ছোট্ট খরগোশ আর পশুরাজ - আদিবাসী লোককথা

       এক ছোট খরগোশ খুব মজার মানুষ। ছোট্ট হলে কি হবে? বলিহারি তার সাহস। শুধু কি তাই? সে খুব মজা করতে ভালোবাসে, চোখেমুখে তার কৌতুক। এই সাহসী কৌতুকপ্রিয় খরগোশ পশুদের কাছে যখন তখন যেখানে সেখানে পশুরাজের নামে নিন্দে রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ভয় ডর বলে কিছু নেই। অত শক্তিমান পশুরাজের বিরুদ্ধে সে শুধুই আজেবাজে কথা বলে ঘুরে বেড়ায়।
        পশুরাজ শুনলেন খরগোশের কথা। এত বড় স্পর্ধা! ঠিক করলেন খরগোশকে এক কামড়ে খেয়ে ফেলবেন।
        শেয়ালকে ডেকে পশুরাজ বললেন, তুমি এক্ষুনি যাও। খরগোশকে বেঁধে আনো। ওকে আমি খাব। আমার পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলব। আমার বিরুদ্ধে নিন্দে? বড় বাড় বেড়েছে। যাও তুমি।
        শেয়াল মাথা নুইয়ে নমস্কার করে রওনা দিল। চলতে চলতে সবুজ তৃণপ্রান্তরে দেখা হল ছোট্ট খরগোশের সঙ্গে। শেয়াল বলল, খরগোশ, আমার সঙ্গে তোমায় যেতে হবে। তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পশুরাজ আমাকে আদেশ করেছেন।
        কয়েকবার ঠোঁট চুলবুল করে খরগোশ বলল, তা তো যেতেই হবে, পশুরাজের আদেশ! কিন্তু যাওয়ার আগে তুমি কি কয়েকটা মিষ্টি আপেল খেতে চাও না, খেয়েই দেখ না। ওই মাঠের ওদিকে একটা আপেল গাছ আছে, আর আপেলের ভারে ডালগুলো সব নুয়ে গিয়েছে। কত আপেল! তুমি ওই গাছে গিয়ে মনের সুখে পেট পুরে আপেল খেয়ে এসো। আমি এখানে তোমার জন্য বসে থাকছি। যাও যাও। দেরি কেন?
        আপেলের নাম শুনেই শেয়ালের মনটা কেমন হয়ে গেল, পেটের মধ্যেও মোচড় দিয়ে উঠল। আহা! কতকাল ভালো খাবার খাই না, কতকাল আপেলের মুখ দেখি না। আঃ! কতকাল কতকাল! শেয়াল লোভী চোখে এগিয়ে গেল মাঠের ওদিকে, পেছনে পড়ে রইল খরগোশ। শেয়ালের দেরি সহ্য হচ্ছে না, সে ছুটল আপেল গাছের দিকে। খরগোশ লাফ দিয়ে পেছন ফিরল, অদৃশ্য হয়ে গেল দূর পাহাড়ি বনে।
        শেয়াল আপেল খেতে লাগল। বড় সুমিষ্ট রসাল আপেল। বহুদিন এমন জিনিস খেতে না পেয়ে আরও ভালো লাগল। খাচ্ছে আর খাচ্ছে, সারারাত চলে গেল, তবুও সে খাচ্ছে। সকাল হতেই শেয়ালের হুশ হল, কিন্তু তক্ষুনি শুরু হল পেটের যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শেয়াল মাটিতে শুয়ে পড়ল, ঘাসের ওপর গড়াগড়ি দিতে লাগল। গড়াচ্ছে আর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর গড়াগড়ি দিচ্ছে।
