গোগোদার সঙ্গে উলুউলু দেশে - বেলাল চৌধুরী

      গোগোদাকে চেনো না তোমরা, সে কি! তোমরা তো দেখছি আমাদের জাতীয় গল্পবৃত্তান্তের কিসসুই-জানো না। গোগোদার মতো অত বড় বীরপুরুষের নামই শোন নি? কি আশ্চর্য কথা! যার নামে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খায়, যার এক হাঁকে কেঁপে ওঠে আসমুদ্রহিমাচল। সমগ্র ভূ-ভারত খুঁজে বেড়ালেও যার জুড়ি মেলা ভার। কাছিমের পিঠে চেপে তিনি ঘুরেছেন কত না দেশবিদেশ, পাড়ি দিয়েছেন সাতসমুদ্র তেরো নদী। এক লম্ফে ডিঙিয়েছেন কত না পাহাড়-পর্বত। যেমন তার বীরত্ব তেমনি তিনি অফুরন্ত গুণেরও খনি বটেন। তার মতো রূপবান, তুখোড় খেলুড়ে, দক্ষ শিকারী, ডাকসাইটে আঁকিয়ে, গাইয়ে, বাজিয়ে সচরাচর খুব কমই দেখা যায়। আর তিনি যে একজন নামকরা নাচিয়ে তো তার নামকরণ থেকেই টের পাওয়া যায়। জি ও গো জি ও গো অর্থাৎ গোগোদা শুনেছি, মাঝে মধ্যে রেগে গেলে নাকি সে এক তুলকালাম কাণ্ড, জীবন্ত ক্ষেপণাস্ত্রের চাইতেও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। এসব কথা সাধারণত দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাই বলাবলি করে। আমি কিন্তু কখনো তাকে তেমনভাবে রাগতে দেখিনি বরং আমি বরাবরই দেখেছি, তিনি বেশ ফুরফুরে ফুর্তির মেজাজেই থাকেন। আমোদ উল্লাসে মেতে থাকতেই ঢের বেশি ভালবাসেন। তার মতো মিশুকে প্রকৃতির লোক আমি খুব কমই দেখেছি। আমাকে তিনি খু-উব পছন্দ করেন। আর করবেন নাই বা কেন? আমি কি কারুর চাইতে কম তার আদেশ-নির্দেশ মেনে চলেছি? উফ, কত কত শক্ত কাজ আর পরিশ্রম। আর সারাক্ষণই ক্রমাগত এটা-ওটা খাওয়া, ছোটাছুটি দাপাদাপি করা, বিকট শব্দের বাজনা বাজানো ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কঠিন সব কাজ।
      কি বুঝলে? কিসসু বোঝনি। আসলে আমি গোগোদার ভীষণ ভক্ত, অনুরাগী আর বাধ্য। তাই তো একবার তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তার বান্ধবী ইল্লির দেশে। সে দেশের নাম উলুউলু। তোমরা হয়তো ভূগোলে বা মানচিত্রে উলুউলু দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না। একমাত্র গোগোদা আর আমিই কেবল জানি, দেশটি কোথায় এবং কিভাবে যেতে হয়। তবে গোপনে তোমাদের আমি একটি সূত্র বলে দিতে পারি, সেটা হল সোজা তোমার নাক বরাবর।
উলুউলু দেশে যেতে হলে প্রথমেই যেতে হবে এক গুপ্ত নৌ-বন্দরে, যেখানে অসংখ্য তিমি, জাম্বো জেটের মতো প্রকাণ্ড কুঁজঅলা গায়ক তিমি, নীল তিমি, কমলা-সাদা-হলুদ ছোপ দেয়া, ময়ূরকষ্ঠী নীল, ধবধবে সাদা, লালশির, নীলশির, নীলপক্ষ, রাঙামুড়ি, সামনে সাদা, ডুবুরি, ডুব-না দেয়া, চোখ সাদা, পাতিহাঁস, রাজহাঁস, কচ্ছপ ও কাছিম, ছোট বড় নানা আকারের কুমির, কামট ও তাদের ছানা আর অগুণতি রঙবেরঙের রোগা মোটা গোল