স্মৃতি-ঘেরা পাথর - আদিবাসী লোককথা

     সেকালের কথা সবাই ভুলে গিয়েছে। সেই ভুলে-যাওয়া কালে এক গাঁয়ে থাকত একটা লোক। সে ছিল খুব ধনী। তার ছিল এক মেয়ে। অমন ফুটফুটে সুন্দরী মেয়ে ওই গাঁয়ে আর একটাও ছিল না। বাবা-মায়ের বড় আদরের মেয়ে সে।
      মেয়ে বড় হল। মেয়ের বিয়ে ঠিক হল। দূরের গাঁয়ের এক অপরূপ সুন্দর ছেলের সঙ্গে বিয়ে। বিয়ের দিন ছেলের বাড়ি থেকে সুন্দর একটা পালকি এল। সেই পালকি চড়ে মেয়ে যাবে তার নতুন বাড়িতে।
     মেয়ে রওনা হল পালকিতে চড়ে। দরজা খোলা। ভেতরে বসে রয়েছে বউ, নতুন সাজে। আরও সুন্দর লাগছে তাকে। পালকির পাশে মা কাঁদতে কাঁদতে চলেছে, মায়ের বুক ভেঙে যাচ্ছে। কতদূরে যাচ্ছে। আদরের ছোট মেয়ে। পালকির আশেপাশে পেছনে গাঁয়ের সব লোক। শেষ বিদায় জানাতে এসেছে গাঁয়ের মেয়েকে। তাদের চোখেও জল। পালকির মধ্যে মেয়ের বুকের কাছটাও ভিজে উঠছে, অঝোরে জল পড়ছে।
     গাঁয়ের সীমানায় তারা এল। এর পরেই মেয়েকে ছেড়ে যেতে হবে। দুপাশে উ&চু পাহাড়। পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সরু পথ। হঠাৎ আকাশে দেখা দিল এক টুকরো কালো মেঘ। ঠিক পালকির ওপরে। মায়ের বুক কেঁপে উঠল, এ কি অলক্ষণ। মা কেঁদেই চলেছে। এখন কি হবে? আমরা কি করব?
     মেঘ নেমে আসছে। আস্তে । মেঘ নেমে আসছে। জোরে। আরও জোরে। আরও জোরে। মেঘ নেমে এল পালকির একেবারে কাছে। একটানে ছিনিয়ে নিল নতুন বউকে। বউ দিশেহারা। কিছু ভাববার আগেই মেঘ মেয়েকে নিয়ে পাহাড় ছাড়িয়ে উঠে গেল। আর কিছু দেখা গেল না। না মেঘকে না মেয়েকে।
      মা আছড়ে পড়ল মাটিতে। হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল। মা যেন একটা পাগলি। চিৎকার করে বলল, “আমি মেয়েকে ফিরিয়ে আনবই। যা থাকে কপালে। ভয় করি না কিছুকে ।
     পরের দিন ভোরবেলা মা গাঁ থেকে বেরিয়ে পড়ল। গাঁয়ের মানুষজন মাকে বিদায় জানাল। এই পথেই মেয়ে গতকাল চলেছিল তার নতুন বাড়িতে। মা সে পথেই চলল। পাহাড় ডিঙিয়ে, মাঠ পেরিয়ে মা চলেছে। একটুও বিশ্রাম নেয় নি। মেয়েকে খুঁজে বের করতেই হবে। আহা, তার আদারের রত্ন। সূর্য ডুবে গেল ওই পাহাড়ের ওপারে। আঁধার নেমে এল। এবার তো পথ দেখা যাবে না । রাতে অপেক্ষা করে আবার সকালে পথে বেরোতে হবে। কিন্তু রাতে থাকবে কোথায়?
