পরলোকের হাঁড়ির খবর - আশাপূর্ণা দেবী

      লম্বা সাঁকোটার এপারে একপাশ ঘেষে দাঁড়িয়েছিল বটকেষ্ট। সময় পেলেই এরকম দাঁড়িয়ে থাকে সে। সাঁকোটা দিয়ে মানুষ পারাপার দেখে। এটা বটকেষ্টর একটা নেশা। কে আসছে কে যাচ্ছে, কে চেনা কে অচেনা তার হিসেব রাখা।
      তা সাঁকো পারাপার তো করছে সবাই। হরদম। দিনদুপুর নেই, রাতদুপুর নেই, সকাল নেই, সন্ধে নেই। এই যে মাত্র খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে বটকেষ্ট, কতক্ষণ তা অবশ্য জানে না, হাতে তো ঘড়ি বাঁধা নেই কাজেই সময়ের হিসেবও নেই। তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। এইটুকুর মধ্যেই কতজন এল গেল। আজ আর চেনা জানা কাউকে দেখল না। আর সবাই তো ঝড়ের বেগে ছুটছে, দাঁড়িয়ে একটা কথা বলবে, এমন সময় নেই।
      যারা যায় তাদের তো কথাই নেই, দৌড়োনোর ঘটা কী? যেন ট্রেন ফেল হয়ে যাচ্ছে, না রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। যারা আসে, তারা বরং কখনো কখনো একটু দাঁড়িয়ে বটকেষ্টর কাছে খোঁজতল্লাশ নেয়, কতদিন এখানে আছে বটকেষ্ট, জায়গাটা কেমন, এইসব।

      আজ আর তেমন কাউকে পায়নি। কথা বলতে না পেয়ে পেট ফুলছিল বটকেষ্টর। হঠাৎ দেখতে পেল ওই দূরে, সাঁকোটার একেবারে ওমাথায় কে যেন আসছে, হাঁটার ভঙ্গিটা যেন চেনা চেনা। দৈবক্রমে এ-সময় সাঁকোটা একটু ফাঁকা রয়েছে। বটকেষ্ট চোখের ওপর দিকে হাত আড়াল করে নিরীক্ষণ করে দেখতে চেষ্টা করল লোকটা কে!
      নদীটা বিশাল, সাঁকোটাও বিশাল লম্বা। পার হয়ে আসতে সময় লাগে। ধৈর্য ধরে থাকতে থাকতেই লোকটা কাছাকাছি এসে গেল। চিনতে পারল বটকেষ্ট। আর চিনে চমকে গেল!
      গজগোবিন্দ না? ও না মিলিটারির চাকরি নিয়ে জলন্ধরে না কোথায় চলে গিয়েছিল। তাগড়া জোয়ান চেহারা, এক কথাতেই চাকরি হয়ে গিয়েছিল। অবিশ্যি যুদ্ধ করার চাকরি নয়। গজগোবিন্দ হচ্ছে ডাক্তার, সেই চাকরিই পেয়েছিল মিলিটারিতে। তো এক্ষুনি চলে এল মানে?
      ভাবতে ভাবতেই লোকটা, মানে গজগোবিন্দ একদম সামনে এসে গেল, আর চেঁচিয়ে উঠল, কেঁ বঁটা নাঁ?
     বটকেষ্ট শিউরে উঠল। চমকাল খানিকটা আহ্লাদে, খানিকটা দুঃখে। বলল, তুঁইও চঁলে এঁলি? তাঁ তোঁ এঁলুম। যঁমের মুঁখে থাঁকা তোঁ? কিন্তু তুঁই কঁবে? 
      সেঁই তোঁ উঁল্টোরথের দিন। 
      তুঁই দেঁশে নাঁ থাঁকাতেই আঁমার এঁই বিঁপত্তি। তোঁর ওঁষুদ একদাঁগ পঁড়লেঁই ঠিক সেঁরে যেঁতুম।
      গজগোবিন্দ বলে উঠল, হঁয়েছিঁল কী? 
     আঁর বঁলিস ক্যাঁনো! ওঁই উঁল্টোরঁথের মেঁলা দেঁখতে গিঁয়ে খাঁন আঁষ্টেক পাঁপড় ভাঁজা আঁর দুঁ’কুঁড়ি মাত্তর বেঁগুনি-ফুঁলুরি খেঁয়েছিঁলুম। ব্যঁস। হঁয়ে গেঁল। ব্যাঁটা নিৰ্ঘত কেঁরোসিঁনে পাঁপড় ভেঁজেছিল।
      গজগোবিন্দ হো হো করে হেসে বলে উঠল, তুঁই দেখছি এঁকরঁকমই রঁয়ে গেঁলি। মেলার বাঁজারের পাঁপড়ভাঁজা দেঁখলে আঁর কাঁণ্ডজ্ঞাঁন থাকে না।
      হাসতে হাসতে আহ্লাদের চোটে গজগোবিন্দ ভীমের গদার মতো দুখানা হাত মেলে জড়িয়ে ধরল বটকেষ্টকে। সঙ্গে সঙ্গে বটকেষ্টও তার লিকলিকে হাত দুটো বাড়িয়ে জাপটে ধরল গজুকে। তা ফল দুজনের একই হল।
      ‘খুস’ করে একটু হাওয়া খেলে গেল দুজনের মধ্যে। দুজনেই তো একটু হাওয়াই জাপটে ধরেছে। সাঁকো দিয়ে হুড়মুড়িয়ে অনেকগুলো লোক চলে এল। বটকেষ্ট আর গজগোবিন্দর ওপর দিয়ে বয়ে গেল। ধাক্কা অবিশ্যি লাগল না, তবে একটা ডিসটার্বেনস তো বটে।
      বটকেষ্ট বলল, চঁ গঁজু, আঁমার ওঁখানে। নিঁরিবিঁলিতে। 
     গজগোবিন্দ তাজ্জব হয়ে বলল, অ্যাঁ। এঁখেনে তোঁর নিঁজেস্বো ঘঁরবাঁড়ি আঁছে?
