হায়রে কুকুর হায়রে ব্যাঙ - আদিবাসী লোককথা

      বরফ-ঢাকা এক মস্ত নদীর তীরে ছিল এক ছোট বাড়ি। সেই বাড়িতে থাকত এক বুড়ি। বুড়ির ছিল এক নাতনি, একটা লোমশ কুকুর আর একটা সবুজ ব্যাঙ। এই নিয়ে বুড়ির সংসার।
      নাতনি দিদিমার বাড়িতে ছিল মহাসুখে। কতই না তার আদর। বুড়ি খুব ভালোবাসত নাতনিকে, খুব যত্নআত্তি করত। সবচেয়ে ভালো খাবার তাকে খেতে দিত। রঙা-চঙা নানান পোশাক তাকে বুনে দিত।
      কিন্তু বেচারা কুকুর? তার দিনরাত বড় কষ্টে কাটত। বুড়ি তাকে দুচোখে দেখতে পারত না। সারাদিন তাকে দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি করাত। একটু বিশ্রাম নেবার উপায় নেই। তার ওপরে খালি গালাগালি। এত কাজ করেও কুকুরের ভাগ্যে জুটত এটো খাবার। শুধু মাংসের হাড় আর মাছের কাটা। হায়রে লোমশ কুকুর।
      আর বেচারা সবুজ ব্যাঙ? তার কষ্ট কুকুরের চেয়েও বেশি। তাকে অনেক কাজ করতে হত। রাতদিন সে কাজ করত। জল বয়ে আনত দূর থেকে, কাঠ কেটে আনতে হত বন থেকে। এত করেও বুড়ি ব্যাঙকে একটু কিছু খেতে দিত না। কুকুর তাও কিছু পেত। রাত্তিরে ব্যাঙ ঘুমোতে যেত পেটে খিদে নিয়ে। হায়রে সবুজ ব্যাঙ। সেদিন ব্যাঙের পেটে কিছু পড়ে নি, কিছুই খায়নি সে। তার ওপরে বুড়ি সারাদিন ধরে ব্যাঙকে গালিগালাজ করেছে। এমনি করে বিকেল গড়িয়ে গেল। পুব কোণ অাঁধার হয়ে এল, পশ্চিমে তখনও লাল আলোর আভা। বুড়ি ব্যাঙকে পাঠাল জল আনতে। নদীর তীরে বরফের গর্তে রয়েছে জল। ব্যাঙ ক্লান্ত, তার পা আর চলছে না, চোখ মেলে রাখতে পারছে না, মাথা সোজা রাখতে পারছে না, বুক কাঁপছে। তবু ব্যাঙ 'না' বলতে পারল না। ভয়,—যদি বুড়ি কিছু করে!
      জল আনতে যাবার সময় ব্যাঙ কুকুরকে ডাকল। সে যদি সঙ্গে যায়, ব্যাঙ একটু ভরসা পায়। কুকুর ব্যাঙের কষ্ট বোঝে। তারও যে কষ্ট ! সঙ্গে সঙ্গে কুকুর রাজি হল।
      তারা দুজনে আস্তে আস্তে নদীর তীরে সেই বরফের গর্তের পাশে এল। দুজনেই ধপ করে বসে পড়ল। দেহ আর চলে না। এবার দুজনেই কেঁদে ফেলল। এভাবে তো আর বাঁচা যায় না। এর চেয়ে মরণ ভালো। কি ভাগ্য করেই তারা এসেছিল। তারা কাঁদছে কাঁদছে। আকাশে সুন্দর গোল চাঁদ উঠেছে। পুর্ণিমার রাত। চাঁদের আলোয় বরফের মাঠ, বরফের নদী, বরফ-ঢাকা বন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাকে আর বেদনার কথা জানাবে তারা? চাঁদের দিকে চেয়ে চেয়ে তারা কাঁদতে লাগল।
       হঠাৎ সবুজ ব্যাঙ ফোঁপাতে ফোঁপাতে চাঁদকে বলল, ‘ওগো চাদঁ, তুমি কত ভালো। আমাদের দিকে একটু চাও, আমাদের দয়া করো। চাঁদ, তুমি আকাশ থেকে নেমে এসো। তুমি যদি শুধু আকাশেই থাকো, আমাদের দুঃখ ঘুচবে কেমন করে? তুমি এই বরফ-ঢাকা জমিতে নেমে এসো। আমাদের নিয়ে যাও। তোমার বুকে নিয়ে যাও। আমরা তোমার কাছে থাকব। ব্যাঙ আরও কাঁদছে।
       কাঁদছে কাঁদছে, তারা কাঁদছে। আর বারবার চাঁদকে ওই এককথা বলে চলেছে। অনেকক্ষণ পরে চাঁদ তাদের কান্না আর কষ্টের কথাগুলো শুনতে পেল। তার বুক টনটন করে উঠল। তার চোখেও জল এল। সে ঝড়ের বেগে আকাশ থেকে নেমে এল বরফ-ঢাকা জমিতে। কুকুর আর ব্যাঙকে বুকে তুলে আবার ঝড়ের বেগে আকাশে উঠে গেল।
      অনেকক্ষণ পরে বুড়ি এল খোঁজ করতে। এখনও কেন কুকুর আর ব্যাঙ ফিরছে না? কিন্তু বরফের গর্তের কাছে বুড়ি কাউকেই দেখতে পেল না। চিৎকার করে বুড়ি তাদের ডাকল, কেউ সাড়া দিল না। হঠাৎ তার চোখ চলে গেল চাঁদের পানে। অবাক হয়ে বুড়ি দেখল, লোমশ কুকুর আর সবুজ ব্যাঙ চাঁদের বুকে খেলছে, হাঁসছে। বুড়ি চিৎকার করে বলল, ‘ও আমার আদরের কুকুর আর ব্যাঙ, আমি তোমাদের ভালো ভালো খেতে দেব, আদর করব, তোমরা নেমে এসো। তোমরা আমার ছেলের মতো, তোমরা কেন দূরে থাকবে?
      কেউ তার কথার জবাব দিল না। কেউ ফিরে এল না। সেদিন থেকে বুড়ি তার বাড়িতে থাকে নাতনিকে নিয়ে, চাঁদের বুকে থাকে কুকুর আর ব্যাঙ।
      তাই আজও তোমরা যদি চাঁদের দিকে তাকাও, দেখবে,-চাঁদের বুকে বসে রয়েছে একটি কুকুর ও একটি ব্যাঙ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য