পঞ্চতন্ত্র : গাধা ও কুকুর

     অনেকদিন আগে কর্পূর নামে এক ধোপা ছিল। ওর ছিল একটা গাধা আর একটা কুকুর ; কুকুরটা বাড়ি পাহারা দিত, আর গাধা ধোপার কাপড়ের মোট বইত। দুজনের মধ্যে বেশ ভাব ছিল।
     একদিন ধোপার বাড়িতে চোর এল; ধোপা তো ঘুমে অচেতন উঠানের এক কোণে খুঁটিতে বাধা গাধাটা তখনও ঘুমায়নি। কুকুরও বসে আছে ওর পাশে। চোর দেখে গাধা স্থির থাকতে পারল না। লাফিয়ে উঠল। কিন্তু কুকুর টু শব্দ পর্যন্ত করল না। গাধা কুকুরের এ রকম আচরণ দেখে খুবই অবাক হয়ে গেল। মনে মনে ভীষণ রেগে গেল। সে মোটা গলায় কুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, মনিবের বাড়িতে চোর এসেছে। তোমার উচিত চিৎকার করে মনিবকে জাগিয়ে দেওয়া। তা না করে চুপ করে আছ কেন?
     কুকুর গাধার উপদেশ শুনে বলল, তোমার কাজ তুমি করগে? আমার কাজের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। নিজের চড়কায় তেল দাও।
      গাধা রেগেমেগে লাল ! বলল, কি, তোমার ব্যাপারে মাথা গলাব না? মনিব তোমায় রেখেছে বাড়িতে যাতে চোর না আসে তার জন্য, আর তুমি মনিবের খেয়েপরে তারই সাথে বেইমানি করছ? তুমি চোর দেখেও চিৎকার করবে না? আর আমাকেও চুপ করে থাকতে বলবে?
     কুকুর চেঁচিয়ে বলল, হ্যাঁ, তুমি চুপ করেই থাকবে। তুমি কি জান না যে দিনরাত আমি মনিবের বাড়ি পাহাড়া দিই। তাতে আমার কি কোন লাভ হয়েছে? বরং মনিব পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে আছেন। একবার ফিরেও দেখেন না আমার দিকে। বরং ভাবেন কুকুরটা পাহারা দেবেই। এটা তার দায়িত্ব। তাই আদরও করেন না। বিপদের সম্ভাবনা থাকলে ঠিক খাতিরযত্ন করত। ভালমন্দ খেতে দিত। এগুলো কি আমি মিথ্যে বলছি?
     কুকুরের কথা শুনে গাধা রেগে বলল, বোকা তুমি। যে চাকর মনিবের বিপদের সময় অর্থ চায়, সে কি রকম চাকর?
     গাধার কথা শুনে কুকুর আরো চটে গেল। একচেট ঘেউঘেউ করে বলল, কি সব বলছ তুমি? আর যে মনিব কাজের সময় চাকরকে আদরযত্ন করেন না, তিনিই-বা কেমন মনিব শুনি?
     গাধা কুকুরের কথায় খুব ছিছি করে বলল, মনিবের বিপদের সময় কাজে অবহেলা করা অন্যায়। যাক, তুমি যখন নিজের কাজ করছই না, তখন আমাকেই মনিবকে জাগাতে হবে। এই বলে গাধা হাম্বা হাম্বা করে চিৎকার দিতে শুরু করল।
      গাধার এই বিকট চিৎকার শুনে চোর তো দে ছুট। আর ধোপারও ঘুম ভেঙে গেল। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল কি হয়েছে দেখতে।
     গাধা মনিবকে দেখে তো আনন্দে 'হাম্বা হাম্বা’ করে আরও জোরে চেঁচাতে লাগল। অসময়ে গাধার এই চিৎকার শুনে ধোপা তো খুব রেগে গেল। বেশ ঘুমচ্ছিল, ওর চিৎকারের জন্যই উঠে পড়তে হল। ভাবল, গাধাটা পাগল হয়ে গেছে। ধোপার মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। ব্যস, ধোপা একটা মোটা লাঠি এনে গাধাকে খুব জোরে জোরে পেটতে লাগল আর বলতে লাগল—পাজি কোথাকার রাত-দুপুরে তোমার কি আনন্দ হয়েছে যে চিৎকার করে আমার ঘুমের বারটা বাজিয়ে দিলে! দাঁড়াও, তোমায় মজা দেখাচ্ছি।
      বেচারা গাধা মনিবের ভাল করতে গিয়ে এমন ঠ্যাঙানি খেল যে কি বলব? 