     বটকেষ্ট একটু রহস্যময় হাসি হেসে বলল, ‘আঁছে বঁললে আঁছে, নাঁই বঁললে নাঁই। তোঁ নিঁরিবিঁলিটা আঁছে। নবকেঁষ্টর মা তোঁ সেঁখানের। পৃঁথিবীর বাঁড়িতে।
      গজগোবিন্দ একটু দুঃখিত হয়ে বলল, ওঁ। তাঁই তোঁ! আঁহা। তুঁই আঁসার আঁগে খুঁব কাঁন্নাকাঁটি কঁরল তোঁর গিন্নী?
     তাঁ করছিল। শুঁনতে শুঁনতে চঁলে এঁইচি। বহুদূঁর অঁবধি সেঁই চেঁচানির আঁওয়াজ কাঁনে এঁসেছে। 
     দুজনে আসতে লাগল। তবে হাঁটার কষ্ট তো নেই। হাওয়ায় ভাসা ব্যাপার। অনেকখানিটা দূরে চলে এসে বটকেষ্ট বলল, আঁয়।
      গজগোবিন্দ অবাক হয়ে বলল, এঁই বাঁড়িটা আঁগে দেঁখেঁছি মনে হঁচ্ছে। 
    তাঁ হঁতেই পাঁরে। এঁটা আমার বঁর্ধমানের দেঁশের বাঁড়িটার প্যাটানের। ওঁখানে যাঁরা ভঁদ্দর হঁয়ে কাঁটিয়ে এঁসেছে তাঁদেরকে এঁমনটা দেঁওয়া হঁয়। গুঁড কনডাঁকটের প্রাঁইজ আঁর কি!
      কিছু গাছপালার পাশ দিয়ে দরজায় চলে এল বটকেষ্ট বন্ধুকে নিয়ে। 
[বিঃ দ্রঃ—দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, প্রেসের ভাঁড়ারে চন্দ্রবিন্দু অক্ষরটির শর্ট পড়ে যাওয়ায়, এদের কথোপকথনে আর চন্দ্রবিন্দু দেওয়া সম্ভব হবে না।]
      গজগোবিন্দ কলেজে পাঠকালে একবার বটকেষ্টর দেশের বাড়িতে গিয়েছিল। এখন দেখে অবাক হয়ে গেল, ঠিক যেমন যেমন দেখেছিল সেই রকমই ব্যবস্থা। উঠোনে কুয়ো, কুয়োয় কপিকল লাগানো, পাশে ঘটি-বালতি।
      দাওয়ার ধারে একখানা বড় চৌকি আর খান দুই-তিন জলচৌকি পাতা। অর্থাৎ এটাই ড্রইংরুম। বটকেষ্ট বলল, হাত-মুখ ধুবি? 
      গজগোবিন্দ বলল, নাঃ। আসার আগে এইসা চান করিয়েছে, সর্দি হয়ে গেছে। বসি আয়। 
      চৌকিটায় বসল দুজনে। 
     বটকেষ্ট বলল, খাবি কিছু? 
     গজগোবিন্দ বলল, তা পেলে মন্দ হয় না। 
     কী খাবি বল? 
     কী আছে তোর? 
     কিছুই নেই, আবার সবই আছে যা চাইবি, পেয়ে যাবি। 
     গজগোবিন্দ যোশ হয়ে বসে বলল, ব্যাপারটা কী বল তো? 
    ব্যাপারটা এইই। যা চাই মনে করবি, সামনে এসে যাবে। তবে— 
    একটু দুঃখু দুঃখু আর মজা মজা হাসি হাসল বটকেষ্ট। 
    কী হল রে বটা? তবে’ বলে হাসলি যে? 
    বটকেষ্ট বলল, হাসছি এই জন্যে খেলে তুই টের পাবি না। খাচ্ছিস, খেলি। 
    অ্যাঁ। 
    সেই তো। এই যে তখন তোতে-আমাতে কোলাকুলি হল। হাতে-বুকে টের পেয়েছিলি কিছু? 
    গজগোবিন্দ আস্তে মাথা নাড়ল।
    হুঁ। ঠিক সেই রকমই। দেখ হাতে হাতেই। তা তুই তো মিষ্টির যম ছিলি, মিষ্টিরই অর্ডার দিই?
    তাই দে।
   বটকেষ্ট হাতটা একবার উঁচু করে হাতছানি দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে বলল, এই যে শুনছেন? বড় এক থালায় নবীনের রসগোল্লা গাঙ্গুরামের চমচম গিরিশের কড়াপাক কল্পতরুর অমৃতি আর তিতু ময়রার রসমালাই পাঠিয়ে দিন তো। বেশ বড় সাইজের থালা নেবেন। আর সব জিনিস চারটে চারটে দেবেন।
    গজ বলল, ইয়ে বট, চিত্ৰকূট হবে না? আমাদের ঝামাপুকুর লেনের মোড়ে হলধরের দোকানে যে পেল্লায় সাইজের চিত্ৰকূট বানাত? অবিশ্যি দামটা একটু বেশি। বোধহয় দুটাকা করে। তবে কী ফাস্ট ক্লাশ ।
     দামের জন্যে ভাবতে হবে না।
     গলাটা একটু চড়িয়ে বলল বটকেষ্ট, ঝামাপুকুর লেনের হলধরের দোকানের চিত্ৰকূট চারখানা।
     গজগোবিন্দ বলল, সবাই চারখানা করে বলছিস, তুই খাবি না?
     আমার মিষ্টি খাওয়া বারণ জানিস না? ডায়াবেটিস।
    গজ অবাক হয়ে বলল, এখনো, এখানে এসেও আছে সে সব?
    থাকবে না? জানিস না স্বভাব যায় না মলে?
    বাঃ, এটা কী স্বভাব? এটা তো রোগ!
    ও দুই এক। দেখিস এই রোগ নিয়েই আবার জন্মাতে যাব।
    ধ্যেৎ
   ধ্যেৎ মানে? দেখিসনি কেউ কেউ জন্ম পেটরোগা, কেউ কেউ জন্ম থেকেই লোহা খেয়ে হজম করে। কারুর বা জন্মকাল থেকেই বারোমাস কান কটকট মাথা ঝনঝন নাকে সর্দি। কারুর ওসবের বালাই মাত্র নেই। মানেটা কী?
