ফুটবল থেকে সাবধান - হাসান আজিজুল হক

      ভল্টু বিষম খিদে নিয়ে সকালে বিছানায় উঠে বসল। অথচ যাকে বলে হেঁটে চলে বেড়াবার তাগৎ তা তার নেই। গতকাল বিকেলেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। পল্টু ওদিক থেকে বলটা ধরে ফটুকে কাটিয়ে ভল্টুকে পাশ দিয়েছে। ভল্টুর সামনে কেউ নেই, গোল পর্যন্ত একদম ফাঁকা—খালি গোলকী রামু ভয়ে তলপেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক অমনি সময়ে—যাকে বলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত কোথা থেকে লেদু এসে ধাই করে একটা চার্জ কষলে। ভল্টুু পশ্চিম মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, পায়ের পাতাও কাজেই পশ্চিম দিকেই ছিল। কচাৎ করে একটা আওয়াজ হলো, আর তার পায়ের পাতাটা সিম্পলি উত্তর দিকে ঘুরে গেল। তারপর আর ওর কিছুই মনে নেই, আবছা দেখলে রামু তলপেট ছেড়ে দিয়ে দুহাত তুলে নাচছে আর আকাট চাষা লেদু কিরকম অবাক গলায় বলছে, লাও বেপদ, পাটো গেল যি।’
      এই অবস্থায় বাড়ি ঢোকার উপায় ছিল না। তাহলে আব্বর পিটুনীর চোটে বাকী ঠ্যাংটাও যেত। সেইজন্যে বেশ খানিকটা রাত্তির হলে ভল্টু লেদুর ঘাড়ে ভর দিয়ে চুপি চুপি নিজের ওপরের ঘরে উঠে গেছে। নিচে নামার কোন প্রশ্নই নেই, সেজন্যে ভল্টুকে গতরাতে একসের শুকনো চিড়ে চিবিয়েই কাটাতে হয়েছে। ওর এই ঘরে হাঁড়ি-কুড়ি খুঁজলে মাঝে মাঝে চিড়ে, চাল বা গুড়টুর একটু পাওয়া যায়। এই যা বাচোয়া। ছোট বোনটা একবার ডাকতে এসেছিল খেতে। ভল্টুু আজ আর খাবে না। বারোমাসের পেত্যেকদিন বাড়িতে ভাত চিবোয় না ভল্টুু। .
      এখন এই সক্কাল বেলায় ভল্টুর এমন ভয়ানক খিদে পেল যে সে পরিষ্কার বুঝতে পারল তার জ্বর হয়েছে। জ্বরটর হলেই খিদেয় সে অজ্ঞান হয়ে যায় এটা তার ছোটবেলাকার অভ্যেস। ডানপায়ের গোড়ালির কাছটায় টেনিস বলের মত ফুলে উঠেছে। ‘জীবনে আর আমি ফুটবলের চেহারা দেখব না”—এই বলে ভল্টুর ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল, আর লেদু ব্যাটার পাতো আর পা দিয়ে ভাঙা যাবে না—কাঠের উপর রেখে মুগুর দিয়ে থেতো না করলে উপায় নেই।’
      ছোট বোনটা এই সময় আবার এলো। বেণী দুলিয়ে ঝংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করল সে নিচে নামবে কিনা। আর ভল্টু মুহুর্তে কেমন উদাস হয়ে গেল, ‘হায়রে, আমার কি এমন কেউ আছে যে দুটো খাবার এনে দেয় এখানে—আমার জন্যে একটু ভাবে এমন কেউ নেই এ বাড়িতে। এই যে আমি এখন এ্যালজেব্রা কষব—আর সে সব কি সাংঘাতিক সাংঘাতিক এ্যালজেব্রা—ভাবলেও নাড়িতুড়ি বাইরে চলে আসে–সে সম্বন্ধে কারুর কি কোন ভাবনা চিন্তা আছে? এই সব কথার পর ওর ছোট বোন বেচারা একটা আস্তো কাটালের অর্ধেকটা দিয়ে গেছে তাকে। তাই খেয়ে ভল্টু কোন রকমে প্রাণটা রক্ষা করেছে।
      খাওয়া শেষ হতেই কিন্তু মনে পড়ল আজ এ্যাসিষ্ট্যান্ট হেড মাষ্টার ফটিকবাবুর ক্লাশ। এইবার ভল্টুুর সত্যি সত্যিই জ্বর চলে এলো। সত্যি বলতে কি তার এত শীত করে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল যে সে মোটা একটা চাদর টেনে নিয়ে আগাগাড়ো মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। তখুনি নিচে থেকে আবার খড়মের আওয়াজ এলো। ভল্টু টান মেরে চাদর সরিয়ে দিয়ে মরিয়া হয়ে উঠে বসল। সে ভাবল এই রকম ঘাবড়ে গেলে বিপদ বেড়েই যাবে। —স্কুলেও যেতে হবে—এ্যালজেব্রার ব্যবস্থাও করতে হবে। গোড়ালীর কাছে এমন ব্যথা করছে যে ভল্টু উঠে দাঁড়াতে পারছিল না।
      অতি কষ্টে নিচে নেমে এলো সে—উঠোনে আসতেই আব্বার সংগে মুখোমুখি, কোথায় যাচ্ছো?
