স্বপ্ন - মাহবুব তালুকদার

      রোজ রাতে খোকন স্বপ্ন দেখে। বড় মজার আর সুন্দর সেই স্বপ্ন। লালপরী আর নীলপরী দুবোন এসে ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায় অনেক, অ-নে-ক দূরে। পরীদের মতো খোকনের তো পাখা নেই। তাই, ওরা দুজন তার দুহাতে ধরে উড়িয়ে নিয়ে চলে! আকাশের মাঝপথ দিয়ে যেতে যেতে ভারী অবাক হয় খোকন। মেঘগুলো যেন তুলোর পেঁজার মতো তুলতুলে; ধরতে গেলেই হাতের ফোকর দিয়ে পালিয়ে যায়। তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, হাজার হাজার মণি মুক্তো যেন চিকচিক করে জ্বলছে। দুটো একটা পুরে পকেটে রাখতে ভারী ইচ্ছে যায় খোকনের। কিন্তু পরীরা ভাববেটাকি?
      প্রথম যেদিন খোকন স্বপ্ন দেখেছিল, ভারী ভয় হয়েছিল তার। বুক শিরশির করা ভয়টা। খোকন কেঁদেই ফেলেছিল আর ক ! লালপরী ওর চোখের দিকে তাকিয়ে টের পেয়েছিল বোধ করি। একটা মন্তর শিখিয়ে দিয়েছিল তাকেঃ ভয় ভয় ভয়—করব তোকে জয়। ব্যস। ঐ মন্তরে বুকের সব ভয় ফুরুৎ করে উড়ে পালাল। তবু প্রশ্ন করল খোকনঃ আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তোমরা?
      হাজার পরীর দেশে। নীলপরী বললঃ সেখানে আমাদের রাণী আছেন নাম তার রংধনুপরী। রংধনুর মতো সাতটা রং তার পাখায় কি না!
      ওখানে গিয়ে কি হবে?
      রংধনুপরী খেলবে তোমার সাথে।
      আমার কি খেলনা আছে, না লাটাই আছে? অভিমানে গাল ফুলল খোকনেরঃ একটা সাইকেল পর্যন্ত নেই।
      সব হবে। লালপরী আশ্বাস দিয়ে বলল।
      খোকনের ভারী মজা। পরীদের রাণী রংধনুপরীকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হ’ল সে।
    রাজপুরীতে ঢুকেই দেখল কি তকতকে ঝকঝকে সারাটা বাড়ি। রেশমী কাপড়ের পর্দা সরিয়ে রংধনুপরীর ঘরে ঢুকতে দেখল, সাত রংয়ের পাখা ছড়িয়ে ফুটফুটে পরী রাণী তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
      এগিয়ে যেতেই হাসিমুখে রংধনুপরী এসে তার হাত ধরল। মস্ত বড় পদ্মফুলের পাতায় এনে বসাল তাকে। এটা নাকি সিংহাসন! খোকন গিয়ে যেই ওটার ওপরে বসল, অমনি তার কাপড়-জামাগুলো ঝলমলে শাহী পোশাক হয়ে গেল। রাণীর সহচরী দুজন পরী সোনার থালায় জর্দা নিয়ে এল ওদের সামনে। পরীরাণী আদর করে খাওয়াল তাকে। তারপর ওরা দুজনে মিলে কত কি খেলা। পরীদের বাগানে রুপোর গাছে হীরের ফুল ফোটে। যেমন ফুলের রূপ, তেমনি খুশবু। সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে পরীরাণী হারিয়ে গেল। খোকন খুঁজে বের করল তাকে।
      ফেরার আগে খোকন ভেবেছিল, রংধনুপরীর কাছ থেকে একটা সাইকেল, লাটাই, কিছু মাঞ্জা দেওয়া সূতো চেয়ে নেবে। পরীদের দেয়া সুতো নিশ্চয়ই কাটতে পারবে না আর কারো ঘুড়ি। সাইকেলের চাকাগুলো যদি রুপোর পাতের হয় তাহলে কি মজা ! সবাই চেয়ে চেয়ে দেখবে।
      কিন্তু কি যে হোল, ওগুলো চাইবার আগেই ঘুম ভেঙ্গে গেল খোকনের। ঘুম ভেঙ্গে কান্না জুড়ে দিল সে। মা পাশেই ছিলেন। বললেনঃ কি হয়েছে খোকন?
