ভূত চালানো সহজ নয় - ননীগোপাল চক্রবর্তী

      ভূতের গল্প বল আজ—ছেলেরা ধরল চরকা বুড়ীকে। ভূত? ভূত তো কবে সব পালিয়ে গেছে তোদের উৎপাতে।
না, সব ভূত পালায়নি, বলল একটি ছেলে। আমাদের গাঁয়ের একটি মেয়েকে ধরেছিল বাঁশ ঝাড়ের ভূতে। ওঝা এসে ভূত চালান দিয়ে তাকে ভালো করে দেয়। আচ্ছা, এত গাছ থাকতে বাঁশ গাছে ভূত থাকে কেন? জিজ্ঞাসা করে আর একজন।
     চরকা বুড়ী চরকা কাটে আর বলে—সবই বলছি, শোন। ভূত চালানো সহজ নয়। ওর বিপদ অাছে অনেক। বড় বড় ওঝাদের এজন্য উচাটন, বিতাড়ন সব রকম বিছে শিখতে হয়। ভূতসিদ্ধ যারা, তারা উচাটন মন্ত্রে ভূতকে নামায়, আবার বিতাড়ন মন্ত্রে তাকে তাড়িয়ে দেয়।
     এই উচাটনের মন্ত্র-তন্ত্র শিখতে লাগে পুরো দশটি বছর অার বিতাড়নের মন্ত্র-তন্ত্র শিখতেও লাগে কমসে কম আরও দশ বছর। এই বছর কুড়ি ধৈর্য ধরে যারা গুরুর কাছে পড়ে থাকতে পারে—তারাই হয় ভূত মন্ত্রে সিদ্ধ।
      কিন্তু তা তো হয় না। আমাদের ধৈর্য কৈ? আমরা সব কিছুই ফাঁকি দিয়ে অল্পের মধ্যে সারতে চাই ।
     ওঝাদের বেলাতেও তাই। বছর কয়েক তাড়াতাড়ি করে উচাটন মন্ত্র শিখে, তারা আর বিতাড়ন মন্ত্র শিখতে চায় না। ভাবে, তারা সব শিখে ফেলেছে। তার ফল হয় সাংঘাতিক।
     উচাটন মন্ত্রে ভূত আসে, কিন্তু একটা শর্ত—সর্বক্ষণ তাকে কাজ দিতে হবে। কাজ না দিলে, অথবা বিতাড়ন মন্ত্রে তাকে তাড়াতে না পারলে, সে তোমার ঘাড় মটকে চলে যাবে। কত ওঝার এইভাবে অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে।
      একবার হয়েছিল কি, এক ওঝা পূর্ণ সিদ্ধ হওয়ার আগেই উচাটন মন্ত্রে ভূতকে আবাহন জানাল। তার আর দেরি সইছিল না।
      ব্যস্‌ ভুত এসে উপস্থিত। উপায়? কাজ চাই তো! ভেবে চিন্তে তো সে ভুতকে ডাকনি।
      ওঝা বলল, বাড়ী করে দাও, পুকুর কাটাে। অমনি সঙ্গে সঙ্গে পুকুর, বাড়ী-ঘর সব হয়ে গেল। তারপর? ওঝার আর কোন কাজের কথা মনে পড়ে না। কিন্তু কাজ দিতেই হবে ভূতকে, নইলে—
      ওঝা তাড়াতাড়ি বলল,—জল আনো।
      ভূত জল আনছে তো আনছেই। জলে থৈ থৈ। চারদিক জলে ডুবুডুবু। উপায়?
      তখন বুদ্ধি করে ওঝা বলল, সব জল তুলে ফেল । কিছুক্ষণের মধ্যেই সব জল তুলে ফেলল ভূত। এবার? কাজ না দিতে পারলে এখনই তো তার ঘাড়টি মটকে মেরে ফেলে দেবে—কিন্তু এত কাজই বা কোথায়?
      এমন উভয় সংকটের মধ্যে পড়েও লোকটির মাথায় ধাঁ করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
      ভূতকে সে কি করতে বলল, বল দেখি তোরা?—জিজ্ঞাসা করল চরকাবুড়ী।
      ছেলেরা তখন এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
      একজন বলল, ভূতকে ওঝা বলুক, দৌড়ে পালাও এখান থেকে এক্ষুনি— আপদ বিদায় হোক।
     চরকাবুড়ী ঘাড় নেড়ে বলল,—উহু, ওটি হবে না। একমাত্র বিতাড়ন মন্ত্রেই তাকে বলা যাবে—পালাও। বিতাড়ন মন্ত্র যে জানে না, তাকে কেবল কাজ দিয়ে যেতে হবে ভূতকে—বেকার থাকবে না সে এক মুহূর্তও।
      চরকার সুতোটা ঠিক করে নিয়ে বুড়ী বলল,—চট্‌ করে ওঝার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল! সে ভূতকে বলল, ঝাড় থেকে খুব বড় দেখে একটা বাঁ কেটে আনো।
      বাঁশ এলো।
       ওঝা বলল,—ঐ ফাঁকা জায়গায় বাঁশটা পোঁতো। পোঁতা হলো সঙ্গে সঙ্গে।
     ওঝা হুকুম করে বলল, ঐ বাশের মাথায় ওঠে। আর নামো। আজ পর্যন্ত ভূত তাই করছে। সেই একটা বাঁশ থেকে কত বাঁশ, কত ঝাড় ঝাড় বাঁশ হয়েছে। ভূত আজও তাই বাঁশ ঝাড়েই ওঠা-নামা করে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য