জাদুথলে ও রুপোর শিং - আদিবাসী লোককথা

     অনেককাল আগে এক পাহাড়ি গাঁয়ে থাকত এক বুড়ো আর তার বুড়ি। তারা ছিল খুব গরিব । কেননা, তারা এত বুড়িয়ে গিয়েছিল যে, কোন কাজ করতে পারত না। গাঁয়ের লোক দয়া করে যা দিত কোনরকমে তাতেই চলে যেত। কিন্তু গায়ের লোকই বা কত দেবে! তাদেরও তো সংসার চালাতে হয় । ভিক্ষার এই জীবন আর ভালো লাগে না। আগের দিনের কথা ভাবলে চোখে জল আসে।
     বসন্তকাল। গায়ের লোকজন মাঠে চলল। ফসল বুনতে হবে। বুড়ি অনেক কষ্টে চোখের জল চেপে বুড়োকে বলল, আর তো পারি না। তুমি কিছুটা জোয়ার চাষ করতে পারবে না আস্তে আস্তে? আমার কাছে জোয়ারের কিছুটা বীজ আছে। জোয়ারের গুড়ো দিয়ে নরম পিঠে বানিয়ে খাব। ভিক্ষে-করা এই শক্ত দানা তো চিবোতে পারি না? দেখ না চেষ্টা করে।
     বুড়ো ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইল। যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। তারপর বলল, “ঠিক আছে। পারব। কেন পারব না? বীজ দাও। জোয়ার ফলাবই। বুড়ির কষ্ট হল তবু খুশি হল।
     গাঁয়ের শেষে বুড়োর এক খণ্ড জমি ছিল। অনেকদিন তাতে চাষ করা হয়নি। আস্তে আস্তে কাঁপা কাঁপা হাতে বুড়ো মাটি ঠিক করল, আগাছা তুলে ফেলল, মাটি নরম করল। তারপর বীজ ছড়িয়ে দিল। অঙ্কুর হল, গাছ বড় হচ্ছে, বৃষ্টি সরস করল মাটিকে, রোদ সজীব করল গাছকে । গাছে ফসল ধরতে আর দেরি নেই। এখন মাঠে কোন কাজ নেই। তবু প্রতিদিন যায় বুড়ো। খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার ঝাপসা চোখ।
     সেদিনও গিয়েছে বুড়ো। এ কি? একটা সারস লম্বা লম্বা পায়ে জমির ওপর দিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। পায়ের চাপে সরু ফসলের চারা নুয়ে পড়ছে। ‘হায়! চরে বেড়াবার আর জায়গা পেল না? হুশ হুশ । বুড়ো কেঁদে ফেলল। এ-বয়সেও কেঁদে ফেলল। সারস পাখি উড়ে গেল। কাছে গিয়ে বুড়ো দেখে, প্রায় সব ফসলের চারা নুয়ে পড়েছে। ওগুলো গোড়া থেকে বেঁকে গিয়েছে। ওতে আর ফসল ফলবে না। চোখে জল । দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বুড়ো বাড়ি ফিরে এল।
     বুড়িকে বলল, ‘অনেক কষ্টে চাষ করেছিলাম। চারা খুব ভালোই ফলেছিল। কিন্তু... । একটা সারস সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। কপাল খারাপ। কিছুই পাব না।
      বুড়ি একথা শুনে কেঁদে ফেলল। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এককালে তুমি কত বড় শিকারি ছিলে। বুনো শুয়োর, শেয়াল আর পাজি পাখিদের মারতে ওরা তোমাকেই ডাকত। পার না ওই সব পাখিদের মারতে? তোমার বর্শা আর তীর-ধনুক এখনও ওই দেয়ালে ঝোলানো আছে। ওই শয়তান সারসকে মারতে পার না। জোয়ার আর পাব না, কিন্তু কিছুটা মাংস তো পাওয়া যাবে। দেখ না চেষ্টা করে।
     শিকারের কথায় বুড়োর চোখ চকচক করে উঠল। আবার নিভেও গেল। হাত কাঁপে, চোখ ঝাপসা—সে কি পারবে? দেখাই যাক না চেষ্টা করে। বুড়ো পিঠে নিল ধনুক, হাতে �নিল তীর আর বর্শা। সোজা চলে গেল গাঁয়ের শেষে তার জমিতে। একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল সে। রাগে বুড়ো কাঁপছে।
     সারস আবার উড়ে এল। তেমনিভাবে চরে বেড়াতে লাগল। বুড়ো তীর ঠিক করে ধনুকের ছিলায় লাগল। তীর বেরিয়ে আছে ঝোপের বাইরে। তাক ঠিক করছে বুড়ো। এক চোখ বোজা। এইবার তীর ছাড়তে হবে। আর...।
     সারস পাখি মানুষের গলায় কথা বলে উঠল, ’ওগো বুড়ো! আমায় মেরো না। এ তুমি কি করছ?
