বাজ ও সূর্যের আগুন - আদিবাসী লোককথা

       সে অনেককাল আগের কথা। কতদিন আগে তা বলতে পারব না, কিন্তু অনেক আগের কথা। তখন আমাদের বড় কষ্ট ছিল। আমাদের পিতা পিতামহদের বড়ই কষ্ট ছিল। হায়! সেকালের কথা মনে পড়লে চোখে জল আসে। কিন্তু বাছারা, তবু সেকালের কথা তোমাদের জানতে হবে। আমরা থাকব না, তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের তখন এই গল্প শোনাবে। সত্যি গল্প।
        সেই কালে আমাদের লোকজন খুব কম ছিল। তারা ছোট্ট একটা গাঁয়ে বাস করত।গাঁয়ের একদিকে বয়ে চলেছে ছোট্ট তিরতিরে পাহাড়ী নদী, আর গাঁয়ের কিছুটা দূর দিয়ে তিনদিকে পাহাড়। ঘন গাছে সবুজ। অনেক কষ্ট, তবু সুখে দিন বয়ে যায়।
        সব বছরই ওই সময় চারিদিকে বরফ পড়ে। মাটি ঢেকে যায়, গাছের ডাল নুয়ে পড়ে। শীত পড়ে, ভীষণ কষ্ট। কিন্তু একবার সৃষ্টি-ছাড়া বরফ পড়ল। এমন বরফ-পড়া আগে কেউ দেখেনি। নদীর জলও জমে গেল। গাছগুলাকে মনে হল বরফের গাছ। সূর্যের তেজও যেন কমে গেল। সে কি দুর্দিন!
        গাঁয়ের মানুষ ঘর থেকে বাইরে বেরোতে পারে না। ঘরের মধ্যেও দেহ জমে যাচ্ছে। জমানো খাবারও ফুরিয়ে আসছে। সবদিকে দুশ্চিন্তা। বুড়োরা ভাবল, একটা কিছু করতে হয়, নইলে তো জমে গিয়ে না খেয়ে ঘরেই মরে পড়ে থাকতে হবে। কিন্তু কি করবে ভেবে পেল না।
        একদিন একজন বুড়ো দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিল। বরফের হাওয়া দেহে যেন কেটে কেটে বসছে। হঠাৎ সে দেখল, একটা বাজপাখি ঠোঁট দিয়ে বরফ সরিয়ে কি যেন করছে। লোকটি দরজা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাজপাখি তাকে দেখে করুণভাবে সবুজ চোখ মেলে তাকাল। বলল, তিনটে ছেলেমেয়ে বেশ কয়েকদিন খায়নি। বড় কাঁদছে। দেখি কিছু পাই কিনা?
        বুড়ো অবাক হল। পাহাড়ি গাছের উঁচু ডালে থাকে বাজ, দুরন্ত তার গতি, অসীম তার শক্তি, ক্ষুরধার তার ঠোঁট ও নখ। সেও এমন অসহায়! হায় কপাল!
        বুড়ো আস্তে আস্তে বলল, “বাজ, আমরাও যে মরে আছি। একটা কিছু করতে হয়। দেহ তো বরফ হয়ে গেল, পেটে যে ভীষণ ব্যথা। বাজ মুখ তুলে বলল, ‘অনেক কিছুই আমি জানি। কিন্তু এবারে যা অবস্থা তাতে কোন বুদ্ধিই খেলছে না। কোথাও দূরে পালিয়ে যাব তার উপায়ও নেই। ছানারা উড়তে শেখেনি।
        বুড়ো কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘বাজ, সূর্যের আগুন আনা যায় না? সূর্যের মধ্যে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। তুমি ওই কত ওপরে উড়ে যাও, আগুন আনতে পারো না ? এ ছাড়া আমরা বাঁচব না। বাজ, তুমি আমাদের বাঁচাও, তুমি ছাড়া কেউ পারবে না। চিরকাল আমরা মনে রাখব। আমাদের বাঁচাও, আমাদের ছেলেমেয়েদের বাঁচাও। আগুন পেলে তোমার ছেলেমেয়েরাও উত্তাপ পাবে।