হঠাৎ অল্প দূরে মা একটা মন্দির দেখতে পেল। চেঁচিয়ে বলল, সারাদিনের পথ চলায় আমি বড় ক্লান্ত । আমাকে হয়তো পাগলির মতো দেখতে লাগছে। কি করব, আমি যে আমার মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়েছি। আমাকে কি এই মন্দিরে আজ রাতের মতো থাকতে দেবে? কাল সকালেই আমি চলে যাব। শুধু আজ রাতটুকু থাকতে চাই।
     মন্দির থেকে বেরিয়ে এল এক পুজারিণী। দেবীর মতো সে দেখতে। শান্ত স্বরে মাকে ডেকে বলল,‘তোমায় থাকতে দিতে পারি। কিন্তু শোবার মতো কিছু নেই, খেতে দেবার মতো কিছু আমার নেই। তুমি থাকতে পার।
     মা মন্দিরে ঢুকল। পা আর চলে না, চোখ আর খুলে রাখা যায় না। মা মেঝেতে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। গভীর ঘুম। পুজারিণী নিজের পোশাক খুলে মাযের দেহের ওপর পেতে দিল। আহা, বড় ক্লান্ত সে।
     পুজারিণী মায়ের পাশে একটু দাঁড়াল। তারপর বলল, আমি জানি তুমি কোথায় চলেছ। তুমি চলেছ তোমার মেয়েকে খুঁজতে। মেয়ে রয়েছে হিংসুটে রাক্ষসের প্রাসাদে। এই সামনের নদী পেরোলেই তার প্রাসাদ। নদীর পাশেই রয়েছে সরু সাঁকো। সাঁকো পেরোলেই রাক্ষসের প্রাসাদের দরজা। দরজা খোলা। কিন্তু সাঁকোর ওপরে পাহারা দিচ্ছে দুটো কুকুর। একটা বড়, একটা ছোট। যে সাঁকোতে পা দেবে তাকেই ছিড়ে ফেলবে। পারবে না যেতে। তবে হাঁ, একটা উপায় আছে। ঠিক দুপুর বেলা অল্পক্ষণের জন্য কুকুর দুটো ঘুমোয়। খুব অল্পক্ষণ। তখন সাঁকোয় উঠতে পারবে। তবু খুব সাবধান। আর এক বিপদ। সাঁকোর ওপরে ছড়ানো রয়েছে গোল গোল পুতি। অনেক পুঁতি। সাবধানে পা ফেলতে হবে। একবার পা ফসকালেই সর্বনাশ। আছাড় খেয়ে নীচে পড়বে, পড়বার শব্দে কুকুর উঠবে জেগে। মৃত্যুফাঁদ। মারাত্মক ওই পথ।
সকালবেলা এক রকমের খসখস আওয়াজে মায়ের ঘুম ভেঙে গেল। মা অবাক হয়ে চেয়ে রইল। মা শুয়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের ওপরে, চারিদিকে নলখাগড়ার বন। কোথায় গেল মন্দির, কোথায় গেল পুজারিণী। সকালের হাওযা লেগে নলখাগড়ার বন কাঁপছে আর তাই থেকে কেমন আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে। হাহাকার....শুধুই হাহাকার। মায়ের মাথার তলায় শুধু রয়েছে পাথরের একটা বালিশ। পাথরটি সুন্দর।
     মা উঠে বসল। আপন মনে বলল, পুজারিণী, তুমি কে তা জানিনা। তুমি আমায় বাঁচিয়েছ। আমি পথ জেনেছি তোমার কাছে। তোমাকে প্রণাম |
      মা এগিয়ে গেল নদীর দিকে। অল্প দূরেই নদী। সাঁতরে পেরিয়ে গেল নদী। ওপারে যেতেই মা সামনেই সাঁকো দেখতে পেল। সাঁকোর ওপরে একেবারে সামনে দুটো কুকুর। একটা বড়, একটা ছোট। সব চিনতে পারল মা। গাছের আড়ালে বসে রইল। ভেজা পোশাক গায়েই শুকিয়ে গেল।
     মা হঠাৎ তাকিয়ে দেখে, কুকুর দুটো ঘুমোচ্ছে। এই তো সুযোগ। কিন্তু মনে পড়ল ছড়ানো পুতির কথা। কুকুরদের ডিঙিয়ে মা চলে গেল। পুতির ওপর দিয়ে চলা বড় কষ্ট। যদি কিছু হয়। মেয়েকে কি দেখতে পাব না? যদি পড়ে যাই! মা পেরিয়ে গেল সাঁকো।
     সাঁকো পেরিয়েই বাগান। সুন্দর বাগান। বাগানে ঢুকেই মা মেয়ের গান শুনতে পেল, তাঁত বুনছে আর গান গাইছে। এ গান মেয়ে গাঁয়ে থাকতে গাইত। তাঁত বোনার সময়। এখনও গাইছে। মায়ের গলা ধরে আসছে। মা ডাকল, “আমার সোনা মেয়ে?
