শিকারি হাইলিবু - আদিবাসী লোককথা

      অনেক অনেককাল আগের কথা। সেই সময়ে আমাদের এই সুন্দর দেশে ছিল এক শিকারি। নাম তার হাইলিবু। বড় দয়ালু ছিল সেই শিকারি। অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারত না, তাই সবসময় অন্যদের উপকার করত। শিকার করে আনা পশুপাখি সে কোনদিন একা-একা খেত না, পাড়াপড়শির মধ্যে বিলিয়ে দিত, নিজের জন্য অল্পই রাখত। তাই সবাই তাকে খুব ভালোবাসত।
      একদিন হাইলিবু চলেছে পাহাড়ি বনের পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে, হঠাৎ দেখতে পেল, একটা ঘন পাতার গাছের নীচে একটা ছোট্ট সাদা সাপ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সাপ যাতে তার পায়ের শব্দে ঘুম থেকে জেগে না ওঠে তাই খুব আস্তে পাশ কাটিয়ে শিকারি চলে গেল। এমন সময় ওপর থেকে ঝড়ের বেগে একটা বাজপাখি নীচে নেমে এল, ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটার ওপরে, নখে করে তুলে নিয়ে আবার আকাশে উড়ে গেল। হঠাৎ জেগে উঠে সাপটা চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও বাঁচাও ! কান্না শুনে শিকারির বুক টনটন করে উঠল। ধনুকে তীর বসিয়েই ছেড়ে দিল পাহাড়ি বনের অাঁধারে। তীর গিয়ে লাগল বাজের ডানায়, সাপ পড়ল মাটিতে। বাজপাখি উড়ে পালাল।
      শিকারি বলল, এইভাবে একা একা কখনও থাকতে হয়! তুমি এত ছোট। যাও বাবামায়ের কাছে। একা বেরিয়ো না।
      মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সাপ বনের পথে চলে গেল। ধনুক ঠিকঠাক করে শিকারি বাড়ির দিকে রওনা দিল। পরের দিন হাইলিবু আবার গেল সেই পাহাড়ি বনে। আগের দিনের জায়গায় এসে সে দেখতে পেল, একটা ছোট সাদা সাপ এঁকে-বেঁকে তার দিকে আসছে, পেছনে অসংখ্য সাপের সারি। অবাক হল শিকারি। তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, এমন সময় সেই ছোট্ট সাদা সাপ বলল, কেমন আছ শিকারি? আমাকে তুমি চিনতে পারছ না? কালকে তুমি আমাকে বঁচিয়েছিলে। আমি সর্পরাজের মেয়ে। আমাকে বাবা-মা পাঠিয়েছে, তোমাকে যেতে হবে আমাদের প্রাসাদে। বাবা-মা তোমাকে ধন্যবাদ জানাবে। যাবে না আমার সঙ্গে? শিকারি বলল, কেন যাব না? নিশ্চয়ই যাব।
       মেয়ে বলল, শোনো, একটা কথা মনে রাখবে। প্রাসাদে যাওয়ার পরে বাবা-মা তোমাকে কিছু দিতে চাইলে তুমি কিন্তু কিছু নেবে না। শুধু চাইবে একটা দামি পাথর, ওই পাথর বাবা মুখের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। সেই পাথরটা তোমার কাছে থাকলে তুমি সব পশুপাখির ভাষা বুঝতে পারবে। কিন্তু তুমি সেই ভাষা বুঝলেও কোনদিন কাউকেই বলবে না। যদি বলো তবে তুমি পাথর হয়ে যাবে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত পাথর হয়ে যাবে। তুমি মরে যাবে। মনে রেখো।
       মেয়ের কথা শুনে শিকারি মাথা নাড়ল, তারপরে সাপের দলের পেছন পেছন বনপথ দিয়ে হঁটিতে লাগল। তারা অনেক দূরের এক পাহাড়ি ঢালুতে এল, সেই ঢালু পেরিয়ে আরও দূরে যেতে লাগল। শিকারির এখন বেশ শীত শীত লাগছে। শেষকালে তারা এসে পৌছল বিরাট এক দরজার সামনে। মেয়ে বলল, তোমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য
বাবা মা আসছে, এই যে আমার বাবা মা।
      সর্পরাজ এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে শিকারিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, তুমি আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছ শিকারি। তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমি প্রাণের ভেতর থেকে অন্তর দিয়ে তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই আমার ধনরত্বের ভাণ্ডারে ঢুকে তোমায় সবকিছু দেখাচ্ছি। যা মন চায় তাই তুমি নাও। লজ্জা করবে না।
      রাজা ধনভাণ্ডার খুলে দিলেন। হাইলিবুকে নিয়ে রাজা ভাণ্ডারে ঢুকলেন। মণি মুক্তো হীরে জহরৎ ও আরও নাম না জানা সব পাথর থেকে আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। শিকারি এসব কোনদিন দেখেনি, অবাক হয়ে এক ঘর থেকে সে অন্য ঘরে রাজার পেছন পেছন যাচ্ছে। তার মুখে কোন কথা নেই। কিন্তু কোন ধনরত্বই শিকারি নিল না, কোন পাথর সে ছুঁয়েও দেখল না।
        অবাক বিস্ময়ে রাজা বলল, শিকারি, কোন কিছুই কি তোমার পছন্দ হল না? আশ্চর্য তো! 