      আমি সাইকেল কিনব। খোকন আবদার ধরল। তার সাথে কান্না। 
      মা ওর মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে আদর করলেনঃ বড় হয়ে নিশ্চয়ই কিনবে।
      বড় হয়ে নয়। একটু থেমে আবার কান্না ছড়িয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে রাখল সেঃ এখন। 
    সোনামণি লক্ষ্মীমণি আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে মা বললেনঃ এখনও রাত পোয়াতে ঢের বাকী আছে। আরেকটু ঘুমোও।
      কিন্তু খোকনের চোখের পাতা আর বুজল না। শুয়ে শুয়ে লালপরী, নীলপরী আর রংধনুপরীর কথা ভাবল। ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে এলো। খোকন সবার আগে উঠে শিউলি কুড়োতে বাগানে চলে গেল।
       সারাদিন খোকনের মন মেজাজ খুব খারাপ। ওদের পাশের বাড়ির মিঠু কি সুন্দর ঘুড়ি ওড়ায়। ওর লাটাই এ রং-বেরংয়ের সূতোর ঝালর বাঁধা আছে। ঘুড়ির সূতো ছাড়লে বেশ সুন্দর ঘুরতে থাকে ঝালরটা। মিঠুর সাইকেলও নতুন আর মজবুত। প্রথম একদিন ওটার সীটে বসে খোকন দেখেছিল, তোফা আরাম করে বসার জায়গা। কিন্তু মিঠু আর এখন তার সাথে খেলে না। খোকনের সাথে সাইকেল চড়ছিল বলে মিঠুর বাবা মিঠুর কান ধরে কষে চড় লাগিয়ে বলেছিলেনঃ কতদিন বলেছি না, ছোটলোকের সঙ্গে মিশবি না।
      খোকন সেই থেকে আর ওমুখো হয়নি। সত্যি তো মিঠুরা কত বড়লোক! মিঠুর বাবার বিরাট একখানা গাড়ী আছে। আয়নার মত মসৃণ গাড়ীটার দেহ। খোকনের এক একদিন ইচ্ছে করেছে গাড়ীটা ছুয়ে দেখতে। ও বাব্বা! তাহলে রক্ষে নেই।
      ওসব কথা মনে হয়ে সাইকেল কেনার কথা কখন হারিয়ে ফেলেছে খোকন, নিজেই বুঝতে পারেনি। আবার মনে হলেও নিজেদের অবস্থার কথা ভেবে সে চুপ করেছে। কত কষ্ট করে দিন চলে তাদের। ভাঙ্গা একটা সাইকেলে চেপে এই বুড়ো বয়সে দাদু অফিসে যায়। দাদুর ঐ লক্কর-ঝক্করটাকে সাইকেলই বলতে ইচ্ছে করে না। মিঠু ওটা দেখে হাসে কিন্তু খোকন হাসে না।
      নিজেদের অসুবিধার কথা খোকন কখনো বোঝে, কখনো বোঝে না। দাদুকে অফিসে যাওয়ার সময় কতদিন বলেছেঃ দাদুভাই, আমাকে সাইকেল কিনে দাও। দেবে ত?
      একশবার দেব। দাদু আদর করে বলেনঃ খুব ভাল করে লেখাপড়া শেখ। 
      বা রে! আমি যে ক্লাশের ফাষ্ট বয়।
      হ্যাঁ, তাই তো। দাদু যেন সহসা নিজেকে সামলে নেনঃ বেশ, আমার সাইকেলটাই তোমাকে দিয়ে দেব।
      বয়ে গেছে আমার ঐ লক্কর ঝক্কর নিতে। খোকন মুখ ভার করে রাখে।
    আর কথা না বলে দাদু ওকে আদর করে অফিসে চলে যান। তারপর বিকেলে ফেরার পথে কোনদিন চকলেট, কোনদিন মার্বেল নিয়ে আসেন। ওগুলো পেয়ে খোকনের মুখে হাসি ফোটে।
      রাতে আবার সেই স্বপ্ন। মেঘের দেশ, তারার দেশ পেরিয়ে লালপরী আর নীলপরীর হাত ধরে এগিয়ে চলল খোকন। চাঁদের বুড়ী দোক্তা মুখে সূতো কাটছে। বুড়ীকে দেখে খোকন বললঃ বুড়ী, তোমার ত ভারী রূপ। জানো, তোমার রূপের আলোয় আমাদের সারা দেশ জোৎস্নাময় হয়ে যায়।
      এ আর কি রূপ দেখছ? ফোকলা দাঁতে বুড়ী হেসে ফেললঃ কমবয়সে আমার রূপের আলোয় সবার চোখ ধাঁধিয়ে যেত। তোমার পরীরাণীর মত রূপসী ছিলাম তখন।
      তাই নাকি ! খোকনও হাসল। পলক পড়তে না পড়তে পরীরাণীর রাজ্যে পৌছে গেল খোকন। সত্যি ভারী সুন্দর আর রূপসী রংধনুপরী। নিজের দিকে তাকিয়ে খোকন দেখল, তাকেও কম সুন্দর দেখাচ্ছে না। মাথায় হীরে বসানো পাগড়ী সারা গায়ে রত্বরাজিখচিত পোশাক। খোকন এসে পরীরাণীর হাতে ধরল। ফুলের দোলনায় চড়ে দোল খেল দুজনে। তারপর ওরা একটা ফুলের ওড়াগাড়ীতে চাপল। পরীরাণী বলল ওটার নাম নাকি পুষ্পরথ । আকাশে পাতালে সব জায়গায় উড়ে যেতে পারে ওটা। পরীরাণীকে নিয়ে খোকন পুষ্পরথে এক চক্কর ঘুরে এল। আর কি আশ্চর্য পুষ্পরথে চড়তে গিয়ে পরীরাণীর কাছ থেকে সাইকেল চেয়ে নেয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেল সে।
      ঘুম ভাঙ্গতেই খোকন আবার কেঁদে উঠলঃ আমি সাইকেল কিনব। মা প্রথমে সোনামণি বলে আদর করলেন। তাতে কান্না থামল না খোকনের। এরপর বেজায় রেগে গেলেন মাঃ রোজ খালি এক কথা! গরীবের ছেলে গরীবের মত থাকবে না। ঘোড়া রোগ হয়েছে আর কি!
