অগ্নিকুমার - আদিবাসী লোককথা

     সেই পুরনো কালে এক গায়ে ছিল এক সর্দার। সবাই তাকে মানত। অনেক দিন পরে তার এক ছেলে হল । বড় আদরের ছেলে। বাবা-মায়ের আদরের ছেলে। ছোট ছেলের হাসিতে দুষ্টুমিতে বাড়ি ভরে থাকত।
     সুখ বেশিদিন থাকল না। ছেলের বয়েস যখন তিন বছর তখন মা মারা গেল। বাবা আবার বিয়ে করল। ছেলে সৎমায়ের কাছে বড় হতে লাগল।
     এমনি করে দিন কাটে। ছেলের বয়েস এখন নয় বছর। সেই সময় পাহাড়ের ওপরে অনেক দূরের এক গাঁ থেকে বাবার নেমন্তন্ন এল। বাবা যাবে ওই গায়ের সর্দারের বাড়ি। কি এক উৎসব আছে। থাকতে হবে দুমাস। পাহাড়ের কোল বেয়ে নদী একেবেঁকে ওই গায়ে গিয়েছে। বাবা যাবে লম্বা ডিঙিতে।
      যাবার সময় বাবা বউকে বলল, “আমি ফিরে আসব ঠিক দুমাস পরে। তোমাকে অন্য কোন কাজ করতে হবে না। শুধু ছেলের যত্ন নেবে। ওর চুল প্রতিদিন ভালোভাবে আঁচড়ে দেবে। এটা কিন্তু ভুলো না। মায়ের ওপরে ছেলের ভার দিয়ে বাবা ডিঙিতে উঠল। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দুজন সর্দারকে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
     সেই দিন থেকে মা খুব খারাপ ব্যবহার শুরু করল। দুচোখে তাকে দেখতে পারে না। দিনরাত খাটায়। ছেলে কিছু বলে না, মায়ের কথা মেনে চলে।
     মা হয়তো বলে, ‘আজকে তোমায় পাহাড়ে যেতে হবে। ওখান থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনো। আগুন ধরাতে হবে। কাঠ বয়ে আনল ছেলে। সঙ্গে সঙ্গে মা বলল, “যাও, বাগানের আগাছা পরিষ্কার কবো। শুধু বসে বসে খাওয়া। ছেলে মাথার কাঠ নামিয়ে বাগানে চলে গেল। আগাছা তুলতে শুরু করল। নরম হাত, বড্ড ব্যথা লাগে। কিন্তু সে “না’ বলে না।
     এমনি করে সারা দিন তার খাটুনিতে কাটে। সৎমা তার দিকে ফিরেও তাকায় না। যত্ন করা দূরে থাকুক, শুধুই বকাঝকা। ছেলের চুলে মা হাতও দেয় না। ছেলের মাথা হয়েছে পাখির বাসা। এলোমেলো চুল, নোংরা মাথা। এমনি করে দিন কাটে।
     এমনি করে দুমাস কেটে গেল। কালকে সর্দার ফিরবে। মা ছেলেকে বলল, ‘কালকে সকালে তোমার বাবা ফিরবে। তাই আজ তোমাকে খুব খাটতে হবে। পাহাড়ি বন থেকে অনেক কাঠ বয়ে আনো, খুব মন দিয়ে বাগান পরিষ্কার করো।
সারাদিন খাটবে।
     পরের দিন খুব ভোরে ছেলের ঘুম ভেঙে গেল। আজ বাবা আসবে। খুব আনন্দ। ছেলে মাকে বলল, 'মা, আজ তো বাবা আসবে। আমরা তাড়াতাড়ি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তাহলে বাবা নেমেই আমাদের দেখতে পাবে।
      মা বলল, ‘হ্যাঁ, যেতে তো হবেই। তুমি একটু আগে যাও। আমি পেছনে আসছি। আমি চুল আঁচড়িয়ে পোশাক বদলে যাচ্ছি। তুমি রওনা হও। ছেলে লাফাতে লাফাতে নদীর দিকে রওনা হল।
     ছেলে চলে যেতেই মা একটা খুর বের করল। মুখের কয়েকটা জায়গা কেটে ফেলল। রক্ত পড়ছে, খুব ব্যথা করছে—তবু সৎ মা তাই করল। তারপর চুলগুলো এলোমেলো করে চাদর ঢাকা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
     ওই দূরে বাবার ডিঙি আসছে। বাবাকে বাইরে দেখা যাচ্ছে। ছেলে আনন্দে লাফাতে লাগল, হাত নাড়তে লাগল। বাবার ডিঙি তীরে ভিড়ল। এগিয়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে বাবা অবাক হল। ছেলের এ কি অবস্থা ! চুল এলোমেলো, দেহ নোংরা। বাবার খুব কষ্ট হল। বলল, “তোমার এরকম দশা কেন?
