পদ্য লেখার জোরে - মাহমুদুল হক

      এক দেশে ছিলেন এক বাদশাহ। প্রবল প্রতাপশালী। হাতী-ঘোড়া সেপাই-শাস্ত্রী কোন কিছুরই তার অভাব ছিলো না। বাদশার নাম শমশের আলীজান।
      কোন এক সময় বাদশাহ খুব অসুবিধায় পড়লেন। তার নামের সাথে মিলে যায় রাজ্যে এমন লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। ছুতোর, কামার, গাছকাটা শিউলী এদের সকলের নামও শমশের। গোটা রাজ্য শমশেরময় হয়ে আছে এক কথায়। তাই বাদশাহ একদিন উজীর, নাজীর, পাত্র, মিত্র সভাসদ সবাইকে ডেকে দরবারে ঘোষণা করলেন—আমার ক্ষমতা তোমাদের সকলের চেয়ে খুব কম করে হলেও তিন গুণ বেশী, সুতরাং আজ থেকে আমার নামকে তিন দিয়ে গুণ করে ঠিক এইভাবে উচ্চারণ কত্তে হবেঃ—
শমশের
শমশের 
শমশের আলীজান। 
      এই ঘোষণায় বিশেষ করে উজীর আক্কেল আলী খুব খুশী হলেন। তিনি বললেন—বাদশাহ নামদার দীর্ঘজীবি হউন!
উজীর আক্কেল আলী ছিলেন বাদশার সবচেয়ে প্রিয় পাত্র। তার ওপর বাদশার বিশ্বাসও অগাধ। বাদশাহ ধরে নিয়ে আসতে বললে তিনি বেঁধে নিয়ে আসেন। বাদশাহ হাঁচলে কাশলে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
      একদিন হয়েছে কি বাদশাহ উজীরকে সঙ্গে নিয়ে তিন মহল প্রাসাদের পাশ কাটিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াবার সময় দেখেন প্রাচীরের গায়ে একরাশ হিজিবিজি লেখা। বাদশাহ বললেন—দাঁড়াও, পড়ে দেখা যাক।
আক্কেল আলী আক্কেল আলী 
দেবো তোরে কি,
ঘুমের ঘোরে চাঁদিতে তোর
গাঁট্টা মেরেছি। 
      উজীর গরগর করতে করতে বললেন—এ্যাঁ, একি সত্যি কথা? 
      বাদশাহ বললেন—ক্ষেপেচো নাকি। কেউ ঠাট্টা করে লিখেছে আর কি! 
     বাদশার কথা শেষ হতে না হতেই উজীর চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন—কি সব্বোনাশ! অই দেখুন বাদশাহ নামদার, বাঁ দিকের প্রাচীরে আপনার নামেও কি কোথায় সব লিখে রেখেছে।
বটে বটে, বলে বাদশাহ পড়ে দেখলেনঃ
শমশের
শমশের শমশের আলীজান,
আমরুল
জামরুল 
কচু ঘেঁচু সবই খান ! 
শমশের
শমশের শমশের আলীজান, 
খিটখিটে 
মিট্‌মিটে 
শকুনের মতো জান। 
      রাগে আগুন হয়ে বাদশাহ বললেন—দেখেছো কি ওটা? আমার জান বলে শকুনের মতো। এ্যাঁ, এতো বড় কতা! ধত্তে পারলে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াবো।
      উজীর বললেন—শুলে চড়াবো বাদশাহ নামদার, শূলে চড়াবো! যদি না পারি আমার নাম আক্কেল আলীই নয়। ইশ, কি বিচ্ছিরি কতা!
       এরপর অন্যান্য দিনের মতো বাদশাহ দরবারে বসলেন। বললেন—কার কি আর্জি আছে পেশ করো। নাজীর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—বাদশাহ নামদার, আমার বাড়ীর উঠোনে আজ সকালে একটা ঘুড়ি উড়ে এসে পড়েছিলো, তাতে সব বাজে বাজে পদ্য লেখা।
       বাদশাহ গম্ভীরভাবে বললেন—কি লেখা ছিলো? উজীর আবৃত্তি করে বললেনঃ
শমশের শের নয়
লেজ কাটা হনুমান, 
বিড়ালের ডাক শুনে
দেন তিনি পিটটান। 
কাঁঠালের মতো মাথা
আক্কেল আলীটার 
ঘাস খেকো বুদ্ধি
এনতার এনতার
       সকলে গাম্ভীর্য্য বজায় রাখবার জন্যে মুখ নিচু কর েথাকলো
       সভাসদদের মধ্যে থেকৈ একজন উঠে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি আবৃত্তি করতে শুরু করে দিলেনঃ-
তিনগুণ শমশের পেললায় ভূড়ি
দশগুণ বোকামিতে দেয় হামাগুড়ি
খাঁদা নেকো টাক মাথা আবলুশ কাঠ 
বিশগুণ লোভে টেকে ঘোরে মাঠ-ঘাট। 
       বাদশাহ ক্ষেপে উঠে বললেন—তার মানে? তোমরা সব পাললা দিচ্ছো নাকি?
