সাত বোন - আদিবাসী লোককথা

      অনেক কাল আগে এক গভীর জঙ্গলে সাত বোন ছিল। তারা খুব সুন্দরী। এমন রূপ কমই দেখা যায়। তাদের সাত বোনেরই চুল ছিল কোমর পর্যন্ত লম্বা, আর চুল ছিল যেমন কালো তেমনি ঘন, তাদেব দেহের রঙ ছিল সাদা, সাদা বরফের মতো। ছোট ছোট তুষার-কণা দেহে লেগে রইত। কি সুন্দর যে লাগত! যেন তুষার-রঙা ঘামের বিন্দু দেহের ওপরে।
      কিন্তু তারা ছিল একটু অদ্ভুত। কারও সঙ্গে তারা মিশত না। সাত জনে একা একা থাকত। সাত বোন একসঙ্গে শিকার করতে যেত। তারা যেমন কারও সঙ্গে যেত না, তেমনি তাদের সঙ্গেও কাউকে নিত না। কারও সঙ্গে তারা সই পাতাতো না, তাদের কেউ বন্ধু ছিল না। বড় অদ্ভুত এই সাত বোন।
      পাশের জঙ্গলে থাকত সাত ভাই। তারা দেখত, সাত বোন একসঙ্গে শিকারে যায়। তাদের খুব ইচ্ছে এই সাত বোনকে বিয়ে করে। খুব সুন্দরী বউ হত তাহলে। সাত বোন যখন শিকারে যায়, পেছন পেছন যায় সাত ভাই। একটু দূরে দূরে থাকে যাতে সাত বোন তাদের দেখতে না পায়। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে নজর রাখে,—তারা কোথায় যায়, কি শিকার করে, কোথায় বিশ্রাম করে, সবকিছু নজর রাখে।
      এই সাত ভাই একটা জিনিস জানত। অন্য কেউ জানত না। সাত বোনও জানত না। তারা বনের মধুর খবর জানত। চাক ভেঙে কীভাবে মধু জোগাড় করতে হয় তা তারা খুব ভালোভাবে শিখেছিল। মৌমাছিদের এমন কায়দায় তাড়াত যে সেগুলো তাদের কামড়াতেও পারত না।
      কোন গাছের ঘন পাতার মধ্যে মধুর চাক আছে। তারা করত কি, একটা মৌমাছিকে ধরত। তার পেছনে গাছের আঠা লাগিয়ে দিত আর আঠার মধ্যে গুজে দিত পাখির ছোট্ট একটা পালক। মৌমাছি জোরে উড়তে পারত না, আস্তে আস্তে উড়ত। এরাও পেছন পেছন যেত। মৌমাছি গিয়ে চাকে বসত। তখন ওরা চাক ভেঙে মধু নিত।
      একদিন সাত ভাই অনেকটা মধু একটা মাটির ভাঁড়ে রাখল। প্রতিদিন যেখানে সাত বোন শিকার করতে এসে বিশ্রাম করত, সেটা আগে থেকেই সেখানে রেখে দিল। দূরে লুকিয়ে থেকে দেখতে লাগল কি হয়।
      মেয়েরা শিকার করে গাছের নীচে বিশ্রাম করছে। হঠাৎ দেখতে পেল সেই মধুর ভাঁড়। এক বোন একটা আঙুল ডুবিয়ে মুখে দিল। অবাক হল। এমন সুন্দর জিনিস সে আগে কখনও খায়নি। সবাই খেল। খুব খুশি। কিন্তু কীভাবে এমন জিনিস এখানে এল তা বুঝতে পারল না। আগেও অনেকবার এখানে এসেছে, কিন্তু কোনদিন দেখেনি।
      এমন সময় সাত ভাই গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তারাই সে এই মধু রেখেছে তাও বলল। তাদের মনের কথা জানাল। সাত ভাই সাত বোনকে বিয়ে করতে চায়। খুব সুখে রাখবে তাদের। সাত বোন কথা বলল না, তাদের সঙ্গে শিকারেও যেতে চাইল না। তারা বিয়ে করতে মোটেই রাজি হল না। হাবভাবে এসব বুঝিয়ে দিল। সাত ভাইয়ের মন খারাপ হয়ে গেল।