     “মারব না? আমার ফসল নষ্ট করেছে কে? মারবই। 
     সারস কাতরভাবে বলে উঠল, ওগো বুড়ো। আমি জানতাম না, এই ফসলের জমি তোমার, তা আমি জানতাম না। আমি ভেবেছিলাম এ-জমি নিষ্ঠুর সর্দারের। গোষ্ঠীপতির। আমায় ক্ষমা করো।
     ক্ষমা করে দাও বলা খুব সহজ। বললেই হয়ে গেল। এ-দুনিয়ায় আমার আর কিছুই রইল না। যাও-বা কিছু ফলিয়েছিলাম, তাও তুমি নষ্ট করে দিলে। আমার একমাত্র আশা ছিল ওই জোয়ার। এখন বুড়ো-বুড়িকে উপোস করতে হবে। আর এর জন্য তুমিই দোষী। ক্ষমা করব? বুড়ো ভীষণ রেগে গিয়েছে।
     চুপ করে মন দিয়ে সারস বুড়োর কথা শুনল। বলল, “তুমি এত গরিব? ঠিক আছে। তোমায় এমন জিনিস দেব যাতে তোমায় জোয়ারের জন্য কাঁদতে হবে না। একটু দাঁড়াও। সারস ডানা মেলে উড়ে গেল। দূরে ঝোপের আড়ালে মিলিযে গেল।
     বুড়ো হঠাৎ ভাবল, সারস তাকে বোকা বানিয়ে উড়ে গেল না তো? ইস্ তাই ঠিক। ওকে তীর মারাই উচিত ছিল। বুড়িকে গিয়ে এখন কি বলবে?
     হঠাৎ বুড়ো ডানার শব্দ শুনতে পেল। ঝোপের ওধার থেকে সারস হাওয়ায় ভেসে আসছে। তার ঠোঁটে ঝুলছে ছোট্ট একটা থলে।
     বুড়োর ঝোপের কাছে এসে সারস নামল। থলেটা বুড়োর হাতে দিয়ে বলল, “তোমার ফসল আমি নষ্ট করেছি, তার বদলে এই থলে দিলাম।
     “কি হবে তোমার থলে দিয়ে। আমি তো ভিক্ষে করে খাই, ওরকম থলে আমার অনেক আছে। ভিখারির থলে ছাড়া আর কিছু থাকে না। এসব তুমি জান না? বুড়ো আরও রেগে গেল।
     সারস শান্ত গলায় বলল, ‘বুড়ো, এটা তুমি নাও। তোমার হয়তো অনেক থলে আছে, কিন্তু এরকম থলে নেই। এটা হল জাদুথলে। থলেটা নিজের সামনে ধরে বলবে—ছোট্ট থলে, তুমি বড় হয়ে যাও, তুমি সুন্দর হও, তুমি আমায় খাবার দাও, পানীয় দাও। থলে তোমায় সব দেবে। কাজ হয়ে গেলে আবার বলবে— ছোট্ট থলে, তুমি গুটিয়ে যাও, খাবার শেষ হোক, পানীয় শেষ হোক। থলে আবার পুরনো আকারে ফিরে আসবে।
     "তাই যদি হয় তবে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমাকে চিরকাল মনে রাখব। আমরা বড় গরিব। ছোট্ট থলে নিয়ে বুড়ো বাড়ির পথে চলল। বেশ তাড়াতাড়ি।
     কিন্তু বাড়ি য়াওয়া আর হল না। সে দেরি করতে পারছে না। দেখাই যাক না, সারস সত্যি কথা বলেছে কিনা। পথের পাশে সে বসে পড়ল। এদিক-ওদিক দেখল। তারপর থলেটা নিজের সামনে এনে বলল, “ছোট্ট থলে, তুমি বড় হয়ে যাও, তুমি সুন্দর হও, তুমি আমায় খাবার দাও, পানীয় দাও। অবাক কাণ্ড ! তার সামনে এমন সব খাবার আর পানীয় এল যে সে এসব কোনদিন চোখেও দেখেনি। সে কেন, গাঁয়ের সর্দারও দেখেনি।
     �‘সত্যি, সারস বড় ভালো। সে আমাকে ঠকায়নি। মনের সুখে প্রাণ ভরে বুড়ো ওই সব খেল। আবার থলেকে ছোট করে দৌড় দিল বাড়ির পথে।
      বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই বুড়ো আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ও বুড়ি। আরে গেলে কোথায়? বেঁচে আছ তো?
