আদাপা আর দখিনা বাতাস - আদিবাসী লোককথা

       এক যে ছিল কিশোর। তার নাম আদাপা। একদিন ভোরবেলায় সে গিয়েছে মাছ ধরতে। কি শান্ত সমুদ্র। তিরতির করে তার ছোট নৌকো ভেসে চলেছে। এমন শান্ত সমুদ্র সে অনেক কাল দেখেনি। আজ মাছ ধরা অনেক সহজ। আজ অনেক মাছ ধরা পড়বে। কিশোর আদাপা খুব খুশি।
       বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ঝড়ের বেগে দখিনা বাতাস বয়ে গেল। কিছু বোঝার অগেই পাল হেলে পড়ল জলে, নৌকো কাত হয়ে উলটে পড়ল। আর কিশোর ছিটকে পড়ল নোনা জলে। একটু হাবুডুবু খেয়েই সে সাঁতার কাটতে লাগল। বেশ কষ্ট করে তীরে পৌছল। বালিতে বসে হাঁপাতে লাগল।
       ভেজা দেহে ভেজা চোখে চেয়ে রইল জলের দিকে। উলটে-যাওয়া নৌকো অল্প অল্প দুলছে। আরও দূরে সরে যাচ্ছে। আদাপার কান্না পেল। আর তখন দখিনা বাতাস তার কানের চারপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে বইছে আর হাহা করে হাসছে। চারপাশে হাসি আর মনের মধ্যে কান্না | চাপা কান্না।
       হঠাৎ আদাপা লাফ দিয়ে দাড়িয়ে পড়ল। রাগে লাল হয়ে চিৎকার করে বলল, শয়তান কোথাকার! তোমায় যদি দেখতে পেতাম তবে ডানাদুটো দুমড়ে ভেঙে দিতাম।পাজি শয়তান!
       হাঃ হাঃ হাসির শব্দ হল। দখিনা বাতাস দেখা দিল। তার দেহ দাড়িয়ে রয়েছে আদাপার সামনে। দখিনা বাতাস এখন আর না-দেখা বাতাস নয়। বিরাট দানবী। অর্ধেক নারী, অর্ধেক পাখি। আদাপা তার কাছে ছোট্ট শিশু। কিন্তু সে ভয় পেল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ঝাঁপিয়ে পড়ল দানবীব ওপর। জড়িয়ে ধরল তাকে, কিছু বুঝবার আগেই তার ডানা দুটো দুমড়ে ভেঙে দিল।
       হঠাৎ দানবী দখিনা বাতাস উবে গেল, হাওয়ায় মিলেয়ে গেল। এখন আর তাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু হাওয়ার আর্তনাদ ভেসে আসছে। বালুতীরে কিছু গড়াগড়ির শব্দ হচ্ছে—মনে হচ্ছে ভাঙা ডানা ঝাপটাচ্ছে কেউ। গুমরে গুমরে কাঁদছে সে, সে কান্না হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। আদাপা দাঁড়িয়ে রয়েছে বীরের মতো। এখন মজা বুঝুক, নৌকো উলটে দেবার মজা বুঝুক। শয়তান কোথাকার!
       দিন বয়ে যায়। রাত বয়ে যায়। এদিকে হয়েছে কি, দখিনা বাতাস ফিরছে না। দেবতাদের রাজা আনু বসে রয়েছেন স্বর্ণ সিংহাসনে। প্রাসাদের মস্ত ঘরে তিনি বসে রয়েছেন। সব জানালা রয়েছে খোলা তবু দখিনা বাতাস তার প্রভুর কাছে ফিরে এল না। অনেক সময় বয়ে গেল। সাগরজলে জাহাজ চলেছে শান্তভাবে, খেতের ফসল পাকা সোনার রং ছড়িয়ে নুয়ে পড়েছে মাটিতে, শুকনো মাটি রোদের আগুনে ঝলসে গেল,—তবু দখিনা বাতাস বইল না। বর্ষার কালো মেঘ উড়ে এল না—দখিনা বাতাস বইছে না যে। দেবরাজ আনু অস্থির হয়ে উঠলেন। এ কি হল? এমন তো কখনও হয় নি?
