চরকা বুড়ী - ননীগোপাল চক্রবর্তী

চরকা বুড়ী গুড়ি গুড়ি
হাঁটে লাঠি নিয়ে। 
কেউ জানে না কোন জন্মে কার সাথে তার
হয়েছিল বিয়ে!
      অথচ তার বিয়ের কথায় বুড়ী পঞ্চমুখ ।
      একশোজন লাঠিয়াল নিয়ে বর এলো তাকে বিয়ে করতে। তাদের হাতে লাঠি, মাথায় ঝাঁকড় চুল।
    গায়ের মোড়ল ছিল বুড়ীর বাবা। সকলে একজোটে বলল,— এত লাঠিয়াল নিয়ে বিয়ে করতে আসা মানে মোড়লকে ভয় দেখানো। এটা মোড়লের অপমান, গাঁয়েরও একটা নিন্দে। কেন ? আমরা কি বেঁচে নেই? অামাদের ঘরেও কি লাঠি নেই?
      কি করা যায়!
      মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ল। অমনি জড়ো হ’য়ে গেল দুশো লাঠিয়াল সেই রাতেই। তাদের মাথায় লাল গামছা। গোঁফে চাড়া দিয়ে লাঠি হাতে লাইন করে তারা দাঁড়িয়ে গেল।
      বিয়ে বাড়ী খুব হৈ চৈ । খাওয়া-দাওয়া, বাজি-বাজনা।
     পথ চলতি ভিন গাঁয়ের একটি লোক জিজ্ঞাসা করল—ব্যাপার কি? এত লাঠিয়াল কেন? উত্তর হলো, মোড়ল মশায়ের বাড়ী বিয়ে।
      বিয়ে হচ্ছে কার সাথে?
      কে একজন উত্তর করল, মোড়ল মশায়ের মেয়ের সাথে।
      বরের বাবা একথা শুনে মহাখাপ্পা। বলে, কভি নেহি, বিয়ে হচ্ছে আমার ছেলের সাথে।
      মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হচ্ছে, না ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে প্রশ্নটা দাঁড়াল এই।
      ঝাঁকরা-চুল পালোয়ানরা বলে, ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। মাথায় লাল গামছা লাঠিয়ালরা বলে, মেয়ের সাথেই ছেলের বিয়ে হচ্ছে।
      মহা হট্টগোল।
      মন্তর পড়তে পড়েত পুরুত ঠাকুর থেকে গেলেন। বর পক্ষের দাবী,—আগে বিচার হোক কার সাথে কার বিয়ে হচ্ছে, তারপর বিয়ে।
      ডাক পড়ল বড় বড় মাথাওয়াল লোকের। তারা দুপুর রাত অবধি শাস্ত্র ঘেঁটে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর বললেন,—দু’জনেরই সাথে বিয়ে হচ্ছে।
      কিন্তু বরের বাবা তাতে খুশী নয়। এ হতেই পারে না। মেয়েছেলে কি বেটাছেলেকে বিয়ে করতে পারে নাকি? পুরুষের উপর দিয়ে যাবে মেয়ে। তারপর হুঙ্কার দিয়ে বলল,—অামার ছেলে যদি বাপকা বেটা হয় তা হলে এখনই—
     বরপক্ষের একশো লাঠিয়াল অমনি মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় লাল গামছা-বাঁধা দু’শো লাঠিয়াল গর্জে উঠল,—এখনই কি?
      বরপক্ষের পালোয়ানরা বলে—বিয়ের আসর থেকে জোর করে নিয়ে যাবো মেয়েকে—
      কন্যাপক্ষের লাঠিয়ালরা বলে—ঝাঁকড়াচুলো মাথাগুলো সব রেখে দেবো এখানে।
      কথা কাটাকাটি, তারপর লাঠালাঠি। বেঁধে গেল দাঙ্গা। তুমুল কাণ্ড।
     কুটুম্বরা ছাতি ফেলে পালাল, নিমন্ত্রিতেরা খালি পেটে পালাল, রান্নার লোক উনুন ফেলে পালাল। ঢাকি তার ঢাক ফেলে পালাল, শানাইওয়ালা শানাই ফেলে পালাল, পুরুত গামছা ফেলে পালাল, এয়োরা বরণ ডালা ফেলে পালাল।
      ভোর হয়ে গেল। 
      গাঁয়ের আর আর পাঁচজনের চেষ্টায় দাঙ্গা থামলে যারা যার পালিয়েছিল সবাই ফিরে এল,—এল না কেবল বর আর কনে।
      খোঁজ-খোঁজ-খোঁজ—কোথায়ও তাদের হদিশ মিলল না, একেবারে বেপাত্তা!
     বরের বাবা মেয়ের বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বেয়াই, অামার ছেলে তোমার মেয়ের সাথেই গেছে কোথায় চলে!       মেয়ের বাবা ছেলের বাবার গলা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বিয়াই গো, অামার মেয়ে তোমার ছেলের সাথেই গেছে কোথায় পালিয়ে।
      কার সাথে কে গেল ঠিক হলো না কিছু। এই হচ্ছে চরকাবুড়ীর বিয়ের ইতিহাস। বুড়ী যেন একটা গল্পের ঝুলি! চরকা কাটে আর গল্প বলে। ছেলেমেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে। তারা একমনে গল্প শোনে আর তুলোর বীজ ছাড়ায়।
     রাত্রে বুড়ীর ভালো ঘুম হয় না । শুয়ে শুয়ে বুড়ী রোজ রাত্তিরে তার গল্পের মুসাবিদা করে রাখে, সকালেই তা বলতে হবে ছেলেমেয়েদের ; এক গাঁয়ে ছিল তিন জন ঠক। তারা ফাঁকি দিয়ে লোকের জিনিষপত্তোর নিয়ে নিত। তারা সবাই নিজেকে সব চাইতে বড় চালাক মনে করত। এই নিয়ে তাদের ঝগড়া হ’ল একদিন। একদিন গেল তারা তাদের গুরুর কাছে—কে বড় চালাক তাই জানতে। গুরু বলল, কাজ না দেখে কি বলা যায়! তোমরা বেরিয়ে পড়, কে কি বাগালে আমাকে এনে দাও। সব শুনে তবেই তো আমি বলব, কে বড় চালাক?
      ঠকেরা বেরিয়ে পড়ল একসঙ্গে ।
    কতদূর গিয়ে এক মাঠের মধ্যে তারা দেখে, গাধার পিঠে চড়ে একটি লোক যাচ্ছে। তার সঙ্গে অাছে একটি রামছাগল। তার গলায় ঘণ্টা বাঁধা। ছাগলের দড়ি গাধার লেজের সঙ্গে আটকানো। ছাগলটি গাধার পিছন পিছন হাঁটছে আর ঠন্‌ ঠুন করে ঘণ্টা বাজছে। প্রথম ঠক বলল, আমি ওর ছাগলটাকে চুরি করব। দ্বিতীয় ঠক বলল, আমি ওর গাধাটাকে বাগিয়ে নেবো। তৃতীয় ঠক বলল, আমি ওর পরণের কাপড়খানি লোপাট করব।
      এদিকে এক চোর বুড়ীর ঘরে চুরি করতে এসে একমনে তার সেই সব গল্প শোনে। তারপর কি হলো, পরণের কাপড়খানি কি ভাবে লোপাট করল জানবার জন্য, চুরি করার কথা সে ভুলেই যায়।
      এদিকে রাত ফর্স হয়ে আসে।'
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য