     “হাঁ গো, বেঁচেই আছি। তা অত চেঁচাচ্ছ কেন? হয়েছে কি? এতক্ষণ বাইরে থাকে? আমি তো ভয়েই অস্থির! নেকড়ে খেল নাকি! অথবা ভালুকের খপ্পরে পড়েছ। তারা তোমায় মজা করে ঝোপে টেনে নিয়ে গিয়ে......!
     আরে, না না। ওসব কিছু নয়। নেকড়েও খায়নি, ভালুকও ধরেনি। ধরলেই হল? অনেক খাবার, অনেক পানীয়। শেষ জীবনে আর কোন কষ্ট রইল না। আরে, এসেই দেখ না !
      বুড়ি এসব আবোল-তাবোল কথা কিছুই বুঝল না। সে কাছে এল। বুড়ো ছোট থলে সামনে ধরে খাবার দিতে বলল, পানীয় চাইল। অবাক কাণ্ড ! বুড়ির চোখ বোধহয় ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। কাঠের চৌকি ভরে গেল খাবারে পানীয়ে। এসব তুমি পেলে কেমন করে ? বুড়ির গলা কাঁপছে।
      ‘সেই সারস পাখি আমাদের এসব দিয়েছে। এই জাদুথলে দিয়েছে।’ 
    ‘বুড়ো, তুমি তো আচ্ছা বোকা! এমন পাখিকে মারতে তীর-ধনুক-বশ নিয়ে গিয়েছিলে? এত বোকা তুমি? বুড়ি ভুলেই গেল, সে-ই বুড়োকে পাঠিয়েছিল মাংস আনতে। এরকমই হয়।
      পেট পুরে, প্রাণ ভরে তারা খেল। এসব তো জীবনে চোখেই দেখেনি। আর খেতে পারছেনা।
      হঠাৎ বুড়ি বলল, “এটা তো ঠিক হচ্ছেনা। তুমি ওদের ডাক, ওরাও আসুক।
     "ওরা কারা?” 
      "বাঃ, আমাদের গাঁয়ের যারা খুব গরিব, যারা খেতে পায়না, যাদের বড় কষ্ট, তাদের ডেকে আনো। ওরা আমাদের অনেক দিয়েছে। নিজেরা অল্প খেয়েও দিয়েছে। ওদের ভুলতে নেই।
      বুড়ির কথা বুড়ো বুঝতে পারল। সে সব গরিব মানুষকে ডেকে আনল। যারা গরিব, যারা খিদেয় কষ্ট পায়—তাদের সবাইকে ডাকল। তারা এল, প্রাণ ভরে খেল। জাদুথলের গুণ দেখল। খুব খুশি হল।
     বুড়োর বাড়ি গমগম করে। প্রতিদিন দুবেলা সবাই আসে। অফুরন্ত খাবার-পানীয়। সবাই খায়। বুড়োকে ভালোবাসে, বুড়িকে ভালোবাসে। সবাই খুশি। আর কারও অভাব নেই।
      এদিকে হয়েছে কি, সর্দারের এক ক্রীতদাস জাদুথলের কথা জেনে গেল। সে সব কথা সর্দারকে বলল। সর্দার মনে মনে ভাবল, “আমি হলাম এলাকার সর্দার, আমি যা খেতে পাইনা, ওই ভিখারি বুড়ো তাই খাচ্ছে? রোজ! সবাইকে খাওয়াচ্ছে? এতে তো আমারই মান গেল।
      রাগে কাঁপছে সর্দার। হিংসেয় জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে সর্দার। এর একটা বিহিত করতেই হয়। গাড়িতে ঘোড়া জুড়ে সর্দার ছুটে চলল বুড়োর বাড়ির দিকে। ঘোড়ারা ছুটছে যেন ঝড় বইছে। পৌঁছে গেল বুড়োর ভাঙা-চোরা বাড়িতে।
      �গাড়ি থেকে নেমে সর্দার বুড়োর উঠোনে এল। মাথা উঁচু করে কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে সর্দার বলল, শুনতে পেলাম একটা জাদুথলে নাকি সব গরিব লোককে খাওয়াচ্ছে! সত্যি নাকি?
