গয়নার বাক্‌সো - শেখর বসু

      কাকিমা এদিক-ওদিক কী যেন খুঁজে চাপা গলায় বললেন, “আমার গয়নার বাকসো!” তারপর হতভম্ব হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার পরে ছুটে গিয়ে স্টীলের আলমারির পাল্লা খুলে ফেললেন। আলমারি তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও গয়নার বাকসো পাওয়া গেল না। কাকিমার গায়ের রঙ লালচে-ফর্সা, কিন্তু এখন একেবারে কাগজের মতো সাদা দেখাচ্ছিল। কাকিমা কাঁপা-কাঁপা গলায় আবার বললেন, “আমার গয়নার বাকসো !”
      ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। বললাম, “পাচ্ছেন না?” কাকিম আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কাঠের আলমারিটা খুলে ফেললেন এবার। স্টীলের আলমারিতে কাকিমা আস্তে আস্তে খুঁজছিলেন, এবার তাড়াতাড়ি। এত তাড়াতাড়ি যে এটা-সেটা পড়ে যাচ্ছিল মাঝেমধ্যে। আমি তুলে দিচ্ছিলাম, কিন্তু কাকিম| এদিকে নজরই দিচ্ছিলেন না। খোঁজা শেষ করে কাকিম আরও ফ্যাকাশে হয়ে বললেন, “নেই! কী আশ্চর্য! গেল কোথায়?”
      আমি বললাম, “কোথায় রেখেছিলেন, মনে নেই?” কাকিমা এবারও আমার কথায় কোনো উত্তর দিলেন না। না দিয়ে টেবিলের ড্রয়ার, শো-কেস খোঁজার পরে বেশ চেঁচিয়ে বললেন, “আমার গয়নার বাকসো চুরি হয়ে গেছে!” কাকিমা কথাটা এত চেঁচিয়ে বলেছিলেন যে তিন সেকেণ্ডের মধ্যে এ-ঘরে সবাই চলে এল। বাড়ির লোক বলতে আমরা বাদে তিনজন কাজের লোক আর ছোটকাকা। কাকাবাবু এখন এখানে নেই, অফিসের কাজে দিল্লী গেছেন।
      ছোটকাকা সবে কলেজে ঢুকেছে। গম্ভীর হয়ে বলল, “অবাক কাণ্ড। গয়নার বাকসোটা তুমি ব্যাঙ্কের লকারে রেখে আসোনি তো?”
      “না। বাকসোটা তো বছরখানেক হল বাড়িতেই আছে।” 
     “সে কী, অতগুলো গয়না তুমি বাড়িতেই রেখে দিয়েছ! ব্যাঙ্কের লকার রাখার মানে কী তাহলে? বাড়ির পাশেই ব্যাঙ্ক!”
      কাকাবাবু চটে গেলে যেভাবে কথা বলেন, কথাগুলো ঠিক সেভাবেই বলল ছোটকাকা। কাকিমা রীতিমত ভেঙে পড়ে বললেন, “কী হবে এখন !”
        ছোটকাকা আরও গম্ভীর হয়ে বলল, “পুলিশে খবর দিতে হবে।”
      “পুলিশ" শব্দটা কানে যেতেই আমি বুঝতে পারলাম, ব্যাপারটা সত্যিই খুব গুরুতর। এদিক-ওদিক সতর্ক চোখে তাকিয়ে ছোটকাকা বলল, “আচ্ছা, গয়নার বাকসোটা তুমি ঠিক কোথায় রেখেছিলে?”
        কাকিমা থেমে-থেমে বললেন, “মনে হচ্ছে, বিছানার ওপর।”
        ছোটকাকা একটু খোঁচা দিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে?”
       কাকিমা এবার আমতা-আমতা করতে লাগলেন। “হ্যাঁ, মানে, বিছানার ওপরেই তো, এই তো এখানেই।”
       “গয়নার বাকসো খোলা জায়গায় ফেলে রাখো কেন?”