      এখন হয়েছে কি, এক এলাকায় এক মস্ত শিকারি ছিল। তার নাম উররুনাহ। একদিন সে বাড়ি ফিরছে। সারাদিন বনে বনে শিকার করেছে। খুব ক্লান্ত সে। বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে, বাড়ি ফিরল শিকারি। ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। বাড়িতে ঢুকেই মায়ের কাছে খাবার চাইল। মা বলল, এখনও খাবার তৈরি হয়নি। ক্লান্তিতে খিদেতে এমনিতেই তার মাথা গরম ছিল। মায়ের কথা শুনে সে আরও বেশি রেগে গেল। ভীষণ ঝগড়া করল মায়ের সঙ্গে।
      মা আস্তে আস্তে বলল, “বাছা, শুধুই রাগ করছিস। কি করব বল? এক ফোটাও ঘাসের বীজ বাড়িতে নেই। কি দিয়ে রুটি বানাব? ঘাসের বীজ না থাকলে আমি কি করব? এত গরিব আমরা।
      ছেলে গেল আরও রেগে। রাগের মাথায় ওসব কথা শুনতে ভালো লাগে না। সে চিৎকার করে বলল, ‘কাউকে কিছু বানাতে হবে না। আমি নিজেই রুটি বানিয়ে নেব।
      ঘরে ঢুকে হাড়ি খুঁজতে লাগল। কিন্তু সব ফাঁকা। কোন হাড়িতে এক তিল ঘাসের বীজ নেই।
      ছেলে তীরের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার যেন মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। খিদে পেলে মানুষের কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। সে বন্ধুদের বাড়ি গেল। এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরল। ঘাসের বীজ কিছুটা ধার চায়। কিন্তু কোন বাড়িতেই সে ধার পেল না। কেউ তাকে ধার দিল না। সবাই বলল, নেই। সে ভাবল, আসলে সবার ঘরেই বীজ আছে, কিন্তু তাকে কেউ দিচ্ছে না। প্রথমে সে খুব রেগে গেল, রাগে কাঁপতে লাগল। তারপর তার মনে খুব কষ্ট হল। তার এত খিদে পেয়েছে আর কেউ তাকে ধার দিল না? তাকে বিশ্বাস করে না? এরাই তার গাঁয়ের আপনজন? এত খারাপ এরা? নাঃ, সে আর এদেশে থাকবে না। নতুন মানুষের খোঁজে যাবে। ছেলে আর বাড়ি ফিরল না। বেরিয়ে পড়ল নতুন দেশের খোঁজে।
      শিকারি বনের পথে হাঁটছে, হাঁটছে। পেট গুলিয়ে উঠছে, মাথা ঘুরছে। হঠাৎ সে একজন বুড়ো লোককে দেখতে পেল। বুড়ো গাছ থেকে মৌচাক পেড়ে তার থেকে মধু বের করছে। পায়ের শব্দে বুড়ো মুখ তুলে চেয়ে রইল তার দিকে। শিকারি এগিয়ে আসছে বুড়োর কাছে। একেবারে কাছে এসে সে দেখল, বুড়োর কোন চোখ নেই। অত দেখার সময় নেই, উররুনাহ বুড়োর কাছে খাবার চাইল। বুড়ো তাকে অনেকটা মধু দিল। সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলল শিকারি। আহ, প্রাণ বাঁচল। কি শান্তি। বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
      বুড়ো জিজ্ঞেস করল, ‘গাঁ কোথায়? থাকো কোথায়? কত দূরে? ইচ্ছে করলে আমাদের গায়ে থেকে যেতে পারো। কোন ভয় নেই, ভাবনা নেই।
      বুড়োর কথা শুনে শিকারির খুব ভালো লাগল। আপনজনের মতো কথা। কিন্তু বুড়োর কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে না, বুড়ো চোখে দেখতে পায় না। অথচ তার তো চোখ নেই। অবাক ব্যাপার।
      শিকারি বলল, “তুমি কি দেখতে পাও? কথা শুনে মনে হচ্ছে দেখতে পাও। অথচ চোখ কোথায়?