      বুড়ো মানুষটি জীবনে মিথ্যে কথা বলেনি। সে আস্তে আস্তে বলল, “হাঁ, সত্যি কথা।”
     ‘দেখি থলেটা? কেমন করে খাবার দেয়? বুড়ো ঘরের মধ্যে গেল। থলেটা নিয়ে এল। কেমন করে খাবার আসে কেমন করে পানীয় আসে তার কৌশল দেখিয়ে দিল। সর্দার তার চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সে এমন মদ চোখে দেখেনি। এসব জিনিস দিলেও তার রান্নাঘরের লোকজন এমন ভালো খাবার তৈরি করতে পারবে না।
      সর্দার চড়া সুরে বলল, ‘ও থলেটা আমাকে দিতে হবে। তুই ভিখিরি, তুই এসব খাবার দিয়ে কি করবি? এসব সর্দারের বাড়ির জন্য। কত সর্দার, কত বড় মানুষ আমার বাড়িতে আসে। তাদের জন্যই থলেটা আমার দরকার। তুই এসব কোনকালে চোখে দেখেছিস? থলেটা দে।
      'না, থলে আমি দেব না। এটা আমার। এটা তোমরা আমাকে দাওনি। থলে দিয়ে দিলে বুড়ো-বুড়ি বাঁচব কেমন করে? গাঁযের মানুষ বাঁচবে কেমন করে? আহা ওদের বড় কষ্ট ! জাদুথলে আমি দেব না। বুড়ো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল।
      সর্দার বলল, ‘ভাবনা নেই, তোর চলার মতো আমি গাড়ি ভর্তি করে আলু, রুটি, মাংস এসব পাঠিয়ে দেব। তোদের দুজনের চলে যাবে।
      'না, তা হয় না। অনেককেই দেখতে হয়। ওরা যে বড্ড গরিব ! থলে আমি দেব না । বুড়ো কাঁপা গলায় বলল।
     তাই নাকি ? চাবকে পিঠের চামড়া তুলে নেব। সর্দারের মুখেমুখে কথা? যদি এমনিতে না দিস, তবে জোর করে নিযে যাব। থলে আমার চাই-ই, আমি কে জানিসনা? আমাকে চিনিসনা? তোর থলেও যাবে, তুইও যাবি মাটির নীচে। কেউ টু শব্দ করবেন।
      সর্দারের সঙ্গে বুড়ো পারবে কেন? এতক্ষণ বাঁধা দিয়েছিল এই কত না? লোকে শুনলে অবাক হয়ে যাবে। বুড়োর তেজ আছে। গরিব মানুষের তেজ কি বেশিক্ষণ থাকে? বুড়ো জাদুথলে সর্দারের হাতে তুলে দিল।
      সর্দার ফিরে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে বুড়ো, পেছনে বুড়ি। দুজনের চোখেই জল। আর সেদিন থেকে সর্দারের বাড়ি আরও গমগম করে উঠল। নানা এলাকার সর্দারেরা এই সর্দারের বিরাট বাড়িতে আসছে। খাবার খাচ্ছে, পানীয় খাচ্ছে। এরকম খাবারপানীয় তারাও আগে দেখেনি। কোন গরিব মানুষ সর্দারের বাড়ি ঢুকতে পারে না। আগের মতো হয়ে গেল সব, বুড়ো আর অন্য গরিব মানুষ কাঁদে, আর সর্দারের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে সর্দার বলেছিল, গাড়ি-ভর্তি খাবার আসবে। দিন যায়, রাত যায়, আবার দিন হয়। খাবার আসে না। বড় মানুষ কি ওসব কথা মনে রাখে? সর্দার তার নিজের দেওয়া কথা ভুলে গেল।
      বুড়ি একদিন বলল, আমার মনে হয় সর্দার ওকথা ভুলে গিয়েছে। তুমি গিয়ে মনে করিয়ে দাও। সর্দারের তখন মনে পড়বে আর খাবার দেবে। মানুষের কতরকম ভুল হয়।
�      বুড়োও তাই ভাবল। বুড়ো গেল সর্দারের বাড়ি। কিন্তু সর্দার গরিব বুড়োর কোন কথাই শুনল না। বলল, “তোমায় দেব এমন কিছুই আমার নেই। যা, বরং ভিক্ষে কর।
      ‘তাহলে আমার ছোট্ট থলে দিয়ে দাও । বুড়ো সাহস করে বসল। 
      ‘থলে? তুই জাদুথলে ফিরে চাস? একটু দাঁড়া, কেমন থলে ফিরে পাস দেখাচ্ছি। এই বলে রাগে সর্দার চিৎকার করে উঠল। তার চাকরদের ডাকল, পঁচিশ ঘা চাবুক মারতে বলল। হুংকার ছেড়ে বলল, ‘এমনভাবে মারবি যাতে বুড়ো আর কোনদিন এমুখো না হয়।
