সাগরকন্যা ও আকাশের চাঁদ - আদিবাসী লোককথা

       অনেক অনেক কাল আগে আমাদের এই সুন্দর দ্বীপে এক রাজা ছিল। বড় ভালো রাজা। রাজা সবার সুখ-দুঃখের খবর নিত। তার সভায় ছিল এক জাদুকর। রাজা সব সময় তার কথা মেনে চলত।
        এখন হয়েছে কি, এক মহা বিপত্তি। দ্বীপের জেলেরা এসে কেঁদে পড়ল রাজার পায়ে। রাজা মন দিয়ে সব শুনল আর জেলেদের বাড়ি ফিরে যেতে বলল।
        রাজা জাদুকরকে ডেকে বলল, ‘অবাক হবার মতো কথা বটে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। জেলেরা ডিঙি করে অনেক দূরে যায়। ছিপ নামিয়ে দেয় জলে। একই জায়গায় ওরা যায়। কেননা, বহুকাল থেকে ওখানেই ওরা মাছ ধরে। ওই পাহাড়ের কোলে। ছিপে টান পড়ে না, বড়শিতে মাছ ঠোকরাচ্ছে তাও মনে হয় না। কিন্তু ছিপ তুললেই দেখা যায়, বড়শির ওপর থেকে সুতো কাটা। বারবার এমন হচ্ছে। মাছও পাওয়া যাচ্ছে না, বড়শিও উধাও হচ্ছে। গরিব মানুষ অত বড়শি পাবে কোথায়? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কিছু উপায় বের করো। রাজা বেশ চিন্তিত।
        জাদুকর হেসে বলল, ’ও এই ব্যাপার। বুঝেছি। সাগরের অনেক নীচে এক রাজ্য রয়েছে। সেই রাজ্যের নাম লালো-নানা। সেখানে থাকে এক বোন আর দুই ভাই। তারা অপরূপ সুন্দর। এমন রূপ মানুষের হয় না। জেলেরা নিশ্চয়ই লালো-নানা রাজ্যের ওপরে মাছ ধরতে গিয়েছিল।
       অন্য সব কথা রাজা ভুলে গেল। বলল, “আমি ওদের দেখব। ওরা কেমন তা তোমায় দেখাতেই হবে। জাদুকর, তুমি ওদের নিয়ে এসো।
       জাদুকর বলল, তা পারি। চেষ্টা করব। তবে ভাই দুজন তো এখন সাগররাজ্যে নেই। তারা দূর সাগরে বেড়াতে গিয়েছে। শুধু রয়েছে বোন। দেখি চেষ্টা করে বোনকে তীরে আনতে পারি কিনা।
       কয়েক দিন কয়েক রাত কেটে গেল। হঠাৎ একদিন রাতে দামামার আওয়াজ শোনা গেল। আওয়াজ আরও বেশি হচ্ছে। যেন দুই গোষ্ঠীতে লড়াই বেধেছে। দামামার আওয়াজ সবুজ নারকেল গাছের সারি পেরিয়ে সমুদ্রে আছড়ে পড়ছে। সমুদ্রের গর্জনকেও ছাড়িয়ে গেল।
        আওয়াজ পৌঁছল লালো-নানা রাজ্যে। ঘুমিয়ে ছিল সাগরকন্যা হিনা। তার ঘুম গেল ভেঙে। সে জেগে উঠল। প্রবাল প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল হিনা, কিছুই বুঝতে পারল না। সাগর-ফুলের বাগানে এল, অসংখ্য রঙিন মাছ হিনার চারপাশে ভেসে ভেসে খেলে বেড়াচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারল না হিনা। এদিকে চাইছে ঝিনুক চোখ, ওদিক চাইছে ঝিনুক চোখ। হঠাৎ সে দেখতে পেল- মানুষের মতো দেখতে কি যেন সাগরের মাঝখানে ঝুলে রয়েছে। অবাক হয়ে গেল সে। আস্তে আস্তে ভেসে ভেসে সে এগিয়ে গেল। আরও কাছে, আরও কাছে। একেবারে কাছে গিয়ে দেখল। একটা কাঠের মূর্তি, মানুষের মূর্তি। কিন্তু এত সুন্দর কারুকাজ করা যে হিনা চোখ ফেরাতে পারছে না। তার গায়ে সুন্দর ঝলমলে রাজার পোশাক। ঠিক যেন কোন রাজপুত্র। মূর্তির মাথায় সুতো বাঁধা, সেই সুতোতে ঝুলছে কাঠের রাজপুত্র। নিশ্চয়ই ওপর থেকে কেউ মাছ ধরছে। কিন্তু এমন অদ্ভুত টোপ হিনা কোনদিন দেখে নি।
       সাদা মুক্তোর মতো শরীর ভাসিয়ে হিনা সাঁতার দিল। সুতোর পথ ধরে ওপরে উঠতে লাগল। সাগরকন্যা দেখবে, কোন সেই জেলে যে এমনভাবে টোপ ফেলেছে। ওরা কেমন ধরনের ছিপ হাতে বড়শি ফেলেছে?