      খোকন আরো জোরে গলা ফাটিয়ে কান্না শুরু করল। ওঘর থেকে দাদু এগিয়ে এলেন। বললেনঃ কি হয়েছে দাদুমণি? 
      সাইকেল কিনবে! মা রাগের সুরে কথাটা বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন। 
      বেশ তো, কালই সাইকেল কিনে আনব তোমার জন্যে। দাদু প্রসন্নমুখে বললেনঃ আজ অফিসে ঈদের বোনাস পাওয়া যাবে। কাল তোমার সাইকেল নিয়ে আসব।
      সত্যি? অবিশ্বাসের দৃষ্টি ছড়িয়েও আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠল খোকন। দাদু ওর গালে টোকা দিয়ে বললেনঃ সত্যি, সত্যি, সত্যি। সারাটা দিন কি করে কোথা দিয়ে কাটল, খোকন টের পেল না। পাড়ায় সমবয়সী বন্ধুদের যাকে যাকে পারল খবরটা দিয়ে এল। খুব ইচ্ছে ছিল মিঠুকেও বলে কথাটা। কিন্তু মস্তবড় লোহার গেট পেরিয়ে ওদের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে খোকার সাহস হোল না।
      রাতে ঘুমুতে গিয়ে খোকনের ভীষণ আনন্দ। কালই তার সাইকেল কিনে আনবেন দাদু। মনে মনে কল্পিত সাইকেলটার গায়ে হাত বুলাল সে। বিছানায় শুয়েও ওটার যেন স্পর্শ পেল। খোকন ভাবল, আজও স্বপ্নে রংধনুপরীকে দেখতে পেলে কথাটা তাকে জানাতে হবে। খোকন তাড়াতাড়ি টুপ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
      কিন্তু খোকন সেদিন রাতে পরীরাণীকে দেখতে পেল না। লালপরীকে না নীলপরীকেও নয়। স্বল্পই এলো না খোকনের চোখে। সারাটা রাত চোখ জুড়ে কেবল ঘুম থাকল। শুধু ঘুম।
      ভোর বেলা চোখ খুলে বড্ড মন খারাপ হয়ে গেল খোকনের। মুখে একটা বিষাদের কালো ছায়া। চোখ মুখ শুকনো শুকনো। এমন মজার মজার স্বপ্ন ছিল তার ; সব স্বপ্ন যেন চুরি হয়ে গেছে। আজ যে সাইকেল কেনার কথা, তাতেও বিশেষ আনন্দ জাগল না মনে।
      দাদুকে একলাটি পেয়ে চুপি চুপি সব খুলে বলল খোকন। তার স্বপ্নের কথা। লালপরী, নীলপরী আর রংধনুপরীর কথা। হীরার ফুল, রুপোর গাছ, পুষ্পরথের কথা পর্যন্ত। তারপর খোকন বললঃ কাল রাতে যে কোন স্বপ্ন দেখলাম না দাদুভাই । লালপরী, নীলপরী, এমনকি পরীরাণীকেও না।
      দাদু ওর চুলে আদরের হাত বুলিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে বললেনঃ স্বপ্ন যে তোমার সত্যি হতে চলল দাদুভাই।
      তার মানে? খোকন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
      মিষ্টি করে হেসে দাদু বললেনঃ তোমার মনে আকাঙক্ষা ছিল বলে তুমি স্বপ্ন দেখতে। এবার সে আকাঙক্ষা পূর্ণ হবে। তাই স্বপ্নরা আর ঘুমের চাদর মুড়ি দিয়ে তোমার কাছে আসবে না। স্বপ্ন যে সত্যি হয়ে যাবে।
      দোকানে যাবার জন্যে তৈরী হয়ে নিতে দাদু পাশের ঘরে গেলেন। খোকনকেও বললেন ভাল কাপড় পরে তৈরী হয়ে নিতে। কিন্তু খোকন উঠল না, চুপচাপ বসে রইল। কি যেন ভাবনা তার মনে ।
      একসময়ে খোকন আলতো পায়ে দাদুর ঘরে এল। আস্তে করে ডাকলঃ দাদু !
      কি রে? দাদু ফিরে তাকালেন।
      আমি সাইকেল চাই না। স্বপ্ন চাই। খোকন বলল।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য