     ছেলে সরল মনে বলল, “মা তো আমায় শুধু খাটায়। পাহাড়ে পাঠায়। বাগানে আগাছা তোলায়। মা যে আমাকে সাজিয়ে দেয় না। আমি কি করব?
     ‘তোমার মা আসেনি কেন?‘
     মা বলল চুল ঠিক করে পোশাক বদলে আমার পেছনেই আসবে। এখুনি আসবে। অনেকক্ষণ বাবা-ছেলে নদীর তীরে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রইল। এই বুঝি সে আসে। অনেক সময় কেটে গেল। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? তারা হাঁপিয়ে উঠল। শেষকালে বাড়ির পথে রওনা দিল।
     বাবা নিজের ঘরে ঢুকে দেখে, বউ চাদর ঢাকা দিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। বাবা ডাকতেই মা চাদরের ঢাকা সরিয়েই কেঁদে ফেলল। বউয়ের মুখ দেখে বাবা চমকে উঠল। রক্তমাখা মুখ। মা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমায় আনতে যাব কেমন করে? দেখ তোমার ছেলের কাণ্ড। খুর দিয়ে মেরেছে। এ মুখ বাইরে কাউকে দেখানো যায়? তাই আমি যাই নি। তোমার যাওয়ার পরদিন থেকে প্রতিদিন ছেলে খুর নিয়ে আমায় এমনি করে মারত আর চেঁচিয়ে বলত,—বুড়ি সৎমা কোথাকার! দূর হ! উঃ, ভাগ্যি তুমি এসেছ, নইলে আমি মরেই যেতাম। মা কাঁদতে লাগল।
     বউয়ের কথা শুনেই বাবা রাগে ফেটে পড়ল। ছেলের কোন কথাই আর সে শুনল না। চিৎকার করে বলল, ‘এত শয়তান তুমি? মায়ের গায়ে হাত তোল? যে মা তোমাকে বড় করে তুলেছে? অকৃতজ্ঞ শয়তান কোথাকার। দেখাচ্ছি মজা। দূর করে দেব বাড়ি থেকে।
      বাবার ছিল তিনটে ঘোড়া। তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো ঘোড়াটাকে সে নিয়ে এল। খুব ভালো পোশাক দিল, দূর গাঁ থেকে ছেলের জন্য যেসব উপহার এনেছিল তাও দিল। ঘোড়ায় চাপিয়ে বাবা ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। ছেলের বুক কান্নায় যেন ফেটে যাচ্ছে।
     কি আর করবে সে? মা এমন মিথ্যে কথা বলল। বাবা দিল তাড়িয়ে। বেশ তাই হোক। নতুন ঝকমকে পোশাক পরে ঘোড়ায় চেপে ছেলে ছুটে চলল দক্ষিণ দিকে। পেছনে পড়ে রইল তার অতি-চেনা গ্রাম, খেলার সঙ্গীসাথীরা। চলছে, চলছে, এগিয়ে চলেছে ছেলে। এমন সময় সামনে পড়ল এক পাহাড়ি নদী। প্রবল স্রোত। ঘোড়া নামলে ভেসে যাবে। ঠিক আছে, কেমন করে নদী ডিঙোতে হয় আমি জানি। ছেলে চাবুক দিয়ে ঘোড়ার পেছনে আঘাত করল। আরে! এক লাফে ঘোড়া নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নামল।
     আবার চলতে শুরু করল। পাহাড়ি পথ। শেষকালে সামনে পড়ল এক উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় কালো মেঘ জমে রয়েছে। সে সামনে যেতে পারছে না, বামদিকে নয় ডানদিকেও নয়। ঠিক আছে। এমন কিছু শক্ত কাজ নয়। কেমন করে পাহাড় ডিঙোতে হয় আমি জানি। আমার ঘোড়াও জানে। ছেলে চাবুক দিয়ে ঘোড়ার পেছনে আঘাত করল। ঘোড়া মাথা নোয়াল। ছেলে আবার আঘাত করল। আরে! এক লাফে ঘোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে ওপারে গিয়ে থামল। আবার চলতে শুরু করল।
     চলছে, চলছে—এগিয়ে চলেছে ছেলে। হঠাৎ দেখতে পেল, জোয়ারের খেতে একজন বুড়ো-মতন লোক কাস্তে হাতে ফসল কাটছে। তার লম্বা লম্বা এলোমেলো চুল। ছেলে তার কাছে গেল। মধুর গলায় বলল, “কর্তাবাবা ও কর্তাবাবা, আমি কাজ চাই। কারও কাজের লোক দরকার? এখানে কেউ কি কাজের লোক খুঁজছে? তুমি কিছু জান?