     সঙ্গে সঙ্গে জানলা দিয়ে মেয়ের মুখ দেখা গেল। হাসিতে ভরা মুখ। বাগান দিয়ে দৌড়ে আসছে মেয়ে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। মেয়ে মাকে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল। মায়ের চেহারা দেখে মেয়ে এবার কেঁদে ফেলল। মাকে কিছু খেতে দিল। তারপর বলল, “মা, অল্পক্ষণ পরেই রাক্ষস আসবে। তোমাকে দেখতে পেলেই ভীষণ বিপদ। সর্বনাশ। তোমাকে লুকিয়ে রাখতে হবে।
      মা বলল, “রাক্ষস দেখতে কেমন রে? 
     মেয়ে বলল, “মানুষের চেহারার মতোই। তবে একটু বড়। মাথায় শিং আছে, সামনের দাঁতদুটো বড়। দেহে ভীষণ শক্তি, খুব হিংসুটে। দেহের রঙ নীলচে। আর সময় নেই মা, তুমি এই পাথরের সিন্দুকে ঢুকে পড়ো।
     এমন সময় রাক্ষস ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই সে রাগে ফেটে পড়ল, ‘মনে হচ্ছে ঘরের মধ্যে মানুষ আছে। আমি গন্ধ পাচ্ছি। কোথায় মানুষ?
     মেয়ে বলল, কই, আমি তো কিছুই জানি না। মানুষ কোথায়? আমি জানব কেমন করে?
     রাক্ষস বলল, “ঠিক আছে, বাগানের ফুলগাছ দেখে আমি ঠিক বুঝতে পারব। আমাকে ফাঁকি দেওয়া?
    এখন হয়েছে কি, বাগানে রাক্ষসের একটা জাদু ফুলগাছ ছিল। সেই ঘরে যে কজন থাকবে ফুলগাছেও সেকটা ফুল ফুটে থাকবে। সেই ফুল দেখেই রাক্ষস সব বুঝতে পারবে। বাগানে গিয়ে রাক্ষস দেখতে পেল গাছে তিনটে ফুল রয়েছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে রাক্ষস ফিরে এল ঘরে। কোথায় তুমি আর একজনকে লুকিয়ে রেখেছ? আমি তুমি আর একজন কোথায়? চারিদিকে দেখতে লাগল রাক্ষস। সে ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছে। এই বুঝি মেয়েকে মেরে বসে। রাক্ষস গায়ে হাত তুললে আর রক্ষা নেই। যা বলবান!
     মেয়ে কিছু বলতে পারছে না। মাথায় কিছু আসছে না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আজ বুঝি নিস্তার নেই। হঠাৎ মেয়ের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে হেসে মেয়ে লজ্জা লজ্জা ভাব করে বলল,‘আমার পেটে ছেলে রয়েছে। তাই হয়তো তিনটে ফুল ফুটে রয়েছে। তোমার ছেলে।
     ‘আমার ছেলে?’ আর কিছু বলল না রাক্ষস। সে পালটে গেল। কোথায় গেল তার রাগ, কোথায় গেল হন্বিতম্বি। সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল। মাথা মেঝেতে রেখে পা দুটো ওপরে তুলে দিল। মেঝেতে গড়াগড়ি খেল, সাত পাক ডিগবাজি খেল। কি আনন্দ, কি ফুর্তি।
     ঘরের বাইরে সাঙ্গপাঙ্গদের চিৎকার করে ডাকতে লাগল। 'অনুচর, আমার অনুচর, তোমরা তাড়াতাড়ি এসো। ধেনো মদ নিয়ে এসো। বাজনা বাজাও। আমার ছেলে। ফুর্তি করো। কুকুর দুটোকে মেরে মাংস বানাও। নাচের আয়োজন করো। তাড়াতাড়ি। আমার ছেলে।
     আনন্দে নাচছে রাক্ষস। অনুচরেরাও খুশি, তারাও নাচছে। তারাও চিৎকার করছে, ধেনো আনো, বাজনা বাজাও, কুকুর দুটোকে মেরে ফেলো, বড়টাকে, ছোটটাকে। প্রভুর ছেলে?
