জোনাকি - আদিবাসী লোককথা

     ভুলে-যাওয়া সেই কালে এক যে ছিল গরিব চাষি। খুব সুখের সংসার। কষ্ট আছে কিন্তু তারা সুখি। সেই চাষির ছিল এক ছেলে। বড় আদরের।
     কিন্তু বউ একদিন মারা গেল। ছেলেটা তখনও খুব ছোট। তার বয়েস দশ বছর। বাবা আবার বিয়ে করল। ঘরে এল নতুন বউ, নতুন মা। সৎমা।
     একদিনও তর সইল না। প্রথম দিন থেকেই সৎমা খুব খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। দুদিন সবুরও করল না। ছেলে অবাক হল। কিন্তু ভয়ে চুপ করে রইল। চুপ করে থাকলে অবিচার বেড়েই যায়।
     বাড়ির সবচেয়ে নোংরা আর শক্ত কাজগুলো করানো হত ছেলেকে দিয়ে। ছেলেকে পাঠানো হত মাঠে, খেতের কাজে। বড় কষ্ট। এ ছোট বয়সে কি এসব করা যায়? তাছাড়া মা বেঁচে থাকতে, এসব কাজ কোনদিন করেনি। শুধু কি তাই? সৎমা তাকে যা খেতে দিত, তাতে পেটে খিদেই থেকে যেত। কিছুক্ষণ পরে কেমন পেটে চিনচিন ব্যথা হত। মাথা ঘুরত। তবু ভয়ে সে কিছুই বলত না। বাবাও নতুন মায়ের পক্ষে।
     একদিন সকালে মা ছেলেকে ডেকে বলল, “এই আমার পয়সাগুলো নাও, চলে যাও পাহাড়ের ওপাশের গাঁয়ে। সেখানকার এক দোকানে ভালো বাদাম তেল পাওয়া যায। কিনে আনো। যদি দেরি হয়, এমন মার দেব যে জীবনে ভুলতে পারবে না। উনুনের পাশেই অনেক চেলা কাঠ আছে। যদি তাড়াতাড়ি না আস।
     ছোট্ট ছেলে কেঁপে উঠল। এর আগেও সে কয়েকবার চেলা কাঠের শাস্তি পেয়েছে। উঃ কি অসহ্য কষ্ট। রাতে দেহ গরম হয়ে ওঠে। বোধহয় জ্বর হয়। আজকে আরও বেশি ভয় পেল। মায়ের মুখ-চোখের চেহারা কেমন যেন অন্যরকম। যদি দেরি হয়? অত দূরের দোকানে কেন? কাছেও তো দোকান ছিল। কিন্তু এসব কথা বলার উপায় নেই। ছোট ছেলে তামার পয়সাগুলো নিয়ে উঠোন পার হয়ে বেরিয়ে পড়ল। কাঁপতে কাঁপতে। পথে যেতে যেতে ভাবছে, তাড়াতাড়ি ফিরতে না পারলে, উঃ কি ভয়ানক শাস্তিই না মা দেবে। শাস্তির কথা ভেবেই সে যেন কেমন আনমনা হয়ে পড়ছে। আবার মন ঠিক করে পথ চলছে। মা বড় নিষ্ঠুর। ছেলে বড় অসহায়।
     বাতাস বইছে সোঁ সোঁ করে। যত পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে হাওয়ার দাপট তত বাড়ছে, ঠান্ডায় যেন পায়ের পাতা জমে যাচ্ছে, দেহ অবশ হয়ে আসছে। হাওয়ার উলটো দিকে তাড়াতাড়ি হাটা যাচ্ছে না। তবু ছোট ছেলে ছোট পায়ে এগিয়ে চলেছে। কয়েক ঘন্টা হাঁটার পরে পাহাড়ের ওপারের গাঁয়ে সে পৌছল। যাক, শেষকালে দোকান খুঁজে পেল। কিন্তু এ কি? তামার পয়সাগুলো কোথায় গেল? জামার পকেটে ছিল পয়সা। গেল কোথায়? ছেলের মুখ সাদা হয়ে গেল। হায়! পকেট ছেড়া। পুরনো জামা। তাতে একটা ফুটাে রয়েছে। কোথায় পড়ল কে জানে। ছেলের বুক কাঁপতে লাগল। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। চেলা কাঠের কথা আর মায়ের চোখ-মুখের চেহারা মনে পড়ল।পয়সা নেই।