       সভাসদ বললেন -- বাদশাহ নামদার বেয়াদবি মাফ করবেন, আজ সকালে আমার বাড়ীর সামনেও একটা ঘুড়ি এসে পড়ে, তাতে লেখা ছিলো ওইসব।
       বাদশাহ বিরক্ত হয়ে সেদিনকার মতো দরবার ভেঙে দিলেন। পরদিন উজীর দরবারের দিকে আসবার পথে দেখেন গাছের ডালে ঝুলছে একটা রঙীন এবং বেশ বড়ো রকমেরই একটা ঘুড়ি। ঘুড়িটার ওপর রঙ দিয়ে তার মুখ খুব বিশ্ৰীভাবে আঁকা। আর তাতে লেখাঃ—
আক্কেল আলী উজীর বটে 
কুলোপনা কান, 
পেটের পিলে বাড়ছে কেবল 
গোলায় বাড়ে ধান। 
উজীর তক্ষুণি বাদশার কাছে ছুটলেন। বললেন—কাহাতক আর সহ্য করা যায় বাদশাহ নামদার, একটা বিহিত কত্তেই হবে। বাদশাহ বললেন—আজ থেকে রাজ্যময় আইন জারী করা গেল, ঘুড়ি ওড়ানো আর ঘুড়ি তৈরী করা দুটোই বন্ধ। যারা মানবে না, তাদের হাত কেটে দেওয়া হবে, হাত। উজীর বললেন—খাসা আইন হয়েছে বাদশাহ নামদার। এইবার বাছাধনেরা জবদো হবে, অ্যাঁ!
       পরদিন দেখা গেল শাহীমহলের সামনের ময়দানে রাজ্যের যতো ছেলেপিলেরা শুখনো কলাপাতার তৈরী গোল গোল কি সব ঘুড়ির মত ওড়াচ্ছে।
      বাদশাহ হাঁক পেড়ে বললেন—ধরো ওদের, হাত কেটে দাও ওদের সকলের। বাদশার হুকুমে ছেলেদের সবাইকে গরু বাঁধা করে ধরে আনা হলো। বাদশাহ চীৎকার করে বললেন—তোমরা আমার হুকুম অমান্য করে ঘুড়ি উড়িয়েচো কেন?
       তাদের মধ্যে থেকে একজন চটপটে গোছের ছেলে জবাব দিলো—আমরা তো ঘুড়ি ওড়াই নি। ঘুড়ি তো চারকোণওয়ালা কাগজের তৈরী হয়।
       বাদশাহ বললেন—যা উড়ে তাই ঘুড়ি। ছেলেটি খুব আশ্চর্য হয়ে বললে—তাহলে পাখী, তুলো, ধূলো, হাওয়ার জাহাজ সব্কই কি ঘুড়ি? পাখীদের উড়তে দিজ্ঝেন কেন, ওদেরও বারণ করে দিন।
       বাদশাহ গর্জন করে বললেন—চোপরও! ব্যাপারটা গণ্ডগোলের ঠেকছে। ঠিক হায়, পণ্ডিত কই। পণ্ডিত এসে বললেন—বাদশাহ নামদার, বই তো অন্য রকম কথা বলে। যাহা ঘুরঘুর করে ওড়ে তাই ঘুড়ি।
       ছেলেটি চোখ বড়ো বড়ো করে বললে—ঘুরঘুর করে আবার কিছু ওড়ে নাকি! আপনি কিছুই জানেন না দেখছি। ওড়ে তো পৎ পৎ করে আর ফুরফুর করে। ঘুরঘুর করে ওড়া হয় না ঘোরা হয়, যেমন চোর ডাকাতরা ঘুরঘুর করে ঘোরে।
       পণ্ডিত বললেন—থামো দিকি, বেশী ফ্যাচোর ফ্যাচোর কোচ্চো কেন বাপু। তা বাদশাহ নামদার একটু সময় লাগবে, বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে কিনা।
        বাদশাহ বললেন—বেশী সময় দিতে পারবো না। এক্ষুনি নথিপত্তোর হাতড়ে দ্যাকো। এটা বিহিত কত্তেই হবে।
      পণ্ডিত বললেন—এ কি আর গোলায় ধান জমানো বাদশাহ নামদার, এ হলো গিয়ে আপনার দশমুনে অভিধান ঘাটাঘাটির ব্যাপার, সময় দিতেই হবে।
       বাদশাহ একটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললেন—দিলাম। একঘণ্টা। চটপটে ছেলেটি পণ্ডিতকে বললে—চলুন, আমরাও আপনাকে সাহায্য করবো। পণ্ডিত বক বক করতে করতে ওদের সবাইকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলেন। ঘরের ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বের করে নিয়ে এলেন দশমুনে এক বাণ্ডিল। তারপর বিড় বিড় করে আঙ্গুল গুণে বললেন—ক খ গ ঘ—ঘয়ে ঘুড়ি। সববোনাশ করেচে। এ যে ব্যানজোন বননের চার নমবোর। গোটা তাড়াটাই খুলতে হবে। ঘুড়ি শব্দ পাওয়া যাবে একেবারে সেই গোড়ার দিকে।
