তাঁতী বৌ - ননীগোপাল চক্রবর্তী

      এক তাঁতী আর তার বৌ। দিনরাত খটাখট— না, তাঁত বোনার খটাখট্‌ শব্দ নয়—ঝগড়ার খট্‌খটানি। ওটা তাদের মধ্যে লেগেই আছে!
      শাকের ক্ষেতে গরু ঢুকেছে। তাঁতী বলে, আমি তাঁত বুনছি। তাঁতী-বৌ তুই গরু তাড়া।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমি রান্না করছি। গরজ থাকে তুমি তাড়াও।
      তাঁতী বলে, আমি পারব না।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমি নড়ব না ।
      তাঁর্তী বলে, আমার জড়ানো কাপড় খুলে যাবে।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমার চড়ানো রান্না পুড়ে যাবে !
      কেউ তারা গরু তাড়াতে যায় না। শাক ক্ষেত সাবাড় করে গরু চলে যায়!
      খদ্দের এসেছে ভোরে কাপড় কিনতে।
      তাঁতী বলে, তাঁতী-বৌ দোর খোল।
      তাঁতী-বৌ বলে, কেন কর গণ্ডগোল।
      সে পাশ ফিরে শোয় ।
     জিদ ওদের কম নয়। কেউ আগে দোর খুলবে না। দোর খোলা হয় না। রোদ্দুর চারদিকে চমচম করে৷ খদ্দের ফিরে যায়।
      দুপুর হয়ে যায়, তবু তারা দোর খোলে না। পাড়াপড়শীর ভাবে কি হ’ল, ওদের বাড়ী এমন চুপচাপ কেন। লাঠি দিয়ে বাইরের থেকে দোর খোলে তারা। তখন তাঁতী আর তাঁতী-বৌ ঘর থেকে বেরোয়।
      ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল তাঁতী। তিনটে কৈ মাছ পেয়েছে সে। বাড়ী এসে তাঁতী-বৌকে দিল সেই মাছ রান্না করতে। তাঁতী-বৌ মাছ তিনটে কুটে রান্না করল।
      খাওয়ার সময় তাঁতী বলে, আমাকে দুটো কৈ দে আর তুই নে একটা ।
      তাঁতী-বৌ চক্ষু কপালে তুলে বলে, কেন? এত আধিক্যেতা তোমার কি জন্যে শুনি?
      আমি কত কষ্ট করে মাছ ক’টা ধরে এনেছি— তাঁতী-বৌ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে,—আহা! শুনে মরে যাই! না। আমি কত কষ্ট করে মাছ কুটেছি, রান্না করেছি। আমি খাবো দুটো কৈ আর তুমি খাবে একটা। তাঁতী রেগে-মেগে বলে, না, কক্ষনও না। আমিই দুটো খাবো।
      কথা কাটাকাটির পর হাতাহাতির উপক্রম! শেষটায় ঠিক হলো,—যে আগে কথা বলবে সেই খাবে একটা কৈ৷ গুম হয়ে থাকল দু’জনেই। কেউ কোন কথা বলে না! রান্নাভাত হাঁড়িতেই থাকল। কৈ মাছের ঝোল পড়ে থাকল কড়াইতে ঢাকা দেওয়া।
      বাড়ীতে আর টু শব্দ নেই,–কথা বললেই তাকে খেতে হবে একটা কৈ। কিন্তু একটা খেতে ওদের কেউই রাজী নয়।
      তাঁতী-বৌয়ের আদরের পোষা বিড়ালটা ম্যাও ম্যাও করে কড়াইয়ের কাছে ঘুরে বেড়াল। তারপর ক্ষিদের জ্বালায় বেরিয়ে গেল বাড়ী থেকে।
      তাঁতী চুপ করে শুয়ে রইল ঘরের মধ্যে। তাঁতী-বৌ এক পাশে মাদুর বিছিয়ে পড়ে থাকল। কারও মুখে কোন কথা নেই!
      একদিন যায়, দু'দিন যায়। পাড়ার লোকে ভাবে, এটা কেমন হলো?—পাড়াটা একেবারে চুপ মেরে গেল যে! ওরা কি বাড়ী ছেড়ে চলে গেল নাকি দু’জনে?
       তিন দিনের দিন পাড়ার লোকে গিয়ে দেখে, তাঁতী আর তাঁতী-বৌ মরার মত চোখ বুজে পড়ে আছে দু’জায়গায়!       তারা কত ডাকাডাকি করল কিন্তু উত্তর দিল না কেউ। উত্তর দেবেই বা কি করে? যে উত্তর দেবে তারই তো আগে কথা বলা হবে। আগে কথা বললে সে তো আর দুটো কৈ পাবে না, একটা কৈ খেতে হবে তাকে।
      চার দিনের দিন পাড়াপাড়শীরা ওদের মরা মনে করে মাদুর দিয়ে জড়িয়ে শ্মশানে নিয়ে চলল। তখনও ওরা কেউ কথা বলে না। অবশেধে চিতা সাজিয়ে তার উপর ওদের যখন তুলে দেবে, তাঁতী-বৌ তখনও নির্বাক।
      কিন্তু তাঁতী দেখল, খুব বেগতিক। পুড়ে যদি ছাই হয়ে গেলাম, তা হলে দুটাে কৈ খাবে কে? দূর ছাই! সে তাড়াতাড়ি চিতার উপর থেকে বলে উঠল, ওরে তোরা আমায় পোড়াসনে, আমি একটাই খাবো।
      তাঁতী-বৌ তখন তাড়াতাড়ি উঠে বসে মাথার কাপড়টা টেনে দিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য