      বুড়ো মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যাঁ, খুব ভালোভাবে দেখতে পাই। ঠিক তোমার মতো। তবে হ্যাঁ, তোমার মতো চোখ নেই। আমাদের এই আদিবাসী গোষ্ঠীর কারও চোখ নেই। কিন্তু সবাই দেখতে পাই। আমরা নাক দিয়ে দেখতে পাই। নাকই আমাদের চোখ।
      শিকারি এমন অদ্ভুত কথা আগে কখনও শোনেনি। বুড়োর মধু দেওয়া, বুড়োর কথাবার্তা তার খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু এমন গোষ্ঠীর মধ্যে তার থাকতে সাহস হল না। যদি কিছু হয়? না, সে থাকবে না। আরও এগিয়ে যাবে। দেহে বলও ফিরে এসেছে।
      শিকারি এগিয়ে চলল, দু-একবার পেছন ফিরে দেখল। বুড়ো আবার একমনে কাজ করছে। হাঁটতে হাঁটতে সে এসে পৌঁছল একটা ছোট্ট হ্রদের তীরে। আঃ, কি স্বচ্ছ টলটলে জল। নীচের বালি-পাথরকুচি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কেউ নেই আশেপাশে। সে এখানেই থাকবে।
      হ্রদের টলটলে জল অনেকটা খেল। মাথায়, মুখে জলের ছিটে দিল। খুব ভালো লাগল। একটা ঘন গাছের নীচে শুয়ে পড়ল।
      সকালের রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তীরের মতো এসে পড়েছে ঘাসে। শিকারি চোখ মেলে চাইল। এক ঘুমেই রাত ফুরিয়ে গিয়েছে। চোখ খুলে সামনে চাইতেই সে অবাক হয়ে গেল। কোথায় গেল সেই হ্রদ? সেই টলটলে জলের হ্রদ? ওই হ্রদ থেকেই তো জল খেয়েছিল? এখন মাঠ। সবুজ ঘাসের বিরাট মাঠ। সে অবাক হল, ভয়ও পেল। এ কেমন দেশ?
হঠাৎ আকাশ জুড়ে মেঘ করে এল। থমথম করছে চারিদিক। ঝড় আসবে। হ্রদ নিয়ে ভাববার সময় নেই। একটা আস্তানা তৈরি করতে হবে। ঝড়-জল থেকে বাঁচতে হবে। সে লেগে পড়ল কাজে। গাছের মোটা মোটা ডাল মাটিতে পুঁতে ফেলল। গাছের বাকল নিয়ে এল। অনেক। ছাদ আর বেড়া করতে হবে। একটা গাছের সুন্দর বাকল দেখতে পেল। গায়ের জোরে হাত দিয়ে বাকল টানতেই সে অবাক হয়ে গেল। বাকলের নীচে গাছের সঙ্গে লেগে রয়েছে একটা অদ্ভুত জন্তু। এমন জন্তু সে আগে দেখেনি। ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল।
      হঠাৎ জন্তুটা আকাশ-ফাটা গর্জন করে উঠল, ‘আমি বুলগাহনুননু। আমি...।’ 
     বাকল ছেড়ে দিল শিকারি। পেছন ফিরেই ঝড়ের বেগে দৌড় দিল। ভয়ে তার বুক ভীষণভাবে কাঁপছে। ওঃ, খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছে।
      তারপর সে থামল। আর ছুটতে পারছে না। আর বোধহয় ভয় নেই। শান্ত হয়ে সে বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
     হঠাৎ শিকারি দেখতে পেল, দূরে একটা নদী। আর অনেক এমু পাখি ঝাঁক বেঁধে সেই নদীতে জল খেতে আসছে। শিকারি ঠিক করে ফেলল একটা পাখিকে মারতে হবে। তাহলে আর আজকের খাবারের জন্য ভাবতে হবে না। গুটিগুটি এগিয়ে সে নদীর পাশে একটা গাছে উঠে পড়ল। ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইল। এমুরা অনেক কাছে এসেছে। শিকারি বর্শা ছুড়ে মারল। বড় শিকারি। বর্শা গিয়ে বিঁধল একটা এমুর গায়ে।
      গাছ থেকে নেমে আহত এমুকে সে ধরতে ছুটেছে। এমু ছটফট করছে। হঠাৎ শিকারি বুঝতে পারল, ওগুলো এমু পাখি নয়। ওরা এক অজানা গোষ্ঠী। তাদেরই একজনকে সে বর্শায় বিঁধেছে। ও আর বাঁচবে না। সে পাখি ভেবে মানুষ মেরেছে। শিকারি বুঝল, এখুনি বিপদ হবে। ওরা লোকটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করবে। এইবার ধাওয়া করবে হত্যাকারীকে। খুঁজবে কে এমন কাজ করল। ওরা অনেকে।