     ‘হ্যাঁ, তা জানি বৈকি। সব খবরই রাখি। ওই পাহাড়ের উত্তরে একজনের মস্ত বাড়ি আছে, মস্ত খামার আছে। তা সেথায় পঁয়ত্রিশ জন কাজ করে। সাতদিন আগে একজন কিষান মারা গেল। এখনও কাউকে পায়নি। তা বাছা, তুমি দেখতে পার। কিন্তু ও পোশাকে কি তোমাকে কিষাণ রাখবে?
     ‘তাহলে এক কাজ কর কর্তাবাবা। আমার পোশাক তুমি নাও, তোমার কিষানের পোশাক আমাকে দাও। তাহলেই নেবে।
     বুড়ো একটু ভয় পেয়ে বলল, তা কি হয়? ওই পোশাক আমি পরলে সবাই সন্দেহ করবে। চোর ভেবে ধরবে আমাকে। কাজ নেই। বরং তুমি আমার পোশাক নাও। তোমার যখন খুবই দরকার।
     ‘বেশ তাই দাও। কিন্তু আমাকে একটা ঝুড়ি দিতে হবে। আমার পোশাকগুলো ওর মধ্যে রেখে তোমার কাছে জমা রাখছি। আপত্তি নেই তো?
     বুড়ো রাজি হল। ছেলেটা বড় মিষ্টি, বড় ঘরের ছেলে বলে মনে হয়। ছেলেটা ঝুড়িতে পোশাক খুলে রাখল। ঘোড়ার লাগামও রেখে দিল। তারপর ঘোড়াকে পাহাড়ি ঢালুতে ছেড়ে দিল। সেখানে বেশ ঘন বন । তারপর কিষানের পোশাক পরে বুড়োর সঙ্গে খামারের মালিকের বাড়িতে গেল। তার লোকের দরকার। ছেলেকে কাজ দিল সে। দিন-মজুরের কাজ। ছেলে তাতেই খুশি ।
     তখন থেকেই কাজে লাগল ছেলেটি। খামারের মালিক তাকে মাঠে পাঠাল। সেখান থেকে লম্বা লম্বা ঘাস কেটে আনতে হবে। গোরু-মোষ খাবে। একটু পরেই ছেলেটি বুঝল, কাজটা বেশ শক্ত। ঘাসের ডগায় হাত ছড়ে যাচ্ছে, কাস্তের আঘাতে হাত কাটছে। এসব কাজ কি সে কোনদিন করেছে?
     সে ফিরে এল মালিকের কাছে। বলল, “আমার হাত কেটে যাচ্ছে, আমি ঘাস কাটতে পারব না। তার চেয়ে আমাকে বাগানের আগাছা পরিষ্কার করতে দাও। এটা আমি জানি।
     ‘বেশ, তাই কর। বাগানেই কাজ কর । অল্প কিছুক্ষণ কাজ করেই ছেলে বুঝল, এ বাগান তাদের বাড়ির বাগান নয়। সে ফিরে এল। মালিককে বলল, ‘বাগানে আমি কাজ করতে পারব না। হাতে আমার ফোস্কা পড়ে গিয়েছে। জ্বালা করছে। আমি বরং রান্না করতে পারব। সাতজন মিলে যা রান্না করে আমি একাই তা পারব?