       “ফেলে রাখিনি। এক-একবার মনে হচ্ছে, আলমারিতেই তুলে রেখেছিলাম।”
      “চাবি দেওয়া ছিল আলমারিতে?”
      “হ্যাঁ।”
      “চাবি ছিল কোথায়?”
      “আলমারির সঙ্গে লাগানোই ছিল।”
      ছোটকাকা ঠিক কাকাবাবুর ভঙ্গিতে বলল, “তাহলে আর চাবি লাগানোর মানে কী?”
      কথাটা বলার পরে ছোটকাকা চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবল, তারপর চোখ খুলে বলল “আজ বাইরের লোক কে-কে এসেছিল এ বাড়িতে?”
      কাকিমা এ কথার কোনো উত্তর দিলেন না। তখন ছোটকাকা নিজেই উত্তর খুঁজতে লেগে গেল। দেখা গেল, সকালে থেকে বিকেলের মধ্যে এ বাড়িতে এসেছে কাজের লোকদের একজন আত্মীয়, ছোটকাকার তিন বন্ধু, কাকিমার চেনাশোনা মিসেস সিনহা আর আমার বন্ধু লালটু।
       ছোটকাকা এবার সবার দিকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল, “এ-বাড়ির কাউকেই আমি ছাড়ব না। দরকার হলে এক-এক করে সার্চ করব সবাইকে।”
       সার্চ করার কথা শুনে আমি সবার আড়ালে নিজের পকেট দুটো দেখে নিলাম একবার। বলা তো যায় না যদি ভুল করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখি। গয়নার বাকসো অবশ্য আমার এই ছোট্ট পকেটে ঢুকবে না, তবু ... । আসলে পুলিশের কথা আমার মাথার মধ্যে ঘুরছিল সমানে।
      সবাই মিলে সারা ঘর আর একবার তোলপাড় করে খোঁজা হল, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না গয়নার বাকসো। কাকিমার মুখ এখন প্রায় কাঁদো-কাঁদো। সেদিকে তাকিয়ে ছোটকাকা বলল, “এক কাজ করলে হয় না। আমি একজন গুণীকে জানি। অল্প বয়েস, কিন্তু সত্যিই গুণী। বাটি চালিয়ে হারানো জিনিস খুঁজে দিতে পারে। না পারলে এক পয়সাও নেয় না। ডাকব?”
       কাকিমা একেবারে ভেঙে পড়ে বললেন, “আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। যা পারিস কর। তাড়াতাড়ি।”
       “আচ্ছা বৌদি, গয়নাগুলোর দাম কত হবে ?”
       “হাজার-পঞ্চাশ তো বটেই।”
      মাথায় হাত দিয়ে ছোটকাকা বলল, “পঞ্চাশ হাজার ! তুমি তো তাও আবার পুরনো দিনের হিসেব বলছ। এখনকার হিসেবে ওই গয়নার দাম লাখ-দুয়েক তো হবেই।”
       গয়নার দাম শুনে কাকিমা আঁতকে উঠলেন। ছোটকাকা কাকিমাকে অভয় দিয়ে বলল, “একদম ঘাবড়িও না। দেখা যাক কী করতে পারি।
        প্রথমে নিজেরা চেষ্টা করব, না পারলে পুলিশ, পুলিশ না পারলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে খবর দেব।”
        কাকিমা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “তুই বাটি-চালা না কিসের কথা যেন বলছিলি?”