   মানে বলবার আগেই চোখের সামনে চৌকির ওপর এসে পড়ল বৃহৎ একখানা খাগড়াই কাসার থালা! তাতে পরিপাটি করে সাজানো অর্ডারি-মালগুলি।
    গজগোবিন্দর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
    বলল, কতকাল যে এসব জিনিস চোখে দেখিনি রে। মিলিটারিতে তো রুটি আর মাংস, ডাল আর চাপাটি ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু তুই একেবারে খাবি না? একলা খাব?
     বটকেষ্ট হেসে বলল, খাব না বলে অর্ডার দিইনি। তবে দে দু-একটা।
    গজ বিপন্নভাবে বলল, দেবই বা কোথা থেকে? যা গুনেগুনে আনালি। তো যাকগে, ডায়াবেটিসের রুগি মিষ্টি না খাওয়াই ভালো। আমিই হা হা হা গপগপ লপালপ! এ কী, আরে কী হল? গেল কোথায় খাবারগুলো?
     তোর পেটের মধ্যে।
    ধ্যাৎ কখন? খেলাম কই?
    গপাগপ মুখে পুরলি না?
    গজ মনমরা ভাবে বলল, পুরলাম, তাই না? কিন্তু জিভ জানতে পারল কই?
    পায় না !
    বটকেষ্ট বলল, ওই দুঃখে খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। শুধু হাওয়া খেয়ে থাকি। কী হবে মিথ্যে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে?
    ঋণের বোঝা মানে? এসব ধার করে নিলি না কি?
    বটকেষ্ট হেসে বলল, তবে? এই ধার করে রাখলাম, পরের জন্মে শোধ করতে হবে!
   গজগোবিন্দ এখানে নবাগত, এপারের হালচাল কিছু জানে না। অবাক হয়ে বলল, পরের জন্মে? কি করে শোধ করবি? এইসব দোকান থাকবে?
    থাকবে না আবার? পরের জেনারেশান কি দোকানে মিষ্টি খাওয়া ছাড়বে? তার পরের জেনারেশান?
    গজ বলল, কিন্তু এখনকার লোকগুলো কী বেঁচে থাকবে তোর ধার শোধ নিতে?
    আরে সে তো নিশ্চয় থাকবে না। তবে ওর নাতি-পুতি গিন্নি-পুণ্য কেউ তো থাকবেই, তাদের দেব।
    গজর হাঁ বেড়ে যাচ্ছে। তারা তোকে চিনতে পারবে?
   চিনবে না। তবে না পারলেও কিছু এসে যাবে না। একজন্মের পাওনাদার সাতজন্ম পিছনে ধাওয়া করে ফেরে। আদায় না করে ছাড়ে না।
    বটা!
    কী?
    তুই এত শিখলি কী করে?
    এই লোকমুখে শুনে শুনে। সবাই তাদের এক্সপিরিয়েন্সের ফল শোনাতে ব্যস্ত।
    গজগোবিন্দ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে হঠাৎ বলে উঠল, এটাই তাহলে পরলোক? আমরা মরে গেছি?
    শুনে হোহো করে হেসে উঠল বটকেষ্ট।
    এতক্ষণে বুঝলি? দশবছর মিলিটারিতে থেকে তোর বুদ্ধি-সুদ্ধি ভোতা মেরে গেছে।
    গজগোবিন্দ বলল, তাই হবে। তবে চল তোর এই পরলোকটা একটু বেড়িয়ে দেখি।
   দূর! কোনো চার্ম নেই। সবই তো মরা। বাগান-টাগানগুলোয় সেই যে কোন কালে ফুল-ফল ধরে আছে, সে আর ঝরেও না, শুকোয়ও না। নদীতে বান ডাকে না, পাহাড়ে ধস নামে না। শহরে লোডশেডিং হয় না, বর্ষায় রাস্তায় জল জমে না, কোথাও কোনো কলকব্জা বিগড়োয় না, জামাজুতো ছেড়ে না—
     গজ উল্লাসে লাফিয়ে উঠে বলে, আরে সাবাস! এ যে দারুণ সুখের জায়গা রে।
     দু-দশদিন থাক, বুঝবি ঠ্যালা। সুখে অরুচি ধরে যাবে। তার চে’ তুই সেখানের গপ্পো বল সদ্য এলি। সদ্যই দেখে এলি!
    গজগোবিন্দ হতাশ হয়ে বলল, ওখানের আর কী গল্প! মরছি তা টের পেয়েছি? কোথায় কোনখানে একটা বোমা পড়ল, ধারে-কাছেই নয়। শব্দে বুকটা কেমন ধড়মড়িয়ে উঠল, জ্ঞান হারিয়ে গেল। কে জানে কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম, চেনা জগৎটা কোথায় হারিয়ে গেছে; মস্ত একটা নদী, তাতে লম্বা সাঁকো। বোকার মতো সেই সাঁকোর মুখে দাঁড়িয়ে আছি।.তারপরই হঠাৎ তোকে দেখে যেন বেঁচে গেলাম।
      বটকেষ্ট আবার হেসে অস্থির।
     বেঁচেই গেলি বটে। তো পৃথিবীর জন্যে মন কেমন করছে না তোর? যেতে ইচ্ছে করছে না?
    করছে রে, খুব করছে। হঠাৎ আচমকা চলে আসতে হল! বৌ-ছেলেমেয়েকে লিখেছিলাম সামনের মাসে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসছি। হল না। তারা খুবই মনোকষ্টে আছে তো? একটিবার যদি ঘুরে আসতে পারতাম!
    বটকেষ্ট বলে ওঠে, ঘুরে আসা যায়। তবে ভাবছিস তারা তাহলে আহ্লাদে ভাসবে, কেমন? ওই আনন্দেই থাকো। যাও না। গিয়ে দ্যাখোগে। গেলে দেখেই আঁ আঁ করে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করবে, ওঝা ডাকবে, ভূত ছাড়ানোর মন্তর পড়ে বাড়িতে সর্ষে পড়া ছড়াবে, দরজায় দরজায় আমনাম লিখে রাখবে।
     কে বলেছে তোকে এসব?