     ঠিক আছে, তাই হবে। তুমি রান্নাই করবে। তুমি বড্ড ছোট। তোমার যা খুশি তুমি তাই করো। যা তোমার মন চায়।
     ছেলেটি বলল, শুধু আজকের দিনের জন্য আমার সাতজন লাগবে। সাতজন থাকলেই হবে ।
     ‘বেশ, তাই হবে। সাতজনকে নিয়ে ছেলে রান্নাঘরে গেল। বিরাট রান্নাঘর। সে একজনকে পাঠাল নরম কাদা আনতে। আর একজনকে পাঠাল পাথর বয়ে আনতে। দুজনকে পাঠাল জল আনতে, একজনকে পাঠাল খড় আনতে। আর এগুলো আনা হয়ে গেলে অন্য দুজনকে কাদা ছেনতে দিল। কাদার মধ্যে চুন, বালি আর খড়ের টুকরো দিল। কাদা খুব মজবুত হল। তারপর পাথর সাজিয়ে সাতটা উনুন তৈরি করল। একসঙ্গে সাতটা উনুন জ্বলিয়ে দিল।
     অল্পক্ষণের মধ্যে অতগুলো লোকের তিন বেলার ভাত রান্না হয়ে গেল। আগে কি হত ? দুপুর গড়িয়ে যেত সকালবেলার ভাত রাঁধতে, সন্ধেবেলায় তৈরি হত দুপুরের ভাত আর মাঝরাতে তৈরি হত রাতের ভাত। এখন থেকে সকালবেলায় কিষানদের ডেকে বলত, সকালের ভাত খাও ! ঠিক দুপুর বেলায় বলত, দুপুরের ভাত খাও। সূর্য পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়লেই সে বলত, রাতের ভাত খাও।
খামারের মালিক মহা খুশি । কিষানরাও খুশি । এমন সুন্দর ব্যবসথা। কাজও ভালো হতে লাগল। মালিক বলল, ‘খুব ভালো ছেলে তুমি। তুমি রান্নাঘরের কাজ খুব ভালো পার। আগুন তোমার হাতের মুঠোয়। তুমি তো অগ্নিকুমার । চিরকাল তুমি আমার কাছে কাজ করো। তুমি এখানেই থাক। আর শোন, কালকে তো আমাদের পরব। নাচ-গান হবে। কাল কিন্তু দুপুরের ভাত অনেক আগেই তৈরি করতে হবে। পারবে তো ? পরের দিন সকালে অগ্নিকুমার যখন রান্না করছে তখন খামার-মালিক এসে বলল, ‘অগ্নিকুমার, তুমিও কিন্তু আজকের নাচের পরবে যাবে।
সে বলল, কিন্তু আমি তো যেতে পারব না। ছয় বছর আগে এই দিনে আমার মা মারা গিয়েছিল। আনন্দের পরবে এই দিনে যোগ দিতে নেই।
ঠিকই, তুমি যোগ দেবে কেমন করে ? বেশ, সবাই তো চলে যাবে। তুমি একা সব দেখাশোনা করবে। এখানে তুমি একাই থাকবে। আমি নিশ্চিন্ত ।
খামার-মালিক চলে গেল। অন্য কিষানরাও চলে গেল। পাহাড়ের এই পশ্চিম এলাকায় সে একা। সবাই চলে যেতেই অগ্নিকুমার ভালো করে চান করে নিল ।
তারপরে গেল বুড়ো কিষানের বাড়িতে। তার সুন্দর পোশাক পরে নিল। তারপর উঠল এক উঁচু গাছে। সেখান থেকে চিৎকার করে তার ঘোড়াকে ডাকল। বনের গভীর থেকে ঘোড়া বেরিয়ে এল। তাকে লাগাম পরাল সে। ঘোড়া ছুটিয়ে সে নাচের আসরের উত্তর দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। এবার অগ্নিকুমারের ঘোড়া নাচবে– এ কথা বলেই সে ঘোড়ার পেছনে চাবুক মারল। এক লাফে ঘোড়া আসরের মাঝখানে পৌঁছে গেল। নাচতে লাগল ঘোড়া, সুন্দর ভঙ্গিতে। পিঠের ওপরে ছেলেটি।
      সেখানকার গোষ্ঠীপতি ও অন্যান্য লোকজন চিৎকার করে উঠল, ‘আজ আমাদের মধ্যে আকাশের রাজ্য থেকে এক দেবদূত এসেছে। সবাই উঠে দাঁড়াও, দেবদূতকে পূজো করো। সবাই মাথা নিচু করে প্রণাম করল।
     খামার-মালিকও মাথা নিচু করে প্রণাম জানাচ্ছে। তার পাশে ছিল তার মেযে। সে বলে উঠল, "এ তো আমাদের অগ্নিকুমার ! তার বাঁদিকের কানের কাছে একটা কালো চিহ্ন আছে। এই দেবদূতেরও আছে। এ অগ্নিকুমার।
