নারকেল গাছ - আদিবাসী লোককথা

      আমাদের দ্বীপ সবুজ গাছে ভরা। অল্প দূরে নীল জলের সাগর। অত বড় সাগর কোথাও নেই। সাগরের ওপার নেই। এই দ্বীপের পুব দিকে বয়ে গিয়েছে একটা নদী। পাহাড়ের কোল বেয়ে নদী বইছে। টলটলে জল। মিষ্টি ঠান্ডা জল। এমন নদীর জল আর কোথাও নেই।
      সেই নদীর পারে যে গ্রাম সেই গ্রামে থাকত এক মেয়ে। অপরূপ সুন্দরী সেই মেয়ে। তার সবচেয়ে ভালো লাগত সাঁতার কাটতে। জলে নামলে তার মন সবচেয়ে খুশি থাকত। নদীর তীরে ঘন গাছ-গাছালি। গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের বড় বড় পাথরের কোল ছুঁয়ে নদী বয়ে চলেছে। আর সেই নদীতে প্রতিদিন চান করে সেই মেয়ে। মনের আনন্দে সাঁতার দেয়। আশপাশে কত রঙিন মাছ ভেসে ভেসে চলে, তারাও মেয়ের সঙ্গে খেলা করে।

      একদিনও বাদ যায় না। সব দিন মেয়ে নদীতে যায়। ছোট্ট নদী, ভয় নেই। একা একাই সে যায়। প্রতিদিন তার আরও বেশি বেশি ভালো লাগে সাঁতার কাটতে। বড় আনন্দে দিন বয়ে যায়।
      দুপুরে মেয়ে জলে নেমেছে। সাঁতার কাটতে কাটতে, জলে খেলা করতে করতে বিকেল হয়ে গিয়েছে। তবু জল ছেড়ে ওঠার নাম নেই। হঠাৎ মেয়ের মনে হল, কি যেন তার গায়ে লাগল। কে যেন আলতো করে তার দেহ বার বার করে স্পর্শ করছে। স্বচ্ছ টলটলে জল। নীচে তাকিয়ে দেখে, মস্ত বড় একটা মাছ তার পেছনে, সে-ই তাকে স্পর্শ করছে। মাছটির চোখ বড় বড়। ডাগর চোখ। মুখে কেমন হাসিহাসি ভাব। ভয়ে আঁৎকে উঠল মেয়ে। তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে তীরে উঠল। বুক কাঁপছে। জলের দিকে তাকিয়ে দেখল, মাছটা আস্তে আস্তে পাহাড়ের বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে কোথায় লুকিয়ে পড়ল। পাহাড়ের ওই এলাকায় যেখানে আঁধার আঁধার জল, সেখানে এরকম অনেক মাছ রয়েছে। মেয়ে তা জানে। কিন্তু ওরা তো কখনো পাথরের ফাঁক ছেড়ে টলটলে জলে আসে না? তবে? মেয়ে খুব ভয় পেয়ে গেল। মেয়ের সাঁতার দেবার এলাকায় ওদের তো আগে কখনও দেখেনি? ভাবল, আর আসবে না এখানে।
      পরের দিন। দুপুরবেলা। মেয়ের মন ছটফট করছে। কতদিন ধরে এই সময়ে সে নদীতে যায়। না গিয়ে থাকতে পারে না। আজও পারল না। ভাবল, ও একদিন ওরকম হয়েছে। আর হবে না। মেয়ে চলল নদীর দিকে। একটু ভেবে জলে নেমে পড়ল। না, কিছুই তো হচ্ছে না? মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে মেয়ে।
