তিন পাহাড়ের হরিণ | ২ | - শওকত আলী

    চিত্রল সর্দারের মুখোমুখি মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো। তারপর বললো, অনেক অনেক দূরে আছে সবুজ ঘাসের দেশ। সূর্য যখন ওঠেনি তখন থেকে ছুটতে হবে আর সূর্যটা ডুবে আকাশ থেকে যখন লাল রং মুছে যেতে থাকবে তখন পৌছানো যাবে সে জায়গায়। একটা নদী পার হতে হবে, নদীর ওপারে শুধু সমতল মাটি। কেবল সবুজ আর সবুজ।
কিন্তু যাবে কি করে? চিত্রলের কথার মাঝখানে বাধা দিলো এক বুড়ো হরিণ। চিত্রল হেসে জিজ্ঞেস করলো, কেন যেতে অসুবিধা কোথায়? 
     কেন, ঐ যে কালরাজ ওৎ পেতে আছে।
     চিত্রল সমবেত সব হরিণের মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিলো। তারপর বললো, আসলে ভয়টা আমাদের নিজের ভেতরে। আজ আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম। গায়ে গায়ে লেগে ছিলাম সর্বক্ষণ, কালরাজ হামলা করতে এসেও পারে নি। আর আমরা যদি ভয় পেয়ে এক একজন এক একদিকে ছুটে যেতাম তাহলেই মরতে হতো আমাদের। আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, একজোট হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াই, তাহলে কেউ আমাদের ওপর হামলা করতে সাহস পাবে না।
     চিত্রল আরো কিছু বলতো হয়তো, তার আগেই কে একজন বলে উঠলো, ঐ ছোকরাকে আর আসকারা দিও না। ওর কথা শুনে এখান থেকে বেরুলেই আমরা মরবো। কালরাজ আমাদের কাউকে ছাড়বে না। অনেক দিন ধরে সে হরিণের রক্তের স্বাদ পায় নি। না, আমরা যাবো না।
     সর্দার কিছু বললো না, শুধু দেখতে লাগলো। চিত্রল আর একবার চারদিকে তাকিয়ে বললো, আকাশে মেঘের দেখা নেই। এখানকার ফোয়ারা শুকোতে আর দেরী নেই, তখন পানি না খেয়ে মরতে হবে। এখন হয়তো বাচ্চারা খাদ লাফিয়ে পার হয়ে যেতে পারবে। না-খেয়ে না-খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে তখন সে শক্তিটুকুও আর থাকবে না। তখন বাচ্চারা শুকিয়ে না খেয়ে মারা পড়বে। তার চাইতে গেলে এখনই চলে যাওয়া ভালো।
     ওর কথা কেউ শুনলো না। বুড়োরা সমস্বরে না না বলে চেঁচাতে লাগলো।
     চিত্রল মাথা নিচু করে সরে এলো। কিছুটা হেঁটে এসে পেছনে তাকালো একবার। আহা বাচ্চাগুলোর ভারী কষ্ট হবে। এত সুন্দর বাচ্চারা, কী লাফালাফি ছুটাছুটি করছে—এরাই শুকিয়ে যাবে, হাড়-পাজরা দেখা দেবে। পিপাসায় কাতর হয়ে একসময় দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে খাদের মধ্যে পড়ে পড়ে মরতে থাকবে। তখন? তখন এই বুড়োরা কোথায় থাকবে?
