সাতরঙা রামধনু - আদিবাসী লোককথা

      ওদের বাড়িঘর সেই দূরের আকাশে। ওরা দুই বোন। একজনের নাম হাইনে-ওয়াই, সে বড় বোন। সে আকাশের আলো, বৃষ্টি নামায় পৃথিবীতে। ছোট বোন হাইনে-পুকোহুরানগি, সে কুয়াশাকুমারী। আকাশে তেমন টলটলে জল নেই, কিন্তু ওরা দুজন চান করতে খুব ভালোবাসে। তাই প্রতিদিন ভোরবেলায় দুই বোন নেমে আসে পৃথিবীতে, টলটলে জলে চান করে। ভোরের বেলায় অল্প আলোয় আমরা যে কুয়াশা দেখি, আসলে তারা  সেই দূর আকাশের বোন, আলোককুমারী আর কুয়াশাকুমারী।
       এমনি করে দিন বয়ে যায়। কোন বিপদ-আপদ ঘটে না। সূর্যের আলো একটু বেশি হলেই তারা আকাশ-পথে উড়ে যায়।
       এখন হয়েছে কি, সেইখানে থাকত এক কিশোর। টলটলে জলধারার কাছে সে সকাল বেলায় ঘুরে বেড়াত। জলে মাছ কেমন খেলা করে, গাছের ফাঁকে পাখি কেমন বাসা বাঁধে, এসব সে দেখে বেড়াত। কিশোরের নাম উয়েনুকু। একদিন সে হঠাৎ দেখতে পেল, কুয়াশাকুমারী আর আলোকুমারী জলে চান করছে। কুয়াশাকুমারীকে দেখে সে আর চোখ ফেরাতে পারে না। এমন রূপ, এমন সুন্দরী। ঠিক করল, মেয়েকে সে বিয়ে করবে। মেয়েকে তার মনের কথা বলবে। ভাবছে, এমন সময় দুজনেই আকাশ-পথে মিলিয়ে গেল। অবাক হয়ে চেয়ে রইল উয়েনুকু।
এমনি করে দিন কাটে। সব দিন ভোরবেলায় ঝোপের আড়াল থেকে সে তাদের দেখে। পেছন ফিরে চান করছে ওরা,
      এমনি করে দিন কাটে। সব দিন ভোরবেলায় ঝোপের আড়াল থেকৈ সে তাদের দেখে। পেছন ফিরে চান করছে ওরা ডুবছে, ভাসছে, জলে ঢেউ তুলছে—হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল উয়েনুকু। কিছু বুঝবার আগেই সে ধরে ফেলল কুয়াশাকুমারীকে। আলোকুমারী আকাশ-পথে মিলিয়ে গেল।
       ধরা পড়ে কুয়াশাকুমারী কাঁদছে। কিশোর বলল, “তুমি আমায় বিয়ে করবে? তুমি আমার বউ হবে? তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করব না। করবে বিয়ে? অবাক হল কুয়াশাকুমারী। অবাক চোখে চেয়ে রইল। কিশোরকে তারও বড় ভালো লেগে গেল। সে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে।
       আকাশের মেয়ে তার বউ হবে। কিন্তু সে দিনের বেলায় পৃথিবীতে বরের কাছে, বরের বাড়ি থাকবে না। সূর্য যখন অনেক নীচে নেমে যাবে, চারদিক যখন আঁধার হয়ে আসবে, তখন দূর আকাশ থেকে নেমে আসবে আকাশি মেয়ে। সারারাত থাকবে। আবার সূর্য যখন নীচ থেকে ওপরে উঠবে, সেই আলো-হওয়া ভোরের একটু আগেই আবার সে চলে যাবে দূর আকাশে। আর একটা কথা, গাঁয়ের কাউকে তার কথা বলা চলবে না। কেউ তাকে দেখতে আসতে পারবে না। তার বউয়ের কথা শুধু জানবে তার বর। তবে অনেক দিন নয়, তাদের যখন ফুটফুটে একটা ছেলে হবে তখন কিশোর সবাইকে বলতে পারবে আকাশি মেয়ের কথা, ছেলেকে কোলে নিয়ে কুয়াশাকুমারী তখন সবার সামনে আসবে। এই কথা ভুলে গেলেই আকাশের মেয়ে সেই যে দূরে চলে যাবে, আর ফিরবে না কোনদিন।
       উয়েনুকু মাথা নাড়ল, সে রাজি। এ মেয়েকে ছাড়া সে বাঁচবে কেমন করে? তাদের দুজনের বিয়ে হয়ে গেল! দুজনেই হাসছে।
       এমনি করে দিন কাটে। সন্ধের আঁধার নেমে এলেই আকাশের মেয়ে বরের ঘরে ঢুকে পড়ে। কেউ দেখতে পায় না। ভোরের আলো আবছা হয়ে ফুটলেই দিদি আলোকুমারী বরের দোরের কাছে এসে বোনকে ডাকে। বোন ফিরে যায় আকাশে, দিদির পাশেপাশে। ভালোভাবে ভোর হবার আগেই দুই বোন মিলিয়ে যায়।