      হঠাৎ কোমরের কাছে কিসের যেন ছোয়া লাগল? সেই বড় ডাগর চোখের মাছ নয় তো? মেয়ে ভয়ে আঁৎকে উঠল। ভয়ে ভয়ে জলের নীচে চেয়ে দেখল। মাছটি আস্তে আস্তে জলের ওপরে মাথা তুলল। কি শান্তি তার চোখে-মুখে। মাছ চেয়ে রয়েছে মেয়ের ভেজা সুন্দর টলটলে মুখের দিকে। এত সুন্দর এই মাছ, এত শান্ত ওর চোখ-মুখ, এত মিষ্টি ওর স্বভাব! মেয়ের আর একটুও ভয় করছে না। মাছ তাকে তো আঘাত করছে না? মাছ তো তার কোন ক্ষতি করছে না? তবে আর ভয় কিসের? মেয়ে সাঁতার কাটতে লাগল, ডুবছে ভাসছে। মাছ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। অল্পক্ষণ পরে জলের নীচে চলে গেল মাছ। এঁকেবেঁকে পাথরের ফাঁক দিয়ে আঁধার জলে মিলিয়ে গেল মাছ। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। মেয়ে উঠে এল জল থেকে।
      দিনের পর দিন চলল এই জলের খেলা। মেয়ে জলে নামলেই কোমরে মাছের ছোঁয়া লাগে। তারপরে মাছ মাথা তোলে জলে। মেয়েরও খুব আনন্দ। সে-ও মাছের সঙ্গে সাঁতার কাটে, ডোবে ভাসে। জলে মেয়ের সঙ্গী হয়ে গেল সেই মাছ। মেয়ের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আর একটুও ভয় করে না। মাছ ডাগর চোখে মেয়েকে চেয়ে চেয়ে দেখে,—মেয়ের খুব ভালো লাগে। এমনি করে অনেকদিন কেটে গেল।
      একদিন। মেয়ের চান হয়ে গিয়েছে। বালুতীরে বসে সে বিশ্রাম করছে। চুল আর দেহের জলে সেখানকার বালি ভিজে উঠেছে। অল্প অল্প ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে! হঠাৎ মেয়ে দেখল, সাঁতার কেটে মাছ তীরের কাছে এল। সেখানে অল্প জল। অল্প ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ মাছের দেহ পালটে গেল। কোথায় সেই মাছের দেহ? সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক কিশোর দেবতা। কি অপরূপ তার রূপ।
      কিশোর দেবতা মানুষের ভাষায় বলল, ‘সুন্দরী মেয়ে, আমি ওই পাথরের ফাঁকের মাছেদের দেবতা। ওরা আমার প্রজা, ওদের রাজা আমি। বিপদে-আপদে প্রাণ দিয়ে ওদের রক্ষা করি। ওদের কোন বিপদ ঘটতে দিই না। তাই ওরা সুখি।
      মেয়ে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কোন কথাই সে বলতে পারছে না ।
     কিশোর দেবতা আবার বলল, “আমি আর আমার মাছেরা কখনও ওই পাথরের আঁধার রাজ্য থেকে টলটলে জলে আসি না। ওখান থেকেই সবকিছু দেখতে পাই। তোমাকেও রোজ দেখতাম। তোমাকে ভালোবেসে ফেললাম। পারলাম না লুকিয়ে থাকতে। তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অনেকদিন তোমার আশেপাশে ঘুরেছি। তোমার কোমর ছুঁয়ে জানিয়েছি আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার মতো রূপসি মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। তুমি আমায় ভয় পেয়ো না, আমি কিশোর দেবতা। আমি তোমায় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। তুমি বোঝ না?