        শেয়াল ফিরছে না দেখে পশুরাজ অবাক হলেন। শেয়াল কোথায় গেল? তার আদেশ কি মানে নি? তখন পশুরাজ ছোট্ট পাহাড়ি নেকড়েকে ডেকে বললেন, ছোট্ট পাহাড়ি নেকড়ে, তুমি যাও আর শেয়ালকে খুঁজে আনো। দেখ, কেন শেয়াল খরগোশকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এল না ? যাও, শিগগির যাও।
        ছোট্ট পাহাড়ি নেকড়ে মাথা নুইয়ে প্রণাম করে রওনা দিল। নেকড়ে চলছে, চলছে, দুপাশে চোখ রেখে এগোচ্ছে। চলতে চলতে নেকড়ে দেখতে পেল, একটা আপেল গাছের তলায় ঘাসে শুয়ে শেয়াল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সে অবাক হল।
শেয়ালের কাছে গিয়ে নেকড়ে বলল, তুমি এখানে? দুষ্টু খরগোশ কোথায় গেল? তাকে ধরে নিয়ে তুমি কেন পশুরাজের কাছে যাওনি? কত দেরি হয়ে গেল। ওধারে পশুরাজ রেগে লেজ ঝাপটাচ্ছে।
        শেয়াল ভয় পেল। শুয়ে শুয়েই বলল, আমি খরগোশকে গিলে ফেলেছি। সে যাতে না পালাতে পারে তাই আস্ত গিলেছি। কিন্তু বন্ধু, কি বিপদ! সেই হতচ্ছাড়া এখন পেট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমার ভেতরে খালি লাথি মারছে। আর দেখ আমার দশা। পেটের ব্যথায় আমি এখন মরছি। এখন কি করি? আমি তো বন্ধু আর হাঁটাচলা করতে পারছি না! বড়ই যন্ত্রণা! তুমি একটা কাজ করবে? ওই যে দূরে পাহাড়টা দেখছ, ওই পাহাড়ের ওপাশে এক ধরনের বুনো লতাপাতা আছে দেখতে পাবে। ওই লতাপাতা খুব ভালো ওষুধ, ওগুলো চিবিয়ে খেলেই আমার পেটের ব্যথা একেবারে কমে যাবে।
        বন্ধুর যন্ত্রণায় নেকড়ে স্থির থাকতে পারল না। ছুটে গেল পাহাড়ের দিকে। পাহাড় ডিঙিয়ে ওপাশে গেল। দেখতে পেল, ঘন সবুজ লতাপাতায় জায়গাটা ভরে রয়েছে। দাঁত দিয়ে অনেক লতাপাতা ছিড়ে মুখ ভর্তি করল। পাতার রসে জিভ ভিজে গেল। চমকে উঠল পাহাড়ি নেকড়ে। এমন সুস্বাদু পাতা তো বহুকাল খাই নি! আঃ, কি অপুর্ব। কতকাল ভালোমন্দ খাই না। কতকাল কতকাল! এমন ভালো জিনিসের মুখ কতকাল দেখি না! পেটের মধ্যেও মোচড় দিয়ে উঠল। ক্ষুধিত চোখে ছোট্ট পাহাড়ি নেকড়ে লতাপাতা খেতে লাগল, ভুলে গেল কেন সে এখানে এসেছিল। খাচ্ছে আর খাচ্ছে, সারারাত ধরে নেকড়ে লতাপাতাই খাচ্ছে। পেছনে দূরে আপেল গাছের তলায় শেয়াল শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
        পরের দিন আলো ফুটল, অন্ধকার কোথায় পালাল। শেয়াল ফিরল না খরগোশকে নিয়ে। নেকড়ে ফিরল না শেয়াল আর খরগোসকে নিয়ে। পশুরাজ আরও রেগে গেলেন। তার রাজ্যে হল কি?