       শেষকালে দেবরাজ তার এক দূতকে পৃথিবীতে পাঠালেন। সে খুঁজছে দখিনা বাতাসকে। পাওয়া গেল তাকে। কিন্তু হায়, এ কি দশা তার! কি করুণ অবস্থা ! স্বর্গের দখিনা বাতাস বালুতীরে কাঁদছে আর গড়াগড়ি দিচ্ছে। দূত তাকে তুলে নিয়ে দেবরাজের কাছে উড়ে গেল।
       দেবরাজ তার ভূত্যের এই দশা দেখে রাগে জ্বলে উঠলেন। পড়ন্ত বিকেলের রক্তরাঙা সূর্যের মতো রেগে লাল হয়ে উঠলেন। দেহ কাঁপছে, চোখ জ্বলছে।
       বাজ পড়ার শব্দ হল। আনু আদেশ দিলেন, "যে মানুষ আমার ভূত্যের এই দশা করেছে, তাকে নিয়ে এসো। এখুনি।
রাতের অন্ধকার। ঘুমিয়ে রয়েছে আদাপা। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় আদাপার ঘুম ভেঙে গেল। আলোয় চোখ সয়ে এলে আদাপা দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক আলোকিত দেহ, তার ডানাদুটো অল্প অল্প কাঁপছে।
       আলোকিত দূত বলল, “দেবরাজ আনু তোমাকে ডেকেছেন। তোমায় যেতে হবে তার বিচারসভায়। তুমিই সেই মানুষ যে দখিনা বাতাসের ডানাদুটো দুমড়ে ভেঙে দিয়েছ।
       বাছারা, আজকে আমি তোমাদের বলতে পারর না, কেমন করে আদাপা দেবরাজের বিচারসভায় গিয়েছিল। দূত তাকে পথ বলে দিয়েছিল কিনা তাও আমি জানি না। আমার মনে হয়, সমুদ্রের যে পথ দিয়ে সূর্য আকাশে ওঠে, সে পথ দিয়েও আদাপা যেতে পারে। কিংবা ওই দূর পাহাড়ের কোলে হয়তো কোন রথ ছিল, সে রথেও সে যেতে পারে। আমি ঠিক জানি না।
       আলোকিত দূত অদৃশ্য হল। আদাপা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। বাবাকে জাগিয়ে তুলে আদাপা বলল, “বাবা, সব শেষ হয়ে গেল। আর আমাদের আনন্দের দিন ফিরে আসবে না। জাল নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরা হবে না, তোমার সঙ্গে আর নৌকোয় যেতে পারব না। ঘন বনের ছায়ায় ছায়ায় তোমার হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে পারব না। সব শেষ। দেবরাজ আনু ভীষণ রেগে গিয়েছেন। আমি নাকি মস্ত অপরাধ করেছি। তিনি আমাকে তার বিচারসভায় ডেকেছেন। আমার বিচার হবে।
       বাবার বুক কেঁপে উঠল। তার যে আর কেউ নেই! আদাপাই তার সব। চোখের কোল ভিজে উঠল। তবু শক্ত মনে বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, "বাছা, দেবরাজ যখন ডেকেছেন, তখন যেতেই হবে। শোকের পোশাক পরে তুমি যাবে। বিনয়ী হয়ে কথা কইবে। উদ্ধত হবে না। আবার অকারণে মাথাও নত করবে না। মধুর কথায় তার কাছে ক্ষমা চাইবে। কেন তুমি ডানা ভেঙেছ তাও জানাবে। দেবরাজ যদি তোমায় ক্ষমা করেন, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে আমাদের এই পৃথিবীতে। হ্যাঁ, আর একটা কথা। স্বর্গের কোন খাবার খাবে না, কোন পানীয় স্পর্শ করবে না। পৃথিবীকে যদি ভুলতে না চাও, তবে এই নিষেধের কথা মনে রেখো। পৃথিবী বড় সুন্দর।