     বাবা ধমক দিয়ে বলল, “তুমি অনেক বড় হয়েছ। তোমাব বিয়ের বয়েস হয়েছে। ছেলেমানুষি করবে না। অপবিত্র কথা বলবে না। দেবদূতকে অভক্তি করতে নেই। প্রাণাম করো। আকাশ রাজ্যের দেবদূত সে।
     মেয়ে একটু হেসে মাথা নিচু করে দেবদূতকে প্রণাম করল, কিন্তু চোখ খুলে। আড়চোখে চেয়ে রইল।
     নাচের আসর ভেঙে গেল। সবার আগে ফিরে এল ছেলে। ঘোড়াকে পাহাড়ের কোলে বনে ছেড়ে দিল। পোশাক আর লাগাম ঝুড়িতে করে বুড়োর বাড়ি রেখে এল,—আবার কিষাণ হয়ে পাহাড়ের পশ্চিমে চলে গেল। ঘুমিয়ে পড়ল।
     কিছুক্ষণ পরে খামার-মালিক এসে তাকে ডেকে তুলে বলল, ‘অগ্নিকুমার! আঃ, আজকে যদি তুমি যেতে। খুব ভালো হত। আকাশ-রাজ্য থেকে ঘোড়ায় চেপে এক দেবদূত এসেছিল। আমাদের পরবে নাচের আসরে। আমবা সবাই তার পুজো করেছি। 
     ‘তাই নাকি? দেবদূত এসেছিল? আঃ, আমার দেখা হল না। যেতে পারলে কি ভালোই হত।’
     খামার মালিক বলল,‘কালকের পরের দিন আবার নাচের পরব হবে। তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাবান্না শেষ করে রেখো।
    কালকের পরের দিন এল। খুব সকালে উঠেই অগ্নিকুমার সব কিযানের জন্য সকালের ভাত তৈরি করে ফেলল। কাজ শেষ হয়েছে এমন সময় খামার-মালিক এসে বলল, আজকে তুমি চলো আমাদের সঙ্গে। নাচের পরবে।
     অগ্নিকুমার মাথা নিচু করে বলল, “যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আজকের দিনে আমার ঠাকুমা মারা গিয়েছিল। আমার বোধহয় আজকের দিনে যাওয়া ঠিক হবে না। দুঃখের দিনে আনন্দ করতে নেই।
      সবাই চলে গেল। কেউ নেই পাহাড়ের পশ্চিম এলাকায়। এক অগ্নিকুমার। সে ভালোভাবে চান করে নিল। বুড়ো কিষানের বাড়িতে গিয়ে ভালো পোশাক পরে নিল। গাছে উঠে ঘোড়াকে ডাকতে যাবে এমন সময় খামার-মালিকের মেয়ে ফিরে এসেছে। সবার সঙ্গে যেতে যেতে সে ফিরে এসেছে। বলেছে, বাড়িতে কি যেন ভুলে রেখে এসেছে। কি আর করে অগ্নিকুমার। মেয়ে জেনে ফেলেছে। মেয়েকে ঘোড়ায় চাপিয়ে অগ্নিকুমার রওনা দিল। দুজনে এল নাচের আসরের পুব দিকের দরজায়।
     সবাই দেখ, অগ্নিকুমারের ঘোড়া কেমন নাচে,'-এ কথা বলেই চাবুক দিয়ে ঘোড়ার পেছনে আঘাত করল। ঘোড়া লাফ দিল আর আসরের মাঝখানে এসে নামল। ঘোড়া নাচতে লাগল। সুন্দর ভঙ্গিতে।
     গোষ্ঠীপতি আর খামার-মালিক বলে উঠল, 'আজকে দেবদূত এসেছে তার বউকে নিয়ে। কি সুন্দর। সবাই উঠে দাঁড়াও, পুজো করো।
     সকলের ফেরার আগেই অগ্নিকুমার ও মেয়ে পাহাড়ের পশ্চিমে চলে এল। ঘোড়াকে ছেড়ে দিল পাহাড়ি ঢালু বনে, পোশাক বদলে নিল, তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
      একটু পরেই খামার-মালিক এল। ঘুম থেকে জাগিয়ে সে বলল, ‘অগ্নিকুমার, আজকে গেলে তোমার আরও ভালো লাগত। আজকে দেবদূত এসেছিল বউকে সঙ্গে নিয়ে। কি সুন্দর।
     ‘তাইতো, গেলে খুব ভালো লাগত। দেখতে পেতাম। কিন্তু কি করব আমি। খামার-মালিক বাড়িতে ঢুকে দেখে মেয়ে শুয়ে রয়েছে। ‘তুমি আজ কেন নাচের আসরে গেলে না? বাবা জিঙ্গেস করল। মেয়ে বলল, তার পেটে ভীষণ ব্যথা করছে। যাবে কেমন করে?