      ছেলে বাড়ির পথে ফিরছে। হাউ হাউ করে কাঁদছে, ‘মা, আমাকে আর মেরো না। মা, মা,! আর এমন হবে না। মা ! যেন মা তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখছে। হোঁচট খাচ্ছে। দেহ টলছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। খালি হাতে ফিরে গেলে মা মেরেই ফেলবে। সে বাঁচবে না। ফিরে গেলে মা তাকে আস্ত রাখবে না। সে মরে যাবে। আরও কাঁদছে ছেলে।
     বারবার মাথা নেড়ে ছেলে বলছে, "পয়সাগুলো খুঁজে পেতেই হবে। যেখানেই হারিয়ে যাক খুঁজতেই হবে। নইলে— । পাগলের মতো বারবার বলছে। পথের পাশের ঝোপে, পাথরের ফাঁকে ছেলে পয়সা খুঁজে চলেছে।
     ছোট ছেলে। মনে ভয়। পয়সা খোঁজায় ব্যস্ত। ফেরার সময় সে পথ হারিয়ে ফেলল। যে পথ দিয়ে পাহাড়ের ওপাশের গাঁয়ে গিয়েছিল, সে পথে ফেরা হল না। দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, ছেলেও পয়সা খুঁজে পেলনা। এ কি হল? অনেক বিপদ এসেছে তার ছোট্ট জীবনে। কিন্তু এমন বিপদে সে আগে পড়েনি।
     সন্ধ্যা নেমে এল। চারিদিকের পথঘাট নির্জন হয়ে গেল। গাছে গাছে শুধু পাখিদের বিকট চেঁচামেচি। একা একা ভয় করছে। তবু সে বাড়ি ফিরতে সাহস পাচ্ছে না। মা রয়েছে বাড়িতে। ছেলে জানেও না এ পথে সে বাড়ি পৌছতে পারবে না। সে পথ হারিয়েছে। বৃথাই তার বাড়ি ফেরার চেষ্টা করা। পথ-হারানো ছোট ছেলে।
     তার পা দুটো অবশ হয়ে এল। আহা, ছোট্ট দুটো পা। সে আর চলতে পারছে না। এমন সময় ঝড় এল, প্রচণ্ড ঝড়। পথের ধুলো-পাতা পাক খেয়ে খেয়ে ওপরে উঠছে। গাছগুলো নুয়ে পড়ছে, এবার বুঝি ভেঙেই পড়বে। অন্ধকারে ঝড়ে সে দিশেহারা হয়ে বসে পড়ল। পা’দুটো যেন তার নয়, পাথরের পা। দেহ যেন কেমন অচল হয়ে পড়ল।
     কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না ! পয়সা খুঁজতেই হবে। কিন্তু খুঁজবে কেমন করে? চোখে যে কিছুই দেখা যায় না। তবু সে এগোল। কেন তা জানেনা। সব যেন কেমন হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ পায়ে খুব ঠান্ডা লাগল, ভিজে মাটি। চোখে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না। একটা দমকা হাওয়া এল। সে টাল সামলাতে পারল না। সামনেই পাহাড়ি নদী। জলে গিয়ে পড়ল। হাত-পা-দেহ অবশ। বাঁচবার চেষ্টাও করতে পারল না। ডুবে গেল। ছোট ছেলে মরে গেল।
     মৃত্যুতেও ছেলে সৎমায়ের নিষ্ঠুরতার কথা ভুলতে পারল না। মায়ের শাস্তির ভয় তার মন থেকে গেল না। মনে হল, ‘মা আমাকে ছাড়বে না। ঠিক শাস্তি দেবে। পয়সা হারিয়েছে, ঠিক চেলা কাঠ দিয়ে মারবে। মা মা। এক অদ্ভুত আতঙ্ক!
তার আত্মা বারবার বলছে, "পয়সা আমাকে খুঁজে পেতেই হবে। পয়সা আমাকে খুঁজে পেতেই হবে?
     এই আতঙ্কের মধ্যে ছেলে জন্ম নিল জোনাকি হয়ে। সে জোনাকি হল,—হাতে অস্পষ্ট আলো, ছোট আলো, জ্বলছে নিভছে। মৃত্যুর পরেও সে খুঁজে চলেছে মায়ের দেওয়া পয়সা। ছোট ছেলে ছোট্ট জোনাকি হয়ে অল্প আলোয় পয়সা খুঁজছে পথে, বনের ধারে, পাথরের ফাঁকে। সে আজও পয়সা খুঁজে পায়নি। জোনাকি আলো জ্বেলে এখনও হারানো পয়সা খুঁজছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য