     আনন্দে দিশেহারা হয়ে রাক্ষস প্রচুর ধেনো মদ খেল। আর ঠিক থাকা যাচ্ছে না। দেহ অবশ হয়ে আসছে, চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠেছে। রাক্ষস ঘুমিয়ে পড়ছে।
     বউকে জিজ্ঞেস করল, বউ, আমার খুব ঘুম পেয়েছে। আমার শোবার কাঠের সিন্দুক কোথায়? আর পারছি না।
বউ একথা শুনে মনে মনে শান্তি পেল। কিন্তু সে ভাব সে প্রকাশ করল না। খুব আদর করে রাক্ষসকে ধরল, আস্তে আস্তে সিন্দুকের কাছে নিয়ে গেল, যত্ন করে তাকে শুইয়ে দিল। তারপর পর পর সাতটা ডালা বন্ধ করল, সাতটা ডালাতেই একে একে তালা লাগাল। রাক্ষস এখন অনেক ভেতরে, গভীর ঘুমে ঢলে পড়ছে।
     মেয়ে তাড়াতাড়ি মায়ের পাথরের সিন্দুক খুলে ফেলল। মা জেগেই ছিল। দুজনে পালাল রাক্ষসের বাগান পেরিয়ে। বড় কুকুর, ছোট কুকুর টুকরো টুকরো হয়ে রাক্ষসের পেটে রয়েছে, তাই ভয়ের কিছু নেই। তারা অনেকটা নিশ্চিত্ত। তারা তাড়াতাড়ি রাক্ষসের সেই বিরাট ঘরে ঢুকে পড়ল। সেখানে রয়েছে প্রকাণ্ড রথ, মাঝারি রথ, ছোট রথ, ছোট জাহাজ, বড় জাহাজ। কোনটা নিলে আমরা খুব তাড়াতাড়ি পালাতে পারব? মা-মেয়ে ঠিক করতে পারছে না। এদিকে সময় নষ্ট করা চলবে না। এমন সময় ঘরে দেখা দিল সেই পুজারিণী। সে বলল, রথে তেমন জোরে যাওয়া যাবে না। তোমরা ছোট জাহাজ নাও। নদীর জলে তিরবেগে ছুটবে ছোট জাহাজ। দেরি করে লাভ নেই।
     মা-মেয়ে জাহাজে চড়ল। জাহাজ বয়ে চলেছে তিরের গতিতে। নদীতে অনেক জল। হাওয়ায় ভেসে চলেছে জাহাজ। মা-মেয়ের মুখে হাসি।
     রাক্ষস হঠাৎ জেগে উঠল। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছে, বুক হাইফাই করছে। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। চিৎকার করে বলল, “বউ, তেষ্টা পেয়েছে, বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে, এক্ষুনি জল দাও। জল দাও।
     অনেক বার ডাকল রাক্ষস । কে শোনে কার কথা। বউ তো সাড়া দিচ্ছে না। তবে কি.. ? প্রচণ্ড শব্দে কাঠের সিন্দুকের সাতটা ডালা ভেঙে গেল। রাক্ষস বেরিয়ে এল। ঘরে নেই কেউ। তবে কি... ? এ ঘরে ও ঘরে খুঁজল। কোথাও নেই কেউ। তাহলে...? মানুষের মেয়ে পালিয়েছে? শয়তান কুকুর। হুংকার দিল রাক্ষস। দুঃখে-রাগে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। অনুচরেরা নেশার ঘোরে এখানে ওখানে পড়ে ছিল। লাথি মেরে রাক্ষস তাদের জাগিয়ে দিল। প্রভুর হুংকারে তাদের নেশা ছুটে গেল। রাক্ষস ছুটে গেল বিরাট ঘরে। দেখল, একটা ছোট জাহাজ নেই। ছুটে গেল নদীর পারে । বহুদূরে দেখতে পেল, জাহাজ চলেছে। প্রায় অদৃশ্য হয়ে এসেছে জাহাজ। তাহলে?
