এসব আমাদের মা দিয়েছে - আদিবাসী লোককথা

      এক যে ছিল বাবা-মা। তাদের দুই ছেলে। সবাই মিলে কাজ করে। সুন্দর দ্বীপ। চারিদিকে নীল জল। এ জায়গাটা তাদের খুব পছন্দ।
      কিন্তু এমন দিন থাকল না। পরপর দু বছর খরা হল। প্রচণ্ড খরা। দুর্ভিক্ষ। সবচেয়ে কষ্ট জলের। দ্বীপের ছোট ছোট পুকুর শুকিয়ে গেল। ঝরনার জল আর পড়ে না। জলের বড় কষ্ট। চারিদিকে এত জল, কিন্তু তাতে তেষ্টা মেটে না। জিভ পুড়ে যায়। শরীর ঠান্ডা হয়, কিন্তু তেষ্টা মেটে না।
      শেষকালে মা একটা গর্ত দেখতে পেল। মাটিতে গর্ত। সেই গত বেয়ে অনেক নীচে নেমে গেলে তবেই জল মেলে। খুব কষ্ট। তবু তেষ্টা মেটাবার জল তো পাওয়া গেল।
      বাড়ি থেকে অনেক দূরে সেই গর্ত। একদিন হয়েছে কি, মা গর্তে ঢুকতে যাবে, তার পেট আটকে গেল গর্তের এক জাযগায়। আসলে, মা আবার মা হতে চলেছে। ছেলে ভেতরে বড় হচ্ছে। তাই মায়ের পেট গেল আটকে। বাবা অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু মাকে ছাড়াতে পারল না। সে তেমনি আটকে রইল। চেষ্টা করতে গেলেই যন্ত্রণায় মা চিৎকার করছে। কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না।
      অনেক সময় বয়ে গেল। মা-বাবা কেন ফিরছে না? এত দেরি তো কোনদিন হয় না? তবে আজকে কি হল? বাড়িতে বসে বসে দুই ভাই ভাবছে। বারবার বাইরে এসে দূরে তাকিয়ে দেখছে। মা-বাবা আর আসে না।
      শেষকালে কাঁদতে কাঁদতে দুই ভাই হাটা দিল। খুব তাড়াতাড়ি। গর্তের মুখে যেতেই তারা দেখল, মা নেই, বাবা চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে রয়েছে। বাবার খেয়ালই নেই, পাশে এসে দুই ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা' বলে ডাকতেই সে চমকে উঠল। সব বলল তাদের।
     নিচু হয়ে ছেলে দুটি গর্তের মুখে ঢুকল। কিছুটা এগিয়ে গিয়েই মাকে দেখতে পেল। মা ক্লান্ত হয়ে সেখানে আটকে রয়েছে। ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। মা কাঁদল না।
      ছেলেদের জড়িয়ে ধরে মা বলল, “আমি আর ফিরতে পারব না। তাতে কি?
      তোমাদের যা দেব তাতে দুঃখ থাকবে না। মায়ের জন্য কাঁদতে নেই।
      মা প্রথমে তাদের দিল একটা পাখি। ঠিক তিতির পাখির মতো দেখতে। আর দিল একমুঠো বীজ। ঠিক লাউয়ের বীজের মতো দেখতে। আরও দু-একটা জিনিস।
      ছেলেদের হাতে এসব তুলে দিয়ে মা বলল, "বাছারা, এই পাখি যখন আনন্দে তার দুটো সুন্দর ডানা ঝাপটাবে, তখন তোমাদের শস্যের গোলা জোয়ার শস্যে ভরে উঠবে।
      জলের পাত্রগুলো উপচে পড়বে টলটলে জলে। যখন লাউয়ের বীজ থেকে অঙ্কুর গজাবে, সেই ছোট গাছ পুঁতে দিয়ো মাটিতে। সেই গাছে ফল ধরবে। ফলগুলো কাটলেই তার মধ্যে নানান ধরনের ফসল পাবে। অফুরন্ত। কোন অভাব থাকবে না। আমি ফিরব না, কিন্তু তাতে দুঃখ নেই। তোমরা সুখি হবে?
      বাড়িতে ফিরে এল তারা। পরের দিন। সুন্দর সকাল। মিষ্টি হাওয়া বয়ে আসছে। তিতির আনন্দে ডানা ঝাপটাল। শস্যের গোলা ভরে উঠল, পাত্রে পাত্রে জল উপচে পড়ছে। কি আনন্দ।
      বীজ থেকে অঙ্কুর হল। অঙ্কুর থেকে গাছ। গাছে ফলল অনেক ফল। ফলগুলো কেটে ফেলতেই নানান ধরনের ফসল মাটিতে পড়ল। কিন্তু শুধু ফসল নয়। কয়েকটা ফল থেকে অনেক পাখি, অনেক জন্তু বেরিয়ে এল। তারা বেরিয়েই ফসল খেতে শুরু করল। সর্বনাশ! এত প্রাখি, এত জন্তু! এরাই তো সব খেয়ে শেষ করে দেবে! তাড়াও, তাড়াও, এদের তাড়াও । অনেক পাখি আর জন্তুকে তারা তাড়িয়ে নিয়ে চলল। পাহাড়ের দিকে। তারাও ভয় পেয়ে পাহাড়ি বনে ঢুকে পড়ল। আর কোনদিন ফেরেনি। তারা সেখানেই রয়ে গেল। আজকে আমরা পাহাড়ি বনে যেসব পশুপাখিকে দেখতে পাই তারা ওদেরই ছেলেমেয়ে। বুনো শুয়োর, হরিণ,—আরও কত কি।
      কয়েকটি পশু বেশ শান্ত। তারা তেমন করে ফসল খায়নি। তারা যেতে চাইল না পাহাড়ি বনে। থাকতে চাইল মানুষের মধ্যে। ছেলে দুটি কি আর করে! তাদের থাকতে দিল। বড় শান্ত তারা। আহা থাক। তারাই হল আমাদের পোষা শুয়োর। বড় উপকারী।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য