     গজগোবিন্দ তার ভীমের গদার মতো হাতের থাবাটা দিয়ে চৌকিতে একটা ঘুষি মারল। শব্দটব্দ হল না, শুধু ঘুষিটা উঠে এল হুস করে।
     বটকেষ্ট বলল, বলেছে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা। আমার যে গিন্নি আমার চলে আসার কালে ডাক ছেড়ে কেঁদে কেঁদে বলছিল, তোমায় না দেখে আমি কী করে থাকবো গো--কী করে বাঁচবো গো’—তিনিই যেই না ভরসন্ধ্যায় বাইরের জানলায় আমায় একটু দেখেছেন, সেই বিকট চিৎকার করতে করতে সে ঘর ছেড়ে চম্পট। ছেলেটার পড়ার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম, ছেলে বলে উঠল, “বাবা! প্লিজ। দয়া করে তুমি আমাদের মায়া ত্যাগ করো’...বলেই ফটাফট ঘরের তিন তিনটে আলো জ্বেলে দিয়ে চেঁচিয়ে নামতা পড়া শুরু করে দিল, ‘আম দুই সাড়ে তিন! অমাবস্যে ঘোড়ার ডিম।
      শুনে গজ তো হাঁ।
      হঠাৎ এটা বলতে বসল কেন?
      বুঝছিস না? ইয়াংম্যান। ফুটবলে চ্যাম্পিয়ান। প্রত্যক্ষে ‘আম’নাম করতে লজ্জা! তাই ওই কান ঘুরিয়ে নাকে হাত।
      গজ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তাহলে বলছিস গিয়ে কোনো লাভ নেই।
      লাভ ওই অভিজ্ঞতা। যতক্ষণ তুমি মানুষ, ততক্ষণ সবাই তোমার আপন’, যেই তুমি ভূত’ কেউ তোমার নয়।
     কী? আমরা এখন ভূত ?
     গজ মিলিটারি মেজাজে চড়ে উঠল।
     বটকেষ্ট বলল, 'ভূত' বলতে দুঃখু হয়, বলতে পারিস প্রেতাত্মা।
     গজগোবিন্দ হতাশ গলায় বলল, নাঃ। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। একটু ঘুমিয়ে নিই। দারুণ ঘুম পাচ্ছে।
     বটকেষ্ট লবডঙ্কা নেড়ে বলল, ওই ‘পাবে’। হবে না।
     হবে না ?
    না। এখানে নিদ্রাজাগরণ বলে কিছু নেই। কিম্ভূতকিমাকার একটা অবস্থা রে গজু। ক্ষিধের জ্বালা নেই,—খাওয়ার সুখ নেই। রোগ-ব্যাধির যন্ত্রণা নেই, আবার সুস্থ স্বাস্থ্যের আরামও নেই। দেহ আছে দেহ নেই।
    গজগোবিন্দ বলে উঠল—ক্ষিধের জ্বালা নেই সেটা তো একটা শান্তি রে বটু। ক্ষিধের জ্বালার বাড়া তো দুঃখ নেই।
    কী যে বলিস গজু! ক্ষিধের জ্বালা না থাকলে, খাওয়ার সুখটা পাবি? যেটা জীবনের সবচে’ সুখ।
    তাহলে—
    তাহলে বলে কিছু বলতে যাচ্ছিল গজু, হঠাৎ একটা কেলে কুচ্ছিৎ খ্যাঁকশেয়ালিমুখো লোক এসে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, এই যে গজগোবিন্দ ডাক্তার কে?
    এই তো।
    নিজের বুকে হাত চাপড়াল গজ। মানে ভাবল হাতটা চাপড়েছে।
    লোকটা বলল, তা এসেছ তো অনেকক্ষণ, এতক্ষণ ফ্রেন্ডের সঙ্গে আড্ডা মারা হচ্ছে যে ! ডিউটি দিতে হবে না?
    ডিউটি।
    গজ মিলিটারি। চড়ে উঠে বলল, এখানে আবার ডিউটি কিসের?
    অ্যাঁ ডিউটি নাই? ওরে আমার চাঁদুরে। গরমেন্টের রাজত্বে বাস করবে, ডিউটি দিতে হবে না?
    গজ চেঁচিয়ে বলল, বটা। ঠিক?
    বটকেষ্ট বলল, খুব ঠিক রে ভাই!
    তো কাজটা কী ?
    লোকটা বলল, কী তা গিয়েই দেখতে পাবে। পৃথিবীতে যে যা করেছে, করত, এখানেও তাই করতে হবে। ধোবাকে রাতদিন ধোবার পাটে কাপড় কাচতে হবে, নাপতেকে রাতদিন লোকের গোঁপদাড়ি চাঁচতে হবে। কুমোরকে রাতদিন চাক ঘোরাতে হবে। কলুকে রাতদিন ঘানি ঘোরাতে হবে। কামারকে রাতদিন লোহা পেটাতে হবে। ছুতোরকে—
    বুঝলাম। গজগোবিন্দ বলে উঠল। আর আমাকে?
    তোমাকে?
    লোকটা মিচকে হাসি হেসে বলল, তোমায় দিনভোর রুগির নাড়ি টিপতে হবে।
    তো এখানে তো রোগ-ব্যাধিই নেই শুনলাম।
    নাইবা থাকল। তা বলে ডিউটি ফাঁকি দেবে নাকি? বলি ভূতের ব্যাগার খাটা’ বলে কথা শোনো নাই কখনো? ভুতো খাটুনি? এই যে তোমার বন্ধুবাবু, রেল কোম্পানির মালবাবু ছিল না? তো ওনার ডিউটি রাতদিন মাল ওজন আর তার হিসেব রাখা। তবে লোকটা মহা ফাঁকিবাজ। একদণ্ডে কাজ সেরে ওই নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে।
    ও, ওই যেখান দিয়ে এলাম? বিশাল নদী! তো নদীটার নাম কী হে?
   লোকটা নিজের কপাল চাপড়ে বলল, হায় কপাল। তাও বোঝোনি? বেশি পণ্ডিতদের এই হয়। বৈতরণী গো। বৈতরণী।
    ‘অ্যাঁ’
    গজ যেন নতুন করে শক খেল, বৈতরণী পার হয়ে চলে এসেছি তার মানে সত্যি মারা গেছি? সত্যি ভূত হয়ে গেছি!