     চারদিকে জ্যোৎস্না, পশ্চিম থেকে গরম হাওয়া বয়ে আসছে। সারাদিন পাহাড়ের গায়ে যে উত্তাপ জমেছিলো সেই জমানো উত্তাপ এখন হাওয়া হয়ে বইছে। চিত্রল আকাশের দিকে তাকালো। তারাগুলো ঝিকিমিকি কাঁপছে। অনেক অনেক দূরে তারার দেশ। চাঁদটা যে কত দুরে কে বলবে? তার জানতে ইচ্ছে করে। তাদের দলের এক বুড়ো ছিলো, সে তাকে সমুদ্রের কথা বলেছিলো, পাঁচ-পাহাড়ের ধবল চুড়োর গল্প শুনিয়েছিলো। এখনও তার ইচ্ছে করে সেই সব দেশে যেতে |
     কিন্তু এরা, এই জীবগুলো গর্ত থেকে বেরুতে চায় না মোটে। নিজের দলের হরিণদের কথা ভেবে করুণা হয় চিত্রলের।
     তবু সে যাবে। দরকার হয় একাকী চলে যাবে। এদিকে একটি একটি করে দিন যেতে লাগলো। আরো আগুন ছোটানো হাওয়া বয়ে এলো পশ্চিম থেকে। পাহাড়ের পাথরে পাথরে বুকজোড়া পিপাসা হা হা করে ফিরতে লাগলো। গাছের শুকনো পাতাও আর পাওয়া যায় না। ফোয়ারার পানি শুকিয়ে এসেছে, এখন আর স্রোত বয় না। আর কদিন কে জানে।
     চিত্রলের কোন কাজ নেই। সে আর দূর দেশে যায় না। বাচ্চা হরিণদের ছুটতে শেখায়, জোরে লাফাতে শেখায় আর শেখায় ঢালু পাহাড়ের গায়ে পাথর থেকে পাথরে কিভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে যেতে হবে। যারা শিখে ফেলে তাদের নিয়ে যায় বাইরে, সেই বিপজ্জনক খাদের রাস্তা ডিঙ্গিয়ে বাইরের বন থেকে কিছু ঘাস-পাতা খাইয়ে আনে।
     হরিণেরা সবাই এখন গালাগাল করে একে অপরকে। বাইরে যাওয়া হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু তবু এ জায়গা ছেড়ে যে সবাই মিলে দুর অজানার পথে পা বাড়াবে, এমন সাহস কারো হয় না।
     কালরাজ হঠাৎ সেদিন দেখতে পেয়েছিলো। দুপুরে টিলার মাথায় দুটো প্রকাণ্ড পাথরের আড়ালে সে ঘুমোচ্ছিলো। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। কটা পাখি চ্যাঁ চ্যাঁ করে উঠেছিলো। উঠে বসতেই চোখে পড়ে তিনটে হরিণ একসঙ্গে বিদ্যুৎ বেগে ছুটে যাচ্ছে। সে লাফিয়ে ওঠে, এতো কাছে সে বহুদিন হরিণ পায়নি। কিন্তু হরিণগুলো যে কিভাবে নিমেষে পাহাড়ের খাদের ওপারে চলে গেলো, সে আজো ভেবে পায় না। হরিণ তিনটের পিছু সে ছাড়ে নি।
     কালরাজ ছুটেছিলো ওদের পিছনে। কাছাকাছি গিয়েও ছিলো, কিন্তু ঝাপিয়ে পড়তে পারে নি। কাছাকাছি হতেই দেখলো তিনটে হরিণই শিং বাগিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
     কোনদিন এমন হয় নি। তার অবাক লেগেছিল। এ রকম তো হওয়ার কথা নয়। হরিণেরা তো চিরকাল বাঘ দেখে যে যেদিকে পেরেছে পালাতে চেয়েছে, আমন গায়ে গায়ে লেগে শিং বাগিয়ে রুখে দাঁড়ায় নি কখনো। কালরাজ দূর থেকে দাঁড়িয়ে হরিণ তিনটের সুঁচালো শক্ত শিংগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। শিংগুলোকে বড় বেশিধারালো মনে হয়েছিলো তার। তারপর থেকে কালরাজ লক্ষ্য রেখেছে কোন পথে আসে ওরা। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সে ঘুরে বেডাচ্ছে। একদিনও কি পাবে না একটা হরিণকে। ওঃ। কতোদিন হরিণের রক্তের স্বাদ পায়নি, কতোদিন নরম মিষ্টি মাংস খায়নি। মনে পড়লেই তার জিভ থেকে লালা ঝরতে আরম্ভ করে।
     আরেকদিন কয়েকটা শুকনো ঝোপের আড়ালে আড়ালে হাঁটছিলো কালরাজ। লক্ষ্য রাখছিলো দুটি হরিণের ওপর। বড় হরিণটা খাদ পেরিয়ে এপারে এসে দাঁড়ালো। ছোটটা লাফিয়ে পার হবে ঠিক তক্ষুনি এক অলক্ষুণে পাখি চ্যাঁ চ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠলো আর সঙ্গে সঙ্গে বড় হরিণটা ফিরে চাইলো। নড়লো না, পালিয়ে গেলো না। কালরাজ এগিয়ে গেলো। তার মনে হচ্ছিলো হরিণটা নির্ঘাৎ ভয় পেয়ে দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে কাছে গেলো, একপা একপা করে। আর একটা মাত্র লাফ । সে লাফ দেবে, এমন সময় দেখলো, হরিণটা লাফিয়ে ওপারে চলে গেলো।
     কালরাজের মনে হচ্ছিলো, এ হরিণটাকেই সে কদিন আগে দেখেছে। আরো দুটো হরিণের সঙ্গে শিং বাগিয়ে রুখে দাড়িয়েছিলো সেদিন। স্পষ্ট মনে পড়ে তার, দুই শিং এর মাঝখানে একটা চওড়া শাদা চিহ্ন দেখেছিলো সেদিনও।
     তার জেদ চেপে গেলো। চিরকাল সে রাজার মত হেঁটে ফিরেছে সারা বনে। সে যখন নির্জন দুপুরে হেঁটে যায় তখন বনের পাখিরা চেঁচায়। কে যায়, কে? অন্য পাখিরা উত্তর দেয় রাজা যায়, বনের রাজা। বনের রাজা কালরাজ, আজ হোক কাল হোক, সে দেখে নেবে হরিণের দলটাকে । তার সঙ্গে চালাকি!