      শিকারি পেছন ফিরে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে দৌড় দিল। এঁকেবেঁকে সে ছুটে চলেছে, ওঃ, খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছে। ওরা যদি ওকে ধরতে পেত, ওমনিভাবে বর্শা দিয়ে মারত। আর ওপথে নয় ।
      উররুনাহ পথ চলছে, বনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। শেষকালে এক জায়গায় এসে সে ঘাসের ওপরে বসে পড়ল। মাথার ওপরে গাছের ঘন ডালপালা। হঠাৎ শিকারী সাত বোনকে দেখতে পেল। অল্প দূরেই তারা বসে রয়েছে। শিকারি উঠে তাদের কাছে গেল। তারা বলল, “আমরা সাত বোন। এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াই। অন্য কারও সাথে কথা বলি না, কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাই না। কিন্তু আজ রাতটুকু তুমি আমাদের সঙ্গে থাকতে পারো। কালকেই তোমাকে চলে যেতে হবে।
      এই বলে সাত বোন শিকারিকে অনেকটা খাবার দিল। খুব খিদে পেয়েছে তার। সে কোন কথা না বলে খেতে লাগল। খাওয়ার পরেও সে কিছু বলল না। চুপচাপ শুয়ে পড়ল। ভোর হতেই শিকারি এমন ভান করল যেন সে বহু দূরে চলে যাচ্ছে। অন্য পথে সাত বোন রওনা দিল। শিকারি ঘন বনের মধ্যে দিয়ে ঘুরে এসে সাত বোনের পেছন পেছন যেতে লাগল। লুকিয়ে লুকিয়ে সে যাচ্ছে যাতে ওরা দেখতে না পায়।
      সাত বোন একজায়গায় থামল। মাটির গর্তে কি যেন দেখল। সেই গর্ত থেকে কয়েকটা ডিম তুলে নিল। তারপর গোল হয়ে বসে সেই ডিম খেতে লাগল। আপনমনে খাচ্ছে আর গল্প করছে।
     শিকারি ঝোপের আড়ালে হামাগুড়ি দিয়ে ওদের দিকে এগোচ্ছে। ওদের পিছনে ওরা রেখে দিয়েছিল অনেকগুলো মেটে আলুর কাঠি। শিকারি হাত বাড়িয়ে দুটাে কাঠি চুরি করেই ঝোপে লুকিয়ে পড়ল। ওরা কেউ দেখতে পায় নি।
খাওয়া শেষ করে সাত বোন উঠল। আবার অন্য কোথাও যাবে। মেটে আলুর কাঠি তুলে নিতেই দেখল, দুটো আলুর কাঠি নেই! আশ্চর্য তো! এই তো ছিল! গেল কোথায়? কেউ তো আসেনি এখানে? তারা এধার-ওধার অনেক খুঁজল। কিন্তু দুটো কাঠি কোথাও পেল না ।
      শেষকালে ওরা ঠিক করল, যে দুই বোনের কাঠি হারিয়েছে, তারা এখানেই থাকবে। সেগুলো খুঁজবে। যতক্ষণ না পায় ততক্ষণ খুঁজবে। খুঁজে পেলে আবার পাঁচ বোনের কাছে যাবে। অন্য পাঁচ বোন ঘন বনে এগিয়ে গেল। দুই বোন খুঁজতে লাগল সে দুটো কাঠিকে।
      তারা ঘন ঘাসের মধ্যে খুঁজছে, ঘন ঝোপের মধ্যে খুঁজছে। শিকারি ঝোপ থেকে বেরিয়ে এক জায়গায় শক্ত মাটিতে কাঠি দুটো পুতে দিল। আবার লুকিয়ে পড়ল ঝোপের আড়ালে। ঝোপের মধ্যে থেকে সবকিছু দেখতে পাচ্ছে।
      দুই বোন পেছন ফিরেই কাঠি দুটাে দেখতে পেল। মুখে হাসি ফুটল। ছুটে গিয়ে মাটি থেকে কাঠি তুলতে গেল। কাঠি টেনে তুলছে – শিকারি ঝোপের আড়াল থেকে লাফ দিয়ে পড়ল। দুই হাতে দুই বোনকে শক্ত করে চেপে ধরল। তারা হাত ছাড়াতে চেষ্টা করল। পারল না। বুঝল, পালানো যাবে না। শান্ত হল দুই বোন।
      শিকারি বলল, “তোমরা আমার সঙ্গে যাবে। তোমরা দুজনে হবে আমার বউ। আমার তাই ইচ্ছে।
     বউ হতে দুই বোনের একটুও ইচ্ছে নেই। কিন্তু শিকারির দেহের শক্তি অনেক বেশি। তারা গায়ের জোরে পারবে না। তাই দুই বোন বউ হতে রাজি হল। উপায় কি?