      হাইলিবু বলল, রাজা, আপনার ভাণ্ডারে সবকিছুই খুবই সুন্দর কিন্তু এগুলো সবই সখের জিনিস। আমি একজন সাধারণ গরিব শিকারি, এসব দিয়ে আমি কি করব রাজা? কোন উপকারে লাগবে এসব? স্মৃতির জন্য সত্যিই যদি আপনি আমায় কিছু দিতে চান, তাহলে আপনার মুখের ভেতর লুকিয়ে-রাখা ওই দামি পাথরটি আমায় দিন।
      এই কথা শুনে রাজা আস্তে আস্তে তার মুখটা নীচের দিকে নামিয়ে আনল, অল্পক্ষণ চুপ করে রইল, তার পরে মুখ থেকে পাথরটা বের করে দিল। শিকারির হাতে তুলে দিল সেই পাথর।
      পাথর নিয়ে শিকারি প্রাসাদ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। পেছন পেছন এল সেই মেয়ে। বারবার সাবধান করে দিল সেই মেয়ে, ওগো শিকারি, এই পাথর যতদিন তোমার সঙ্গে থাকবে তুমি সবকিছু জানতে পারবে। কিন্তু তুমি যা জেনেছ তা যেন কাউকে বলে দিয়ো না। কিছু বলবে না। সর্বনাশ হয়ে যাবে শিকারি। তুমি বাঁচবে না, তুমি পাথর হয়ে যাবে। একথা একবারের জন্যও ভুলে যেয়ো না। মনে রেখো।
       হাইলিবুর খুব সুবিধে হয়ে গেল। বনে পাহাড়ে শিকার করা অনেক সহজ হয়ে গেল। পশুপাখির ভাষা সে বুঝতে পারে, গাছের ঘন পাতার আড়ালে কোন পাখি বসে আছে, পাহাড়ের এপাশে কোন পশু রয়েছে তাদের কথা শুনেই সে জেনে যেতে পারে। এমনি করে কয়েক বছর কেটে গেল। একদিন প্রতিদিনের মতো হাইলিবু পাহাড়ে শিকার করছে। হঠাৎ সে শুনতে পেল এক ঝাঁক পাখি আকাশ দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যেতে যেতে বলছে, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। আগামী কাল এই পাহাড়ে বিরাট বিস্ফোরণ ঘটবে, আগ্নেয়গিরি কাঁপিয়ে ভেঙে ফেলবে এই পাহাড়কে। মাঠঘাট ভেসে যাবে জলে। কে জানে কত পশুপাখি মারা পড়বে ! কি যে হবে এদের!
      এই কথা শুনে হাইলিবু চমকে উঠল। কি হবে তাহলে? শিকার করতে আর মন চাইল না। সে তাড়াতাড়ি ফিরে গেল গাঁয়ে। তাদের বলল, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আমাদের সবাইকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। এখানে আর এক মুহুৰ্তও থাকা নিরাপদ নয়। তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো, পালাও এখান থেকে। সর্বনাশ হয়ে যাবে।
      কেউ বিশ্বাস করল না হাইলিবুকে। কেউ ভাবল, ও বোধহয় পাগল হয়ে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কেউই শিকারির কথায় বিশ্বাস করলনা। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে শিকারি কাকুতিমিনতি করে বলল, আমি মরে গিয়ে কি তোমাদের বিশ্বাস জাগাতে পারব? তখন কি তোমরা বিশ্বাস করবে?