     সে পাহাড়ের গায়ে দুটো প্রকাণ্ড পাথরের আড়ালে আস্তানা গাড়লো। আর লক্ষ্য রাখলো, কবে কখন ওরা দল বেঁধে বের হয়।
     বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। একদিন দেখলো, তখনও সন্ধ্যা হয়নি ভালো করে। সারারাত সে ঘুরে বেড়িয়েছে শিকারের খোজে। তিন দিন ধরে কিছুই পাচ্ছে না। ভোরের দিকে আস্তানায় ফিরছে এমনি সময় দেখলো অনেকগুলো হরিণ সেই খাদের ওপার থেকে একে একে এপারে লাফিয়ে আসছে। কালরাজের লোভী জিভ পানিতে ভর্তি হয়ে গেলো। আনন্দে সে গরগর করে উঠলো। ল্যাজটাকে আছড়ালো কয়েকবার। তারপর এগিয়ে গেলো। নিঃসাড়ে সে এগোতে লাগলো। যে চড়াই বেয়ে হরিণের ওপারে উঠে আসবে সেই চড়াইয়ের মাথায় গিয়ে দাঁড়ালো। এমনিতে খাড়া চড়াই, ঢালু পাহাড়ের গা-ভর্তি নুড়িপাথর বিছানো। একটু নাড়া লাগতেই একটা নুড়ি গড়িয়ে পড়লো। শব্দ হলো।
     হ্যাঁ, শব্দ হলো। আর চকিতে তাকিয়ে দেখে নিলো চিত্রল। শয়তানটা ঠিক এসে দাঁড়িয়েছে।
     সর্দার তখনো ওপারে। বাচ্চারা এক এক করে সবাই লাফিয়ে এসেছে। সে ডাকলো অশান্ত, চপল। মুহুর্তে তিনজন পাশাপাশি দাড়িয়ে গেলো।
     কালরাজ দেখলো, দেখে অবাক লাগলো তার। হ্যাঁ সেই হরিণ তিনটা। নাকি এরা হরিণ নয়, অন্য কোন জীব? অবাক লাগে তার। আরো আশ্চর্য, দেখলো, বাচ্চা হরিণগুলো এক এক করে লাফিয়ে লাফিয়ে আবার খাদের ওপারে চলে যাচ্ছে। তার মানে, মুখের গ্রাস আবার ফস্কাবে। অসম্ভব। কভি নেহি! কালরাজ গর্জে উঠলো।
     নিচে খাদের ধারে যেখানে তিনটে পাথর পাশাপাশি মাটিতে গাঁথা সেখানে হরিণ তিনটে দাঁড়িয়ে। ঘাড় বাকিয়ে রেখেছে হরিণগুলো। লড়াইয়ে ডাকছে যেন। এতো সাহস তাদের। কালরাজ রাগে গরগর করতে করতে ল্যাজ আছড়াতে আছড়াতে দেখলো একে একে বাচ্চা হরিণগুলো ওপারে, তার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনটে ছিলো একটু আগে একটা গেলো। ঐ আরেকটা । কালরাজ গর্জে উঠলো। পাহাড়ে পাহাড়ে তার গর্জনের প্রতিধ্বনি শোনা গেলো। না, আর পিছোবে না সে। দেখে নেবে হরিণের দলটাকে।
     খাদের মুখে, যেখানে কটা পাথর ঢালু পাহাড়ের গায়ে গাঁথা, সেখানে নামতে পারলে খাদের ওপারে যেতে দেরী লাগবে না। আর তা হলেই নরোম উষ্ণ মিষ্টি রক্তমাংসের স্বাদে মুখটা ভরে যাবে। কালরাজের দুচোখে লোভ চকচক করতে লাগলো। সে পায়ে পায়ে ঢালু পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে লাগলো। হরিণের লোমগুলো পর্যন্ত দেখতে পায় সে। আর একবার মাত্র একটা লাফ। আন্দাজ করে ঠিক মতো একটা লাফ শুধু!