    লোকটা হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে গজকে ধাক্কা দিয়ে বলল, চল চল। প্রেথমে "স্বরূপ ঘরে’ ধোলাই হবে চল। তবেই টের পাবে।
    গজগোবিন্দ মুখ ফিরিয়ে বলল, স্বরূপ ঘর’ কী রে বটা? কী হয় সেখানে?
    বটকেষ্ট হঠাৎ মিচকি হেসে বলল, এই যে এই হয়। আঁ আঁ আঁ আঁক করে ছুট মারল গজগোবিন্দ।
    ‘স্বরূপ ঘরে ধোলাই-এর’ পরে কী হয়?
    আসল চেহারাটি হয়।
    মুলো মুলো দাঁত, কুলো কুলো কান, উল্টো উল্টো পা, জটা জটা চুল, আর কেলে কম্বুলে গায়ের রং।
    ধোলাই একবার হতেই হবে, মেকআপটাও নিতে হবে। তবে সেটা প্রকাশ করা তোমার ইচ্ছে সাপেক্ষ ।
    লোকটার সঙ্গে যেতে যেতে গজগোবিন্দ বলল, আমার থাকার জায়গাটা কোথায়?
    কেন, হসপিটাল এরিয়ায়।
    লোকটার একটু ইংরিজি বুলি প্রবণতা আছে।
    গজ চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে যেতে লাগল। ঘরবাড়ি-বাগান-পুকুর সবই সাধারণ, সবই যেন দেখা দেখা!
    লোকটা এগিয়ে যাচ্ছিল, গজ ডাক্তার জোর পায়ে হেঁটে তাকে ধরে ফেলে বলল, এইসব জায়গা কী এরিয়া?
    লোকটা অবজ্ঞায় নাক কুঁচকে বলল, এইসব মিডল ক্লাসের!
    ওর অবজ্ঞার ভাবে রাগ এলেও গজ বুঝল, এর কাছ থেকেই সব তথ্য জানা যাবে। আস্তে বলল, তো ভাই শুনেছি—পরলোকে নাকি স্বৰ্গ আছে নরক আছে, সেসব কই?
    লোকটা আরো অবজ্ঞায় বলল, আছেই তো। কে বলল নেই? তো তোমার চোখের সামনে ঝুলে থাকবে নাকি?
    সে তো বটেই, সে তো বটেই। তো কোথায় কোন রাজ্যে আছে?
   লোকটা গোঁফে তা দিয়ে বলল, এই রাজ্যেই আছে। চিত্রগুপ্তর রাজ্যে। স্বর্গটা হচ্ছে গিয়ে ‘পশ এরিয়া’। মানে বড়মানুষদের পাড়া। সেখানে অভাব নেই, অসুবিধে নেই, জ্বালা নেই। শুধু ঐশ্বর্য জৌলুস, আরাম আয়েস, আর যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা।
    ওঁঃ । আর নরক?
   সে হচ্ছে গিয়ে বস্তি-ঝুপড়ি-নোংরা-কাদা-পচানালা-পেকো পুকুর, আর হতভাগা সব লোকেদের চেঁচামেচি। তো তোমার আবার স্বৰ্গ-নরকের খোঁজ কেন? তোমার পাসপোর্ট তো এই মিডলম্যান এলাকায়। আছে নাকি কেউ আপনজন স্বর্গে কিংবা নরকে? তো আমায় যদি টুপাইস দিয়ে দাও একবার দেখা করিয়ে আনতে পারি।
    গজ বলল, না আমার কেউ ওসব জায়গায় নেই। থাকলে এখানেই আছে। তো নাম বললে খুঁজে দিতে পারো?
    ও তুমি নিজেই খুঁজে পাবে। মেলা বোকো না। যত্ত সব ঝামেলা। চলো চলো।
    তো সেই গেল তো গেল। বটকেষ্ট রোজ ভাবে, কোথায় নিয়ে গেল গজকে! আর কি কখনো দেখা হবে? এই যে কত আপনজন এসেছে, এ যাবৎ কাউকে কি দেখতে পেয়েছে? ঠাকুর্দাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে। বড় ভালোবাসতো বুড়ো বটুকে। তো কে জানে সে এখন আবার সেতু পার হয়ে চলে গিয়ে কারুর ঘরে নতুন খোকা হয়ে জন্মে বসে আছে কিনা।
    তা শুধু কি ঠাকুর্দা? আরো কতজনই তো এসেছে বটুর জীবনকালে। কাকেই বা দেখতে পেয়েছে? একবার সেজ পিসেকে দেখেছিল, একবার নতুন জ্যাঠাকে, আর একবার পাড়ার শশীবাবুকে। তো শশীবাবু তো চোখাচোখি হতেই অচেনার ভান করে কেটে পড়লেন। পড়তেই পারেন। এখানে আসার আগে বটকেষ্টর কাছে বেশ কিছু টাকা ধার করেছিলেন কিনা, বিজনেস করব বলে।
    তো সে যাক। গজাটার কী হল? দিন মাস বছরের হিসেব নেই, হঠাৎ একদিন দেখতে পেল গজগোবিন্দ আসছে দু’হাত তুলে নদের নিমাইয়ের ভঙ্গিতে।
    বটা আছিস; ওঃ, কতদিন থেকে খুঁজছি। তোর এই ঘরও হারিয়ে মরেছিলাম। হঠাৎ আজ দূর থেকে দেখলাম তুই বসে আছিস। তো সে যাক—বটা স্কুল না গিয়ে তুই কবিতা লিখতিস না? আর কলেজ লাইফে নাটক?
    বটকেষ্ট অবাক হয়ে বলল, লিখতাম তো। তা এখন কী? 
    বলছি—আবার লেখ। আমি তোকে মেটিরিয়ালস দেব। 
   বটকেষ্ট হা হা করে হেসে উঠল, এখানে বসে কাব্য নাটক লেখা হবে? 
