       এইও চুপ! রাজু আর থাকতে না পেরে একটা ধাড়ী বানরকে ধমক লাগায়ঃ যদি বাড়াবাড়ি করো তোমার লাগাব বলে রাখছি ....
       ধাড়ী বানরটা কাদকাঁদ হয়ে বলেঃ আমরা বড় বাড়াবাড়ি করছি! দিন হুজুর, মার লাগিয়ে দিন আমাদের। বড়ো বাড় বেড়ে গেছে, পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দিন আমাদের। ওরে, হুজুরকে সবাই পিঠ পেতে দে। হুজুর দয়া করে আমাদের জুতো পেটা করবেন।
       রাজু রেগে-মেগে আরো গোটা দুই ধমক লাগায়। তারপর হনহন করে সামনের দিকে এগোয়। মেজাজ তার বিগড়ে গেছে। স্বপ্ন দেখার বন্ধু কানে কানে বললো এরা আগাছার দল। দুনিয়ার সর্বত্র আছে। কেমন লাগলো ওদের?
       কি বিচ্ছিরি!
       রাজুর রাগ এখনো যায়নিঃ আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে।
      অদৃশ্য বন্ধু বললো, চলো রাজু, এগিয়ে চলো। রাজু এগিয়ে চললো। কিছুদূর গিয়ে রঙ বদলে গেলো। শাদা নীলের মেশামেশি একটা আশ্চর্য রঙ চারদিকে। একটু দূরে মস্ত একটা প্রাসাদ দেখা গেল ! সামনে বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছে হাজার হাজার ছোট ছোট ভালুক শিশু।
       এটা একটা বিদ্যালয়। অদৃশ্য বন্ধু রাজুর কানে কানে বললো। রাজু তাকিয়ে দেখলো ভালুক শিশুদের সামনে পেছনে বই, বই আর বই। বইয়ের পাহাড়। সবাই বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পুরছে। রাজু অবাক হয়ে যায়। কাছে গিয়ে সে বইগুলি পরীক্ষা করে। নানা ধরনের নানা বিষয়ের বই। ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, সাহিত্য, বিজ্ঞান বিষয়ের বই।
       এই, তোমরা বইয়ের পাতা খাচ্ছ কেন? রাজু একটা ভালুক শিশুকে প্রশ্ন করে।
       ভালুক শিশু বলেঃ এটা আবার কোন ধরনের প্রশ্ন হলো? সিলেবাসে যা আছে তা থেকে প্রশ্ন করো, জবাব দিয়ে যাচ্ছি। হুঁ ... জিজ্ঞেস করো।
       রাজু বলেঃ বইয়ের পাতা কেন খাচ্ছ তা তোমরা জানো না?
       না জানি না। ঐ যে আমাদের শিক্ষক, তাকে বরং তুমি জিজ্ঞেস করো ভাই।
       রাজু তাকিয়ে দেখলো চশমা চোখে একজন ধেড়ে ভালুক বেত হাতে গম্ভীরভাবে বসে আছে। সে তার দিকে এগিয়ে গেলো। কাছে গিয়ে আদাব দিলো। বললোঃ যদি কিছু মনে না করেন তো একটা প্রশ্ন করি!
       বলো।
       ছাত্রেরা বইয়ের পাতা খাচ্ছে কেন?
      ভালুক চশমাটা ঠিক করে বসালেন নকের গোড়ায়। গম্ভীরভাবে বললেনঃ তুমি ভুল দেখেছ। ওরা বইয়ের পাতা খাচ্ছে না, গিলছে !
       গিলছে!
       রাজু আর্তনাদ করে উঠেঃ বইয়ের পাতা গিলে খেলে অসুখ হবে না ?
       তা তো হবেই। এরজন্যে আমরা একটা উপায় বার করেছি। পরীক্ষা। ছেলেদের ফি বছর পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি আমরা। পৰীক্ষার খাতায় ছেলেরা গেলা বইয়ের পাতাগুলি উগড়ে দিয়ে আসে। খুব সুন্দর ব্যবস্থা,তাই না!
       রাজু বললোঃ এভাবেই লেখাপড়া হচ্ছে?