চ্যাপটা বেঁটে লম্বা মাছ, মাছের পোনা কোনটা ঠিক সাম্পানের মতো কোনটা বা ডিঙি নৌকার মতো। তোমার খুশিমতো যে কোনটাতে চেপে যেতে পারো। টিকিট-ফিকিটের বালাই নেই। শুধু পিঠে চেপে বসা, পরমুহুর্তেই দেখবে হুশ করে তুমি অগাধ জলের বুক কেটে ছুটে চলেছ তরতর করে। ওই নৌ-বন্দরের কর্মচারীদের মধ্যে নানা কাজে সাহায্য করবার জন্যে রয়েছে জাঁদরেল চেহারার কোলা সোনা নানা জাতের ব্যাঙ, বড় বড় দাড়অলা কাঁকড়া, গুপো ভোঁদড়। তার আবহাওয়া বিশারদের কাজ করেন গাঙশালিখ ও শঙ্খ চিল।
      আমরা গিয়েছিলুম সব চাইতে দ্রুতগতিসম্পন্ন বিশাল এক নীল তিমির পিঠে চেপে। প্রচণ্ড গতি ভালবাসেন গোগোদা। জলের বুকে ফোয়ারা তুলে সাঁই সাঁই করে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলছিল আমাদের নীল তিমি। বলতে লজ্জা নেই, আমি চোখ বুজে দুহাতে গোগোদাকে আঁকড়ে ধরে পেছনে বসেছিলাম। আমি আবার বিষম ভীতু কি না? গোগোদা কিন্তু বেশ মনের আনন্দেই গাইছিলেন, ‘লাল লাল মাছদের নীল নীল গান’। মাঝে মাঝে শিসও দিচ্ছিলেন। সে যাই হোক উলুউলু দেশে পৌছে আমার চোখজোড়া তো ছানাবড়া হবার যোগাড়। প্রথমেই পড়ল কোকাকোলা আর শরবতের নদী, তারপরেই আইসক্রিমের খাল বিল। কি ঝলমলে তার রঙ ! চার পাশে দুই তীরে তীরে ক্ষীরের ছানার অজস্র গাছপালা। ডালে ডালে ঝুলছে সোনালী রঙের বিস্কুট, কোনটাতে জ্যাম বা জেলি আবার কোনটাতে বা মাখন কিংবা মার্মালেড মাখানো আর রূপালী রাংতা মোড়া নানা ধরনের সুগন্ধী চকোলেট, লজেঞ্চুষের গুচ্ছ দুলছে ঝিরঝিরে হাওয়ায়। আমার তো জিব দিয়ে অনবরত লালা গড়াতে থাকল। আমি কি করব কিছুই আর বুঝতে পারছিলুম না। বাগানে বাগানে ফুটে রয়েছে মিষ্টি খইয়ের ফুল, মুড়ির মোয়া, ক্ষীরকদম্ব, নারকোলনাডু, শোন-পাপড়ি। উফ আমি আর তাকাতে পারছিলুম না। ঘুরে ঘুরে বাগানের খবরদারি করছে সাহেবদের মতো লালমুখো সব দশাসই ডেয়ো পিঁপড়ের দল। দেখলে ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। নিচে ছড়ানো চমৎকার সাদা দানা চিনির বালি, চিকচিক করছে মিছরির নুড়ি। এদিক ওদিকে খেলনার দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো রয়েছে রাশি রাশি ফল। থোকা থোকা রস টশটশে আঙুর, গাঢ় লাল রঙা আপেল, উজ্জ্বল হলুদ সোনার বরণ নাশপাতি, ডাশা পেয়ারা, মিশমিশে কালো জাম, মসৃণ রূপসী কমলালেবু, দুষ্ট জামরুল, রক্তাভ ডালিম ও বেদানা আর ঘোর সবুজ রঙের ইয়া বড় বড় তরমুজ। শশা, কলা, পাপর ভাজা, রেশমী মিঠাই, ফুলকো লুচি ও পরোটারা ঘুড়ি হয়ে ঘুরছে আকাশময়। ভো-কাট্টা হচ্ছে মাঝে মধ্যে। ডানা মেলে পাখির মতো ওড়াউড়ি করছে জিভেগজা, পানতুয়া আর জিলেপি। সবার গায়ে সাইনবোর্ডের মতো বড় বড় হরফে লেখা আমাকে খাও, আমি খুব মিষ্টি, আমাকে পান কর ইত্যাদি।