      না, মেয়ে ভয় পায়নি। যখন মাছ হয়ে জলে খেলা করত তখনও ভয় পায় নি। আর এখন তার সামনে বসে রয়েছে সুন্দর কিশোর দেবতা। তাকে ভয় পাবে কেন? মেয়ে কিশোরকে ভালোবাসল। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা।
      এর পরদিন থেকে মেয়ে অনেক আগে আগে নদীতে চান করতে আসে। জলে মাছের সঙ্গে সাঁতার দেয়, খেলা করে। তারপরে তীরে উঠে আসে। তীরে এলে মাছ হয়ে যায় কিশোর দেবতা। বালুতীরে দুজনে বসে থাকে। চুল আর দেহের জল শুকিয়ে গেলে সবুজ বনে পথ হাটে। পাশাপাশি। হাত ধরাধরি করে। কি আনন্দ। কত সুখ।
      ঘন বনের মধ্যে দিয়ে সরু পায়ে-চলা পথ। পথে শুকনো পাতা। পাতার আওয়াজ তুলে তারা পথ হাটে। এই সময়টা মেয়ের সবচেয়ে ভালো লাগে। কিশোর দেবতারও। এই পাশাপাশি হেঁটে চলার সময় দুজনের চোখ-মুখের চেহারাই কেমন পালটে যায়।
      কিন্তু যে মুহুর্তে ফিরে যাবার সময় হয়, যে মুহুর্তে কিশোর দেবতা বালুতীর থেকে নদীর জলে পা দেয়, সেই মুহুর্তে সব অন্যরকম হয়ে যায়। কিশোর চোখের পলকে মাছ হয়ে যায়। এঁকেবেঁকে সাঁতার দিয়ে পাথরের অন্ধকার ফাঁকের মধ্যে মিলিয়ে যায়। মেয়ে-জল-ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে,—মেয়ের চোখ-মুখও পালটে যায়। বেদনায় কান্নায়।
      যত দিন যায় মেয়ে বেশি বেশি করে কিশোরকে ভালোবেসে ফেলছে। এমন ভালোবাসা কেউ কোনদিন দেখেনি, শোনেনি। প্রতিদিন একসাথে পথ হাটে। আগের দিনের চেয়ে আজ আরও ভালো লাগছে। প্রতিদিনই আগের দিনের চেয়ে বেশি ভালো লাগে।
      একদিন মেয়ে চান করে তীরে বসে রয়েছে। মাছ সেদিন জলে আসেনি। মেয়ের সঙ্গে জলে সাঁতার কাটেনি। মেয়ের মন খারাপ। হঠাৎ মেয়ে দেখতে পেল, কিশোর দেবতা আসছে। মেয়ের চোখে হাসি ঝরে পড়ল। কিন্তু কিশোর আসছে খুব আস্তে আস্তে, চোখে-মুখে বর্ষাকালের কালো মেঘ। এমন তো কখনও হয়নি? মেয়ের বুক কেঁপে উঠল।
      কিশোর এসে মেয়ের পাশে বসল। মেয়ের একটি হাত তুলে নিল নিজের কোলের ওপর। আস্তে আস্তে বলল, ‘এবার বিদায় নেবার সময় হল। আর দুজনের দেখা হবে না। আমায় শেষ বিদায় দাও।
      'না, না, ও কথা বলতে নেই। ও কথা বোলো না। আমি তোমায় ছেড়ে বাঁচতে পারব না। বিদায়ের কথা বলতে নেই। মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে কিশোরের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। কিশোরের বুক ভিজে যাচ্ছে।
      একটু পরে কিশোর বলল, “এ হল দেবতার আদেশ। আমাদের মন না চাইলেও এ আদেশ মানতে হবে। দেবতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করার নেই। বিদায় নিতেই হবে, বিদায় তোমায় দিতেই হবে। দেবতাদের দেবতার ইচ্ছে নয়, আমাদের মিলন হোক। আমি দেবতা, আমার দেবতার কথা মানতেই হবে।
      কিশোরের চোখের জলে মেয়ের কপাল-মুখ ভিজে গেল। মেয়ে চেয়ে রয়েছে কিশোরের মুখের পানে। সে-ও কাঁদছে।