       ছেলেরা সবাই বললে—আপনি বুড়ো মানুষ, টানা হ্যাচড়া আপনার শরীরে কুলোবে না। আপনি সামনের দিকটা ধরে থাকুন, আমরা সবাই মিলে বাণ্ডিলটা পিছনের দিকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি, তাহলেই চট করে খোলা হয়ে যাবে। পণ্ডিত বললেন—খুব ভালো কতা বাপুরা, তাড়াতাড়ি পাঠ উদ্ধার হয়ে যাবে।
       ছেলেরা সবাই একযোগে বাণ্ডিলটা ঠেলতে ঠেলতে গড়িয়ে পিছনের দিকে নিয়ে চললো। পণ্ডিত ধরে বসে রইলেন সামনের দিকটা ।
       সেটা ছিল বিরাট। ওজনেও দশ মণের সমান। তাই না পেরে এক সময় সবাই ছেড়ে দিলো। এক পলকে সড় সড় করে সেটা আগের মতো আবার জড়িয়ে গিয়ে এক ধাক্কায় পণ্ডিতকে ছুড়ে দিলে সামনের সমুদ্রে।
       ছেলেরা সবাই তক্ষুনি বাদশার কাছে ছুটে গিয়ে নালিশ জানালো। বললে—বাদশাহ নামদার, দেখুন পণ্ডিতের কি কাণ্ড ! আমাদের বললে তোদের নিয়েই যতো অনর্থ, তোরাই অভিধান ঘেটে বের কর ঘুড়ি মানে কি, আমি ততোক্ষণ একটু সাঁতরে আসি। তারপর তিনি সেই যে সাঁতরাতে গিয়েছেন এখনো পর্যন্ত ফেরার নামটি নেই।
       বাদশাহ বললেন—বুড়ো মানুষের অনেক দোষ, যতো সব বায়নাক্কা। আক্কেল আলী দ্যাকো দিকি কি ব্যাপার।
     উজীর সাগর পারে গিয়ে দেখেন পণ্ডিত রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছে। তিনি চেঁচিয়ে বললেন—এই বুঝি আপনার অভিধান ঘাঁটা?
       পণ্ডিত হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে পাড়ে উঠে এসে বললেন—বুঝলেন কিনা, বিদ্যা হলো সমুদুর, তাই একটু ঘেঁটে দেখছিলাম আর কি।
       উজীর বললেন—তা পেলেন কিছু ? পণ্ডিত বললেন—পেলাম আর কই । বুড়োমানুষ, আপনাদের মতো দেহও নেই, ক্ষমতায় কুলালো না। ঘুড়ি শব্দটা একেবারে তলদেশে কিনা, ওটা খুঁজে আনা যার তার কমমো নয়।
       উজীর কি যেন ভাবলেন। তার মনে হলো বাদশার জন্যে তিনি কি না করতে পারেন। বিদ্যাসমুদ্রের তলদেশ থেকে ঘুড়ি শব্দের অর্থ খুঁজে আনা তো সহজ কাজ। বরং বাহাদুরী দেখানোর এই এক সুযোগ। বাদশাহ নিশ্চয়ই খুব খুশী হবেন।
       তিনি বললেন—কোথায় দেখিয়ে দিন।
       পণ্ডিত বললেন—মাঝিদের বলুন, ওরা মাঝখানে গিয়ে ঠিক জায়গা মতোই ঝুপ করে নামিয়ে দেবে।
      উজীর বললেন—ঠিক হায় ! জেলে নৌকোর মাঝিরা তাদের ডিঙিতে করে সমুদুরের একেবারে মাঝখানে গিয়ে চ্যাংদোলা করে উজীর আক্কেল আলীকে ঝুপ করে ছেড়ে দিলো। উজীর আক্কেল আলী সে যে সমুদ্রের তলোদেশে ঘুড়ির অর্থ আনতে গেলেন আর ফিরলেন না।
       ছেলেরা দল বেঁধে শাহীমহলের ময়দানে ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে সুর ধরলোঃ 
উজীর গেলেন রসাতলে
বাদশা গেলেন ঘরে 
নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে
মাথা ঠুঁকে মরে।
ঢ্যাম কুড়কুড়, ঢ্যাম কুড়কুড়
তা ধিন্‌ ধিনতা ধিন 
পদ্য লেখার জোরেই কেবল
এলো সুখের দিন।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য