      ওখানকার রাষ্ট্রপ্রধান হলেন তিতিরদিদি। কি অসামান্য সুন্দরী ও রূপবতী। যেমন তার রূপের ছটা তেমনি তার জমকালো পোশাকের বাহার। এমনিতে বেজায় রাশভারি হলেও আমাকে দেখে কেন জানি না ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন। আর অমনি এক অবাক কাণ্ড । তার হাসির সঙ্গে ঝরতে লাগল রাশি রাশি মুক্তোদানা। সে কি দৃশ্য ! বলে বোঝাতে পারব না। তিতিরদিদির পরেই ইল্লির স্থান। ইল্লির রূপের গুণের বর্ণনা দেয়া অন্ততঃ আমার সাধ্যের অতীত। তাছাড়া গোগোদাই বা কি মনে করবেন? ইল্লির প্রধান সহচরী কালুর সঙ্গে গোগোদা কেন জানি না আমাকে এত বিশেষভাবে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি লজ্জায় তার দিকে মুখ তুলেই তাকাতে পারিনি। ওখানে আরও যাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাদের মধ্যে বৈদেশিক মন্ত্রকের পুপলু, তথ্য ও বেতার দপ্তরের বাবুই, টেলিভিশন কেন্দ্রের শারি ও মৌরি, নৃত্য পটিয়সী মুন্না, সভাকবি ও ছড়াকার ঘুচাই, চারু ও কারু শিল্পী তাতাই, কুস্তিগীর ডোডো, সানাই ও বিউগল বাদক দুই যমজ ভাই বুদ্ধ-ভূতুম, বাঘা সাংবাদিক শার্দুল শাবক তিতাস, যন্ত্রবিদ্যবিশারদ বাবু ভোজনপটু তকাই, বীরাঙ্গনা তৃণা, সুন্দরী শ্রেষ্ঠা নায়িকা রাজুমাসি, কোকিলকণ্ঠী সুগায়িকা দুই বোন রিঙ্কু ও টিঙ্কু, ক্ৰন্দন শিল্পী বুড়ি, বন্ধন শিল্পী রাবড়ি ও তুবরি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য অনেকেই ছিলেন। যাদের সকলের সঙ্গেই আমার দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছিল। এবার উলুউলু দেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের বিৰরণ দেয়া যাক। জনপ্রিয় দৈনিক কাগজে রয়েছে তিনটিঃ কাঁচাআম, ইলশেগুঁড়ি ও পাকাকলা।
      দৈনন্দিন আহার্যের মধ্যে আচার চাটনি, পনির মোরব্বা, ফুচকা, আলু কাবলি ও আমসত্ত্বই প্রধান খাবার। বড়শি ফেললে চটপট উঠে আসে টকটকে লাল চিংড়ি ফ্রাই,হাতের পাতার মতো ইয়াব্বড় ভেটকির কাটলেট। অনুরোধ করলেই খুব সুন্দর রাঙা কুসুম সমেত জলপোচ ডিম পেড়ে দেয় মোরগেরা প্লেটের ওপর কিংবা সাজিয়ে দেবে ফাউল কারি বা আস্ত রোস্ট। তুলতুলে নধর খরগোশ, ধেড়ে ইঁদুর, ছুঁচো, মিনি বেড়ালের পিঠে চেপে ঘোরা যায় সারা শহর। বিরাট বিরাট মোষেরা হচ্ছে ডবল ডেকার। শজারু হচ্ছেন যাননিয়ন্ত্রণের কর্তব্যক্তি। নানা কাজে তাকে সাহায্য করেন ময়না ও টিয়াপাখি। ইস্কুলটিস্কুলেরবালাই নাথাকলেও আছে অনেক চিড়িয়াখানা, ফুলের বাগান, রঙিন টেলিভিশন কেন্দ্র, চড়ুইভাতির জায়গা আর দোকান ভর্তি কার্টুনের বই। টিনটিন, অরণ্যদেব, বাদুড়-মানব, জাদুর ম্যানড্রেক, মিকিমাউস, কালিকেওর স্মরণীয় কীর্তিকলাপ। সুকুমার রায়ের যাবতীয় রেখা ও লেখা, বিভূতিভূষণের আম আঁটির