      ভল্টুু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এমন মারাত্মক একটা হাসি ছাড়লো যে আব্বার মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়। তিনি অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলেন আর তাকে দেখিয়ে ভল্টু হাত পা নাড়তে লাগলে এমনি ভাবে যেন তার পায়ে কিছুই হয়নি।—তেমনি হাসতে হাসতে বললে—‘জী না, আমার কিছু হয়নি।’
      ‘জিজ্ঞেস করছি কোথায় যাচ্ছে!’ ওর আব্বা গম্ভীর গলায় বললেন। 
      ‘এই যাঃ, দিচ্ছিলাম সব ভেস্তে’ –ভাবলে ভল্টুু—তারপর মুখ কাচুমাচু করে বললে, পল্টুর কাছে এ্যালজেব্রাটা একটু আনতে যাচ্ছি—মানে এ্যালজেব্রা আপনি কিনে দেননি তো! বোধহয় একটু চুপসে গেলেন ভল্টুুর আব্বা। ভল্টুু ওঁর চোখের ওপর দিয়ে মার্চ করতে করতে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসেই তার মনে হোল গোড়ালীটার পাশে ঐ টেনিসবলটা দিয়ে তার জানটাই বেরিয়ে যাচ্ছে। সেটা চেপে ধরে ‘মাই ফাদার’ বলে ভল্টু বসে পড়লো।
      এমন বিচ্ছিরি ব্যথা করতে লাগল যে ইচ্ছে হচ্ছিল পাটাকে কেটে বাদ দিয়ে দেয়। এইসময় লেদু কোথাথেকে দুটো গরু তাড়াতে তাড়াতে এসে হাজির।
      ‘পা কি বুলে ? লেদু বললে। 
     ‘পা কি বলে দেখবি—এই দ্যাখ—বলে ভল্টু বাঁ পা দিয়ে একটা লাথি ঝাড়ল লেদুর কোমর বরাবর। কিন্তু ঠিক সময়ে সরে গেছে লেদু। ফলে এই হলো ভল্টুুর বাঁ-পাটাও জখম হলো। লেদুটা চাচা হলে কি হবে। আসলে প্রাণটা ওর বড্ড ভাল, বললে, “আমার দোষটাে কি বল, আমি চার্জ লোব না ? চার্জ না নিলে বলটো যি গোলে ঢুকিয়ে দিতিস।’
      ভল্টুু গম্ভীর হয়ে বললে, যাক যা করেছিস করেছিস। বল খেলা গেলো আমার চিরদিনের জন্যে। পা-টা কেমন ফুলে উঠেছে দেখেছিস। তোর মন খারাপ করছে না আমার জন্যে?
      লেদু কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে,“তোর লেগে দুঃখুতে আমার জানটাে বেরিয়ে যেচে র‌া। 
      ‘তাহলে আমাকে একটু খুশী করা তোমার কর্তব্য কিনা?