       জলের ওপরে অল্প শব্দ হল। হিনা মাথা তুলেছে জলে। এলোমেলো ভেজা চুল কপাল বেয়ে মুখের ওপরে পড়ছে। মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে সে দেখল, এখানে-ওখানে অনেকগুলো ডিঙি জলে ভাসছে। ঢেউ-এর তালে তালে অল্প অল্প দুলছে। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল, ডিঙির সারি সাগরের তীর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। কি সুন্দর লাগছে জলের ওপরে ডিঙির সারি।
       হিনা একটা ডিঙির কাছে গেল। মাথা উঁচিয়ে দেখল, তার ওপরে একটা কাঠের মূর্তি। আর একটা ডিঙির কাছে গেল, আর একটা মূর্তি। সাগরকন্যা সাঁতরে চলেছে এক ডিঙি থেকে আরেক ডিঙিতে। সব ডিঙিতেই একই রকমের মূর্তি। ঠিক জলের তলার মূর্তিটার মতো। তখন তো আকাশে কোন চাঁদ ছিল না, আকাশে শুধু ছিল তারা। সেই তারার আবছা আলোয় মূর্তিগুলোর পোশাক আর গায়ের গয়না দেখে মুগ্ধ হল হিনা। এমন সুন্দর জিনিস সে আগে কখনও দেখেনি। হিনা ভাবল, কোন এক জাদুকর বোধহয় দ্বীপের সব মানুষকে এমন কাঠের মূর্তি করে দিয়েছে। সব মানুষ প্রাণহীন কাঠ হয়ে গিয়েছে।
        ডিঙির মূর্তি দেখতে দেখতে হিনা সাগরতীরে পৌঁছে গেল। চারিদিক শান্ত, প্রাণের কোন সাড়া নেই। নারকেল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রইল হিনা। ভাবল—কোন মানুষ নেই দ্বীপে, তাহলে আর ভয় কি! একটু এগিয়ে সে আরও অবাক হল। নারকেল গাছের সারির মধ্যে মধ্যে সেই রকম মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সব কাঠের মূর্তি। তাহলে? তাহলে হিনা যা ভেবেছিল ঠিক তাই! সব মানুষ মূর্তি হয়ে গিয়েছে।
        নারকেল গাছের সারির নীচ দিয়ে, ফুলফোটা বনের পাশ দিয়ে, আবছা আঁধারে সাগরকন্যা ভেসে চলেছে। চুলগুলো পেছনে দুলছে, যেন হাওয়ায় ভাসছে প্রবাল রাজ্যের মিষ্টি মেয়ে।
        যেতে যেতে সে একটা ছোট বাড়ির সামনে এল। দোর বন্ধ। আলতো করে হাত দিতেই দোর খুলে গেল। কেউ নেই ভেতরে। অনেকটা সাঁতার কেটেছে হিনা, অনেকটা পথ হেঁটেছে হিনা। ক্লান্ত সে। ধবধবে বিছানায় শুয়ে পড়ল সাগরকন্যা। ঘুমিয়ে পড়ল হিনা। কখন ভোর হয়েছে। হিনা ঘুমিয়ে রয়েছে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে চাইল। দেখল, দ্বীপের রাজা তার দিকে চেয়ে রয়েছে। ভয় পেল না হিনা, খুব ভালো লাগল। রাজার মুখে হাসি, মেয়ের চোখে মুক্তো-ঝরানো হাসি। রাজা দুহাত বাড়িয়ে মেয়েকে বসিয়ে দিল। মেয়ের চোখে সাগরজলের শান্তি ।