      এমনি করে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। সুখেই দিন কাটতে লাগল। তবু উয়েনুকুর মনে বড় দুঃখ। তার এমন সুন্দরী বউ, অথচ সে কাউকে বউয়ের কথা বলতে পারে না। গাঁয়ে কুয়াশাকুমারীর চেয়ে রূপসি মেয়ে আর একটাও নেই। অথচ সে কাউকে দেখাতে পারে না। গাঁয়ের কেউ আজ পর্যন্ত তার বউকে দেখতে পেল না। নাঃ, এভাবে মন মানে না। সে সবাইকে তার বউ দেখাবে। মনে মনে ঠিক করে ফেলল। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিয়ে দেবে।
       একদিন সন্ধে হবার আগেই সে ঘরের সব ফাঁক-ফোকর ভালোভাবে বন্ধ করে দিল। দরজার ফাঁক, জানলার ফাঁক সব বন্ধ। সকালের আলো যাতে একটুও ঢুকতে না পারে। সব ব্যবস্থা করে সে নিশ্চিত্ত হল। সকাল হবে, বাইরে আলো ঝলমল করবে কিন্তু ভেতরে একেবারে আঁধার। বউ বুঝতেই পারবে না-সকাল হয়েছে, আলো ফুটেছে, আঃ, বউ কেমন বোকা বনে যাবে। সবাই তখন বউকে দেখতে পাবে, গাঁয়ের সবচেয়ে সুন্দরী বউকে তারা দেখবে।
       কুয়াশাকুমারী নেমে এল ঘরে। আঁধার ঘর। সে কিছুই বুঝতে পারল না। অন্য দিনের মতোই সবকিছু ঠিকঠাক আছে। রাতে কত গল্প, কত কথা, কত আনন্দ। শেষকালে আকাশ মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কিশোর কিন্তু ঘুমোতে পারল না, জেগে রইল সারারাত। ভোর হলেই গায়ের লোক আসবে তার ঘরে। সব আগে থেকে বলা হয়ে গিয়েছে।
       সূর্য ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আবছা আলো পুব কোণে ফুঠে উঠেছে। আকাশ থেকে নেমে এল দিদি আলোকুমারী। বোনকে ডাকল। কোন ডাকই পৌঁছল না বোনের কানে। সব যে বন্ধ। অনেক, অনেকবার ডাকল দিদি, বোন তো আসছে না। কি আর করে সে । এদিকে আলোর তেজ বাড়ছে। দিদি আবার আকাশ-পথে চলে গেল।
       সকাল হতেই গাঁয়ের মানুষজন চলে এসেছে কিশোরের বাড়িতে। খুব আগ্রহ তাদের, নতুন বউ দেখবে। নতুন বউয়ের রূপের কত কথাই না তারা উয়েনুকুর কাছে শুনেছে। সেই গল্পের বউ, রূপকথার বউকে আজ তারা প্রথম দেখবে। দলের প্রথমেই রয়েছে গায়ের অন্য সব বউ।
       উয়েনুকু বিছানা থেকে নেমে আস্তে আস্তে পাশের দরজা খুলছে। খুব সাবধানে। দরজা খুলে গেল। সকালের মিষ্টি রোদের আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। বাইরে দরজার সামনে অনেক মানুষজন। তারা উকি দিল। বউয়ের চোখে আলো পড়ল, বউ চমকে উঠল। উঠে বসল বিছানায়। অবাক চোখে চাইল,— দেখল উয়েনুকু দাঁড়িয়ে মিষ্টি চোখে হাসছে, দরজার ওপাশে অনেক অবাক-করা চোখ।
       আকাশ মেয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল। দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে। মাথার খোলা চুল দেহ বেয়ে পায়ের কাছে পড়েছে। অপরূপ দেবীমূর্তি। সে এগিয়ে গেল দরজার সামনে। বেরিয়ে এল বাইরের উঠোনে। সবাই পথ করে দিল। উঠোন পেরিয়ে সে একটা ঘন গাছের নীচে এল । চোখে জল, ঠোট কাঁপছে। সে গান গেয়ে উঠল। বিদায়ের গান। মিষ্টি গলার করুণ গান। গায়ের মানুষজন আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের বুকেও বেদনা, চোখ ভিজে উঠেছে। মেয়ের বিদায়ের গান শুনে। আকাশ থেকে ঘন কুয়াশা নেমে আসছে। ঠিক গাছের ওপর থেকে। ঘন কুয়াশা নেমে এসে গাছের ওপরে থেমে গেল। মেয়ে তখনও গান গাইছে। গান শেষ হল। কুয়াশা আরও নীচে নেমে এল, মেয়েকে ঢেকে দিল। হঠাৎ কুয়াশার মেঘ ওপরে উঠতে লাগল। পাক খেতে খেতে কুয়াশা ওপরে উঠছে। মাঝখানে মেয়ে, কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না। একটু পরে কুয়াশা আকাশের সাদা মেঘে মিলিয়ে গেল।