     ‘লিচ্চয়'—লেদু বললে। 
     ‘তাই যদি ইচ্ছে তোমার, তাহলে বোর্ডিং-এ পন্টুর কাছে নিয়ে চল আমাকে—হাঁটার তো ক্ষমতা রাখিস নি। লেদু ঘাড় নামিয়ে বললে, ‘ওট্‌ তাইলে—ঘাড়ে করেই লিয়ে যাই তোকে।’
     লেদুর চুল মুঠো করে ধরে ভল্টু মনের আনন্দে পল্টর কাছে পৌছুল। সে তখন স্কুলের বারান্দায় বসে নস্যি টানছিল। সামনে এ্যালজেব্রাটা খোলা। ভল্টুকে ওমনি করে আসতে দেখে সে একেবারে থ হয়ে গেল, ফিসফিসিয়ে বললে, কাঁধ থেকে নামো গাড়োল কোথাকার। শীগগীর নামে।
     ‘কেন? ভল্টু জিজ্ঞেস করল। লাইব্রেরীতে ফটিক স্যার বসে আছে। তোমাকে ওমনি অবস্থায় দেখলে আজ আর চারা নেই। এ্যালজেব্রা হয়েছে?
     ‘না’
     ‘তাহলে আজ তুই নির্ঘাৎ মারা যাচ্ছিস। তোকে আর রক্ষা করা গেল না।
    ফটিকবাবুর নাম শুনেই ভল্টু তাড়াতাড়ি লেদুর ঘাড় থেকে নামার চেষ্টো করছিল। পায়ের ব্যথা নিয়ে লাফিয়ে নামারও উপায় নেই। আর লেদুটা এমনি হাদা যে যত তাকে নামিয়ে দিতে বলা হচ্ছে ততই সে স্কুলের খোলা মাঠে চক্কোর দিচ্ছে। ‘কিগ? কি বুলছ? লেদু এই কথা জিজ্ঞেস করে আর লাইব্রেরীর খোলা দরজার সামনে ভল্টুকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
     ‘নেকু? কি বলছি বুঝতে পারছে না? ভল্টু খিঁচিয়ে উঠলো।
     ‘লাববে?’
    ‘কোথাকার চাষা বলতো এটা। একশবার বলছি নামিয়ে দে, নামিয়ে দে। এতক্ষণ পরে বলে কিনা লাববে? ওরে আস্তে আস্তে—ফেলে দিস না—মরে যাব, মরে যাব’—ভন্টু কঁকিয়ে উঠল আর সংগে সংগে হুড়মুড় করে লেদু তাকে নামিয়ে দিলে ঘাড় থেকে। ইষ্টুপিট, গাধা, উল্লুক’—মহাখাপ্পা হয়ে ভল্টু গালাগাল দিতে লাগল লেদুকে। জিনিস পায়ে কি সাংঘাতিক দরদ হয়েছে তবু—
     ‘অয়, তা আমি কি করব—লাবিয়ে দিতে বুললে যে—’ রাগে বাক্যহারা হয়ে ভল্টু লেদুর দিকে চেয়ে রইল খানিক। পল্টু সিরিক সিরিক করে একটা অদ্ভুত আওয়াজে হেসে বললে, যাক ছেড়েদে—অবোধ জীবতো—করে ফেলেছে। এখন এ্যালজেব্রার কি করবি বল। সকাল থেকে বসে বসে নস্যি টানছি, উপায় তো কিছু করা গেল না। তোদের আর কি ভাই, বাড়িতে থাকিস—স্কুলে না এলেই হোল। আমরা তো বোর্ডিং-এ থাকি, ক্লাশে না পেলে কান ধরে নিয়ে যাবে।
     ‘ওই আনন্দেই থাক’-- দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভল্টু বললে, ‘ফ্যামিলি লাইফের দুঃখুতো বুঝলি নে কোনদিন। বাড়িতে যদি জানতে পারে পায়ের এই দশা হয়েছে, মারের চোটে বাকি পা-টাও এ রকম করে দেবে—তারপর গরুর গাড়ি করে স্কুলে পৌছিয়ে দিয়ে বলে যাবে, হারামজাদাটাকে আচ্ছা করে কসুন তো।”
     'ফটকে তাহলে তো আজ প্রাণে মারবে রে’— 
     পল্টু বললে, ‘এ্যালজেব্রার এই অংকগুলোই আগের ক্লাশে কষতে বলেছিল। কেউ পারেনি বলে আবার দিয়েছে। আজ কষে নিয়ে না যেতে পারলে—
     ‘কি হবে চিন্তা করা যাচ্ছে না, ভল্টু পাদপুরণ করে দিলে।’ 
     “উপায় করি কি’—
     ‘আমিও তো তাই ভাবছি।’ 
    ‘ফুটবলটা বার করে নিয়ে আসব? আমার ঘরেই থাকে।’ ভল্টু জিজ্ঞেস করে। 
     ‘বল দিয়ে কি করবি বলদ কোথাকার?
