হৃদয় রেখে এসেছি - আদিবাসী লোককথা

       আমাদের সুন্দর সবুজ দেশের চারদিকে সাগর। ঘন নীল জলের সাগর। সেই সাগরের নীচে রয়েছে রাজ্য। সেখানে বাস করত এক রাজা। রাজার এক মেয়ে। চোখের মণি। একবার সেই মেয়ের হল অসুখ। কঠিন অসুখ। কিছুতেই মেয়ে ভালো হয় না। অনেক ওষুধ-পথ্য খাওয়ানো হল, কিছুতেই কিছু হল না। শেষকালে ডাকা হল দেশের সবচেয়ে বড় ওঝাকে। ওঝা অনেক মত্তর-টত্তর পড়ে শেষকালে বলল, হ্যাঁ, ধরতে পেরেছি। মেয়ের অসুখ কেমন করে সারবে বুঝতে পেরেছি। ওই ওপারে দূরের দ্বীপে থাকে এক বানর। তার তাজা হৃদয় মেয়েকে খাওয়ালেই মেয়ের রোগ সারবে। খুব সাবধান। বানর যেন টের না পায়। খুব চালাক। মহা ফন্দিবাজ। ওঝা চলে গেল।
       কুকুর খুব বুদ্ধি ধরে। সে ছুটতে পারে খুব জোরে। রাজা কুকুরকেই পাঠাল। কুকুর রওনা দিল। তাড়াতাড়ি পৌছে গেল মাটি-গাছপালার দ্বীপে। খুঁজে খুঁজে শেষকালে কুকুর বানরের দেখা পেল।
       কুকুর গাছের নীচে বসে রয়েছে। গাছের ডালে বানর। কুকুর মিষ্টি হেসে বলল, বন্ধু তোমার দ্বীপে বেড়তে এলাম। নিজের দেশে ঘুরতে ঘুরতে একঘেয়ে লাগছিল। তুমি কোথাও বেড়াতে যাও না? কত কিছু দেখার আছে। একঘেয়েমি লাগে না? বানর পিঠ চুলকে বলল, তা আর লাগে না? যেতে তো ইচ্ছে করে কিন্তু..... বানরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কুকুর বলল, হবেই তো। চলো না আমাদের দেশে দু চারদিন ঘুরে আসবে। নতুন জায়গা, বেশ ভালো লাগবে।
       তা জলের নীচে যাব কেমন করে? পথ যে চিনি না। কোনদিন তো যাইনি। 
      এই কথা! আমার পিঠে চেপে বসবে, দু’পা দুদিকে দিয়ে। চোখের পাতা ফেলতে না ফেলতেই দুজনে পৌঁছে যাব জলের তলার সুন্দর দেশে। এ আর এমন কি কথা ! 