   না হবার কী আছে? তুই যদি লেখা ছেড়ে রেলগুদামের মালবাবু বনে না যেতিস এখানে তো তোকে ওই লিখতেই হত রাতদিন। দেখলাম তো ঘাড় গুজে লিখেই চলেছে কত কতজন। বলল, এখন নাকি ভীষণ চাপ, যতসব শারদীয়া সংখ্যা বেরোনোর মুখ। তো তুই একবার পুরোনো অভ্যেসটা ঝালিয়ে নে। তখন তো তোর লেখাগুলো নিয়ে কাগজের সম্পাদকদের দোরে দোরে ঘুরতিস, আর মুখ শুকিয়ে ফিরে আসতিস। এখন দ্যাখ।
   বটকেষ্ট হতাশ গলায় বলল, এখনো তাই হবে। হবে না। গজগোবিন্দ শূন্যে একটা তুলোর ঘুষি মেরে বলল, শুনলাম, নরলোকে নাকি এখন পরলোক'এর খবরের জন্যে খুব চাহিদা। চটপট লিখে ফেলতে পারলে এই সামনের পুজোতেই কোনো একখানা গাবদা-গোবদা পত্রিকায় লাগিয়ে দিতে পারা যাবে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে তুই এখানে এসে ওই মালই জন করেছিস, আর সেতুর লোক গুনেছিস। এখানের তথ্য-টত্য কিছুর ধার ধারিসনি। তো একখানা ঘুঘু রিপোর্টারের সঙ্গে বেশ পটিয়ে নিয়ে, আর নিজে ঘুরে ঘুরে অনেক সব মালমশলা জোগাড় করে ফেলেছি। বইয়ের নামও ঠিক করে ফেলেছি। তবে আমার তো লেখার অভ্যেস নেই! তুই কলমটা ধর।
    বটকেষ্টর প্রাণটা একটু হাহাকার করে উঠল। আহা! অভ্যেসটা যদি রাখত। তবে বলা যায় না। লোকে তো বলে, সাঁতার শিখলে আর সাইকেল চালাতে শিখলে লোকে নাকি জীবনে-মরণে ভোলে না। তা কলম চালানোটাও কি—
    কাঁপা গলায় বলল, বলছিস পারব?
    আলবৎ পারবি!
    কিন্তু ছাপবে কে? পড়বে কে?
    হ্যাঁ, সেটাই তো কথা।
   গজ বলল, তার জন্যে অবশ্য আমাদের নরলোকে নামতে হবে। কোনো একটা গাবদা ম্যাগাজিনের এডিটারকে কায়দা করতে হবে। তো তার জন্যে ভাবনা নেই। হয়ে যাবে। তেমন বেকায়দা করে একবার স্বরূপটা দেখিয়ে দেওয়া যাবে। ওঃ একবার লাগাতে পারলে—একদম হট কেক!
    বটকেষ্ট বলল, কী করে বুঝছিস?
    আরে জানিস না জ্যান্ত মানুষদের চিরটাকালই এই মরে যাওয়াদের সম্বন্ধে অগাধ কৌতুহল। প্ল্যানচেটে আত্মা নামায়, খুঁজে খুঁজে পরলোক তত্ত্বর বই পড়ে। চিরটিকাল! তোর মনে আছে, আমাদের ইস্কুলের হেডসার ‘পরলোকের কথা’ বলে একটা সিরিজ লিখতেন? কী তার ডিম্যান্ড! অথচ সবই অন্যের বই থেকে টুকলিফাই! গাদাগাদা বই জোগাড় করতেন—ইংরিজি-বাংলা—
    খুব মনে আছে।
    তবেই বোঝ? টুকে মেরে বাহাদুরি। আর আমাদের এ বই একদম প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ!!
    কিন্তু গজু, লেখার সরঞ্জাম?
   গজু মুচকি হেসে বলে, সে কি আর জোগাড় না করে বলছি? এই দ্যাখ একটা উঠতি কবির টেবিল থেকে বাগিয়ে আনলাম। দিস্তে দিস্তে কাগজ মজুত রেখেছে, গোছা গোছা ডট্‌পেন! এন্তার লিখছে আর ছিড়ে দলা পাকিয়ে ফেলে দিচ্ছে। লিখছে আর ছিড়ছে। ছিড়ছে আর লিখছে। ভুক্ষেপও নেই যে টেবিল থেকে একদিস্তে কাগজ আর একগোছা ডটপেন উপে গেল। এই নে। নাটকাকারে লেখ, ঝপাঝপ এগিয়ে যাবে।
    বটকেষ্টকে ধরে দিল গজগোবিন্দ সেই বাগিয়ে আনা কাগজ-কলম।
    গজু রে—
    বটু বলে উঠল—ওরে আমার খাস্তাগজ, জিবেগজা, নোনতা গজা, মশলা গজা! তোকে আমি বলেছিলাম, বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে গেছে। আয় একটু কোলাকুলি করি, যাক গে কাজ নেই। তো কী যেন বলছিলি, নামটা ঠিক করে ফেলেছিস!
    ফেলেছি! নাম হবে পরলোকের হাড়ির খবর!! প্রত্যক্ষদর্শীর কলমে—’!
    পরলোকের একটা গুণ ইচ্ছে মাত্রই কাজ হয়ে যায়। চটপট, ঝটপট।
    কাজেই বই শেষ হতে দেরি হল না।
    বটু বলল, তবে আর দেরি করা ঠিক নয়, অ্যাঁ। শারদীয়া সংখ্যার মরসুম তো এসেই গেল।
   গজু বলল, তবে চল। কিন্তু নাটকের প্রথম দৃশ্যটা একটু দেখা হবে না? আমি গড়গড়িয়ে বলে গেলাম, তুই খসখসিয়ে লিখে গেলি। জিনিসটা কী দাঁড়াল—
    বটকেষ্ট সেই দিস্তেভর্তি কাগজ বাগিয়ে মুড়ে ফেলেছে। আর খুলল না। বলল, গোড়াটা? মুখস্থই বলছি। প্রথম দৃশ্য—পরলোকের মহাফেজখানা।
    ঘরে ঘরে মন্ত্রী-উপমন্ত্রী, আমলা-সামলা, এবং ঘরের বাইরে অপেক্ষারত যত হ্যাংলা ক্যাংলা ন্যাংলা! তাদের আবেদন, পরলোকের পিওন চাপরাশি পাহারাদার ইত্যাদিরা সাধারণদের প্রতি বড়ই দুর্ব্যবহার করে। দুরছাই করে। নিজেদেরকে লাট সাহেব ভাবে—
    গজু চঞ্চল হয়ে বলে, থাক রে বটা। শুনতে গেলে আঠা ধরে যাবে, নেশা লেগে যাবে। তাহলে আজ আর যাওয়া হবে না। উঠে পড়া যাক।
    উঠে পড়া মানেই হাওয়ায় ভেসে সেই নদীতীরে সেতুর মুখে। কিন্তু সেতুর মুখের সামনে এক বিপত্তি। দুটো মুস্কো কালো লোক বুলডগের মতো মুখে বলে উঠল, থামো থামো! যাচ্ছ কোথায় হে জোড় মানিক? বলি যাবার পাসপোর্ট আছে?