     অনুচরেরা রাক্ষসের পেছনে। রাক্ষস বলল, ‘হাটু জলে নেমে পড়। নদীর সব জল গিলে ফেলো। দেরি নয়।
    অনুচরেরা কাজে লেগে গেল। সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছে, চোঁ চোঁ জল গিলছে তারা। মা-মেয়ে দেখল, জাহাজ হঠাৎ থেমে গেল। জাহাজ আর সামনে যাচ্ছে না, পেছনে চলেছে। আস্তে, জোরে, আরও জোরে, তিরের গতিতে জাহাজ চলেছে রাক্ষসের প্রাসাদের দিকে। এ কি হল? এ কি হল? তাদের মুখ শুকিয়ে গেল, বুক কাঁপছে। মা আছড়ে পড়ল কাঠের পাটাতনের ওপর।
     অল্পক্ষণ পরেই রাক্ষস তাদের ধরে ফেলবে। আর তারপর? মা-মেয়ে সব আশা ছেড়ে দিল। উদাস চোখে চেয়ে রইল। দুপারের পাহাড় গাছ পেছনে সরে সরে যাচ্ছে।
      এমন সময় জাহাজে দেখা দিল সেই পূজারিণী। সুন্দর পবিত্র বেশে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। "তোমরা দুজনে শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছ? এখুনি রাক্ষসের হাতে গিয়ে পড়বে।
     কি করবে তারা? কিছুই বুঝতে পারছে না। পূজারিণী বলল, “তোমরা কি জান না রাক্ষসরা সবচেয়ে পবিত্র জিনিস দেখলে হাসতে থাকে? পবিত্র জিনিস দেখাও। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জিনিস মেয়েদেরই আছে। তা হল তাদের দুটি বুক। শিশু মানুষ হয় বুকের দুধ খেয়েই। খুলে ফেল তোমাদের বুকের আবরণ।
     মা ও মেয়ে তাদের বুকের কাপড় খুলে ফেলল। পূজারিণী খুলে দিল নিজের বুকের কাপড়। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ছ’টি বুক।
     তাদের দিকে চোখ পড়তেই রাক্ষসেরা হাসতে লাগল। খুব স্পষ্ট সবকিছু দেখা যাচ্ছে। কেননা, জাহাজ খুব কাছে। তারা দেখছে আর হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। গড়িয়ে পড়ছে আর মুখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে। যেমন করে পাহাড় থেকে ঝরনা নামে। জাহাজ থেমে গেল। জাহাজ চলতে শুরু করল। এবার অন্যদিকে। রাক্ষসের প্রাসাদ থেকে দূরের পথে। বুক খোলাই রয়েছে। রাক্ষসেরা হাসছেই। ওরা কি পাগল হয়ে গিয়েছে? একবার সোজা হচ্ছে, আবার হাসির দমকে দেহ বেঁকে যাচ্ছে। নদীর জল বেড়ে যাচ্ছে, তাতে স্রোত এল, জাহাজ চলল দূরে, বহু দূরে। রাক্ষসের প্রাসাদ আর দেখা যাচ্ছে না। আঃ কি শান্তি ।
     মা-মেয়ে বারবার নত হয়ে পূজারিণীকে প্রণাম জানাল। পূজারিণী, তুমি না থাকলে আমরা এই বিপদ থেকে বাঁচতাম না। তুমি প্রথম থেকে কত উপকারই না করলে। তোমাকে প্রণাম |
     পূজারিণী মধুর হেসে বলল, “আমি পূজারিণী নই। আসলে আমি হলাম পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। যে স্মৃতিস্তম্ভে মাথা রেখে তুমি মন্দিরে ঘুমিয়েছিলে। স্মৃতিই তো সব। তার প্রতীক আমি পাথরের রূপে থাকতে ভালোবাসি। আমি খুব খুশি হব, প্রতি বছর যদি তুমি একটা করে পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি কর। সেই পাথরটার পাশে রাখবে। প্রতি বছর একটা করে। এতেই আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ। স্মৃতিই সব। সাদা মেঘের মধ্যে মিলিয়ে গেল পবিত্র পূজারিণী।
     মা-মেয়ে বাড়িতে ফিরে এল। পথে আর কোন বিপদ ঘটেনি। গাঁয়ের সবাই খুব খুশি।
    মা-মেয়ে পূজারিণীর কথা ভোলেনি, সারা জীবন ধরে তারা প্রতিশ্রুতি রেখেছে। প্রতি বছর পূজারিণীর নামে একটি করে পাথরের স্মৃতি তৈরি করেছে। কখনও ভোলেনি। তাই তো আমাদের এই সুন্দর দেশ জুড়ে কত পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতি-ঘেরা পাথরই ছিল পূজারিণীর সবচেয়ে প্রিয়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য