       �বাজ চুপ করে রইল। সে জানে, সূর্যের মধ্যে আগুন আছে। দূর আকাশে অনেক অনেক ওপরে সে যখন উড়ে যায়, এখানকার চেয়ে আরও বেশি উত্তাপ পায় সে। আরও ওপরে উঠলে আরও গরম। ডানার পালক, চোখ জ্বালা করে। হ্যাঁ, সূর্যের আগুনের খবর সে জানে। কিন্তু ওই আগুন যদি তার পালককে পুড়িয়ে দেয়? সে মাটিতে নামবে কেমন করে? বুড়ো তাকিয়ে রয়েছে বাজের দিকে। বাজ মুখ তুলে আবার চোখ নামিয়ে বলল, বেশ তাই হোক। আমি তোমাদের জন্য আগুন আনব। কিন্তু আর কয়েকদিন পরে। একটু সহ্য করো, আগুন আমি আনবই।
        বাজ উড়ে গেল তার বাসায়। মা বলল, "বাছারা, সব সময় ডানা নাড়বে। তাড়াতাড়ি উড়তে শিখতে হবে। মা তো আর চিরকাল তোমাদের পাশে থাকবে না ! তাড়াতাড়ি বড় হও।
        ছানারা অতশত বোঝে না, কিন্তু মায়ের চোখে চিকচিক জল দেখতে পায়। তারা জানতে চায়, মা হেসে উড়ে যায় খাবার আনতে। সারাদিন ধরে বেশ কয়েকদিন পরিশ্রম করল বাজ। তারপরে একদিন ছানাদের বলল, “তোমাদের পালক বেশ সবল আর ঘন হয়েছে। বরফ পড়া একটু কমলেই তোমরা উড়তে পারবে। ভয় নেই। আমি একটু দূরে যাব। যদি নাও ফিরে আসি, তোমরা নিজেরাই বেঁচে থাকতে পারবে। বাছারা আমার।
        বাজ উড়ে এল বুড়োর দরজায়। বুড়ো দরজা খুলে অবাক হল। বাজ কথা রেখেছে, সে এসেছে। তারা বোধহয় বেঁচে যাবে।
        বাজ বলল—‘অনেক দূরের পথ। অনেক উঁচু পথ। অবিরাম ডানা মেলে উড়তে হবে, মুখ দিয়েও নিঃশ্বাস নিতে হবে। তাই শুকনো ডাল মুখে ধরতে পারব না, পড়ে যেতে পারে। তুমি ওই গাছের লতা দিয়ে এই শুকনো ডালটা খুব জোরে আমার পায়ের সঙ্গে বেঁধে দাও। আগুন আনতে চললাম। যাই হোক না কেন, তোমাদের জন্য আগুন বয়ে নিয়ে আসবই।
        কৃতজ্ঞতায় বুড়ো অভিভূত, সে শুকনো ডাল বাজের পায়ে বেঁধে দিল, কিন্তু কোন কথা বলতে পারল না। একবার বুড়োর দিকে আর একবার তার বাসার দিকে তাকিয়ে বাজ উড়ে চলল পাহাড়ের পথে । অল্পক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুড়ো ভেতরে চলে গেল।
         ওপরে, ওপরে, আরও ওপরে উঠছে বাজ। মাঝে মধ্যে নীচে তাকিয়ে দেখছে গলা নামিয়ে। না, তার বাসা কিংবা বাছাদের আর দেখা যাচ্ছে না। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। উচুতে আরও উচুতে উড়ে চলে দুর্জয় বাজপাখি। তার ডানা দুটো টনটন করছে। কিন্তু বাজের একটা সুবিধা আছে। সে অনেকক্ষণ হাওয়ায় ভেসে থাকতে পারে, তখন আর ডানা ঝাপটাতে হয় না, ডানা মেলে সে ভেসে থাকে। কিন্তু এতে তাকে কিছুটা নেমে যেতে হয়। তাতে কি ? দম নিয়ে, ডানায় জোর এনে আবার সে ওপরের দিকে উড়ে যায়, দ্বিগুণ উৎসাহে। তাকে আগুন আনতেই হবে।
        গাছের বাসায় দেহ জমে যেত। এখন একভাবে উড়তে উড়তে বাজের দেহ গরম হয়ে উঠেছে। ক্লান্তি আছে, শীত নেই। ডানায় ব্যথা আছে, প্রাণে উৎসাহ জেগেছে। মানুষের কষ্টে সে অনেক বড় কাজ করতে চলেছে। সে ভাবছে, আর কি কোনদিন তার বাছাদের কাছে ফিরে যেতে পারবে। আহা আদরের বাছারা তার।
        অগ্নিপিণ্ড সূর্যের অনেক কাছে বাজ চলে এসেছে। সূর্যের মধ্যে কেমন আগুনের খেলা দেখতে পাচ্ছে। চোখ জ্বলছে, ডানার পালক জ্বলছে। আর যে এগোনো যায় না। আর তো সহ্য করা যায় না। আর পারছে না বাজ। দেহ যেন পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ছেড়ে গেলে তো চলবে না! আগুন তাকে আনতেই হবে, জীবন যায় যাক।