      বানর একটু চিত্তা করল। কুকুর অন্যদিকে চেয়ে আছে। তার যে খুব আগ্রহ আছে বোঝা গেল না। কুকুরকে ভালোই মনে হচ্ছে। কি আর হবে। দেখাই যাক না।
       কুকুরের পিঠের ওপরে দুদিকে দুপা দিয়ে বানর জুত করে বসল। কুকুর আস্তে আস্তে জলের দিকে এগিয়ে গেল। জল আছড়ে পড়ছে তীরে। বালি ভিজে যাচ্ছে, কুকুরের পায়ে এসে জল লাগল। পা বাড়াল কুকুর, অল্প জল। হঠাৎ ........ । হঠাৎ কিছু শোনার আগেই দুজনে পৌঁছে গেল জলের নীচের রাজ্যে।
       রাজার বাড়িতে বানরের খুব খাতির। খাওয়া দাওয়া আনন্দ ফুর্তি। সবাই বানরকে মানে, ভক্তি করে। দেখা হলেই কোমর বেঁকিয়ে মাথা নিচু করে প্রণাম জানায়। এত সম্মান বানর আগে কোনদিন পায় নি। দ্বীপে তো বেশ ভয়ে ভয়েই থাকতে হত। ফল ফুলুরি জোগাড় করা কি সোজা কষ্ট । আর এখানে? বানর রয়েছে রাজার হালে।
       এমনি করে দিন যায়। সব মাছ, সব পশু, সব বাসিন্দার সঙ্গে খুব ভাব হয়েছে। সারাদিন শুধু আনন্দ। নতুন বন্ধুদের ডেরায় ডেরায় ঘুরে বেড়ানো। আহা, এমন দিন যেন চিরকাল থাকে। একদিন বানর বেড়তে গিয়েছে অক্টোপাসের বাড়িতে। সেদিন শংকর মাছও এসেছে, তিনজনে গল্পগুজব করছে। মজার প্রাণী এই শংকর মাছ। বানরের বেশ মজা লাগে। কেমন গোল, এমনটি সে আগে দেখেনি।
       হঠাৎ একথা সেকথা বলতে বলতে ওরা দুজন বানরকে বলল, বন্ধু, কি বিপদেই না পড়েছ? কবে যে কি হয়ে যায়? ভাবলে গা শিউড়ে ওঠে। 
       কেন কেন কিসের বিপদ? বানরের লেজ যেন গুটিযে এল। সে কি? বন্ধু, তুমি কিছুই জানো না? তাই ভাবি, এমন ফুর্তিতে থাকো কেমন করে?
       আঃ বাজে কথা রাখ তো। আসল ব্যাপার বলো। বানরের বুক কাঁপছে, গলা শুকিয়ে আসছে। বিদেশ বিভুঁই জায়গা, অচেনা রাজ্য।
       আসলে, রাজার মেয়ের রোগ সারছে না। ওঝা বলেছে, বানরের তাজা হৃদয় জ্যান্ত অবস্থায় কেটে মেয়েকে খাওয়ালে তবেই রোগ সারবে। তাই তো তোমায়...। এরা কি বলছে বানর আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে, জিভ যেন গলার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। কিন্তু ভেঙে পড়লে তো চলবে না। বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। বুদ্ধি করে বাঁচতে হবে। আমার মনের কথা ওরা যেন বুঝতে না পারে। ভয় পেয়েছি এটা যেন জানতে না পারে।
       বানর কুতকুত চোখে এধার ওধার চাইছে, চোখে কেমন দুষ্ট দুই ভাব। ঠোঁট বেঁকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। খুব যেন মজার ব্যাপার। ওরা দুজন অবাক হয়ে গেল। বানরের মনে কি একটুও ভয় নেই। তার কি প্রাণের মায়া নেই? জ্যান্ত থাকতে বুক চিরে হৃদয়....... ওরা ভাবতে পারছে না।
       বানর বলল, হায় কপাল! আমার হৃদয় খেয়ে রাজার মেয়ে ভালো হয়ে উঠবে, আর আমি এমন বোকামি করলাম? ইস, এতো মস্ত পুণ্যের কাজ। কিন্তু, ছিঃ ছিঃ, আমি একি করলাম? কেন? কেন? কেন? কি আর বলব দুঃখের কথা। এসব আগে থেকে বলতে হয়। লুকোনোর কি আছে? আমি যদি জানতাম, তাহলে কখনও হদয়টাকে ওই গাছের ডালে রেখে আসতাম না। আহা, মেয়েটা কেমন সেরে উঠত। বুকের মধ্যে ফাঁকা, হৃদয়টা রয়েছে গাছের ডালে। দুঃখে বেদনায় বানর ভেঙে পড়ল। 