    বটকেষ্ট ভয়ে ভয়ে গজুর দিকে তাকাল, কিন্তু গজুর নির্ভীক ভঙ্গি। পাসপোর্ট আবার কী হে? আসার সময় তো এসব ঝামেলা হয়নি। সরো সরো। সরার বদলে লোক দুটো ক্যাক করে দুজনকে ধরে ফেলে বলল, আসা আর যাওয়া এক হল? আসার সময় ওখানকার অফিস থেকে রিলিজ অর্ডার হয়ে গিয়েছিল, আমাদের লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।
    জানি। ডাঙস মারতে মারতে। তা বলে ভেবো না এখানের আইনকানুন আমি জানি না। সব জেনে ফেলেছি। পাসপোর্ট লাগবে তখন আবার যখন দুধের খোকা হয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করতে যাব। সে অনেক কাগজপত্র।
    লোক দুটো বলল, সে হবে না। ছাড়া হবে না। 
   তার মানে টু পাইস চাই? কেমন? নড়তে-চড়তে টু পাইস। পাবে-টাবে না। এই যাচ্ছি তোমাদের এখানকার কীর্তিকাহিনি কাগজে ছাপিয়ে দিতে।
    লোক দুটো ফস করে ওদের হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, কাগজের লোক? ও বাবা! 
    না, লেখক। বই লিখে নিয়ে যাচ্ছি ছাপাতে। 
    উরিব্বাস! লোক দুটো হঠাৎ নরম হয়ে গিয়ে হাত কচলে বলে, তাহলে আমাদের ‘কথা’ একটু লিখে দেবেন স্যার।
    তোমাদের আবার ‘কথা’ কিসের হে? দিব্যি যখন-তখন লোককে ডাঙস মারতে মারতে সাঁকো পার করে করে নিয়ে আসছ আর ‘মাসল” বাগাচ্ছ! তোফাই তো আছ।
    লোক দুটো অসন্তুষ্ট গলায় বলল, ওই তো। ওই দুঃখেই তো মরে আছি। হুকুমের চাকর, হুকুম মতোই চলতে হয়। তো এই নিকৃষ্ট কাজটায় আর মন নাই। যদি কাগজে লেখালিখি করে পৃথিবীতে একটা চাকরি মেলে—
    আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখা যাবে। এখন পথ ছাড়ো তো। লোক দুটো তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দেয়। ওরা দুই বন্ধু সাঁকো পার হয়ে চলে আসে। তারপর বলে ওঠে, এখন কোন দিকে? - বটকেষ্ট বলে, কোন দিকে আবার? সোজা ‘রণডঙ্কা’ অফিসে। ব্যাটা সম্পাদক জন্মজীবনে আমার একটা লেখা ছাপেনি। সব অমনোনীত বলে ফেরত দিয়েছে। আবার কতগুলো ফেরত দেয়ওনি। ওকে দিয়েই এখন এই বই ছাপিয়ে নিতে হবে।
    গজগোবিন্দ বলল, নিয়েছিস তো গুছিয়ে? 
    সে আর বলতে।

    বিকেল চারটে। ‘রণডঙ্কা’ সম্পাদক খগেন ঘোষাল যথারীতি চেয়ারটা টেনে টেবিলের ধারে বসে ডিশ ঢাকা চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে মুখে ঠেকিয়ে 'আঃ' বলে ওঠবার বদলে বিশাল হাক পাড়লেন, বনমালী! এই বনমালী! এ কী দিয়ে গেছিস আমায়? চা না নিমের পাচন? বনমালী!
    বনমালীর সাড়া পাওয়া গেল না। তার বদলে কোথা থেকে যেন একটা ‘খি-খি-খি-খি’ হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া গেল।
    এর মানে? খগেন ঘোষালের চুল খাড়া হয়ে উঠল। এত সাহস হয়েছে ব্যাটার। আবার হাঁক পাড়লেন, এই ব্যাটা বনমালী। বদমাশ শয়তান। আবার হাসি! চায়ে দুধ আর চিনি দিয়ে যা।
    আবার হাসি। খি-খি-খি। 
   খগেন ঘোষাল এখন সচকিত হলেন। হঠাৎ এতটা দুঃসাহস হবে বনমালীর? শব্দটা যেন ঘরের মধ্যেই খেলে বেড়াচ্ছে। দেওয়াল থেকে সিলিঙে, সিলিং থেকে দেওয়ালে।...নাকি জানলার বাইরে থেকে?
    তবু আবারও চেঁচিয়ে উঠলেন, বনমালী। 
    তখন সেই হাসিরাই জবাব দিল, বনমালীর আঁশ ছাডুন। সে এখন চোখ উল্টে হাত-পা খিচছে।
    খগেন ঘোষাল সাহসী ব্যক্তি। তিনি কড়া গলায় বললেন, তোমরা কে হে? কোথা থেকে কথা বলছ?
    আঁগ্যে এই আপনার সামনে থেকেই। আপনি যদি চোখ থাকতে অন্ধ হন আমরা নাচার। এই আপনার ডান দিকে আমি কবি বটকেষ্ট পাল। আর আপনার বাঁদিকে আমার বন্ধু ডাক্তার গজগোবিন্দ খাসনবীশ!
    খগেন ঘোষাল অনুভব করলেন তার দুটো হাতের ওপর দিয়ে একটা হিমালয়ের হিমেল হাওয়া বয়ে গেল।
   খগেন ঘোষাল কোনোমতে জামার মধ্যে থেকে পৈতেটা টেনে বার করে মনে মনে রামনাম জপ করতে করতে বললেন, কী উদ্দেশ্যে হঠাৎ আমার এখানে?