     বাবা ব্যস্ত হল। একজন বদ্যি ডাকা দরকার। বাবা একথা বলতেই মেয়ে বলল, ‘বদ্যির দরকার নেই। বরং দেবতার থানের পুজারিণীকে ডেকে আনো।
      পুজারিণী এল, আঁক কষে ভবিষ্যৎ-বাণী করল, ‘দেহের কোন রোগ নয়। রোগ মনের। কিংবা বহু পুরনো মানসিক দুর্বলতার। অন্য চিকিৎসা দরকার।
      মেয়ে এ কথায় আপত্তি জানাল। লজ্জা পেল। মাথা নেড়ে বলল, “নতুন যে পুজারিণী থানের ভার পেয়েছে তাকে ডেকে আনো।
     নতুন পুজারিণী এল। আঁক কষে ভবিষ্যৎ-বাণী করল, "এ রোগ সত্যি অন্যরকম। তবে বহু পুরনো নয়। অল্পদিনের রোগ। এই খামারে যেসব লোকজন কাজ করে তাদের মধ্যে একজনকে মেয়ের খুব ভালো লেগে গিয়েছে। তারা নিজেদের পছন্দমতন ভালো ভালো পোশাক পরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ুক। মেয়ে যার হাতে এক পেয়ালা মিষ্টি দুধ তুলে দেবে, জানবে তাকেই মেয়ের পছন্দ। আসলে রোগটা অন্যরকম।
     খামার-মালিক তার সব কিষানকে একথা বলল। সবাই এল। কিন্তু মেয়ে কারও হাতে মিষ্টি দুধের পেয়ালা তুলে দিল না। আর কেউ বাকি রয়েছে? হ্যাঁ, একজন আসেনি। সে হল নোংরা পোশাকের হতভাগ্য অগ্নিকুমার।
     খামার-মালিক অগ্নিকুমারকে নতুন পোশাক ধার দিল। বলল, সে-ও অন্য কিষানদের মতোই। সে আসুক নতুন পোশাক পরে। দেখা যাক কি হয়।
      অগ্নিকুমার ভালোভাবে চান করে নিল। খামার-মালিকের পোশাক শুয়োরের ডেরায় ছুড়ে ফেলে দিল। তাকে আরও ভালো পোশাক ধার দেওয়া হল, সে গোয়ালের পাশে ফেলে দিল। আরও সুন্দর পোশাক তাকে দেওয়া হল, সে ফেলে দিল রান্নাঘরের পেছনে। শেষকালে অগ্নিকুমার চলে গেল বুড়ো কিষানের বাড়ি। নিজের রেখে-দেওয়া পোশাক পরে, বন থেকে ঘোড়ায় চেপে ফিরে এল খামার-মালিকের বাড়িতে। অগ্নিকুমারকে হাত ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে এল খামার-মালিক, ঢুকল মেয়ের ঘরে। মেয়ের রোগ তক্ষুনি সেরে গেল। চোখ-মুখে হাসিহাসি ভাব। মেয়ে মিষ্টি দুধের পেয়ালা তুলে দিল অগ্নিকুমারের হাতে।
     বাবা বলল, ‘এসব তো কিছুই আমি বুঝতে পারি নি। চিনতে পারি নি। মেয়েকেও চিনতে পারি নি। তা, অগ্নিকুমার, তুমি কি আমার জামাই হবে? আমার একমাত্র আদরের জামাই?
      অগ্নিকুমারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ, নাচ-গান। সবাই খুশি। তিনদিনের বিয়ের পরব শেষ হল। তারপরের দিন অগ্নিকুমার বলল,‘বাবা, আমাকে তিন দিনের ছূটি দিতে হবে। আমি দূর গাঁয়ে আমার বাবা-মাকে একবার দেখতে যাব।’
     খামার-মালিক বলল, তা কি করে হবে? তিন দিনের জন্য তোমায় যেতে দিতে পারি না। শুধু আজকের দিনের জন্য তুমি যেতে পার। শুধু একদিনের জন্য। 
     ‘ঠিক আছে, একদিনের জন্যই যাব।’ আগ্নিকুমার যাওয়ার জন্য তৈরি হল। 
     বউ বলল, “তুমি সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাবে, না পাহাড়ি পথে যাবে? তোমার কি ইচ্ছে?