     ‘একটু খেলি।’
    ভল্টু আর্তনাদ করে উঠল, পাল্টা, তোর মনে এই ছিল—এমনি দাগ দিলি আমাকে? জানিস এ জন্মের মতো বলখেলার দফা আমার রফা হয়ে গিয়েছে। পাখানা দেখেছিস। সেই তুই আবার বলের কথা তুলিস এই সকাল বেলায়?
     তোমার জন্যে দুঃখুতে বুকটো ফাটচে আমার। পা-টো ভেঙে ফ্যাললোম—লেদু আবার এসে ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করলে। ‘তুই যাসনি এ্যখনো—ভন্টু অবাক হয়ে গেল ওকে দেখে।
     ‘বল নিয়ে এসে প্র্যকটিশ করি একটু—বিকেলেই তো খেলা আজ সরফরাজপুরের সংগে’—পলটু আর জিজ্ঞেস করার অপেক্ষা না রেখে ঘরে গিয়ে বল নিয়ে এলো। দেখেই লেদু লুংগী গুটিয়ে মালকোচা মারলে, "গরু মাটে লিয়ে যাবার বেলা হয় নাই এখনও—দুবার পিটিয়ে লি—লাও, মারো দিকিনি—বলে লেদু রেডি হয়ে গেল। তখন পন্টু ওর কানে কানে কি বললে আর ভল্টু দেখল গাধাটা মাথা নাড়ছে ঘনঘন পন্টুর কথায়।
     প্রথম বলটা ধাই করে স্কুলের দেওয়ালে লেগে ফিরে এলো আর সংগে সংগে বলটাকে পাতিয়ে নিয়ে লেদু এমন একটা ভয়ংকর কিক লাগালে যে লাইব্রেরী রুমের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটা ইট খসে পড়ল দুম করে।
     এ্যাসিষ্ট্যান্ট হেডমাষ্টার ফটিকবাবু লাইব্রেরীর ভেতর থেকে হাঁক পাড়লেন, ‘এই সকালে বল বের করেছে কে রে?’ বয়স হয়েছে তো মাষ্টার মশাই-এর—এই জন্যে গলাটা বেশ জমকালো হলেও কেমন কাঁপা কাঁপা, আবার টেনে টেনে বললেন, বলি বল বার করলে কে?
     ভল্টু বসে বসে দেখছিল ফটিকবাবু বিরাট ভুড়ি, কাপড় ইত্যাদি সামলে বহু কষ্টে কাজ ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসবার চেষ্টা করছেন। তক্ষুনি পন্টু দরজার কাছে গিয়ে ঘরে উঁকি দিয়ে বললে, “মাষ্টার মশাই, আমরা।’ বলতেই বিদঘুটে গলায় আকাশ ফাটিয়ে ভেংচিয়ে উঠলেন ফটিকবাবু, ‘এ্যাঃ আমরা! দাঁত বের করা কোথাকার। বলতে লজ্জা হচ্ছে না? বেকুফ, বলদ, গোময়।’ 
     ‘সামান্য একটু প্র্যাকটিশ করছি মাষ্টার মশাই—পন্টু একেবারে বিনয়ের অবতার। 
     ‘চোপ”—আবার বোমা ফাটার আওয়াজ হোল—সকাল বেলায় পড়াশোনার ইস্তফা দিয়ে প্র্যাকটিস হচ্ছে! এ্যালজেব্রা কষেছিস?