        রাজা বলল, “তোমাকে আমি বিয়ে করব। তুমি হবে হাওয়াই দ্বীপের রানি।
      মেয়ে কোন কথা বলল না। অল্প হেসে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে রানি হতে চায়। রাজা সাগরকন্যার গলায় পরিয়ে দিল মুক্তোর মালা, হাতে পরিয়ে দিল প্রবালের বালা। অনেক দিন কেটে গেল। দ্বীপের অপরূপ শোভা আর সৌন্দর্যের মধ্যে তাদের দিন কাটে। সুখে শান্তিতে। দ্বীপের সবকিছুতেই মেয়ে অবাক হয়, সবকিছুকেই সে ভালোবাসে। এমনি করে দিন কাটে। একদিন মেয়ে বলল, “তুমি আমায় অনেক দিয়েছ। সবচেয়ে ভালো জিনিস এই মুক্তোর মালা আর প্রবালের বালা। আমি তোমায় কিছু দিই নি। এবার একটা উপহার দেব।
        রাজা হেসে বলল, “বেশ তো, দাও। কি উপহার তুমি দেবে। মেয়ে বলল, “আমার প্রবাল রাজ্যে একজন ডুবুরি পাঠাও। সাগরের নীচে আমাদের প্রাসাদে সে একটা সুন্দর কাঠের বাক্স দেখতে পাবে। তার মধ্যে রয়েছে এক অমূল্য রত্ন। ডুবুরি সেই বাক্স নিয়ে আসবে। কিন্তু পথের মধ্যে সে যেন সেটা না খোলে। আমার হাতে দেবে। আমি আর আমার দুই ভাই বহু বছর ধরে সেই রত্ন রক্ষা করে এসেছি, পাহারা দিয়েছি।
        রাজা দ্বীপের সবচেয়ে ভালো ডুবুরিকে ডেকে সব বুঝিয়ে দিল। ডুবুরি মাথা নুইয়ে রাজাকে প্রণাম করে সাগরজলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
        বেশ কিছুক্ষণ পরে ডুবুরি উঠে এল তীরে। তার হাতে কাঠের বাক্স। রাজা প্রাসাদে ফিরে গিয়ে হিনার হাতে তুলে দিল সেই রত্নভরা বাক্স। খোলা আকাশের নীচে প্রাসাদের বাগানে হিনা বসে রয়েছে। বাক্স হাতে নিয়ে হিনা রাজার দিকে চাইল। একটু মিষ্টি হেসে রানি বাক্সের ডালা খুলে ফেলল। চোখ-ধাঁধানো গোলমতন কে যেন বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। গোলমতন রত্ন ওপরে উঠছে, আরও ওপরে। উঠতে উঠতে সে আকাশে গিয়ে থামল। সে হল চাঁদ। হাওয়াই দ্বীপের মাথায় চাঁদ আটকে গেল। আগে আকাশে ছিল শুধুই তারা, আজ থেকে আকাশে দেখা দিল চাঁদ। অনেক তারার মাঝে একটি চাঁদ। সাগরকন্যার রত্ন।
        মেয়ে রাজার মুখের দিকে চেয়ে হাসছে, রাজা আকাশে সেই রত্ন দেখে হাসছে। হঠাৎ মেয়ে সাগরের দিকে চেয়ে চমকে উঠল। সর্বনাশ ! চাঁদের প্রতিবিম্ব সাগরজলে !