    একটু ভেবে অগ্নিকুমার বলল, “যদি সমুদ্র-পথে যাই তাহলে তিনদিন সময় লাগবে। আর পাহাড়ি পথে গেলে লাগবে মাত্র একদিন । তাই পাহাড়ি পথেই যাব।
     চোখ-দুটো ভিজে গেল বউয়ের। কান্না-ভরা গলায় বলল, “যখন তুমি পাহাড়ি পথে ঘোড়া ছুটিয়ে যাবে তখন ওপর থেকে তুঁতফল তোমার ঘোড়ার জিনের ওপর পড়বে। মাঝে মধ্যেই পড়বে। তোমার যদি খুব তেষ্টাও পায় তবু তুমি ওই ফল খাবে না। যদি তুমি ওই তুতফল একটাও খাও, তাহলে আমাদের দুজনের মধ্যে আর কোনদিন দেখা হবে না। তোমায় আর কোনদিন আমি দেখতে পাব না ; বউ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
      ঘোড়া ছুটিয়ে পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলেছে অগ্নিকুমার। হাওয়ার বেগে চলেছে। হঠাৎ ওপর থেকে কয়েকটা তুঁতফল তার ঘোড়ার জিনের ওপরে পড়ল। মনে পড়ল তার বউয়ের কথা। একটু হেসে সে ফলগুলো ফেলে দিল। এগিয়ে চলেছে অগ্নিকুমার। তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে উঠেছে, বুক ফেটে যাচ্ছে। আশে পাশে কোথাও পুকুর-ঝরনা কিছুই দেখতে পেল না। জিভ শুকিয়ে তালুতে আটকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই তুতফল ওপর থেকে জিনের ওপরে পড়ছে। ফেলে দিচ্ছে অগ্নিকুমার। কিন্তু আর তো পারে না। হাওয়ার বিপরীতে যাচ্ছে, আরও কষ্ট হচ্ছে। বুক যেন চৌচির হয়ে যাবে। ভুলে গেল বউয়ের কথা। তুলে নিল তুতফল। মুখে দিতেই অগ্নিকুমার ঢলে পড়ল জিনের ওপর। অগ্নিকুমার মরে গেল।
ঘোড়া সব বুঝতে পারল। এবার উঠতে হবে পাহাড়ে। পেছনের পা ভাঁজ করে সে উঠতে লাগল, যেন অগ্নিকুমার পড়ে না যায়। পাহাড় থেকে নামবার সময় সামনের পা ভাজ করে নামতে লাগল, যেন অগ্নিকুমার পড়ে না যায়। শেষকালে ঘোড এল অগ্নিকুমারের বাবার গাঁয়ে। ঘোড়া তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। এখানেই জন্মেছে অগ্নিকুমার। তিনবার ডাকল ঘোড়া। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
      বাবা ঘোড়ার ডাক চিনতে পেরেছে, এ তো তার ছেলের ঘোড়া। বাবা চিৎকার করে বলল, “আমার ছেলে ফিরে এসেছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সে কেন বাবা বলে ডাকছে না! শুধু কেন ঘোড়ার ডাকের শব্দ হল? বউ শিগগির যাও, দরজা খোল, খারাপ কিছু নয়তো? আমার ছেলে?