      চাকররা বুড়োকে চেপে ধরল। মারতে মারতে বাড়ির সীমানার বাইরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। পড়ে রয়েছে বুড়ো। চোখে অন্ধকার, মাথা ঘুরছে, দেহ কাঁপছে। চোখে এক ফোঁটাও জল নেই। অনেকক্ষণ পড়ে থাকার পরে বুড়ো কোনরকমে সোজা হয়ে বসল। ভীষণ ব্যথা দেহে । আস্তে আস্তে বাড়ির পথে চলল।
      বাড়িতে ঢুকেই বুড়ো এবার কেঁদে ফেলল। সর্দারের কাছে থলে চাইতে গিয়ে কি হযেছে সব বলল বুড়িকে। বুড়ি কান্নায় ভেঙে পড়ল। বুড়ো মানুষ দেখেও সর্দারের দয়া হলনা ! তাড়িয়ে দিত কিন্তু মারল কেন? সর্দাররা এরকমই হয়। ওদের দয়ামায়া থাকতে নেই।
      বুড়ি শাপ-শাপাত্ত করল সর্দারের। অনেকক্ষণ কাঁদল। তারপর বলল, ‘তুমি আবার আমাদের জমিতে যাও। হয়তো সারসের সঙ্গে দেখা হবে। চাইলে সে ওরকম আর একটা থলে দিতেও পারে। জাদুথলে। যাবে নাকি?
      আশা জাগল বুড়োর মনে। সে অল্পক্ষণ পরে তার জমির দিকে রওনা হল। সে এল গাঁয়ের শেষ সীমানায়। জোয়ারের চাষের জমিতে বসে রইল। অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ ডানার শব্দ শুনতে পেল। দূরের ঝোপের দিকে তাকিয়ে দেখে, ডানা মেলে হাওয়ায় ভেসে ওই সারস পাখি আসছে। বুড়োর পাশে এসে নেমে পড়ল সারস।
      বন্ধু, তোমার দেওয়া সেই জাদুথলে আমাদের গায়ের সর্দার কেড়ে নিয়েছে। আমি চাইতে গেলাম, আমাকে চাবুক মেরে তাড়িয়ে দিল। এখন বুড়ো-বুড়ি বাঁচব কেমন করে? গরিব মানুষ বাঁচবে কেমন করে? তুমি কি আর একটা জাদুথলে আমায় দেবে? বুড়ো সারসের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
      অনেকক্ষণ ভাবল সারস। তারপর বলল, "না, ওরকম আর একটা থলে আমি তোমায় দেব না। তার চেয়ে ভালো জিনিস। এবার তোমাকে একটা রুপোর শিং দেব। একথা বলেই সারস উড়ে গেল দূরের ঝোপের দিকে। বুড়ো বসে রয়েছে। হঠাৎ দেখতে পেল ডানা মেলে সারস উড়ে আসছে এদিকে, তার ঠোঁটে একটা রুপোর শিং।
      সারস শিংটা দিয়ে বুড়োকে বলল “এই নাও। জাদুথলের বদলে এই শিং নাও। বুড়ো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এই রুপোর শিং নিয়ে আমি কি করব? শিখিয়ে দাও।
      সারস বলল, “এই শিং নিয়ে তুমি সর্দারের বাড়িতে চলে যাও। সেখানে গিয়ে শিং হাতে নিয়ে বলবে এই রুপোর শিঙে অনেক কিছু আছে। যখন সর্দার বলবে, অনেক হয়েছে আর চাই না তখন তুমি বলবে, এসো সবাই শিঙের মধ্যে ঢুকে যাও। একথা বলেই সারস দূরে মেঘের কোলে মিলিয়ে গেল।
      বুড়ো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শিংটা দেখল, রুপোর সুন্দর শিং। বুড়ো ভাবল, সারস নিশ্চয়ই অবাক-করা জিনিস দিয়েছে। আর হয়তো সর্দারের কাছে চাবুক খেতে হবে না। সারস তো আমার বন্ধু।
      �বুড়ো বাড়ির পথে হাঁটছে আর ভাবছে—সর্দারের বাড়ি যাওয়া কি ঠিক হবে? মরে যাইনি ভাগ্যি! কিভাবেই না মারল! আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতে বুড়ো পথ চলছে। হঠাৎ পথে দেখা সর্দারের এক শিকারির সঙ্গে। সে সর্দারের বাড়িতেই থাকে। সর্দারের পাশে থাকে সবসময়। বুড়োকে দেখতে পেয়েই শিকারি বলল, “কি হে, কোথায় গিয়েছিলে? খবর কি বুড়ো?”