      “হ্যাঁ, এক্ষুণি খবর দিচ্ছি। মস্ত বড় গুণী। গয়না খুঁজে বার করতে না পারলে এক পয়সাও নেয় না। কিন্তু পেলে, একটু ভাল রকমের দক্ষিণা নেবে, এই ধরে হাজারখানেক টাকা।”
       কাকিমার চোখে জল এসে গেছে প্রায়। কোনোরকমে বললেন, “দুলাখ টাকার জিনিস খুঁজে দেওয়ার জন্যে এক-দু হাজার কোনো টাকাই নয়। আমার মনে হয়, চোররা এতক্ষণ সব গয়না গালিয়েও ফেলেছে।”
       “অসম্ভব নয়, আজকালকার চোররা অসম্ভব সেয়ানা। ঠিক আছে, আমি এক্ষুণি যাচ্ছি, গুণীকে পাই কিনা দেখি।”
      ছোটকাকা প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। কাকিমার কষ্ট দেখে আমারও খুব কষ্ট হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, আমি যদি ক্লাস ফাইভের বদলে টেনে পড়তাম তাহলে হয়ত এই বিপদের দিনে কাকিমার পাশে দাঁড়াতে পারতাম অনায়াসে ! আমার আক্ষেপ আরও বাড়তে যাওয়ার মুখে ছোটকাকা বাটি-চালার কথা বলেছিল। বাটি-চালা আবার কী জিনিস? জীবনে শুনিনি তো! কাকিমাকে এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হচ্ছিল না। কাকিমার যা মুখের চেহারা এখন !
       ঘণ্টাখানেক বাদে ছোটকাকা ফিরে এল। সঙ্গে ছোটকাকাদের বয়সী আর একটি ছেলে। পরনে ধুতি, গায়ে চাদর। ঠিক এইরকম চেহারার পুরুতমশাই সরস্বতী পূজোর সময় দেখা যায় দু’চারজন। এই কি সেই গুণী? এই কি বাটি চালায়?
       গুণীকে দেখে সারা বাড়ি ব্যস্ত হয়ে উঠল একসঙ্গে। তবে, কারও মুখে কোনও কথা নেই। কাকিমা অসম্ভব মুখ ভার করে দাড়িয়ে ছিলেন। কী ভাবে খবরটা যেন ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। আশেপাশের বাড়ির দুচারজন কৌতুহলী মুখে দূরে দাড়িয়ে ফিসফিস করছিল নিজেদের মধ্যে।
       একটা ছোট মাপের কাঁসার বাটি মেঝের ওপর উপুড় করে রাখল গুণী। তারপর ছোটকাকার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করল, “আপনার কী রাশি?”
      ছোটকাকা মৃদু গলায় কী যেন বলতেই গুণী বলল, “ঠিক আছে, আপনাকে দিয়ে চলবে। আপনি মেঝেয় বসে বাটির ওপর হাত দিন। আমি এখন মন্ত্র পড়ছি। মন্ত্র পড়া হয়ে গেলে, বাটি আপনাকে নিয়ে দৌড়বে। আপনি বাঁধা না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যাবেন। বাটি আপনাকে হারানো গয়নার কাছে নিয়ে যাবে। অবিশ্যি, গয়না যদি বাড়ির মধ্যে থাকে। গয়না বাড়ির বাইরে চলে গেলে আমার আর কিছু করার নেই।”
       ছোটকাকা উবু হয়ে বসে বাটির ওপর হাত রাখতেই গুণী মন্ত্র পড়তে শুরু করে দিল। কী-সব কঠিন-কঠিন মন্ত্র, শুধু অনুস্বার, চন্দ্রবিন্দু আর বিসর্গ। একটা শব্দেরও মানে বুঝতে পারছিলাম না আমি।
       ছোটকাকা আর গুণীকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ বাটি নড়ে উঠল। তারপর খুব জোরে ছুটে গেল কাকিমার শোবার ঘরের দিকে। বাটির ওপর ছোটকাকার হাত, ছোটকাকা হামাগুড়ি দিয়ে ছুটছিল বাটির পেছন-পেছন।