     কালরাজ বসে পড়ে। শরীরটা গুটিয়ে আনে,পেছনের পা দুটোতে সারাজীবনের শক্তি এনে জড়ো করে।
     হুঁশিয়ার, চিত্রল চেঁচিয়ে উঠলো, শয়তানটা এক্ষুনি লাফ দেবে।
     একটা বাচ্চা হরিণ তখনও ওপারে যেতে পারেনি। বাঘ দেখে ভয় পেয়ে থরথর করে কাপছে সে।
    চিত্রল আক্রমণোদ্যত হিংস্ৰ লোভী জানোয়ারটাকে দেখছে। দেখছে আর ঘেন্না হচ্ছে তার। ঘাতক খুনী জীব, তার গায়ের গন্ধ, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সব কিছুর মধ্যে কীরকম যেন একটা ঘেন্না মেশানো আছে বলে মনে হয় তার। চিত্রল মনে করতে চেষ্টা করলো, তার মা-বাবাকে মেরেছিলো এই শয়তানটাই। কতো হরিণ যে ওর পেটে গিয়েছে, কেউ তার হিসেব দিতে পারে না। কিন্তু এবার? এবার আর তা হতে দেবে না চিত্রল, এখানে এই ঢালু খাড়াইয়ের পাশে তোকে আজ উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দেবো। সে মনে মনে বলে। আয় চলে আয়, চিত্রল ডাকে যেন বাঘটাকে। ডাকে আর দেখে, ডোরাকাটা দাগগুলো যেন তার শয়তানীর সাজ। জানোয়ারটার চোখের ভেতরে কী রকম ধূসর শীতল একটা আলো জ্বলছে। চিত্রল চেনে, সে আলো হচ্ছে বিশ্রী লোভের আলো।
     হঠাৎ চিত্রল চেচিয়ে উঠলো, হুঁশিয়ার। লাফ দিয়েছে বনের রাজা কালরাজ। বাচ্চা হরিণটা চিৎকার করে উঠলো। মাত্র কয়েক মুহুর্তের ব্যাপার। কালরাজ পাথর তিনটের ওপর এসে পড়লো। বিদ্যুৎ বেগে ওপরে উঠে গেলো চিত্রল, চপল, অশান্ত। বাচ্চা হরিণটা ছিটকে পড়ে নিচের একটা পাথরে ভর দিয়ে দাঁড়ালো। কালরাজ পড়ামাত্রই বড় পাথর তিনটার নিচের নুড়িগুলো গড়িয়ে পড়লো। দুলে উঠলো পাথরটা। কালরাজ দেখলো হাত বাড়ালেই বাচ্চাটাকে পাওয়া যায়।
     যেই থাবা বাড়াতে যাবে, হঠাৎ অনুভব করলো তার পেটের কাছে কয়েকটা ধারাল খোচা লাগছে। চকিতে তাকিয়ে দেখলো তিনটি হরিণ তাদের ধারালো শিং দিয়ে তাকে ঠেলে ফেলতে চাইছে। কালরাজ শরীরে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিলো তারপর ফিরে দাঁড়ালো। পেছনের একটা পা রাখার জায়গা পাথরটাতে নেই। নিচে কোন মাটি পাচ্ছে না সে,যে পায়ে জোর পাবে। তবু জানোয়ারটা রাগে লোভে হিংস্রতায় কুটিল হয়ে উঠলো। সে চিনে নিলো হরিণটাকে যেটা তার মুখের গ্রাস সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। চিত্রল কাছে ছিলো, চিত্রলের মাথা লক্ষ্য করে সে একটা থাবা মারলো। ধারালো নখ লেগে চিত্রলের গলার কাছ দিয়ে অনেকটা জায়গা চিরে গেলো। লাল হয়ে উঠলো গলাটা।
     ছোট্ট একটুখানি জায়গা পাথরের ওপর পাথর আলগা হয়ে লেগে আছে, বাঘের ভারী শরীরটা যেদিকে হেলছে পাথরটা সেদিকে ঝুঁকে পড়ছে।
     কালরাজ বুঝলো এক্ষুনি পাথরটা খসে গড়িয়ে পড়বে। নিচের অন্ধকার খাদের দিকে ও তাকিয়ে দেখলো। দেখে বুকের ভেতর কী যেন কেঁপে উঠে। না, তার উঠে যাওয়া দরকার। সে ওপরের দিকে একটা শক্ত পাথর খুঁজলো, যেখানে সে লাফ দিয়ে উঠে যেতে পারে। দেখলো কয়েক হাত দূরেই পাথরটা আছে। সে চলে যাবে এখনকার মত। কিন্তু মুখের গ্রাস কে ফেলে রাখে? বাচ্চা হরিণটাকে দেখে সেই মুহুর্তে সারা জীবনের ক্ষুধা যেন তার পেটের মধ্যে জ্বলে উঠেছে। বাচ্চা হরিণটার দিকে আরেকবার সে থাবা বাড়ালো।