        দেহটা লম্বা করে সে সূর্যের দিকে চেয়ে দেখল। ঝলসে গেল তার সবুজ দুটো চোখ। জ্বলে উঠল পায়ে-বাধা শুকনো ডাল। বিদ্যুতের বেগে নীচে নামতে লাগল। পাহাড় থেকে যেমন করে নুড়ি গড়িয়ে পড়ে, পাহাড়ি ঝরনা থেকে যেমন জল ছিটকে পড়ে, বাজ তেমনিভাবে মাটির দিকে নামতে লাগল। সে কি গতি! এমনভাবে বাজ কোনদিন নীচে নামেনি। সে নামছে, নামছে।
        হঠাৎ তার বুক পুড়তে লাগল, পালক পুড়তে লাগল। মাথা নামিয়ে বাজ দেখে, পুরো ডালটা জ্বলছে, তার শিখা তার দেহকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ভাবল, আর পারি না, ডালটা ঠোঁটের আঘাতে ফেলে দি। কিন্তু মানুষ যে চেয়ে আছে, আমার ফেরার আশায় বসে রয়েছে। বাজ গতি আরও বাড়িয়ে দিল। না, তার গোটা দেহের পালক জ্বলছে। সে কি পারবে মানুষের কাছে পৌঁছতে?
        ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ হল। একেবারে সামনেই। বুড়ো দরজা খুলে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল—বাজপাখি জ্বলছে, সে উলটে-পালটে যন্ত্রণায় ছটপট করছে। আগুন! আগুন! আগুন! চিৎকার করতে লাগল বুড়ো। একের পর এক দরজা খুলে যাচ্ছে। বেরিয়ে আসছে বুড়ে-বুড়ি যুবক-যুবতী-কিশোর-কিশোরী। সবার হাতে শুকনো কাঠ। বাজের দেহ থেকে আগুন জ্বালিয়েই ছুটে যাচ্ছে ঘরে, আরও কাঠ দিয়ে দাউ দাউ আগুন জ্বেলে চারপাশে বসে আগুন পোয়াতে লাগল তারা। বুড়োর ঘরেও আগুন গেল। বুড়ো কিন্তু বাজকে ছেড়ে একবারও ঘরে যায়নি। হাতের ঝাপটা দিয়ে আগুন নেভাতে চেষ্টা করছে। হাত পুড়ছে, তবু চেষ্টা থামায় নি। না, বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে। পাথরের মতো নিথর হয়ে গিয়েছে বাজের দেহ। পালক পুড়ে গিয়েছে, বাজকে যেন কেমন লাগছে। বাজের দেহে প্রাণ নেই।
        বুড়ো বাজের দেহকে তুলে নিল। বুকের কাছে আনতেই বুড়ো অবাক হয়ে গেল। বাজের মুখে কেমন সুন্দর হাসিহাসি ভাব। সবুজ চোখদুটো আগুন-রাঙা হয়ে গিয়েছে, পাদুটোও লালচে। বুড়ো ভাবল, বোধহয় আগুনের শিখায় এমনটি হয়েছে। কিন্তু এ কি? শরীর আর নরম নেই, বাজ পাথর হয়ে গিয়েছে। পাথরের বাজ বুড়োর হাতে। গাঁয়ের পাশের ওই পাহাড়ে বুড়ো গেল। বরফ-জমা পথে পাহাড়ে উঠল। পাহাড়ে ওই উচুতে পাথরের বাজকে বসিয়ে দিল। ওই লাল চোখ, লাল পা, পালক-পোড়া পাথরের বাজকে বসিয়ে রাখল। ওই দেখো, আজও বাজ ডানা মেলে এখানে বসে আমাদের গা পাহারা দিচ্ছে। কবে থেকে দিচ্ছে কেউ জানে না।
        আমরা বাজকে পুজো করি। কোনদিন কোন বাজকে মারি না, শিকার করি না। কোন বাজ আমাদের কোন ক্ষতি করে না। বাজ আমাদের দেবতা। হবেই বা না কেন? নিজের জীবন দিয়েও সে আমাদের জন্য আগুন এনে দিয়েছে। এর চেয়ে বড় উপকার আর কি হতে পারে? বাজ আমাদের আগুন দিয়েছে, তাকে আমরা ভুলিনি।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য