       অল্পক্ষণ তাকিয়ে রইল বাবার মুখের দিকে, তারপরে আদাপা রওনা দিল। এক আশ্চর্য উপায়ে আদাপা স্বর্গের পথ পেয়ে গেল। পৌঁছে গেল মেঘের রাজ্যে। মেঘরাজ্যে দেবরাজের বিচারসভা। বিচারসভার ঘরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন দৈত্য। তাদের দেহের দুপাশে বিশাল ডানা। মাথা নামিয়ে আদাপা তাদের অভিবাদন জানাল। বড় বিনয়ী মানুষ। তারা পথ ছেড়ে দিল।
       বিচারসভার ঐশ্চৰ্য দেখে আদাপার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিন্তু সে ঐশ্চৰ্যও ম্লান হয়ে পড়েছে দেবতাদের কাছে। অমর দেবতারা বসে রয়েছেন, তাদের পোশাক আকাশের তারায় খচিত। অপরূপ সুন্দর দেবতারা। মাঝখানে রয়েছেন দেবরাজ। সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল তিনি, চারিদিকে আভা। আদাপা হাঁটু ভেঙে বসে দেবরাজ ও দেবতাদের প্রণাম জানাল। আলোর ছটায় চোখ খুলে রাখা যায় না।
       বাজ পড়ার শব্দ হল। দেবরাজ বললেন, "মানুষ হয়ে এত সাহস কোথায় পেলে? আমার ভূত্যের ডানা ভেঙেছ? কোথায় পেলে এই সাহস?
       আদাপা ভয় পেল না। কথা জড়িয়ে গেল না। বিনয়ী হয়ে মিষ্টি সুরে বলল, 'হে দেবরাজ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। দখিনা বাতাস আমার নৌকো উলটে দিয়েছিল। আমি মাছ ধরছিলাম। মাছ না ধরলে আমরা অনাহারে থাকব। হঠাৎ রেগে গেলাম, তার ডানাদুটো দুমড়ে ভেঙে দিলাম। হ্যাঁ, আমিই ভেঙেছি। কিন্তু সত্যি বলছি, দখিনা বাতাস যে আপনার ভৃত্য রাগের মাথায় আমি সে কথা ভুলে গিয়েছিলাম। রাগ মানুষকে সব ভুলিয়ে দেয়। সেই ভুলে আমি স্বৰ্গরাজ্যের বাসিন্দার গায়ে হাত তুলেছিলাম। আমি অনুতপ্ত, আমায় ক্ষমা করুন।
       তাকিয়ে রয়েছে আদাপা। চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার সুন্দর মুখখানি। না, সে ভয় পায় নি। না, সে উদ্ধত হয়নি। না, মাথা নত করেনি।
       দেবতারা বলে উঠলেন, ‘ছোট্ট মানুষটি সত্যিই অনুতপ্ত। সে অপরাধ করেছে, অপরাধ বুঝে স্বীকার করেছে। সে অনুতপ্ত।
       দেবরাজ কথা বললেন। বাজ পড়ার শব্দ হল না। মধুর সংগীত ভেসে এল, “ছোট্ট মানুষ, তোমায় ভালো লেগেছে। তুমি অনুতপ্ত। তুমি ক্ষমা চেয়েছ। তোমায় ক্ষমা করলাম। কিন্তু তুমি আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে না। স্বৰ্গরাজ্যে যা দেখে গেলে, পৃথিবীর মানুষকে তা জানাতে দেব না। এটাই নিয়ম। আজ থেকে তুমি স্বৰ্গরাজ্যের বাসিন্দা হবে। আমাদের সঙ্গে থাকবে। চিরকালের জন্য অমর হয়ে রইবে তুমি। পৃথিবীর মানুষের মতো মৃত্যু তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না। স্বর্গীয় সুরা পান করে অমরত্ব লাভ করো। দূত, ওকে সুরার পাত্র এগিয়ে দাও ।