     বাচ্চাটার বাঁচবার আশা নেই, নিজের ঘাড় থেকে দরদর করে রক্ত ঝরছে, তবু চিত্রল চেঁচিয়ে ডাকলো, আশাস্ত, চপল। তারপর শিং বাগিয়ে এগিয়ে গেলো। অশান্ত চপল তার ডাক শোনার আগেই সে শিংসুদ্ধ মাথাটা বিদ্যুৎ গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে দিলো। কি একটা ফুড়ে শিং দুটো ভেতরে প্রবেশ করলো বলে মনে হলো তার। আর সঙ্গে সঙ্গে নাকের কাছে একরাশ লোম এবং দুর্গন্ধ এসে লাগলো। আর ঠিক তক্ষুনি মনে হলো, কি একটা প্রচণ্ডশক্তি তার পিঠের ওপর ভেঙ্গে পড়েছে। সে মুখটা ফেরাতে চাইলো, পারলো না। সব কিছু ভুলে গিয়েছে সে তখন। কেবলি মনে হচ্ছে, জন্ম জন্মের শত্ৰু এই জানোয়ারটার কাছে তার হার মানলে চলবে না। পেছনের পা দুটোর ওপর ভর করে প্রচণ্ড শক্তিতে সামনের দিকে সে মাথার বোঝাটাকে ঠেলে ফেলতে চাইলো ।
     সবাই তখন বিমূঢ় হয়ে দেখছে।
     পাথরটা দুলছিলো, তার নীচ থেকে দুটি একটি করে নুড়ি খসে পড়ছিলো। এক সময় একটা পাথর খসে পডলো আর সঙ্গে সঙ্গে বাঘটা চিত্রলের পিঠ ছেড়ে সামনের থাবা দুটাে দিয়ে কী যেন আঁকড়ে ধরতে চাইল। মুহুর্তের জন্য মাত্র, তারপরই পাথরটা আলগা হয়ে কাত হলো এবং বনের রাজা কালরাজকে নিয়ে পড়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে বাঘটার পেটে শিং গাথা অবস্থায় চিত্রলও পড়লো সেই অনেক নিচে, অন্ধকার খাদে, যে অন্ধকার থেকে কেউ কোনদিন আর উঠে আসে না।
     তখন সকাল হচ্ছে, পাখীদের কলকাকলিতে সারা বন যেন ঝঙ্কার দিচ্ছে। পূব পাহাড়ের মাথায় সোনার মত রোদ ঝলমল করছে। হরিণেরা একে একে খাদ পার হয়ে এলো।
     বাচ্চারা ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বুড়োরা কথা বলছিলো না। চিত্রলের মা বাবা নেই। কেউ কাঁদছিলো না ওর জন্য। অশান্ত আর চপল সবার পেছনে আসছিলো। কিছুদুর এগোবার পর সর্দার ডাকলো, কোনদিকে যেতে হবে? অশান্ত সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলো, চপলও দেখলো, তারপর তারা এগিয়ে গেলো বাম দিকে, হ্যাঁ, বাম দিকে। অশান্ত সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, বাম দিকে চলো। পাহাড় বন পার হয়ে গেলে নদী দেখবো আমরা। নদী পার হয়ে গেলে পাবো সেই সমতল যেখানে মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ।
     বাচ্চারা লাফাতে লাফাতে চললো চপল আর অশান্তর পেছনে পেছনে। তারা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলো, বামের রাস্তা নদী পার হয়ে সবুজ প্রান্তরে গিয়ে উঠেছে। তারপর সবুজ প্রান্তর পার হয়ে তারা পৌছোবে পাঁচ-পাহাড়ের কোলে, যার চুড়োয় রুপোর মত বরফ ঝলমল করছে। দেখবে সেই বরফ গলে ঝর্ণা হয়ে কেমন করে নেমে যাচ্ছে। সেখানেই তারা থামবে না। পাহাড় আর ঝর্ণা পার হয়ে তারা আরো এগিয়ে যাবে। এগিয়ে গিয়ে দেখবে, বিশাল সমুদ্র আর তার বুকে নীল পাহাড়ের মত ঢেউ আকাশের বুক ছোঁবার জন্য উপরে উঠছে আর নামছে।

সম্পূর্ণ গল্পটি ডাউনলোড করো: ডাউনলোড
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য