        পশুরাজ রাঙাচোখ শিকারি পাখিকে ডাকলেন। পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচুতে সে থাকে, সবাই তাকে ভয় পায়। পশুরাজের খুব অনুগত এই শিকারি পাখি। সে এসে পশুরাজের সামনে মাথা নুইয়ে দাঁড়াল। খুব শক্ত কাজ না হলে পশুরাজ সহজে তাকে ডাকেন না। সে একথা জানে।
        পশুরাজ বললেন, আমার অনুগত শিকারি পাখি, তুমি এক্ষুনি যাও। দেখো, কোথায় গেল শেয়াল আর পাহাড়ি নেকড়ে ? আর জেনে এসো, কেন তারা এখনও খরগোশকে ধরে আনেনি? যাও, শিগগির যাও।
        শিকারি পাখি মাথা নুইয়ে প্রণাম করে উড়ে চলল তৃণভূমিতে। আকাশে উড়ছে শিকারি পাখি, তার রাঙাচোখ রয়েছে নীচের দিকে। দেখতে পেল, দুষ্টু নিন্দুকে খরগোশ তৃণপ্রাস্তরে কুটুস কুটুস করে ঘাস ছিড়ে খাচ্ছে। কোথায় আছে শেয়াল আর কোথায় আছে পাহাড়ি নেকড়ে— তাদের আর খোজ করল না শিকারি পাখি। হঠাৎ ওপর থেকে ঝড়ের বেগে সোঁ করে নেমে এল খরগোশের ওপরে, কিছু বুঝবার আগেই ধারালো নখে তুলে নিল খরগোশকে। খরগোশ আচমকা ধবা পড়ে গেল, পালাবার পথ পেল না। উড়ে চলল পশুরাজের কাছে।
        খরগোশ দাঁড়িয়ে রয়েছে পশুরাজের সামনে। পশুরাজ বড় বড় চোখে তাকালেন খরগোশের দিকে, ধারাল দাঁতগুলো বের করলেন, জিভ দিয়ে ঠোট চাটতে লাগলেন। তারপর আস্তে আস্তে লেজ নাড়তে নাড়তে বললেন, খরগোশ, শেষ অদি তুমি ধরা পড়লে। পড়বেই এটা তো জানা কথা। অনেকদিন থেকেই তুমি আমার নিন্দে রটিয়ে বেড়াচ্ছ, পশুদের কাছে আমার নামে যা খুশি তাই বলে বেড়াচ্ছ। আমাকে নিয়ে তুমি মজা করেছ, পশুদের কাছে তুমি আমাকে ছোট করেছ। আমি খুব মজার মানুষ, তাই না? এবার বুঝবে। আমি তোমাকে গোটা গিলে ফেলব।
        খরগোশ বেশ বিপদে পড়েছে, কিন্তু তার সাহস ফুরোয়নি, বিপদে বুদ্ধিও কমে যায়নি। শান্তভাবে খরগোশ বলল, পশুরাজ আমি বড় ক্লান্ত। আপনি যদি আমাকে খেয়ে ফেলেন তাহলে আমি মোটেই দুঃখিত হব না, বরং আনন্দিতই হব। কেননা, আমি বড় ক্লান্ত। কিন্তু আমাকে খাওয়ার আগে আপনার কি একটুও ইচ্ছে করছে না ওই তৃণভূমির মোটাসোটা কয়েকটা কুকুরকে খেয়ে নিতে? আমি তো হাতের মুঠোয় রয়েছি। আঃ, কি নাদুস-নুদুস আর চর্বিতে ভরা ওই ছোট ছোট কুকুর! আমি জানি, কোথায় তারা ঘুরে বেড়ায়। বোধহয়, আমিই শুধু তাদের খবর জানি আর সে পথ আপনাকে দেখিয়েও দিতে পারি। অবশ্য, আপনার যদি ইচ্ছে হয়।
       চর্বিতে ভরা নাদুস-নুদুস তৃণভূমির ছোট ছোট কুকুর....ছবিগুলো ভেসে উঠল পশুরাজের চোখের সামনে। খরগোশ তো রয়েছেই, এগুলো তো বাড়তি।
         পশুরাজ এগিয়ে চলেছেন খরগোশের পেছনে পেছনে। আর কেউ নেই। শুধু পশুরাজ আর খরগোশ, খরগোশ আর পশুরাজ। তৃণভূমির পাশে ঘন ঝোপের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে খরগোশ পশুরাজকে ইশারা করল, যেন ওই ঝোপেই রয়েছে।
        পশুরাজ লাফিয়ে পড়লেন ঘন ঝোপের লতাপাতার জালে।
        খরগোশ জানত, ওখানে রয়েছে এমন বুনো লতাপাতা যে, কেউ সেখানে গিয়ে পড়লে আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। যত চেষ্টা করবে, পা যাবে আরও বেশি জড়িয়ে, দেহ আঁকড়ে ধরবে বুনো লতা। আর হলও তাই। রাগে পশুরাজ যত লাফালাফি করতে লাগলেন ততই পড়লেন জড়িয়ে। ক্রমশ এ বাঁধন বেশি শক্ত হচ্ছে। লতার ফাঁদে পশুরাজের শক্তি কমে আসছে।
         বনের সব খবর খরগোশ জানে। বনের সব জায়গায় সে ঘুরে বেড়ায়। চলে যেতে যেতে খরগোশ পশুরাজকে বলে উঠল, পশুরাজ, মনের সুখে তৃণভূমির ছোট ছোট্ট কুকুর খান আর আনন্দ করুন। চিরকালের জন্য আনন্দ করুন।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য