       বাটি থমকে গেল শোবার ঘরের দরজায়। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পরে শা করে ঘুরে ছুটল রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। বাটির পেছন-পেছন আমরাও। ঘরের মাঝখানে কার্পেট পাতা, সেই কাপেটের অর্ধেক উলটে দিল বাটি। তারপর পেডেস্টাল ল্যাম্পের পাশ দিয়ে ছুটে কোণের রঙিন মোড়াটাকে ধাক্কা মারল। ধাক্কা খেয়েই মোড়া উলটোল, আর মোড়া উলটোতেই বেরিয়ে পড়ল গয়নার বাকসো।
       কাকিমা প্রায় ছুটে গিয়ে ছোঁ মেরে বাকসোটা তুলে ডালা খুলে ফেললেন। বাকসোর মধ্যে থরে-থরে সাজানো একগাদা গয়না। কাকিমার মুখে হাসি আর ধরে না। সব দেখেশুনে বললেন, “ঠিক আছে, কিচ্ছু খোয়া যায়নি।”
       কাকিমা গুণীকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “নগদ হাজার টাকা এখনতো বাড়িতেই নেই। যা আছে দিচ্ছি, বাকিটা কাল দিয়ে দেব।"
      গুণী সত্যিই গুণী, লাজুক মুখে বললেন, “ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। আপনি আপনার সুবিধেমতো অসিতাভর হাত দিয়ে টাকাটা পাঠিয়ে দেবেন।” অসিতাভ ছোটকাকার নাম।
      গুণী চলে যাবার পরেও বাইরের ভিড় অনেকক্ষণ ছিল এ বাডিতে। মন্ত্রশক্তি নিয়ে নানান ধরনের গল্প হল। তারপর প্রশ্ন উঠল, কে চোর? বাড়ির কেউ, নাকি বাইরের? দিন-সাতেক এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা হল, কিন্তু সন্দেহজনকরা সন্দেহজনকই থেকে গেল শেষ পর্যন্ত। চোর আর ধরা পড়ল না।
      এই ক'দিনে বাটি-চালার আশ্চর্য ঘটনা আমি ডেকে-ডেকে সবাইকে শুনিয়েছি, কিন্তু কখনোই ভাবতে পারিনি, আমার জন্যে মস্ত একটা চমক অপেক্ষা করছে শিয়ালদা স্টেশনে।
       আমি আর ব্রজদা স্টেশনে গিয়েছিলাম ছোটকাকাকে ট্রেনে তুলে দিতে। ছোটকাকা বন্ধুদের সঙ্গে দার্জিলিং যাবে। হঠাৎ দেখি ছোটকাকার তিন বন্ধুব মধ্যে সেই গুণী। গুণীর পরনে অবশ্য ধুতি চাদরের বদলে প্যান্ট শার্ট।
      ছোটকাকাকে গুণীর কথা জিজ্ঞেস করতেই সে কী হাসি সবার। ব্রজদাও হাসছিল ওদের সঙ্গে। হাসতে হাসতে ছোটকাকা আমাকে বলল, “খবৰ্দার । এর কথা বাড়িতে কাউকে বলবি না। ফিরে এসে মজা হবে খুব।"
       দার্জিলিং থেকে আটদিন বাদে ফিরে আসার পরে সত্যিই খুব মজা হয়েছিল বাড়িতে। মজার আসরে কাকাবাবুও ছিলেন। সব শুনে কাকাবাবু হাসতে হাসতে কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “খুব ভাল হয়েছে। তোমার একটা শিক্ষা হওয়ার দরকার ছিল। গয়নার বাকসো এখন থেকে আর যেখানে-সেখানে ফেলে রেখো না।”
      সেই নকল গুণী ছোটকাকার কলেজের নতুন, বন্ধু। নাম বরুণ, বরুণকাকা খুব মজা করতে পারে। একটু হেসে বলল, “না বৌদি, মাঝেমধ্যে এদিক-সেদিক ফেলে রাখবেন। না হলে আমাদের হাজার টাকাও জুটবে না, বেড়ানোও হবে না।"
    কাকিমা চোখ পাকিয়ে বললেন, “বাদর কোথাকার! দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি।" এবারের মজাটা আরও মজার। কাকিমা ট্রে ভর্তি করে রসগোল্লা আর পায়েস নিয়ে এলেন।
       আমরা সবাই পেট পুরে খেলাম।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য