      কয়েকজন বুড়ো মানুষ বলল, আমরা জানি তুমি কোনদিন আমাদের কাছে মিথ্যে কথা বলনি। আমরা সবাই জানি। আজ তুমি বলছ পাহাড় ভেঙে পড়বে, বানে ভেসে যাবে মাঠঘাট গ্রাম। বলতো শিকারি, এই ভয়ানক কথা তুমি জানলে কেমন করে? কেমন করে তুমি নিশ্চিন্ত হলে যে এই সর্বনাশ কালকে ঘটবে?
       হাইলিবু মনে মনে বলল, আমি জানি সর্বনাশ ঘটবেই। আমি পালিয়ে গেলে আমি বেঁচে যাব ঠিকই। কিন্তু গ্রামবাসীরা? তাদের ছেড়ে আমি পালাব? একাই শুধু বাঁচব? আর গ্রামবাসীদের সর্বনাশের পথে ঠেলে দেব? তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? না তা হয় না। আমি ওদের বাঁচাবই। আমার কপালে যা থাকে তাই হবে, আমি সবাইকেই বাঁচাব। সব কথা খুলে বলল শিকারি। যা যা ঘটেছে সব। সাপের কথা, বাজপাখির কথা, সর্পরাজের কথা, পাথর পাওয়ার কথা, শিকারে সুবিধে হওয়ার কথা, সব বলে দিল তাদের। নইলে যে ওরা বিশ্বাস করবে না তাকে, গ্রাম ছেড়ে যাবে না যে।
কথা বলছে শিকারি আর আস্তে আস্তে সে পাথর হয়ে যাচ্ছে। পা থেকে শুরু হয়েছে, পাথর হচ্ছে শিকারি, শেষকালে কিছুক্ষণ পরে শিকারির দেহ নিথর হয়ে গেল, এখন শুধুই একটি পাথর। গ্রামবাসীদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। বিশ্বাস করত সবাই শিকারিকে ! কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে।
       বাড়ির পশুপাখি জিনিসপত্র সব নিয়ে তারা দূরে চলে গেল। পথ চলতে চলতেই তারা দেখল, পেছনের আকাশে ঘন কালো মেঘ, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সারা রাত ধরে খুব বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি কেউ কোনদিন আগে দেখেনি। পরের দিন দূর থেকে তারা শুনতে পেল, প্রচণ্ড শব্দ আর কি যেন ভেঙে ভেঙে পড়ছে, কেঁপে উঠল পৃথিবীর মাটি। চৌচির হয়ে গেল পাহাড়। পাহাড়ের বুক থেকে জলের ধারা নেমে এল মাঠেঘাটে।
       দূর থেকে এসব দেখে গ্রামবাসীরা বিড়বিড় করে বলল, শিকারি হাইলিবু নিজের প্রাণ দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে গেল। সে যদি আমাদের চলে আসতে না বলত আমরা এতক্ষণ ডুবে মরে যেতাম। নিজের জীবন দিল শিকারি।
      গ্রামবাসীরা কয়েকদিন পরে ফিরে এল তাদের পুরনো গায়ে। গায়ের মধ্যে তারা সেই পাথরটিকে দেখতে পেল, এ তো পাথর নয়, হাইলিবুর জীবন, সেই জীবন যে কখনও নিজের দিকে তাকায়নি, পরের জন্য পাথর হতেও সে দ্বিধা করেনি।
       পাথরটিকে বয়ে নিয়ে তারা ভাঙাচোরা সেই পাহাড়ের চুড়োয় গিয়ে উঠল। সেই সেদিন থেকে গ্রামবাসীরা এই পাথরকে পুজো করে আসছে। হাইলিবুর স্মৃতি অমর হয়ে আছে। সেই হাইলিবু, সেই বীর মানুষটি, সেই শিকারি যে অন্যদের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিল। এই তো সত্যিকারের মানুষ, আমাদের প্রাণের বীর দেবতা।
আজও মানুষজন বলে ওই পাহাড়ের উঁচু এই চুড়োয় এখনও রয়েছে 'হাইলিবু পাথর’।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য