       উয়েনুকু কান্নায় ভেঙে পড়ল। এ কি হল তার? ছলনা করতে গিয়ে সে সবকিছু হারাল। গাছের নীচে আছড়ে পড়ল কিশোর।
       কুয়াশাকুমারী চিরকালের জন্য ফিরে গেল আকাশ-রাজ্যে। তার বর কথা রাখেনি। ছোট্ট ফুটফুটে ছেলে হবার আগেই সবাইকে বলে দিল। আকাশি মেয়ে আর কোনদিন ফিরে আসেনি উয়েনুকুর ঘরে।
       কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে গেল কিশোরের। মনেও খুব কষ্ট। সে এ কি করল? তাকে ছাড়া বাঁচবে কেমন করে। শেষকালে ভাবল, তাকে খুঁজে আনবই, তাকে খুঁজে পেলে ক্ষমা চাইব। একদিন এই পৃথিবীতে তাকে পেয়েছিলাম, আবার তাকে ফিরিয়ে আনব। মনে দুঃখ নিয়ে উয়েনুকু ঘর ছাড়ল, গাঁ ছাড়ল। সে পথে বের হল।
       নদী পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, পাহাড় পেরিয়ে কিশোর চলেছে। সমুদ্রের পাশে পাশে হেঁটে চলেছে। ক্লান্ত হয়, বিশ্রাম নেয়, আবার চলে। গাছের তলায় রাত কাটায়, সূর্য ঘুম থেকে জাগলে সে-ও জেগে ওঠে, পথ চলে। অবিরাম পথ চলা। কিন্তু কোথাও সে তার বউকে খুঁজে পেল না। তবু খোজার বিরাম নেই। কোথায় তার গ্রাম, কোথায় তার জন্মভূমি— সব ভুলে গেল সে। কোনদিকে তার ঘরবাড়ি, কিছু তার মনে পড়ে না। মনে শুধু একটি ছবি, সে ছবি কুয়াশাকুমারীর।
বহু বছর কেটে গিয়েছে, তবু পথ চলার ক্লান্তি নেই তার। বয়স তো থেমে থাকে না। শেষকালে পথে পথে ঘুরতে ঘুরতেই কিশোর একদিন বুড়ো হল। তার সব চুলদাড়ি পেকে কুয়াশার মতো সাদা হয়ে গেল। এখনও সে খুঁজে পায় নি কুয়াশাকুমারীকে। দেহ আর চলে না, দেহ কাঁপে, চোখে ঝাপসা অন্ধকার। দূরের জিনিস ভালোভাবে ঠাওর হয় না। এক ঘন গাছের নীচে বসে পড়ল বুড়ো উয়েনুকু। মাথার তলায় হাত দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু দূরে বিশাল সমুদ্র। হাওয়া বইছে এলোমেলো। উয়েনুকু চোখ বন্ধ করল। সে চোখ আর খুলল না। নিঃস্পন্দ পড়ে রইল তার দেহ — গাছের নীচে
বালির ওপরে।
       আকাশের ওপরে যেসব দেবতা থাকেন তারা সব দেখেছেন। বউকে খুঁজতে কিশোর কি করেছে সব তারা জানেন। পৃথিবীর মানুষের মধ্যে এমন ভালোবাসা তারা আগে দেখেন নি। তারাও অবাক হয়েছেন। মৃত্যুর পরে তারা উয়েনুকুকে রামধনু করে আকাশে রেখে দিলেন, সাতরঙা রামধনু। যে আকাশ থেকে কুয়াশাকুমারী নেমে এসেছিল, কিশোর সেখানেই রামধনু হয়ে রইল। আমরা আকাশে রামধনু দেখলেই বুঝতে পারি, আসলে এ হল আমাদের পৃথিবীর উয়েনুকু। সে একদিন বউকে ঘরে তুলেছিল, আবার চিরকালের জন্য তাকে হারিয়েছিল।
       সেই সেদিন থেকেই সূর্য ওঠার সময়েই প্রভাতী আলো ছড়িয়ে পড়ে, আর বুড়ি পৃথিবীমায়ের বুক চিরে রূপসী কুয়াশাকুমারী দেখা দেয়। আস্তে আস্তে সে আকাশপথে এগিয়ে যায়। আর উয়েনুকু রামধনু হয়ে তখন থেকেই আকাশের এক দিক থেকে অন্য দিকে ছড়িয়ে পড়ে— সে এখনও আকাশের চারপাশে আলো ফেলে কুয়াশাকুমারীকে খুঁজছে। উয়েনুকু এখনও বউকে ভুলতে পারে নি।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের দুটি লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দমতো যে কোন ফরম্যাটটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য