     ‘এইমাত্র শেষ করলাম। বিকেল ম্যাচ তো মাষ্টার মশাই—তাই একটু পায়ের গাটগুলো ছাড়িয়ে নিচ্ছি।’
     ‘হতভাগার কথা কি—গাট ছাড়িয়ে নিচ্ছি ক্লাশে আজ অংক না হলে তোমার গাট আমিই ছাড়িয়ে দেব। যা বলফল নিয়ে পালা।’
     এই সময় দুম করে একটা বল এসে লাগল দরজায়। লেদুর মার। ইতিমধ্যেই আরও কয়েকজন এসে জুটেছে। ‘এ্যই খবরদার, লাইব্রেরী ঘরে একটা বল এসে লাগলে ছাল ছাড়িয়ে নেব।’ বলে ফটিকবাবু খালি গায়ে চেয়ারে গিয়ে বসলেন-পেতলের বিরাট একটা কলসীর মতো তার ভূড়ি ঠিক যেন বাতাসে ভেসে রইল। 
     ‘টেক এম’ পন্টু ফিরে এসে বললে লেদুকে। 
      ইংরেজী হলেও লেদু বুঝলে, বললে, ‘এ্যাম যে হচে না—আমি কি করব?’ 
    ‘আবার মার—খুঁড়িটাতো বাতাসে ভাসছে, দেখতে পাচ্ছে না নাকি—তোমাকে ম্যাচে খেলতে দেওয়া হবে না—এই সামান্য এইম নাই যার সে গোল করবে কিভাবে? ধাঁই—বল গিয়ে লাগল লাইব্রেরী ঢোকার সিঁড়িতে। ফটিকবাবুর ঘুম জড়ানো গলা শোনা গেল, ‘ওরে আস্তে মার,—শেষে একটা সব্বোনাশ হয়ে যাবে। ধাঁই, ঝনঝন ঝনঝন—স্কুলের ঘন্টা উলটিয়ে পড়ল—আর বদনটা উপুড় হয়ে গিয়ে সমস্ত পানি লাইব্রেরী ঘরের মেঝেতে গড়িয়ে চলল। এইযে বদমাস, শিয়ালমরা মামদোভূতের দল, বলি, একটু আস্তে আস্তে বুঝি প্রাকটিশ হয়না?
     লেদু এখন বলটা পাতিয়ে নিয়েছে। লুংগীটা বেশ ভাল করে কষে বেঁধে ঐ্যাক করে একটা আওয়াজ করে কিক কষালে। বলটা মাটি ছেড়ে উঠল, ভল্টু চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে—পলটু, ছদাই, ভ্যাবলা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে—বলটা বাঁদিকের দরজা দিয়ে সাঁৎ করে ঢুকে ডানদিকে ঘুরে গেল—তারপর পাখির মতো নিচে নেমে এসে—বিশ্বাস করা যাবে কি সে কথা? ফটিকবাবুর ভূড়িতে গিয়ে লাগল। টেবিলের ওপর গতকালকের নেভানো হারিকেনটা উলটে ফেলে দিয়ে ঠিক যেন মনের উল্লাসে লাফাতে লাফাতে আবার বাইরে বেরিয়ে এলো।
     ভুম—গম্ভীর একটা আওয়াজ বেরুল। ভল্টু ততক্ষণে চোখ খুলে দেখে ফটিকবাবু চেয়ার শুদ্ধ উলটে পড়ে আছেন। আশ্চর্য ব্যাপার—উপুড় হয়ে গেছেন তিনি—নড়ন চড়ন কিছু নেই। ‘এযে নড়েনা যেরে—ভন্টু প্রায় কেঁদে ফেলল। কিন্তু ওর কথায় কান না দিয়ে পন্টু লেদুকে বললে, “কেটে পড় এক্ষুনি—তল্লাটে যেন পাওয়া যায়না তোকে—যা ভাগ।      লেদু যেতে যেতে শুধু বললে, ‘ভূড়িটো জব্বর বটে বাপু—কি রকম আওয়াজ হোল শুনলে।