       মেঘের আড়াল থেকে দূত এগিয়ে আসছে। আলোকিত দূতের হাতে সুরার পাত্র। স্বর্গীয় সুরা। বাবার মুখ ভেসে উঠল। দূত আরও এগিয়ে আসছে। আরও কাছে। সুরার পাত্রে বাবার মুখ ভেসে উঠছে। আদাপা দেবরাজের পায়ের নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাতরভাবে বলে উঠল, ওগো দেবরাজ, তুমি রেগে যেয়ো না, তুমি আমায় ক্ষমা করো। তোমার তুচ্ছ সৃষ্টিকে দয়া করো। আমি তোমার স্বর্গীয় সুরা পান করতে পারব না। কিছুতেই পারব না।
       বাজ পড়ার শব্দ হল। প্রতিধ্বনি তুলে সে শব্দ শতগুণ হয়ে আছড়ে পড়ল। আগুনের মতো রাঙা হয়ে দেবরাজ বললেন, “আমার দেওয়া প্রসাদ তুমি ফিরিয়ে দিলে? স্বগীয়,সুরা পান করতে অস্বীকার করলে? বুঝেছি তুমি ভেবেছ আমি তোমায় বিষ পান করতে দিয়েছি। এ সুরা পান করলে তুমি বুঝি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। তাই না? হতচ্ছাড়া খুদে মানুষ কোথাকার! মনে শুধুই বদ বুদ্ধি। আমি তোমায় দেবতার আসনে বসাতে চেয়েছিলাম। অমরত্বের স্বাদ পেতে আহ্বান জানিয়েছিলাম। সহ্য হল না | বাজের শব্দ থেমে গেল।
       মাথা নত করে আদাপা বলে গেল, ‘ওগো দেবরাজ, তা নয়। আমি ভুল বুঝিনি।
      তুমি সত্যের পিতা, সত্যকে জানো। আমি তো ভাবিনি। আমি করুণার দানকে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু দেবরাজ, আমি যে তার উপযুক্ত পাত্র নই। আমি সামান্য মানুষ। তোমার বিচারসভায় আসবার আগে আমি বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যদি তুমি আমায় ক্ষমা করো, তবে আমি তাড়াতাড়ি বাবার কাছে ফিরে যাব। তুমি ক্ষমা করেছ, তাই আমি ফিরতে চাই। বাবা বলেছে, পৃথিবী বড় সুন্দর। তুমি ফিরে যেতে আদেশ দাও। আদাপা করুণ চোখে চেয়ে রইল দেবরাজের মুখের দিকে।
       দেবরাজের রাগ মিলিয়ে গেল। অদ্ভুত হাসি ফুটল মুখে। ‘পৃথিবী বড় সুন্দর! ফিরে যেতে চাও সেখানে? বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছ? অমরত্ব চাও না? বেশ তাই হবে। ফিরে যাও পৃথিবীতে। সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম, দুঃখ-কষ্ট, রোগজ্জ্বালা, বার্ধক্যে নুয়ে পড়া, কান্না আর ভয়াবহ মৃত্যু। এই তো মানুষের ভাগ্য। এ যদি তোমার ভালো লাগে, ফিরে যাও তোমার সুন্দর পৃথিবীতে।
       আদাপার মুখে হাসি। সবাইকে প্রণাম জানিয়ে আদাপা পৃথিবীর পথে রওনা দিল। হাঁ, আদাপা পৃথিবীতে ফিরে এল। সে অমরত্ব চায় নি। সে দেবরাজের ভিক্ষা মাথা পেতে নেয়নি, তার প্রসাদ ফিরিয়ে দিয়ে বাবার আদেশ মাথা পেতে নিয়েছে। দেবরাজের চেয়েও আদাপার কাছে তার বাবা অনেক বড়। অমর হয়ে দেবলোকে শান্তিতে সে থাকতে চায় নি। সে মেনে নিয়েছে মানুষের সহজ আনন্দকে, মানুষের দুঃখ-কষ্টকে—সব মানুষ যেভাবে বাঁচবে মরবে, সে-ও সেভাবেই থাকবে। অনেক কষ্ট জীবনে, তবু পৃথিবী বড় সুন্দর। আদাপার পৃথিবী, মানুষের পৃথিবী।

ডাউনলোড PDF : ডাউনলোড

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য