পঞ্চতন্ত্র: গল্প শুরুর গল্প

     প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। সেই সময় ‘মহিলারোপ্য’ নামে দক্ষিণ ভারতে এক রাজ্য ছিল। সে রাজ্যের রাজা অমরশক্তি ছিলেন বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। তিনি যে শুধু গুণী ছিলেন তা নয়, গুণীদের কদরও করতে জানতেন তিনি। তার রাজ্যে বিদ্বান, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী-গুণীর কোনো অভাব ছিল না।
     একদিন রাজা তার রাজসভায় পাত্ৰ-মিত্র, মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বসে ছিলেন। কিন্তু রাজা বসে ছিলেন বিষন্ন মুখে।
     রাজার মলিন মুখ দেখে প্রধানমন্ত্ৰী জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ! আপনাকে আজ চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? আপনার কি অসুখ করেছে? তা হলে বিশ্রাম নিন।
     মন্ত্রীর কথা শুনে মৃদু হেসে মহারাজ বললেন, মন্ত্রিবর! আপনার কথা সত্য। কিন্তু আমি শারীরিক সুস্থ থাকলেও মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ নই।
      একথা শুনে মন্ত্রী আবার বললেন, মহারাজ! আমি কি তা হলে একবার রাজবৈদ্যকে খবর দেব?
      স্নান হাসি ফুটে উঠলো রাজার মুখে। তিনি বললেন, দেখুন, রাজবৈদ্যের সাধ্য নেই আমার এ রোগ সারায় ।
      মহারাজ! আপনার এমন কি রোগ হল যে, রাজবৈদ্য পর্যন্ত সে রোগ সারাতে পারবে না?
     একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা বললেন, আপনারা আমার হিতৈষী ও সুযোগ্য মন্ত্রী। আমার রাজ্যে বিদ্যান, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ব্যক্তির অভাব নেই, কিন্তু তবুও আমি দুঃখী—কারণ কি জানেন?
     কি কারণ? -
     আমার তিনটি মূৰ্খ ছেলেই তার জন্য দায়ী। আমার রাজকার্য প্রজাপালন, ঘর-সংসার সবই অসার মনে হয়, যখনই ভাবি আমার তিনটি ছেলেই আকাট মূর্খ।
     রাজার এই আক্ষেপপূর্ণ উক্তি শুনে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। পরে শান্ত স্বরে বললেন, মহারাজ! আপনি ঠিকই বলেছেন। মূর্খ পুত্রের চেয়ে অপুত্রক হওয়া অনেক ভালো। যেমন করেই হোক রাজপুত্রদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
     একথা শুনে রাজা হতাশ কণ্ঠে বললেন, মন্ত্রিবর! আমার রাজ্যের পাঁচশ বেতনভোগী পণ্ডিত যখন তাদের শিক্ষিত করে তুলতে সক্ষম হলেন না, তখন আর কি করে তাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে? মন্ত্রিবর! আপনার কি তেমন কোনো নীতিশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত ব্যক্তির সাথে পরিচয় আছে?
     আছে মহারাজ।
     কে তিনি?
    বিষ্ণুশৰ্মা নামে এক ভারতবিখ্যাত নীতিশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত আছেন। আপনি যদি অনুমতি করেন তবে তার কাছে দূত প্রেরণ করতে পারি।
     বেশ, তাই করুন ।
     মন্ত্রী তখনই নীতিশাস্ত্রবিদ বিষ্ণুশৰ্মার কাছে দূত প্রেরণ করলেন।
     