    দুটো গলা থেকে বা দুটো নাক থেকে একসঙ্গে একটা কথা উচ্চারিত হল, উদ্দেশ্য মহৎ। ‘রণডঙ্কা'র শারদীয়ার জন্যে একখানা বিশ্বের সেরা কৌতুক-নাট্য এনেছি, পরলোকের হাড়ির খবর। এটা এ বছর পুজো সংখ্যা ‘রণডঙ্কায়’ ছাপিয়ে দেবেন।
    ছাপিয়ে দেবেন।
   শুনেই খগেন ঘোষালের সম্পাদক সত্তাটি তেলে-বেগুনে জুলে ওঠে। স্থান-কাল-পাত্র ভুলে চেঁচিয়ে ওঠেন, ছাপিয়ে দেব? মামাবাড়ির আবদার? পুজো সংখ্যার সব কমপ্লিট হয়ে গেছে, বুঝলেন? কেটে পড়ুন! কেটে পড়ুন।
    কী! কেটে পড়ব? অতো সস্তা না। তুমি বুড়ো খগেন ঘোষাল। একদা আমায় অনেক কাট মারিয়েছ। আর ছাড়ান না। দেখিস বুড়ো, এ লেখা বাজারে পড়তে পাবে না। হট কেকের মতন উঠে যাবে। শারদীয় ‘রণডঙ্কা’ আবার ছাপাতে হবে।
    আপনি’ থেকে ‘তুমি’, তুমি থেকে ‘তুই’।
    মানুষের সহ্যের একটা সীমা আছে তো?
   খগেন ঘোষাল চেঁচিয়ে ওঠেন, পুলিশ। পুলিশ। কনস্টেবল, কনস্টেবল। পাহারোলা। পাহারোলা। ও. সি. ও. সি! মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যপাল! রাজ্যপাল। জৈল সিং! জৈল সিং! রাজীব! রাজীব!
    হে হে, খে খে হিক হিক, হঠাৎ যেন অদৃশ্য শূন্যে দুটাে গলা দুইয়ে শূন্য কুড়িটা হয়ে হাসির বান ডাকিয়ে দেয়, ও বটা! তোর এডিটার দাদু অ্যাতো নার্ভাস? শুদু বাঁশী শুনেই এই চোকে দেখলে তো—তা থাকগে! আপনাকে আর ভিমি খাওয়াবো না। এই লেখাটা দিয়ে যাচ্ছি, ছাপা হওয়া চাই। দে বটা, দিয়ে দে। থলিটা উপুড় করে দিয়ে চটপট চলে যাই।
    ব্যস থলি উপুড় করে বটকেষ্ট। আর সেই লেখারা খগেন ঘোষালের গা-মাথা টেবিল-চেয়ারের ওপর ঝরঝরিয়ে ঝরে উপচে ছড়িয়ে পড়ে।
    কী এ? কী এ? আ আ আ। এ সব কী? 
   চেয়ার ঠেলে টেবিল উল্টে চায়ের পেয়ালা ভেঙে কালির দোয়াত ছিটকিয়ে সারাঘরে দাপাদাপি করে বেড়ান খগেন ঘোষাল আর্তনাদ করতে করতে, বনমালী। বনমালী! তুই কি মরে গেছিস! ওরে বাবারে! এগুলো কিরে?
    ক্যানো? এই তো আমাদের কালজয়ী কৌতুক-নাটক পরলোকের হাড়ির খবর-এর ম্যানাসক্রিপট্ৰ পিন করা হয়নি, গুছিয়ে নেবেন। ছাপাবেন তো দাদা, অ্যা—! না ছাপালে কিন্তু--
    না ছাপলে কী হবে তা আর শুনতে পান না খগেন ঘোষাল। কারণ? কারণ তখন— চোখের সামনে ঝলসে উঠেছে একজোড়া ‘স্বরূপ’। দু'প্রস্থ মুলোর সারিতে ফিক ফিক হাসি, আর দুখানা দুখানা চারখানা কুলো’র লটপটানি।
    ভির্মি খেয়েই দুমাস করে পড়ে যান খগেন ঘোষাল। ফেনা ওঠা মুখে একটি আওয়াজ বেরোয়, ফুঃ ফুঃ ফুঃ লিঃ শ।
    ওরা সাঁকোয় উঠে হাস্যবদনে বলে, নাটকটা যদি স্টেজে নামায় খুব জম্পেস হবে, কী বলিস?

     এদিকে নরলোকের হাড়ির খবর এই— 
    পুলিশ কোনো কাজের নয়’ একথা ভুল। ঘণ্টাকয়েক পরেই এসেছিল পুলিশ। যা করবার করেও ছিল। চটপট। পরদিনই কাগজে কাগজে খবর, ‘রণডঙ্কা পত্রিকা’ অফিসে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড!!....গতকাল বিকালে দুইজন দুৰ্বত্ত ‘ভূতের ছদ্মবেশে পত্রিকা অফিসে বলপূর্বক হানা দিয়া তাণ্ডব-নৃত্য শুরু করে। যথেচ্ছ ভাঙচুর ও মারপিটের পর সম্পাদককে শাসাইয়া রাশি রাশি হিজিবিজি আঁকিজকি কাটা কাগজের টুকরা সর্বত্র নিক্ষিপ্ত করিয়া রহস্যজনকভাবে অন্তর্ধান করে।
    কাগজগুলি দেখিয়া মনে হয় কোনো সাঙ্কেতিক ভাষায় লিখিত বিশেষ ইস্তাহার! দুর্বোধ্য ভাষায় লিখিত এই ইস্তাহারের কয়েকটি নমুনা পাঠোদ্ধারের জন্য বিশেষজ্ঞ দিগের কাছে পাঠানো হইয়াছে।
    আততায়ীদিগের উদ্দেশ্য বোঝা যাইতেছে না। কেহ ধরা পড়ে নাই। সম্পাদক খগেন ঘোষাল ও বেয়ারা বনমালী দাস এখন হাসপাতালে।’

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য