      বুড়ো আনমনে বলল, “আমি আমার পুরনো বন্ধু সারস পাখির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। অনেকদিন দেখা হয়নি। আজ দেখা পেলাম ।
      ‘তা, সারস তোমায় কিছু দিল নাকি? 
      "হাঁ, দিয়েছে। একটা রুপোর শিং।” বুড়ো ঢোলা জামার ভেতর থেকে রুপোর শিং বের করে শিকারিকে দেখাল।
      শিকারির চোখ চকচক করে উঠল। কোনরকমে উত্তেজনা চেপে বলল, তা এতে কি হয়? কাজটা কি?
      এমনি। একটা রুপোর শিং। কি আর হবে? বুড়ো বলল। শিকারি একটু রেগে গেল। রাগ সামলে বলল, কিছুই হয় না? তুমি বুড়ো কিছু চেপে যাচ্ছ। আমার মনে হয়, শিঙের কাছে চাইলে হয়তো সোনা-হীরে পাওয়া যাবে। কি বল?’
      ‘তা হতে পারে। হয়তো পাওয়া যাবে। কে জানে?’ 
     ‘তাহলে শিংকে বল না? সোনা-হীরে বেরোক।’ 
      ‘শিকারি, তুমি নিজেই করোনা। নিজেই বলো, এই রুপোর শিঙে অনেক কিছু আছে। এই বললেই হবে।’
      শিকারি তাড়াতাড়ি বুড়োর হাত থেকে রুপোর শিংটা ছিনিয়ে নিল। হাতে নিয়ে বলল, “এই রুপোর শিঙে অনেক কিছু আছে। অবাক কাণ্ড। শিঙের মুখ থেকে একে একে ঝড়ের বেগে বারোজন শক্তিমান যুবক বেরিযে এল। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে শক্ত চাবুক। তারা বেরিয়েই লোভী শিকারিকে চাবুক মারতে শুরু করল। যন্ত্রণায় ছটছট করছে শিকারি। মাটিতে আছড়ে পড়ছে। তারা কিন্তু থামছে না।
      শিকারি চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলছে, ওগো বুড়ো, তোমার পায়ে পড়ি, এদের ফিরিয়ে নাও। আর পারি না। এবার প্রাণ বেরিয়ে যাবে।
      বুড়ো হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। এমন আনন্দ সে জীবনে পায়নি। হাসছে আর বলছে, ওগো শিকারি, বেশি কৌতুহল ভালো নয়, বেশি লোভ ভালো নয়। অন্যের ব্যাপারে নাক গলিয়ো না, তাহলে বিপদেও পড়বে না। হয়েছে তো?