     এই ঘটনার আরও কিছুদিন পর।
     একদিন মহারাজ অমরশক্তি তাঁর রাজ্যের সভ্যসদ ও সন্ত্রীদের নিয়ে সভায় বসে আছেন। এমন সময় এক সৌম্যদেহী বৃদ্ধ এসে রাজার সামনে উপস্থিত হলেন।
     মহারাজ অশীতিপর সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণকে দেখে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-মহাশয়ের পরিচয়? 
      আমাকে লোকে বিষ্ণুশৰ্মা বলে ডাকে। 
     শুনে রাজা আনন্দিত ও চমৎকৃত হলেন। বললেন, আপনিই পণ্ডিত বিষ্ণুশৰ্মা? আসুন, আসন গ্রহণ করে আমার রাজসভাকে কৃতাৰ্থ করুন।
     মহারাজ অমরশক্তির এই বিনয় ও সাদর আমন্ত্রণে মুগ্ধ হলেন বিষ্ণুশৰ্মা। তারপর আসন গ্রহণ করে বললেন, মহারাজ! আপনার সুনাম অনেক শুনেছি।
      এখন নিজের চোখে দেখে তার সঠিক পরিচয় পেলাম। এখন বলুন আমাকে আপনার কি প্রয়োজন।
     মহারাজ বললেন, দেখুন, আপনার পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের খ্যাতি সুবিদিত। আমি আপনার কাছে একটি আবেদন পেশ করতে চাই। আমার তিনটি মহামূর্খ সন্তান আছে; আজ পর্যন্ত কেউ তাদের শিক্ষিত করে তুলতে সমর্থ হয়নি। আমার অনুরোধ, আপনি তাদের শিক্ষার ভার গ্রহণ করুন। বিনিময় পারিশ্রমিক হিসাবে আমি আপনাকে একশত গ্রাম দান করব।
     একথা শুনে শান্ত স্বরে বিষ্ণুশৰ্মা বললেন, মহারাজ! আমি শিক্ষা দান করি, বিক্রি করি না। তা ছাড়া আমার বয়স এখন আশি পেরিয়েছে। বিষয়আশয় নিয়ে আমি কি করব?
      বেশ তো, আপনি আপনার মত ও পথকে সামনে রেখে আমার পুত্রদের শিক্ষাদান করুন—আপনার কাছে আমার এই অনুরোধ।
      মহারাজ! আপনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ ; আমি আপনার অনুরোধ রক্ষা করলাম ; আজ থেকে আপনার তিন পুত্রের শিক্ষার ভাৱ আমি নিলাম।
      মহারাজ অত্যন্ত প্রীত হয়ে বললেন, আপনি আমার পুত্রদের শিক্ষার ভার গ্রহণ করে আমায় এক চরম দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্তি দিলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবার আমার ছেলেদের মূর্খ বদনাম ঘুচবে।
      একথা শুনে বিষ্ণুশৰ্মা এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে বসলেন-মহারাজ ! আমি এই রাজসভায় সমস্ত সভাসদদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি—যদি আমি ছ মাসের মধ্যে আপনার পুত্রদের বিদ্যান করে তুলতে না পারি তাহলে নরকবাসী হব।
     বিষ্ণুশৰ্মার এ প্রতিজ্ঞা শুনে সভাসদদের মধ্যে কেউ খুশি হলেন, আবার কেউ কেউ একে অসম্ভব বলে ভ্রু কোচকালেন।
      বিষ্ণুশৰ্মা কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা পালনে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি (১) মিত্রভেদ (২) মিত্রপ্রাপ্তি (৩) কাকোলুকীয় (৪) লব্ধ-প্রণাশ ও (৫) অপরিক্ষিতকারক নামে পাঁচটি উপদেশমূলক গ্রন্থ রচনা করে ছ’মাসের ভিতর অমরশক্তির তিন পুত্রকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন।
      বিষ্ণুশৰ্মার নীতিশাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থগুলোর সার কথা ছিল নিম্নরূপ - 
     ১. মিত্রভেদঃ এই অংশে পণ্ডিত বিষ্ণুশৰ্মা দেখিয়েছেন সব বন্ধু সমান নয়, কেউ ভাল আর কেউ মন্দ। কে ভাল আর কে মন্দ তা কেমন করে চেনা যাবে সেইসব উপদেশ নিয়েই এই অংশ ।
     ২. মিত্রপ্রাপ্তিঃ এই অংশে আছে কেমন করে প্রকৃত বন্ধুলাভ করা যাবে তার কথা ;
     ৩. কাকোলুকীয়ঃ এখানে আছে এক দুষ্টুস্বভাব কাকের গল্প। রূপক অর্থে বর্ণিত এই গল্পগুলোতে দেখানো হয়েছে কেমন করে দুষ্ট্র লোকেরা কুমন্ত্রণ দিয়ে দুই সরল বিশ্বাসী বন্ধুর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে সর্বনাশ ঘটাতে পারে। এ ধরনের বন্ধু থেকে সাবধান থাকতে হবে।
     ৪. লব্ধপ্রণাশঃ এই অংশে বন্ধু ও বৈষয়িক ব্যাপারে লাভ ও অলাভের কাহিনী রয়েছে। কোন কাজে কি লাভ কিংবা ক্ষতি হবে তারই প্রেক্ষিতে সাজানো হয়েছে গল্পগুলো।
     ৫. অপরিক্ষিতকারকঃ আমরা অনেক সময় কোনোরকম অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই ঝোকের মাথায় কাজ করে বসি। তার পরিণাম হয় খারাপ। বিষ্ণুশর্ম এই তত্ত্বকেই অপরিক্ষিতকারক অংশে দেখিয়েছেন। রাজপুত্রদের বিষয়গুলো তিনি বুঝিয়েছেন গল্পের ছলে।

পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলো একটি আর একটি গল্পের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফলে প্রথম থেকে না পড়লে কিছুই বোঝা যাবে না। গল্পগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে চাইলে গল্পের তালিকা ব্যবহার করো।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য