        মেয়ের চোখের কোল বেয়ে মুক্তো ঝরে পড়ল। মেয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে রানি বলল, “হায়! কি হবে? সাগরজলে আকাশের চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখে ভাইরা সব বুঝে ফেলবে। তারা জানবে, আমাদের রত্ব হারিয়ে গিয়েছে, রত্ন হাতছাড়া হয়ে আকাশে চলে গিয়েছে। দূর দূর সাগর থেকে একদিন তারা ফিরে আসবে, এসে দেখবে তাদের বোন প্রবাল রাজ্যে নেই। তারা বুঝবে, বোনই তাদের রত্ব নিয়ে গিয়েছে। তারা বন্যার দেহ নিয়ে আছড়ে পড়বে দ্বীপে। রেগে গিয়ে ভাসিয়ে দেবে আমাদের এই সুন্দর হাওয়াই দ্বীপ। মেয়ে কেঁদেই চলেছে।
        রাজা হেসে বলল, “রানি, আমার হিনা, কোন ভয় নেই তোমার। আমাদের দ্বীপের ওই ওদিকে রয়েছে মস্ত উঁচু পাহাড়। বন্যা যদি আছড়েই পড়ে, আমার সব লোকজন, পশু আর ধনরত্ব নিয়ে আমরা উঁচু পাহাড়ে উঠে যাব। ওখানে সাগরজল পৌঁছবে না। কোন ভয় নেই তোমার। তবু মেয়ে ভয়ে কাঁদছে।
        পরের দিন দ্বীপের সবাই চলল উঁচু পাহাড়ে। পেছনে পেছনে বাড়ির সব পশু। ধনরত্নও সঙ্গেই নিল। সকলের সামনে হেঁটে চলেছে দ্বীপের রাজা আর রানি । তারা পৌঁছে গেল পাহাড়ে।
        এমন সময়ে দূরে ঝড়ের শব্দ শোনা গেল। দূর সাগরের ওই দিক থেকে শব্দ ভেসে আসছে। হঠাৎ দেখা গেল,—সমুদ্র সাদা হয়ে ফুলে উঠল, প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে আসছে সাগরের জলের ওপরের সেই সাদা মেঘ। আছড়ে পড়ল দ্বীপের ওপরে। ভেসে গেল বাড়িঘর, ডুবে গেল নারকেল বাগান। জল আছড়ে পড়ল পাহাড়ের নীচে।
        হিনা পাহাড়ের ওপর থেকে দেখতে গেল, তার দুই ভাই সাগরফেনার ওপরে বসে রয়েছে, চিৎকার করে ডাকছে। হিনা ভয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
        সাগরজল নেমে গেল। ঝড়ের শব্দ থেমে গেল। রাজা রানি লোকজন নেমে এল পাহাড় থেকে। সাগরজলের বন্যায় সব বাড়িঘর পড়ে গিয়েছে, জমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে, দ্বীপের সব কিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। দ্বীপ যেন কাঁদছে।
        এত লোক, তাদের খাবার কিছু নেই। বাড়িঘর তৈরি করতে সময় লাগবে, তারা রয়েছে আকাশের নীচে। কত আনন্দ ছিল, সব মানুষ গরিব হয়ে গেল। রাজারও একই অবস্থা।
        রাজা ভাবল, হিনাই দোষী। তার জন্যই এসব হল। সে না থাকলে তো এমন দশা হত না। তখন থেকে রাজা হিনাকে ঘৃণা করতে লাগল। তাকে ভালোবাসে না, তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে না, রানিকে অবহেলা করে। এমন অলক্ষুনে মেয়েকে কি আর রানি রাখা যায়। তাকে রাজা দাসী ভাবতে লাগল। সে হল রাজার দাসী।
        রাজা হিনাকে সকাল থেকে খাটায়। রাত হলে হিনার কাজ শেষ হয়। সবচেয়ে কঠিন কঠিন কাজ তাকে করতে হয়। দেহ চলে না, তবু ভয়ে ভয়ে করতে হয়।
        হিনা ভাবে, হায় ! এ কি হল! কোথায় গেল রানির সুখ। কোথায় গেল রাজার ভালোবাসা। দ্বীপের সবচেয়ে গরিব মেয়েকেও এমন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় না। রাজা যেন আক্রোশের জন্য এমন করছে। দাসীর জীবনও এমন হয় না ! হায়! যদি কোথাও শান্তি পেতাম, সেখানেই চলে যেতাম। হিনা ভাবে কিন্তু পথ পায় না।
        হিনা ভাবে, ফিরে যাবে সাগরতলে প্রবাল রাজ্যে। কিন্তু ভাইদের ভয়ে তাও সাহস পায় না। কি যে করে এখন! দ্বীপের চারদিকে জল। রাজার হাত থেকে পালাবেই বা কোথায়?