      এর মধ্যে বারোজন যুবক শিকারিকে মারতে মারতে প্রায় তাল পাকিয়ে ফেলেছে, মনে হচ্ছে শিকারি যেন এক তাল জোয়ারের ময়দা, এখনি রুটি তৈরি হবে। বুড়ো দেখছে আর হাসছে।
      তারপর বুড়ো বলল, ‘এসো, সবাই শিঙের মধ্যে ঢুকে যাও। চোখের পলকে তারা ছোট হয়ে শিঙের মধ্যে ঢুকে পড়ল। শিংটা পড়ে রয়েছে, কেউ কোথাও নেই। শিকারি গোঙাচ্ছে। বুড়ো ভাবল, ‘এবার বুঝেছি, বন্ধু সারস কেন আমায় এটা দিয়েছে। মুচকি হেসে শিং হাতে নিয়ে বুড়ো চলল সর্দারের বাড়ির দিকে।
      সর্দারের বাড়ির কাছে পৌঁছতেই বুড়ো শুনতে পেল, ভেতরে চলেছে হৈ-হল্লা। সেখানে তখন খাওয়া-দাওয়ার ধুম। আনন্দ-ফুর্তি। বুড়ো মস্ত উঠোনে ঢুকল। বড় জানলা দিয়ে �দেখতে পেল অনেক অতিথির ভিড়, খাচ্ছে আর নাচানাচি করছে। কি আনন্দেই তারা আছে! অথচ যার দয়ায় সর্দার ওই সব করছে সেই জাদুথলে কিন্তু তারই ছিল। বুড়ো আরও দেখল, জাদুথলে একটা কাঠের পাটাতনের ওপরে শুয়ে আছে। সে খুব আনমনা হয়ে গেল ।
      জানলা দিয়ে সর্দার বুড়োকে দেখতে পেয়েছে। গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল, ‘এই বুড়ো, তোর এখানে কি চাই?
      ‘সর্দার, প্রভু, আমি আমার জাদুথলে নিতে এসেছি।’ 
     ‘হাঃ হাঃ ! তোর শিক্ষা হয়নি। এরকম জাদুথলে তোর কোনদিন ছিল নাকি? বোকা বুড়ো কোথাকার! খুব লোভ! হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল সর্দার। হঠাৎ থেমে গেল। হুংকার ছেড়ে চাকরদের ডাকল, "বুড়োকে ঘরের মধ্যে ধরে আন। আমার অতিথিদের সামনে পঁচিশ ঘা চাবুক মার। আর ফিরতে দিবিনা। ধরে আন।’
      চাকররা বুড়োর ঘাড় ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঘরের মধ্যে নিযে এল। ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিল সর্দারের পায়ের কাছে। কিন্তু এরই মধ্যে বুড়ো ঢোলা পোশাকের মধ্যে থেকে কোনরকমে রুপোর শিংটা বের করেই বলে উঠল এই রুপোর শিঙে অনেক কিছু আছে। বুড়োর চোখে আগুন ছুটছে।
      অবাক কাণ্ড। বারোজন শক্তিমান যুবক একে একে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এল রুপোর শিং থেকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে চাবুক । তারা বেরিয়েই সপাং সপাং করে চাবুক মারতে লাগল। সে আঘাতকে কেউ বাধা দিতে পারল না। চাকরবাকর, সর্দার আর অতিথিরা যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। “বাঁচাও বাঁচাও’ বলে কাঁদছে।
      সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছে সর্দার। কেননা, বুড়ো দাঁড়িয়ে আদেশ দিচ্ছে, চাকরদের জন্য এক ঘা চাবুক, অতিথিদের জন্য দু ঘা আর সর্দারের জন্য তিন ঘা। বুড়োর কথামতো যুবকেরা কাজ করে চলেছে। বিশ্রাম নেই, অবিরাম।
      সর্দার সবচেয়ে বেশি মার খেয়ে পাগলের মতো চিৎকার করছে, গোঙাচ্ছে, আছাড়িপাছাড়ি খাচ্ছে। সে আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছে না। মিনতি করে বলল, "বুড়ো, তোমার পায়ে পড়ি, তুমি ফিরিয়ে নাও তোমার জাদুথলে, থামতে বলো তোমার ছেলেদের। এবার মরেই যাব।
      বুড়ো মুচকি হেসে বলল, ‘আহা, একথাটা যদি তুমি আগে বুঝতে সর্দার। থলেটা যদি আগেই দিয়ে দিতে। তুমি ফিরিয়ে দিতে চাইছ ওই ছোট্ট থলে? ফিরিয়ে দেবে কি? ওটা তো তোমার নয়। কিছুই দিতে চাইছ না তুমি, আমি ছেলেদের থামতে বলি কেমন করে?
      ‘বুড়ো, তুমি আর কি চাও বল? আমি তোমায় একটা গরু দেব, একটা ঘোড়াও দেব। ওদের থামতে বলো।
     ‘না সর্দার, ওগুলো এমন কিছু বেশি নয়।’ 
     ‘বুড়ো, মরে গেলাম। মরে গেলাম! উঃ, প্রচণ্ড চাবুকের মার! তুমি যদি ওদের ফিরিয়ে না নাও, সত্যি বলছি মরে যাব। বলো, তোমার আর কি কি চাই? সর্দার চিৎকার করে কাঁদছে।
      ‘বেশ, তুমি যদি বাঁচতে চাও, তাহলে তোমার বাড়ি-জমি-পশুপাখি সব গাঁয়ের গরিবদের দিয়ে দিতে হবে। আর তোমাকেও এই গাঁ ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যেতে হবে।
      অনেক খারাপ কাজ করেছ তুমি। তোমার ক্ষমা নেই। বহুদূরে তোমায় চলে যেতে হবে। রাজি আছ?