    ফটিকবাবু চুপচাপ থাকলেন মিনিট খানেক। ভল্টু পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটা তুলতে গিয়ে দেখল কপালটা ফুলে উঠেছে ওঁর। মাষ্টার মশাই খুব কি লেগেছে আপনার? পল্টু যেন মৰ্মাহত হয়ে জিজ্ঞেস করল। আর বললে বিশ্বাস করবে না কেউ, দারুণ একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। উনি বোধ হয় বললেন, ‘চোপ’—কিন্তু দাঁত নেইতো, শোনাল ‘হাপ’—তারপরেই আর কথা নেই ফটিকবাবু উঠে লাইব্রেরী ঘরের মেঝে দাড়িয়ে দুহাত তুলে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করলেন, ‘আজ সব কটাকে রাস্টিকিট করব—যদি না করি আমার নাম ফটিক চক্রবর্তী নয়, আমার বাপের নাম তারিণীচরণ চক্রবর্তী নয়, আমার ঠাকুর্দার নাম হিরণ্যকশিপু চক্রবর্তী নয়। নিয়ায় কাগজ—যা হারামজাদা শীগগীর কাগজ কলম নিয়ায়।’
     'কাগজ কলম টেবিলেই রয়েছে মাষ্টার মশাই। পল্টু বিনীতভাবে বলল।
     ‘হাপ—আবার মুখের ওপর কথা, যা বলছি কর—নিয়ায় কাগজ কলম।
     ‘টেবিলের কাগজ কলম দেব?’
     ‘কক্ষণও না—ঘর থেকে নিয়ায়।’
     অগত্যা পন্টু কাগজ কলম আনতে গেল। ফটিকবাবু গর্জনে পাড়া কাঁপাতে লাগলেন, ‘পঞ্চান্ন বছর বয়স হোল আমার—নিজের পরিবার পর্যন্ত আমাকে ঘাটাতে সাহস করেনা এই ভূড়ির জন্যে—এইজন্যে গোঁফ পর্যন্ত রাখিনি। হাটের লোক রাস্তা করে দিয়েছে এই ভুড়ি দেখে—আর তুচ্ছ কোথাকার কটা ছোড়া কিনা সেখানে তুচ্ছ গোচর্ম নির্মিত বর্তুল দিয়ে আমাকে আঘাত করে?
     পল্টু কাগজ কলম নিয়ে এলো। ফটিকবাবু নিজের ঘরে এসে তক্তপোষের ওপর জাকিয়ে বসলেন, ‘ইদিকে আয় সব—লাইন দিয়ে দাঁড়া। পল্টু ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এগিয়ে এলো। ‘কাম অন, হোয়াট ইজ ইওর নেম?’—ফটিকবাবু পল্টুকে জিজ্ঞেস করলেন। পল্টু অবাক হয়ে গেল, ‘স্যার, আমার নাম জানেন না আপনি, আমি পন্টু।
     ‘জানি তা কি হয়েছে? যা জিজ্ঞেস করছি তার জবাব দে—ইওর নেম?—পল্টু
     ইয়েস’—ফটিকবাবু খসখস করে পন্টুর নাম লিখলেন।
     'হাউ মেনি হিট্‌স?
     ‘কি বললেন?’
     ‘কবার বল মেরেছিস?’
     ‘দুবার।
     ‘মিথ্যে কথা। সত্যি বল নইলে—’
     ‘চারবার।’
    ‘ফোর হিট্‌স’—ফটিকবাবু আপন মনে কথাটা বলে লিখে রাখলেন। এমনি করে সবার রিপোর্ট নেওয়া হোল। বোর্ডিং এর রাধুনী এই সময় এসে বলে ফেললে, “যাওতো বাপু সব এখন—স্যার, আজ চাল নেব ক’সের? আর যাবে কোথায়—বোমার মতো ফেটে পড়লেন ফটিকবাবু, 'তুমি কোন লাটু—যাও যাও ফলাচ্ছ—তোমার চাকরী নেই আজ থেকে। যাও বেরোও?