কিশোর বলল, “এক্ষুনি আমি বিদায় নিয়ে চলে যাব। কিন্তু তোমায় দিয়ে যাব এমন এক অমূল্য রত্ন যাতে তুমি বুঝবে আমি তোমায় কত ভালোবাসি। সবসময় তোমার একথা মনে পড়বে। শুধু আজ আমি তোমায় যা করতে বলব, তা তোমায় করতে হবে। প্রতিজ্ঞা করো আমার সেই কথা তুমি রাখবে। লক্ষ্মী মেয়ে, তোমায় হ্যাঁ বলতে হবে।’ কিশোর ঝরঝর করে কাঁদছে।
      কান্নায় ভেঙে পড়েছে মেয়ে। কি কথা? কথাটা বলবার আগে কিশোর কেন এমনভাবে কাঁদছে? কি প্রতিজ্ঞা? কেন সে প্রতিজ্ঞা করাচ্ছে? তবু মেয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল। কিশোরের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
      কিশোর নদীর ওপারের সবুজ গাছের সারির দিকে চেয়ে মেয়েকে সেই কাজের কথা বলল। মেয়েকে যা করতে হবে সব খুলে বলল।
       পরের দিন এই দ্বীপে প্রলয় ঘটে যাবে। অবিরাম বৃষ্টি পড়বে। এমন বৃষ্টি আগে কেউ কখনও দেখেনি। নদীর জল ফুলে-ফেঁপে উঠবে, কুল ছাপিয়ে যাবে। দ্বীপের জমি ডুবে যাবে, উঁচু উঁচু গাছ ডুববে তার পরে। সব জলের নীচে। মেয়ে দেখতে পাবে, সব ডুবে গিযেছে। তার নিজের বাড়ির চারপাশেও থৈ থৈ জল। কিন্তু মেয়ের বাড়ি ডুববে না, সে বাড়ি সেরকমই থাকবে। সেই সময় কিশোর দেবতা মাছের রূপ ধরে মেয়ের উঠোনে আসবে। সাঁতার কেটে আসবে। মেয়ের দোরের সামনে এসে মাছ মাথা তুলবে। জলের ওপরে। আর তখন... । তখন মেয়ে যেন ঘর থেকে ঘাস কাটার কাস্তে নিয়ে আসে। এক আঘাতে মাছের মাথা যেন কেটে ফেলে। সেই মাথাটা নিয়ে মাটিতে পুতে দেবে। সেখানটা নজর রাখবে।
      মেয়ে নুইয়ে পড়ল কিশোরের বুকে। এ কি বলছে সে? না, না, কিছুতেই এই নিষ্ঠুর কাজ সে করতে পারবে না। এর চেয়ে মরণ ভালো। এ কথা মেয়ে সহ্য করতে পারছে না। কিশোর যেন অমন কথা আর না বলে। এ আমি কিছুতেই পারব না। তোমার সঙ্গে চিরকালের জন্য বিচ্ছেদ হলেও এ কাজ আমি করতে পারব না।
      কিশোর মেয়ের মুখ দুহাতে তুলে ধরে ধরল, “দেবতাদের দেবতার এ আদেশ। এ তোমাকে পারতেই হবে। না, না বলতে নেই। তুমি যে একটু আগে প্রতিজ্ঞা করলে? প্রতিজ্ঞা করে অমান্য করতে নেই। তাছাড়া দেবতার আদেশ, আমাদের ইচ্ছেয় কিছুই হবার নয়। এটাই হতে হবে।
      কিশোর দেবতা মেয়েকে আলতোভাবে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হেঁটে চলল নদীর দিকে। একবার পেছন ফিরে চাইল। চোখের জলে মুখ-বুক ভেসে যাচ্ছে। জলে পা দিল কিশোর। মুহুর্তে দেহ পালটে গেল। সে মাছ হয়ে পাথরের আঁধার ফাঁকের মধ্যে মিলিয়ে গেল ।
      মেয়ে আছড়ে পড়ল বালুতীরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। দেহ কেমন অবশ হয়ে আসছে। বুকের মধ্যে বর্ষাকালের নদীর ঢেউ, চোখে পাহাড়ি ঝরনা।
      রাত তখনও শেষ হয়নি। বৃষ্টি শুরু হল। সে কি বৃষ্টি। ঝমঝম শব্দ আর থামছে না। ভোর হল। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। নদীর জল তীর ছাপিয়ে দ্বীপের মধ্যে ঢুকছে। নদীর জল, আকাশের জল। জল বাড়ছে। জমি ডুবল, বাড়িঘর ডুবল, গাছ ডুবল। সত্যিকার প্রলয়। মেয়ে সব জানে আগে থেকেই। কিশোর চলে যাবার পর থেকে সে ঘুমোয় নি, তার কান্নাও থামেনি।