     সৎমা তাড়াতাড়ি দরজার কাছে গেল। হতচ্ছাড়াটা ফিরে এল নাকি। দরজা খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে, একটা তেজি পা এগিয়ে এল,— ঘোড়ার শক্ত পা। আঘাত করল সৎমাকে। ছিটকে পড়ল মেঝেতে। তক্ষুনি সৎমা মরে গেল।
      বাবা অবাক হল। কি হয়েছে? দরজার কাছে ছুটে গেল। এসেই দেখে, ঘোড়ার ওপরে নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছে আদরের ছেলে। তাকে কোলে তুলে নিয়ে এল, শুইয়ে দিল একটা পিপের ওপরে। বলল, "যে ছেলে আমার ফিরে আসবে টগবগ করে, সে এল নিঃসাড় হয়ে । কেন এমন হল? শেষকালে ছেলেকে একটা বড় পিপের মধ্যে শুইয়ে তার ডালা বন্ধ করে দিল।
     পাহাড়ের পশ্চিম এলাকায় বউ ছটফট করছে। মনে মনে বারবার বলছে, ‘একদিনেই ফিরে আসার কথা। তিন দিন হয়ে গেল। সে কেন ফিরছে না? পাহাড়ি পথে তুতফল খায়নি তো? বুকটা কেঁপে উঠল, চোখদুটো ঝাপসা হয়ে এল।
     বউ জানে না অগ্নিকুমারের গ্রাম কোথায়। সে কোন দিকে। তবু ভেঙে পড়লে চলবে না। সে তিন পেয়ালা সঞ্জীবনী জল সঙ্গে নিল। হেঁটে চলল পাহাড়ি পথে। যে পথ পার হতে ঘোড়ার সারাদিন লেগেছিল, বউ সে পথ পেরিয়ে গেল অর্ধেক সময়ে। পৌঁছে গেল অগ্নিকুমারের বাড়িতে।
     এটা কি অগ্নিকুমারের বাড়ি? সৎমায়ের মিথ্যে কথায় বাবা যাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, এটা কি তার বাড়ি।
     "তার দেহ কোথায় রেখেছ? আমাকে দেখাও। 
     যাকে আমি চিনি না, যে মানুষ একেবারে অচেনা, তাকে আমার ছেলের দেহ দেখতে দেব কেমন করে?
   ‘আমি অতিথি নই, আমি অচেনা নই। অগ্নিকুমার আমার স্বামী। তোমার ছেলে আমার স্বামী, আমার প্রাণ। আমাদের বিয়ে হওয়ার পর চতুর্থ দিনে সে বাবা-মাকে দেখতে এসেছিল। আর ফেরেনি। আর দেরি নয়, দেহটি কোথায়?
     ‘মেয়ে, আমি ভুল বুঝেছিলাম। শিগগির তুমি ভেতরে এসো। বাবা পিপের মধ্যে থেকে দেহটি বের করে মেয়ের সামনে রাখল। বাবা এমনভাবে ছেলেকে শুইয়ে দিল যেন ছেলে মরে নি, শুধু ঘুমিয়ে রয়েছে। বাবা কাঁদছে।
     মেয়ে সঞ্জীবনী জল নিয়ে তার দেহে ছিটিয়ে দিল, আলতো করে লেপে দিল সেই জল। বউ পাশে বসে অগ্নিকুমারের দেহে ভেজা হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে, চোখ দিয়ে জল পড়ছে।
     চোখ খুলল অগ্নিকুমার। আস্তে আস্তে বলল, “আমি সকালে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আমি সন্ধেবেলা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
    মেয়ে স্বামীর মুখের কাছে মুখ এনে বলল, ‘তুমি সকালেও ঘুমোও নি, তুমি সন্ধেবেলাও ঘুমোওনি। আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম, ওগো, তুঁতফল খেয়ো না। তৃষ্ণার কষ্টে তুমি ভুলে গেলে সব। তুঁতফল খেলে, আর ঢলে পড়লে চির অন্ধকারে। আমার কাছে ছিল মৃত-সঞ্জীবনী জল। তাই তোমায় ফিরে পেয়েছি। চলো, ফিরে যাই আমাদের শান্তি-পাহাড়ে।
     ‘ও যে আমার একমাত্র ছেলে ! ও গেলে আমি বঁচিব কেমন করে? বাবা আর্তনাদ করে উঠল। কান্নায় ভেঙে পড়ল।
     বউ বলল, ‘ওকে ছাড়া আমি তো বাঁচব না। তাহলে আমি এখানেই থাকব। ও থাকবে আর আমি চলে যাব, না তা আমি পারব না।
      অগ্নিকুমার বলল আমি দুজন বাবার দায়িত্ব নেব কেমন করে? বাবা, তুমি সর্দার, তোমার অনেক আছে। তুমি আর একটা ছেলেকে নিজের ছেলের মতো কাছে রাখো। গাঁয়ে অনেক ছেলে। আমি ফিরে যাব পাহাড়ের পশ্চিম এলাকায়, ওরা আমাকে বঁচিয়েছে, ওরাই আমাকে বাঁচিয়েছে। ওরা আমাকে অগ্নিকুমার করে তুলেছে। সবাই সুখে থাকো।
     অগ্নিকুমার আর বউ মিলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি বনের পথে। বাবা তাকিয়ে রয়েছে। ওরা মিলিয়ে গেল। বাবা আকাশের দিকে তাকিযে দেখল—সাদা সুন্দর আকাশ, কোথাও মেঘ নেই। ওরা সুখে থাকুক, ভালো থাকুক।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য