      দুই বোন মনে মনে ভাবল, একদিন না একদিন যেমন করেই হোক শিকারির কাছ থেকে পালাতে হবে। সুযোগ পেলেই পালাবে।
      শিকারি দুই বউয়ের মনের কথা বোঝে। তাই সব সময় নজর রাখে। সে ভাবে, তার হাত থেকে পালানো অত সহজ নয়। শিকারি কিন্তু খুব খুশি। দুই বউ পরমা সুন্দরী, কাজকর্মও মন দিয়ে করে। কিন্তু এরা দুজন বড় অদ্ভুত। কথা প্রায় বলেই না, বেশি রকমের শান্ত। তবু সে খুশি।
      মেয়েদের দেহে রয়েছে সাদা তুষার-কণা। এগুলো শিকারির মোটেই ভালো লাগে না। শিকারি এগুলোকে গলিয়ে দিতে চায়। আগুনের পাশে দুই বউকে অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে। বউ দুজন কিছু বলে না, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। তুষার-কণার ঠান্ডা জল বাম্প হযে উবে গেল, কিন্তু তবু তাদের দেহে কণাগুলো জ্বলজ্বল করতে লাগল। উজ্জ্বলতা কমল, কিন্তু দেহ থেকে কণাগুলো একেবারে মুছে গেল না।
      এমনি করে দিন যায়। বউরাও শিকারিকে ভলোবেসে ফেলল। না, তাদের ভালোই লাগছে। শিকারি মানুষ ভালো। তারা সুখি হল। আনন্দে দিন কাটতে লাগল।
      তবু দুই বোন যখন একা একা থাকে, অন্য পাঁচ বোনের কথা ভাবে, তাদের কথা বলে। মন কেমন উদাস হয়ে যায়। আহা ! ওরা এখন কোথায়? কেমন আছে? ভালো আছে তো? স্বামীর সঙ্গে সুখে থাকলেও দুই বোন চিন্তা করে, একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে পাঁচ বোনের সঙ্গে। আবার সাত বোন একসঙ্গে হেসেখেলে শিকার করে দিন কাটাবে। একদিন উররুনাহ দুই বউকে বলল, ‘পাহাড়ি দেবদারু গাছের ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে এসো। আমার আগুন নিভে আসছে। একবার নিভে গেলে আর তো জ্বালাতে পারব না। আগুন আছে কিন্তু নতুন করে আগুন জ্বালাতে জানি না। সর্বনাশ হবে। গাছের বাকল নিয়ে এসো।
      কেঁদে ফেলল দুই বউ। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ওগো, দেবদারু গাছের বাকল কাটতে বোলো না, ওই গাছের বাকল কাটলেই আমরা আর তোমার থাকব না। আমাদের হারাতে হবে। ও কাজ করতে দিয়ো না।
      শিকারি ভীষণ রেগে গেল। স্বামীর কথা অমান্য করা? আসলে খাটতে চায় না ওরা। রাগে চিৎকার করে বলল, ‘আমি বলছি, এক্ষুনি বাকল কেটে নিয়ে এসো। নইলে...।’ আগুন কমে আসছে দেখে শিকারি আরও বেশি রেগে গেল।
      শিকারি শুনবে না তাদের কথা। বউ দুজন শিকারির শিকার করবার কুঠার নিয়ে পাহাড়ি বনে রওনা দিল। গোটা পথ তারা কাঁদছে। তারা দুটো পাহাড়ি দেবদারু গাছের নীচে এসে থামল।