ভেঁপু, শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প, কমলকুমার মজুমদারের কাঠখোদাই, সত্যজিৎ রায়ের লিমেরিক, অমিতাভ চৌধুরীর ছড়রা সবাই গোগ্রাসে গেলে গ্যালনে গ্যালনে। পাগলা দাশু খুড়ো, সীতানাথ বন্দ্যো, বুড়ো আংলা, হর্ষবর্ধন গোবর্ধন, বিনি, ইতু, প্রোফেসর শঙ্কু, ফেলুদা, গুপী, বাঘা, যাদুকর বরফি, ঘনাদা, পদী পিসী এঁরা পৌরসভার সর্বজনমান্য বিশিষ্ট নাগরিক। নানার্থ বর্ণসংক্ষেপ অভিধান সরকারী উদ্যমে সম্পাদনা করেছেন প্রফুল্ল মুৰ্দ্ধন্য ণ। পূর্ণেন্দু পত্রীর গবেষণা-গ্রন্থ 'কি করে কলকাতা হল গত বছরের রাষ্ট্রীয় পাতাবাহার পুরস্কারের সম্মান মূল্য এক লক্ষ লজেঞ্চুষ। মতি নন্দীর স্ট্রাইকার এবারকার সব চাইতে হিট ছবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর সমস্ত হলগুলোতে একাদিক্রমে ৫২ সপ্তাহ ধরে হাউস ফুল চলে বিশ্ব রেকর্ড করেছে।
      স্থানীয় ফুটবল লীগ পেয়েছে এবার বকপল্লী একাদশ। কোচ বক, গাই বক, লাল বক, খুন্তে বক, ওয়াক বক, কালো বক, কুঁড়ো বক, কানা বক প্রভৃতি দুর্ধর্ষ খেলোয়াড়েরা ছিল দলে। গোলদাতাদের শীর্ষস্থান অধিকার করেছে কানা বক। শীল্ডের ফাইনাল খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সে কি উত্তেজনাপূর্ণ খেলা! সবাইকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল দুটি বিদেশী দল। ছাঙ্গু হ্রদের ‘অম্বুকুক্কুট বন্ধু একাদশ’ ও লাডাকের ‘টিট্রিভ প্রতিভা’। লম্বপুচ্ছ, জলপিপি, চক্রবাক, সোনাজঙ্খা, গগনভেরী, শরাল, ডাহুক পানকৌড়ি, গগনবেড়, হাড়গিলা, সারস, সলিলবায়সের মতো নামজাদা খেলোয়াড়রা ছিলেন দু’দলে। পর পর দু দিন অতিরিক্ত সময় খেলার পরও ফলাফল অমীমাংসিতভাবে শেষ হবার মুহুর্তে ‘অম্বুকুক্কুট বন্ধু একাদশের’ ধুন্ধুমার সেন্টার ফরোয়াড আচমকা একটি দূরপাল্লার সটে গোল করে বসে। কিন্তু ‘টিট্রিভ প্রতিভার’ খেলোয়াড়রা গোলটির বৈধতা সম্পর্কে আপত্তি জানায়। টাকলামাকানের রেফারি টেকো কাক দুই প্রান্তিক মানুষ গোবির ন্যাড়া শকুন ও পামিরের খোড়া বাজের সঙ্গে এ নিয়ে সলাপরামর্শ করেছেন, এমন সময় দেখা গেল, অম্বুকুক্কুট দলের হাড়গিলা শীল্ডটি নিয়ে চোঁচা দৌড় লাগিয়েছে। অমনি দারুণ হাতাহাতি আর হট্টগোলে সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত যতদূর জানি কর্তৃপক্ষ কোন সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌছুতে পারেননি।
      কখনো যদি উলুউলু দেশে যাবার জন্যে মনটা উডুউডু করে প্রথমেই কিন্তু যেতে হবে গোগোদার কাছে, আর গোগোদার কাছে যেতে হলে আসতে হবে আমার কাছে আর আমি কিন্তু এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পেরে গেছ এটা-ওটা-সেটা খেতে ভীষণ ভালবাসি। সুতরাং ...

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য