        একদিন তীরে বসে মাছ ধরছে সাগরকন্যা। চোখ দিয়ে মুক্তো ঝরছে। হঠাৎ দেখতে পেল, সাগরের ওপার থেকে এপার পর্যন্ত বিরাট রামধনু উঠেছে। সে ভাবল, আকাশের সূর্যের দয়া হয়েছে। তাই তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে এই রামধনু। রামধনু পথ দেখাচ্ছে। সূর্য যেন বলছে, এই পথ ধরে তুমি দ্বীপ থেকে পালিয়ে যাও।
        হিনা ছুটে গেল রামধনুর কাছে। রামধনুর পথ বেয়ে সে ওপরে উঠতে লাগল। মনে আশা, সে পালাতে পারবে। ওপরে উঠছে, আরও ওপরে। সূর্যের অনেক কাছাকাছি। চোখ জ্বলছে, দেহ পুড়ে যাচ্ছে সূর্যের তাপে। তবু পালাতে হবে। ওপরে উঠছে জলকন্যা। আর পারছে না সহ্য করতে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল হিনা, হাত আলগা হয়ে গেল। রামধনুর সেতু বেয়ে নীচে নেমে আসছে হিনা, ঝড়ের বেগে।
        হায়! আছড়ে পড়ল বালির ওপরে। আঘাত পেয়ে জ্ঞান ফিরল হিনার। আবার সেই দ্বীপে । দাসী হিনা কেঁদে ফেলল।
        হিনা উঠল না। সেখানেই শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল। সূর্য সাগরজলে ডুব দিল। অাঁধার হল। আকাশে উঠল চাঁদ। তবু হিনা উঠল না।
        হঠাৎ হিনী রাজার ডাক শুনতে পেল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে রাজা তাকে ডাকছে। হিনা বুঝল এবার তাকে পেলে আর আস্ত রাখবে না। সারাদিন কোন কাজই সে করে নি। হায়! এখন সে কি করবে? বুক কাঁপতে লাগল। রাজা এসেই তাকে কাজ করতে বলবে। সারাদিনের শেষ-না-করা কাজ করাবে। হায়! সাগরকন্যার এ কি হল?
        ঠিক সেই সময় এক অবাক কাণ্ড ঘটল। মেয়ে কোনদিন আগে এমন জিনিস দেখেনি। তার সামনেই চাঁদের রামধনু দেখা দিল। তার সামনে থেকে চাঁদের কাছ পর্যন্ত সেই চাঁদের রামধনু।
        হিনা মনে মনে বলল, আঃ ! কি মিষ্টি এই চাঁদের রামধনু। দেহ জুড়িয়ে গেল। আমি চাঁদেই যাব। আমি শান্তি পাব। চাঁদ আমায় এই পথ দেখাচ্ছে। চাঁদের রামধনুর সেতু বেয়ে আমি চাঁদে পৌঁছে যাব।
        দেহে শক্তি পেল হিনা। হিনা উঠে দাঁড়িয়েই চাঁদের রামধনু ধরে ফেলল। সেতু বেয়ে ওপরে উঠছে। কিন্তু এ কি ! পা ধরে টানছে কে? রাজা পৌঁছে গিয়েছে সেখানে। দেখল, রুপোলি সেতু বেয়ে হিনা পালাচ্ছে। পা ধরে নীচ থেকে টানছে রাজা, মেয়েও ওপরে উঠতে চাইছে। ভীষণ টানাটানি। মেয়ের পা বুঝি ভেঙেই যাবে। মেয়ে বুঝল, এবার পালাতে না পারলে আর রক্ষা নেই। প্রাণপণ শক্তিতে রুপোলি সেতু ধরে সে ওপরে উঠতে চাইছে। পা দুমড়ে গেল। হিনা কাতরাতে কাতরাতে ওপরে উঠতে লাগল। পেছন ফিরে তাকালো না হিনা। অনেকক্ষণ ধরে শুনতে পেল। রাজা চিৎকার করছে।
        শেষকালে সাগরকন্যা হিনা পৌঁছে গেল রুপোলি চাঁদের শীতল রাজ্যে। আঃ ! কি শান্তি !
        এখনও প্রবাল রাজ্যের রাজকুমারী চাঁদেই রয়েছে। পা ভেঙেছে, খোড়া হয়েছে।তবু শান্তি, অনেক সুখ।
        তোমরা যখন দেখবে চাঁদের চারপাশে পরির মতো সাদা মেঘ ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে, বুঝবে ওগুলো হিনার পশম বোনার কারুকাজ। হিনা পশম বোনে চাঁদে। সেগুলো সাদা মেঘের মতো চাঁদকে ঘিরে থাকে। একদিন যে ছিল প্রবাল রাজ্যের সাগরকন্যা, আজ সে চাঁদের দেশের আকাশি কন্যা। এই চাঁদ যে একদিন তারই বন্দি রত্ব ছিল। যে মেয়ে তাকে অন্ধকার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছে, তাকে সে বুকে টেনে নেবে না?

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য