      চোখের জল মুছে তারা কুঠার দিয়ে আঘাত করল দেবদারু গাছে। সঙ্গে সঙ্গে দুটো গাছ বড় হতে লাগল, উঁচু হতে লাগল। মেয়ে দুটো কুঠার সমেত আটকে গেল গাছে। গাছ উঁচু হচ্ছে, মেয়েরা ওপরে উঠছে। গাছও আকাশ-পানে মাথা তুলছে, মেয়েরা আকাশ-পানে উঠছে। উঁচুতে, আরও উঁচুতে। শেষকালে দেবদারু গাছ আকাশে গিয়ে থামল। তাদের উঁচু হওয়া বন্ধ হল। মেয়েরা সেই দূর আকাশে।
      হঠাৎ দুই বোন দেখতে পেল, মেঘের কোলে দাঁড়িয়ে পাঁচ বোন হাত বাড়িয়ে দুই বোনকে ডাকছে। পাঁচ বোন আগেই আকাশে পৌঁছে গিয়েছে। তারা অপেক্ষা করছিল দুই বোনের জন্য। দুই বোন জড়িয়ে ধরল পাঁচ বোনকে। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল দুই বোন, আবার তাদের ফিরে পেয়েছে। সাত বোন আবার একসঙ্গে হল। আকাশের ওই দূরের মেঘের রাজ্যে। বড় আনন্দের দিন আজ।
      দূর থেকে শিকারি দেখতে পেয়েছে, দেবদারু ওর বউ দুজনকে নিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। রাগে সে ছুটে এল গাছের কাছে, হাতে তীর-ধনুক-বর্শা। কিন্তু সে ওদের নাগাল পেল না। নীচ থেকেই হম্বিতম্বি করতে লাগল। শিকারি লাফাচ্ছে, উঁচু হচ্ছে, হাত-পা নাড়ছে আর মুখে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে।
      সাত বোনের এক কুটুম্ব থাকত আকাশে। সে মাটির ওপরে শিকারির হাম্বিতম্বি দেখে তো হেসেই খুন। কি মজা লাগছে। আহা ! বেচারি। সেই কুটুম্বের হাসি আর কোনদিন থামল না। সে হল শুকতারা। আজও মিটমিট করে হাসছে।
সেই সাত ভাই অনেক দিন বনে বনে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরল, তারা প্রাণ দিয়ে সাত বোনকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু সাত বোনকে বউ হিসেবে পায় নি। বড় কষ্টে বহু পথ তারা ঘুরেছে। নাঃ, আর কোনদিন সাত বোনের দেখা পায়নি। আকাশের দেবতা সাত ভাইয়ের মনের ব্যথা বুঝেছেন, তাদের ভালোবাসা তিনি দেখেছেন। আহা! ওরা সাত বোনের কাছাকাছিই থাকুক। তাই আকাশের দেবতা সাত ভাইকে মেঘরাজ্যে ঠাঁই দিলেন।
      সাত বোন আকাশ-রাজ্যে তারা হয়ে ফুটে রইল। তারা হল সপ্তর্ষিমণ্ডল, সাত বোন একসঙ্গে রয়েছে। সাত ভাইও এল আকাশে। সারাদিন সাত ভাই মৌমাছি শিকার করে, মধু খায়। আর রাতে আকাশে ফুটে ওঠে তারা হয়ে। এই সাত ভাই হল কালপুরুষের কোমরবন্ধনী আর তরবারি। সাত তারা-বোন যখন গান গায়, সাত তারা-ভাই তখন আনন্দে নেচে ওঠে।
      আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাত তারা-বোনই খুব উজ্জ্বল। কিন্তু এরই মধ্যে দুজনের আলো যেন অল্প কম। ওই দুটি তারা উররুনাহের বউ ছিল। আগুনের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল শিকারি, তাই তুষার-কণার আভা অল্প কমে গিয়েছে।
      সাত তারা-বোন, সাত তারা-ভাই আর কুটুম্ব শুকতারা আকাশে ফুলের মতো ফুটে রয়েছে আজও।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য