      গোটা দ্বীপ এখন মস্ত বড় একটা পুকুর। এ পুকুরের কোন তীরভূমি নেই। জল উঠল মেয়ের উঠোনে। কিন্তু তার বাড়ি ডুবল না। মেয়ে বসে রয়েছে দাওয়ায়। চোখ রয়েছে উঠোনের জলে । ঝাপসা চোখে মেয়ে বসে রয়েছে। জলে ছলাৎ শব্দ হল। জল কেঁপে কেঁপে উঠল। মেয়ের বুক কেপে কেঁপে উঠল।
      হঠাৎ উঠোনের জলে দাওয়ার সামনে মাছের মাথা ভেসে উঠল। কিশোর দেবতা মাছের রূপে ডাগর চোখে চেয়ে রয়েছে মেয়ের পানে। চোখে কিসের যেন মিনতি।
      মেয়ে বুঝল, শেষ সময় এসে গিয়েছে। চিরবিদায়ের সময়। এখন তার কথা-দেওয়া প্রতিজ্ঞা রাখতেই হবে। বুক চৌচির হয়ে গেলেও প্রতিজ্ঞা রাখতেই হবে।
      ঘরে ঢুকল মেয়ে। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আন্দাজে হাতে তুলে নিল ঘাস কাটার কাস্তে। দাওয়ায় এল। মাছ মাথা তুলেই রয়েছে। সবকিছু আবছা। এবার মেয়ের চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। কাস্তে এধার থেকে ওধারে গেল। মাছের মাথা দেহ থেকে খসে পড়ল। মেয়ে জল থেকে তুলে নিল সেই মাথা। বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল।
বাড়ির পাশে এক খণ্ড জমি জেগে রয়েছে। এত জলেও সে জমি ডুবে যায় নি। মাটি সরিয়ে গর্ত করে মেয়ে মাছের মাথা পুঁতে দিল সেখানে। কয়েক ফোটা নোনতা জল গড়িয়ে পড়ল সেই মাটিতে।
      সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে রোদ ঝলমল করে উঠল। জল কমতে লাগল। গাছের মাথা জেগে উঠল, গাছের মাঝখানটা দেখা গেল। বাড়িঘর দেখা যেতে লাগল। সোঁ সোঁ শব্দে জল নদীর দিকে নেমে যাচ্ছে। বালি-ঘাস-ছোট গাছ-গাছালি সব দেখা যাচ্ছে। আবার সেই আগের দ্বীপ।
      জল নেমে গেল। সবার মনে আনন্দ। কিন্তু মেয়ের মনে সুখ নেই, মুখে কোন কথা নেই। সে সবসময় ভাবে কিশোর দেবতার কথা। কাস্তের কথা মনে হতেই মেয়ে আঁৎকে ওঠে। হায়! কোথায় হারিয়ে গেল সেইসব সুখের দিন। মেয়ে আর নদীতে যায় না চান করতে। সব আনন্দ শেষ।
      প্রতিদিন ভোরবেলা উঠেই মেয়ে সেই জমিখণ্ডের পাশে গিয়ে বসে যেখানে মাটির নীচে রয়েছে কিশোর দেবতার মাথা। প্রায় সারাদিনই মেয়ে সেখানে বসে থাকে আর ভাবে।
      কিশোর দেবতা নজর রাখতে বলেছিল। তাই তাকিয়ে থাকে মেয়ে। কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। কিছুই দেখতে পেল না মেয়ে। তবু কিশোরের আদেশ সে মেনে চলে।
      হঠাৎ মেয়ে একদিন ভোরবেলা দেখল, মাটির ওপর সবুজ মতন কি যেন দেখা যাচ্ছে। চোখ আরও কাছে নিয়ে দেখল,— সবুজ চারার কচি পাতা। পরের দিন দেখল— কচি পাতা দুভাগ হয়ে অল্প বড় হয়েছে। আরও সবুজ হয়েছে। দিনে দিনে চারা ভালোভাবে মাথা তুলল। মাটি ফুড়ে বড় হচ্ছে চারা। এমন গাছ মেয়ে আগে কখনও দেখেনি। এই দ্বীপে এরকম গাছ নেই। নতুন গাছ। গাছ বড় হচ্ছে। গাছের মাথায় শুধুই বড় বড় শক্ত পাতা। মাথার নীচে কোন ডালপালা নেই, গোল কালো শক্ত খুঁটির মতো শুধুই দেহ।