       কথার হাত-পা নেই, ডানাও নেই। তবু এক কান থেকে দশ কান হয়, দশ কান থেকে হাজার কানে পৌছয়। খুব তাড়াতাড়ি। হলও তাই। বানরের কথা দশ কান হয়ে রাজার কানে গেল। রাজা ব্যথা পেল। আহা, বানর তো নিজেই তার মেয়ের জন্য হুদয় দিতে চাইছে। কি দরকার ছিল তাকে বোকা বানানো? আগে থেকে খুলে বললেই হত।
       রাজা বানরকে ডেকে বলল, বন্ধু, তুমি যে আমার মেয়েকে এত ভালোবাস, আগে জানতে পরিনি। আমায় ক্ষমা করো। শিগগির তুমি চলে যাও, গাছ থেকে তোমার হৃদয় নিয়ে এসো। খুব তাড়াতাড়ি। আমি সঙ্গে কুকুরকে দিচ্ছি।
       বানর ভেজা চোখে রাজি হয়ে গেল। এই যাবে আর আসবে। আহা ছোট মেয়ে বড় কষ্ট পাচ্ছে।
      কুকুরের পিঠে চেপে চোখের নিমেষে বানর তার দ্বীপে ফিরে এল। বানর পিঠ থেকে নামল। কুকুরের পাশে বসে একটু অপেক্ষা করল। আস্তে আস্তে হেঁটে চলেছে বানর। কোন তাড়া নেই। কুকুর তাকে জোরে যেতে বলল। কিছুটা এগিয়েছে বানর, আড়চোখে পেছন ফিরে কুকুরের দিকে চাইল বানর। কুকুর সামনের দুপায়ের মধ্যে মুখ রেখে আধবোজা চোখে তাকিয়ে রয়েছে। বানরের লেজ খাড়া হল... তিন লাফে গাছের মগডালে চেপে বসল। আঃ, কি শান্তি। এবার বানরের হাসি পেল। জলের নীচের লোকজন এত বোকা? হুদয় কি রেখে আসা যায়? হাসির দমকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি ডাল ধরে ফেলল।
       কুকুর বসেই আছে, বসেই আছে। বানর তো গাছ থেকে নামছে না? সে গাছের নীচে গেল। ওপরে তাকিয়ে দেখে, বানর দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ভেংচি কাটছে। মুখে কোন কথা বলছে না। কুকুর সব বুঝল, সে খুব চালাক। দু একবার গাছের গোড়ায় নখের আঁচড় কেটে রাগে ফিরে গেল জলের নীচের রাজ্যে।
       জানাজানি হয়ে গেল। অক্টোপাস আর শংকর মাছ বানরকে একথা ফাঁস করে দিয়েছে। তারা বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। রাজার হাতে শাস্তি পেতে হবে। তাদের ধরে আনা হল। রাজার সৈন্য অক্টোপাসকে ধরল। দেহ কেটে দেহের সব হাড় বের করে নিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল অক্টোপাস। হাড় নেই দেহে, একতাল মাংস ঘুরে বেড়াচ্ছে জলে। মাংস কাটার ফলে কিছু টুকরো মাংস দেহের চারপাশে ঝুলে রইল। ধরা হল শংকর মাছকে। মুগুর দিয়ে পেটানো হল। বেদম প্রহার। ওপরের মুখ দেহের নীচে চলে গেল। সুন্দর থলথলে লেজে মুগুরের আঘাত পড়ছে। হাড় বেরিয়ে লেজের বাইরে লেগে থাকল। ধারালো কাঁটা। মুগুরের আঘাতে ছোট লেজ বড় লম্বা হয়ে গেল। দেহের তুলনায় বড়। বড়ই অসুবিধে। মুখ রয়ে গেল দেহের নীচে। রাজার শাস্তি, কথা ফাঁস করে দেবার শাস্তি।
       বানর তারপর থেকে জলের দিকে এগোয় না। গাছ থেকে নামে না। মাটিতে যদি বা নামতে হয়, সবসময় তৈরি থাকে গাছ ওঠার জন্য। মাটিতে সে দৌড়েই চলাফেরা করে। যদি কুকুর ধরে। আহা, হৃদয় উপড়ে ফেলে যদি।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য