     করট বলল, তাই বলছি—কি দরকার পরাধিকার চর্চার? আমাদের খাবার তো আছেই, তাই অন্যের ব্যাপারে নাক না গলানোই ভাল।
      করটের কথায় দমন ছি ছি করে উঠে বলল, তুমি কি শুধু খাবারের জন্য মনিবের সেবা কর? এ তো অন্যায় কথা!
মানুষের জীবনে উন্নতি অবনতি নিজের উপরই নির্ভর করে। যেমন মানুষ তার নিজের কর্ম অনুযায়ী কূয়া খননকারীর মতো ক্রমশ নিচের দিকে যায়, আবার কর্ম অনুযায়ীই প্রাচীর নির্মাণকারীর মতো উপরের দিকে ওঠে।
     করট বলল, তাহলে দমন তোমার কি মত শুনি? দমন বলল, বলার কি আছে? জল খেতে গিয়ে প্রভু ভয় পেয়েছেন, তাই হয়তো চুপটি করে আছেন।
     করট শুনে বলল, কি করে বুঝলে? দমন বলল, না বোঝার কি আছে? বুদ্ধিমান মানুষের কাছে বোঝার কি বাকি থাকে শুনি? কথায় আছে, যেখানে বায়ু এবং সূর্যরশ্মি প্রবেশ করে না সেখানেও পণ্ডিতের বুদ্ধি প্রবেশ করতে পারে। এ তে মানুষের কথা বলছি। এমনকি পশুরাও বুঝতে পারে যে চালকের আদেশেই ঘোড়া তার ভার বহন করে।
     করট সব শুনে বলল, হ্যাঁ, সবই বুঝলাম। তবে তুমি সেবাকাজে অনভিজ্ঞ। 
     দমন বলল, কেন? সেবাকাজে আমার অভিজ্ঞতা নেই বলছো কেন? 
     করট একটু হেসে বলল, অসময়ে তুমি মনিবের কাছে গেলে তিনি তোমাকে গালাগালি করবেন।
     দমন রাগত গলায় বলে ওঠে, তা করুক। তবুও আমি মনিবের কাছে যাব। এটা আমার কর্তব্য। তুমি যাই বল না কেন ভাই আমি মনিবের কাছে যাবই।
     করট বলল, তা গিয়ে কি বললে শুনি? 
     কি আর বলব? তবে প্রথমে দেখব মনিব আমার উপর বিরক্ত না অনুরক্ত।
     কি করে বুঝবে? আমাকে ভাই একটু বুঝিয়ে বল না। 
    দমন বলল, সহজেই বোঝা যায়। দূর থেকে দেখে হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করা, আদর প্রকাশ করা, অসাক্ষাতে গুণের প্রশংসা করা, তার সেবকদের প্রতি হৃদয়ের টান দেখানো, দান করা, সন্তোষ বর্ধন করা, দোষ করলেও গুণ গ্রহণ করা—এগুলোই হচ্ছে ভৃত্যের প্রতি অনুরক্তির লক্ষণ। আর কালক্ষেপণ করা, আশা বাড়িয়ে দেওয়া, প্রাপ্য বস্তু না দেওয়া, বুদ্ধিমান মানুষ এগুলি বিরক্তির চিহ্ন বলেই ধরে নেন।
     করট এই কথাগুলো শোনার পর বলল, তবুও প্রসঙ্গ উত্থাপন না করলে তোমার কিছু বলা উচিত নয়। প্রসঙ্গ উঠলেই তোমার বলা উচিত।
      দমন বলল-—না না, সে ব্যাপারে তোমার কোনো ভয় নেই। আমি কোনো অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলব না। উপযুক্ত সময়েও যদি মনিবকে কিছু বুদ্ধি না দিতে পারি তাহলে মন্ত্রিপদে থাকার কি প্রয়োজন? তা এখন আমি যাচ্ছি ভাই।
      করট কি আর করবে, এত বলেও বন্ধুকে থামাতে পারল না। তাই বলল, ঠিক আছে, যাও । তবে আমার মতে না যাওয়াই তোমার ভাল ছিল।
     দমন তো সিংহরাজের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ওকে দেখে সিংহ বেশ খুশিই হল। বলল, আরে দমন যে, কি খবর? কি মনে করে? এসো, এসো।
     দমন কিন্তু কিন্তু করে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছি। যদিও আমি ভৃত্য, আমার মতো ভূত্যের আপনার প্রয়োজন নেই। তবুও ভাবছি আপনার বিপদের সময় আমার আসা উচিত। এ আমার কর্তব্য।
      এই শুনে সিংহ বলল, হুম, আমিও ভাবছিলাম বহুদিন আসনি। নিশচয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা নিয়ে এসেছ। তা হলে বল তোমার কি কথা, নিৰ্ভয়ে বল।
      দমন বলল, দেখলাম আপনি জল খেতে হ্রদে গিয়ে জল না খেয়েই দৌড়ে এসেছেন। তারপর থেকে লুকিয়ে আছেন, তাই ভাবলাম হয়তো আপনি কোনো বিপদে পড়েছেন।
     সিংহরাজ তখনও ভয়ে কাঁপছে। দমনের কথায় ওর ধড়ে প্রাণ এল ; বলল, তা তুমি ঠিকই ধরেছ তুমি হচ্ছ মন্ত্রিপুত্র আর একজন মন্ত্রীও বটে। তবে তোমাকে বলতে বাধা নেই, সত্যিই আমি ভয় পেয়েছি।
      মনিবের কথায় দমন বলে ওঠে, সেকি! সত্যিই আপনি ভয় পেয়েছেন? 