     ‘ওগো বুড়ো, এই বাড়ি এত জমি ছেড়ে আমি বঁচিব কেমন করে? আমি তো কাজকর্ম জানিনা, কি কারে বাঁচব? আমার হয়ে কে কাজ করে দেবে?
      হাসতে হাসতে বুড়ো বলল, সেসব তুমিই জান। আমার জানার কথা নয়। ছেড়ে যেতে না চাইলে এমনিভাবে মার খেতেই হবে। উপায় কি বলো? এই ছেলেরা, এখন শুধু চালাও সর্দারের দেহে।
      যুবকেরা চাকর ও অতিথিদের ছেড়ে শুধু সর্দারকেই মারতে লাগল। বারোজন একজনকে মারছে। গরম পাত্রে যেমন করে বান মাছ যন্ত্রণায় লাফায় সর্দার তেমনি লাফাচ্ছে। শেষকালে সর্দার বলল, সব নাও বুড়ো, সব নাও। গরিবদের দাও। শুধু ওদের থামাও। বুড়ো বলল, যাক, ব্যাপারটা বুঝেছ। ঠিক ওষুধ ধরেছে। শোন, মনে রেখ আমাকে আর আমার ছেলেদের। এই ছেলেরা, এসো, সবাই শিঙের মধ্যে ঢুকে যাও।
      চোখের পলকে ছেলেরা সবাই শিঙের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সব শান্ত। চাকররা অতিথিরা আর সর্দার সবাই মেঝের ওপরে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কাঁদছে, গোঙাচ্ছে, বিড়বিড় করে কিসব যেন বলছে। আনন্দের আর ফুর্তির ঘর কেমন পালটে গিয়েছে।
      বুড়ো তার সুন্দর রুপোর শিংটা ঢোলা পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। পাটাতনের ওপর থেকে জাদুথলে তুলে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিল। বুড়োকে কেমন খুশিখুশি জয়ীজয়ী লাগছে, চোখে দীপ্তি, চলাফেরার উচ্ছলতা। সবদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল ।
     শেষকালে সর্দারের কাছে গিয়ে বলল,‘সর্দার, তোমার অনেক রয়েছে। কোন অভাব তোমার নেই। বন্ধু সারস পাখি আমায় জাদুথলে দিয়েছিল। এই গরিব মানুষ আমরা খেয়েপরে ভালোই ছিলাম। সহ্য হল না তোমার। সর্দার হয়ে কোথায় তুমি আমাদের বাঁচাবে, না আমাদের শুধু কষ্টই দিয়েছ। যাক গে ওসব কথা । হঠাৎ বুড়ো রাগে ক্ষেপে গিয়ে আবার বলল,‘শোন সর্দার, কাল সকালে আমি আবার আসব। হাতে থাকবে আমার রুপোর শিং। তোমায় যদি এখানে দেখতে পাই, ছেলেদের আবার ডাকব। আর কিছু নয়।
      বুড়ো তার রুপোর শিং আর জাদুথলে পেয়ে খুব খুশি । গাঁয়ের সবাই খুশি। সবাই প্রাণ ভরে খেতে পারবে । ওদের বড় কষ্ট।
      বুড়ো যদি আবার ফিরে আসে? হাতে যদি থাকে সেই রুপোর শিং? আর যদি...। সেদিন থেকে সর্দারকে কেউ দেখেনি। একা সে চলে গিয়েছে কোথায় কেউ জানে না। সেদিন থেকে অন্য গাঁয়ের সর্দাররাও খুব ভয়ে ভয়ে থাকে! গাঁয়ের লোকের ওপর জুলুম করে না। যদি বুড়োকে ওরা ডেকে আনে?
      সূর্য ওঠে সূর্য অস্ত যায়, গাঁয়ের লোক সকাল-সন্ধে বুড়োর বাড়ি আসে। দিনগুলো বড় সুন্দর! রাতগুলোয় ভয় নেই।

ডাউনলোড PDF : ডাউনলোড

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য