      দেখতে দেখতে সব গাছের মাথা ছাড়িয়ে সে গাছ ওপরে উঠল। এত লম্বা গাছ দ্বীপে আর নেই। একদিন গাছের মাথায় সাদা ফুল দেখা দিল। ফুল ঝরে পড়ল। ছোট ছোট ফল দেখা দিল। সবুজ ফল। এক ডালে অনেক ফল। এমন আকারের ফল মেয়ে আগে কখনও দেখেনি। ফল বড় হচ্ছে। ফলের সবুজ রঙ আরও গাঢ়-ঘন হচ্ছে। একসময় সবুজ আভা মিলিয়ে গেল। কেমন শুকনো হয়ে এল ফলের দেহ। আরও শুকনো। হঠাৎ একদিন ঝোড়ো হাওয়ায় কয়েকটা ফল বালির ওপর আছড়ে পড়ল। মেয়ে ফলগুলো নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কিশোর দেবতার দান।
      সবাই এল। দ্বীপের সবাই। অবাক হয়ে সেই গাছকে দেখতে লাগল। মেয়ের হাতের ফলগুলো পরখ করল। মেয়ে বলল, “জলের মাছেদের কিশোর দেবতা এই গাছ দিয়েছে, ফল দিয়েছে। আর কিছু বলল না।
      দ্বীপের একজন বুড়ো মানুষ ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফলের খোসা ছাড়িয়ে ফেলল। মানুষের মাথার মতো শক্ত ফল বেরিয়ে এল। ফল ফাটিয়ে দিতেই বেরিয়ে পড়ল ভেতরের সাদা শাস আর কিছুটা জল। বুড়ো সবাইকে একটু একটু শাঁস দিল। মুখে দিয়ে সবাই অবাক হয়ে গেল। এমন সুস্বাদু ফল তারা আগে কখনও খায়নি। নতুন অভিজ্ঞতা। মেয়ে কিন্তু খেল না, শাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তাকিয়ে রইল ছাড়ানো ফলের শক্ত খোলাটির দিকে।
      মেয়ে মাটি থেকে তুলে নিল ফলের শক্ত খোলাটি। খোলার গায়ে দুটি চোখ আর একটি মুখ। কিশোর দেবতা নিজের জীবন দিয়ে যে অমূল্য রত্ন তাদের দিয়ে গেল, সেই ফলে তার চোখ আর মুখের চিহ্ন রেখে গেল। সাঁতার কাটবার সময় মেয়ে মাছের যে চোখ আর মুখ দেখেছিল, সেই চোখ-মুখ এই ফলের গায়ে আঁকা হয়ে রইল। কিশোর দেবতা বলেছিল, কোনদিন ভুলতে পারবে না। সত্যি তাই। চিরকালের জন্য মনে পড়বে।
      এই হল নারকেল গাছ আর তার ফল। দ্বীপের অমূল্য রত্ন। সেদিন থেকে পৃথিবী এই ফল পেল। এ গাছ অমূল্য রত্ন। কেননা, গাছের সব কিছু মানুষের কাজে লাগে।ফলে শাঁস, ফলের জল, বাড়ির ছাদ করার জন্য গাছের পাতা, ঝাঁটার জন্য পাতার মধ্যেকার শক্ত কাঠি, বাড়ির খুঁটির জন্য গাছের দেহ, মাছ ধরবার সরু নৌকোর জন্য গাছের দেহ। কিশোর দেবতা ঠিকই বলেছিল, অমূল্য রত্ন।
      এই অমূল্য নারকেল ফলের জল কিন্তু একটু নোনতা। মেয়ে যখন তার প্রিয়তম কিশোর দেবতার মাছ-দেহের মাথা পাশের জমিখণ্ডে পুঁতে দিয়েছিল, সেই সময় মাটির ওপরে কয়েক ফোঁটা নোনতা জল পড়েছিল। দুঃখী মেয়ের কান্নাঝরা চোখের জল। সেই থেকে ফলের জলও নোনতা হয়ে রইল।
      মেয়ে আর নেই। কিশোর দেবতা আজ আর নেই। কিন্তু দুজনে মিলে রয়েছে এই নারকেল ফলের মধ্যে। কিশোরের আত্মত্যাগ আর মেয়ের চোখের জল। কিশোরের দেহ থেকে হয়েছে শাস আর মেয়ের চোখের জলে হয়েছে ফলের নোনতা জল। দুজনেই একসঙ্গে বেঁচে রয়েছে। ভালোবাসায় বিচ্ছেদ নেই।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য