      দমনের কথায় সিংহ বলে উঠল, না না, তুমি বুঝতে পারছ না; জল খেতে গিয়ে শুনলাম সেই প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর গর্জন। যার গর্জন এমন সে নিশ্চয়ই খুব ভয়ঙ্কর কোনো জানোয়ার; মনে হয় তুমিও সেই গর্জন শুনেছ। ভাবছি এখান থেকে চলে যাব।
      সিংহের কথা শুনে তো দমন মনে মনে হেসেই খুন। মনের হাসি চেপে বলল, শুনেছি। তবে আমার মনে হয় এভাবে চলে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। কারণটা আগে জানা দরকার। কারণ না জেনে কখনো ভয় পাওয়া উচিত নয়। আমি আর করট তাহলে কারণ জানার চেষ্টা করি?
     সিংহ করটের কথা শুনে বলে ওঠে, করট? সে আবার কে? দমন বলল, সেকি আপনি জানেন না? করট হচ্ছে আপনার আর এক মন্ত্রী। একসঙ্গেই কাজ করি আমরা। আমি এখনই ওকে গিয়ে ডেকে আনছি। এই বলে দমন ছুটে গিয়ে করটকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে হাজির করল সিংহরাজের সামনে।
      সিংহ ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, তা পারবে তোমরা কারণটা বার করতে? 
      দমন বলল, নিশ্চয়ই পারব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আর যদি না পারি তখন না হয় আমরা চলে যাব।
     সিংহরাজ দমনের কথা শুনে খুব খুশি হল। বলল, তোমরা যদি কারণটা খুঁজে বার করতে পার, তা হলে তোমাদের পুরস্কার দেব। এই বলে সিংহ ওদের দুজনকেই আগাম কিছু বকশিশ দিয়ে বিদায় করল।
     করট কিন্তু দমনের এই ব্যবহার মোটেই ভাল চোখে দেখল না। বলল, দমন, তুমি কি সত্যিই পারবে? পারবে কি পারবে না এটা আগের থেকে না জেনেই পারবে বলে চলে এলে! এটা কি ভাল কাজ হল? তা ছাড়া আগের থেকে এতগুলো পুরস্কার নেওয়া তোমার উচিত হয়নি।
      দমন করটের কথা শুনে চুপ করে রইল। মনে মনে একটু হাসল। বলল, বন্ধু, অত ভাবছ কেন? তুমি শুধু চুপ করে বসে দেখ আমি কি কাণ্ড করছি। আমি সব পারব। কারণ, আমরা তো জানি ওটা একটা বলদের গর্জন। বলদ তো
আমরা খাই। কি বল, খাই না? বলদের গর্জন সিংহরাজ চেনেন না বলেই অত ভয় পেয়েছেন। তাই ভাবছেন সেটা না-জালি কত ভয়ঙ্কর হবে!
      করট বন্ধু দমনের কথা শুনে বলল, তা তুমি বলে দিলে না কেন? বলে দিলেই তো সব পরিষ্কার হয়ে যেত।
     দমন বন্ধুর কথায় একচোট হেসে বলল, সত্যিই তুমি নিৰ্ঘাৎ বোকা। বলে যদি দিতাম তাহলে কি এতগুলো পুরস্কার পেতাম? কথায় আছে—মনিবকে কখনও প্রয়োজনবোধশূন্য করবে না, তাহলে দধি নামক বিড়ালের মত বিপদে পড়তে হবে।
      করট মুখে বলল, দমন, তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান। তা এবার বল দধি বিড়ালের কি ঘটনা হয়েছিল।
      দমন দধি বিড়ালের গল্প বলতে শুরু করল।

পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলো একটি আর একটি গল্পের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফলে প্রথম থেকে না পড়লে কিছুই বোঝা যাবে না। গল্পগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে চাইলে গল্পের তালিকা ব্যবহার করো।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য