     এরপর ভল্টুুর ডাক পড়ল।
     ‘নেম?—ফটিকবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
     ‘ভন্টু।’
     ‘ফাদার্স নেম?’
     ভল্টু মিউমিউ করে তার আব্বার নাম বলল।
     ‘সাবু খেয়েছ।’
     ‘কি বলছেন মাষ্টার মশাই?’
     ‘ওতো ওরকম করবেই মাষ্টার মশাই। আসলে আপনার ভূড়ির ওপর বলটা ওই ভল্টুুই মেরেছে তো। পন্টু বলল।
     ‘কি রকম?’
     ‘ওর পাটা একবার দেখুন না। এমন মার মেরেছে যে গোড়ালী একেবারে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। আহা বড্ড লেগেছে বেচারার।'
     কথা শুনে ফটিকবাবু হাঁক ছাড়লেন, ইদিকে আয়।
     ভল্টু অবাক হয়ে পল্টুর দিকে চাইতে গিয়ে দেখে সে তখন ওপরের দিকে চেয়ে কড়িকাঠ গুনছে। যেন কোন কিছুই সে জানে না।
     ‘পল্টা’—বলে ভল্টু একটা গগনবিদারী চীৎকার করতে যাচ্ছিল, ফটিকবাবু ওর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে ওকে সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
     ‘হতভাগা—’
     ‘মাষ্টার মশাই আমি গতকাল—’
     ‘শাট আপ—কথা বললে খুন করব তোকে—গুণ্ডা, ডাকাত, বদমাস—
     ‘আমি গতকাল মাঠে ফুটবল খেলছিলাম, এই সময় হঠাৎ—
     ‘চোপ রও—উল্লুক পাজী।’
     'হঠাৎ লেদু এসে এমন জোরে—
     ‘নড়তে নাড়ে বন্দুক ঘাড়ে। সেই তখন থেকে বলছি সকালবেলা বল খেলে কাজ নেই—কানে যাচ্ছে না তোমাদের।’
     ‘এমন জোরে চার্জ কষলে যে’—ভন্টু তার গল্প বলেই যাচ্ছে।
     ‘পায়ের অবস্থা দেখছিস ভল্লুক কোথাকার—গ্যাংগ্রিন হয়ে মারা যাবি যে।’
     ‘আমি এখানে একটা বলও মারিনি স্যার।’
     ‘একটি চড়ে তোমার দাতকপাটি লাগিয়ে দেব—বলছি চুপ করতে। এই তোরা সব ভাগ এখান থেকে। স্কুলের সময় সবাই আসবি। সবকটাকে রাষ্টিকিট করতে হবে। হঠাৎ পল্টুর দিকে নজর পড়তেই খিঁচিয়ে উঠলেন ফটিকবাবু, ‘তুমি শয়তান ভেবেছ ক্লাশ নেবনা আজ? ওরে ওতে আমার কিছু হয়না। আমার নাম কি জানিস তো? দেখে আয়গে ইসলামপুর স্কুলের টিমে আমার নাম লেখা আছে সোনার কালিতে। আজ সারাদিন শুধু এ্যালজেব্রার ক্লাশ হবে।’
     তারপর ফটিকবাবু তার হোমিওপ্যাথির বাক্স খুলে একটা ঔষুধ বের করে ভন্টুকে খাইয়ে দিয়ে বললেন, যা বাড়ি যা, দুদিন চুপ করে বাড়িতে বসে থাকবি—স্কুলে আসবি না। পথে বেরুবি না—তোর বাবাকে আমি বলে দেব। হতভাগা পা-টার দশা করেছে কি—চিরদিনের মতো খেলাধূলা যে যাবে—যা ভাগ। নুনের পুটুলী করে রাত্রে সেক দিবি আর এই ঔষধ আজ সন্ধ্যায় এক পুরিয়া, কাল সকালে আর সন্ধোয় এক এক পুরিয়া করে খাবি। যতসব শেয়ালমার নিয়ে হয়েছে আমার কারবার। যা যা পালা।’ এই বলে হাঁক দিলেন তিনি, ‘পল্টা, তামাক সাজ।’

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য