       ঠিক ধরেছ! এভাবেই লেখাপড়া হচ্ছে। যে ছাত্র যতবেশী বই গিলতে পারে সে তত ভাল ছাত্র। ছেলেরা যাতে সহজে বইগুলি গিলতে পারে আমরা সেটা তদারক করি।
       রাজু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছাত্রদের বই গেলা দেখল। একটা ভালুক ছেলে গোটা ইতিহাসটা গিলে ফেলল। শিক্ষক তাড়াতাড়ি গিয়ে এক গেলাস পানি দিলেন তার হাতে। বললেনঃ ইতিহাসটা গিলেছ, পানি খেয়ে এবার ভূগোলটা গিলে ফেল।
       ছাত্রটি বোধহয় শিক্ষকের খুব প্রিয়। সে একটু আপত্তি জানিয়ে বললঃ না স্যার, এক সঙ্গে এতগুলি আমি গিলতে পারব না। আমার পেট ভারী হয়ে গেছে।
       লক্ষ্মী বাবা, এরকম করে না ... শিক্ষক তাকে সস্নেহে পানি খাইয়ে দেন। বলেনঃ কতকিছু এখনো গেলার বাকী আছে। ইতিহাস গিলেছ, এখনো বাকী আছে ভূগোল, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, অঙ্ক, সমাজ-বিদ্যা, সাহিত্য! সব গিলতে হবে ...পরিশ্রম করো বাবা,পরিশ্রম করো ...ফল পাবে।
       ছাত্রটি তখন এক হাতে নিল ভূগোল আর এক হাতে সমাজ-বিদ্যা। বিনয়ের সঙ্গে বললোঃ দোয়া করবেন স্যার যেন ভালয় ভালয় সব গিলতে পারি।
       রাজুর মন খারাপ হয়ে গেল। সে তখন স্বপ্ন দেখায় মানুষের যে বন্ধু, তাকে ডাকতে লাগলো। ডেকে বললো তুমি আমাকে আগাগোড়া ফাকি দিয়েছ। আমি এইসব দুঃস্বপ্ন দেখতে চাইনি। আমি স্বপ্নের মতো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলাম। আমি আনন্দ চেয়েছিলাম। দুঃখ চাইনি। কষ্ট চাইনি।
       অদৃশ্য সেই বন্ধু এসে তখন হাত ধরলো রাজুর। বললোঃ মন খারাপ করো না রাজু। যা তুমি ইচ্ছে করবে তা-ই পাবে। মানুষের স্বপ্ন মানুষের হাতের মুঠোয়। শেষ তাঁবুটার দিকে তাকিয়ে দেখো রাজু। এগিয়ে যাও।
       রাজু মাঠের প্রান্তে সেই তাবুটা দেখলো। অদৃশ্য বন্ধুর নির্দেশ মতো তাবুতে গিয়ে ঢুকলো সে। চারদিকে আবীরের মতো কুয়াশা। কোথাও নীল ও শাদা রঙের ফোয়ারা ঝলসে উঠছে। তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলো রাজু আর কতগুলি সুন্দর, অনুপম সুখের মানুষ এগিয়ে এলো দৌড়ে। এসো রাজু তুমি আমাদের। তোমার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।
       রাজু ওদের সাথে মিশে গেল। দেশ দেখলো। কি সুন্দর দেশ। খোলা আসমানের নিচে কাঁচা সবুজ রঙের মাঠ। মাঠের পাশ দিয়ে রূপালী নদী বইছে। নদীর ধারে কলার বাগিচা, খামার আর লোকালয় ।
এখানে অন্ধকার নেই। চোখের পানি নেই। চাপা কান্না আর হিংস্র গর্জন নেই। মানুষগুলি বললো, এখানে কলহ নেই, সন্ধ্যা নেই, আগুনের তাপ ও সন্দেহের জ্বালা নেই। এখানে এসো, রাজু। স্বপ্নের ভেতর এসো। ওরা রাজুকে নিবিড় করে ডাকলোঃ এখানে হাসি আছে, আলো ও কোমলতা আছে। এখানে নক্ষত্র জ্বলে, নেভে, নদী চুপ চুপ, আকাশের নাম বন্ধু ও আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্বপ্নের উত্তরাধিকারী।
       এখানে এসো রাজু। এখানে এসো।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য