গুপ্তধনের নেশা - সুবিনয় রায়চৌধুরী

     কাটনা গ্রামে বহুকালের বনিয়াদী পাকড়াসী বংশ বাস করেন। নরেশ বাবু সেই বংশের লোক; বড় জমিদার; খুব খ্যাতি-প্রতিপত্তি। তাঁর একমাত্র ছেলে সত্যেশ এবার বসুমতী কলেজ থেকে আই-এ পরীক্ষা দিয়েছে।
     সত্যেশের কয়েকটি বন্ধু ছেলেবেলা থেকেই তার খেলার সাথী; কলেজেও তাদের অনেকে সত্যেশের সঙ্গে পড়ে। কেদার সেন ডাক্তারের ছেলে পরেশ, অনুকূল ঘোষ কণ্টাক্টরের ছেলে বিনয়, ভূষণ চাটুর্জে উকিলের ছেলে অবিনাশ, মহেন্দ্র ঘোষ মোক্তারের ছেলে হেমেন্দ্র, এরা সবাই সত্যেশের অন্তরঙ্গ বন্ধু। লেখাপড়ায় সকলে খুব ভাল না হলেও বুদ্ধি নাকি তাদের খুবই ধারাল। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করা, ডিটেকটিভ-গিরি করা–এসব নাকি তাদের মাথায় খুব ভালরকম খেলে।
     বন্ধুদের মধ্যে বিনয়ই পাণ্ডা; সব কাজে সে বুদ্ধি জোগায়। কেমিষ্ট্রী নাকি তার খুব ভালরকম জানা আছে। বাড়ীতে সে নিজের চেষ্টায় ল্যাবরেটারী বানিয়েছে ; সেখানে নানা রকমের আবিষ্কারের চেষ্টা চলে। সে নাকি গোবর থেকে চিনি, গোঁফের পমেটম, মুখে মাখার পাউডার বানাবার চেষ্টা করছে, মাছের পিত্তি থেকে সাবান বানাবার চেষ্টা করছে, ইদুরের চর্বির থেকে মুখে মাখবার স্নো’ তৈরী করার চেষ্টা করছে, বেড়াল তাড়াবার এক আশ্চৰ্য্য কল বের করেছে, যার মধ্যে বেড়ালকে ছেড়ে দিলে ভয়ে একেবারে আধ-মরা হয়ে যাবে; তারপর, বাইরে ছেড়ে দিলে বেড়ালভায়া সেই রাজ্যি ছেড়ে চোঁচাচম্পট দেবে।
     পরেশ হলো “টিকটিকি পুলিশ”—সে যত রাজ্যের খবর নিয়ে আসে। কোথায় কোন আশ্চৰ্য্য ঘটনা ঘটছে, কে কবে বিলাত যাচ্ছে, ক্রিকেট-ফুটবলে কোন টীম কেমন খেলছে, কোন পালোয়ান এবার ‘চ্যাম্পিয়ন’ হবে—সব খবর তার কাছে পাবে।
     হেমেন্দ্র সাহিত্যিক; সে তার সাহিত্য-চৰ্চা নিয়েই আছে। আজ “ভেঁপু” কাগজের জন্য কবিতা লিখছে, কাল “ঢাক” কাগজের একটা মুখবন্ধ লিখছে, পরশু “লেখন্তিকা” কাগজের জন্য ছোট গল্প লিখছে।
     অবিনাশ হলো “আর্টিষ্ট”, রাতদিন সে তার খাতা আর পেন্সিল নিয়েই আছে। যত রাজ্যের স্কেচ আর কার্টুন আর লতাপাতা এঁকে সে তার খাতা ভরিয়ে রেখেছে। তাছাড়া, বাড়ীতে তার আঁকার সরঞ্জাম, রং, তুলি, বোর্ড, কাগজ, ইত্যাদি রয়েছে ;–ঝুড়ি ঝুড়ি ছবিও আঁকা রয়েছে। খোদাইএর কাজেও সে খুব ওস্তাদ।
     সত্যেশ বেচারা ভাল মানুষ; সে বিনয়ের এসিষ্ট্যান্ট হয়েই সন্তুষ্ট; সময় পেলেই বিনয়ের ল্যাবরেটরীতে গিয়ে সে হাজির হয়। মাঝে মাঝে সত্যেশদের বাড়ীর বৈঠকখানায় তাদের বৈঠক বসে আর নানান বিষয়ে আলোচনা হয়। নরেশবাবু খুব মিশিয়ে লোক ; তিনিও মাঝে মাঝে তাদের খবর নেন আর লুচি, আলুর দম, মালপোয়, পায়েস, মিঠাই ইত্যাদি খাওয়াবার ব্যবস্থা করেন,—কাজেই, তাদের আড্ডাটা বেশ ভালরকম জমে।
     কাটনায় আর একটি লোক বাস করত যার কথা সকলেই বলত। লোকটির নাম পঞ্চানন পোদ্দার ;–ছোটখাট, রোগা, বেঁটেপানা, আধ বুড়ো লোকটি; স্বভাব অতি নিরীহ। কিন্তু এর সম্বন্ধে একটি গুজব শোনা গিয়েছিল —এর নাকি রাশি রাশি গুপ্তধন আছে।
     কোথায় রেখেছে কেউ জানে না; জিজ্ঞাসা করলেও হেসে উড়িয়ে দিত। কেমন করে এ ধন পেল তাও কেউ জানে না। সামান্য জমিজমা নিয়ে রামধন বাস করে; সাধারন লোকের মত থাকে, খায় দায়।
     পঞ্চাননের ছেলে রামধন পোদ্দার বেজায় সাহেব। লেখাপড়া খুব বেশি করে নি, তাই বড় চাকরী তার জোটে নি। কলকাতায় নাকি অনেক সাহেবের সঙ্গে তার আলাপ; তারা তাকে “Ramsden” বলে ডাকে। নিজের নাম সই করে Ramsden Podder ।
     এজরা ষ্ট্রীটের ফারগুসন কোম্পানীর অাপিসে রামধন ৩০ টাকা মাইনেতে কেরাণীর কাজ করত ; সেই আপিসের বড় সাহেব জাঞ্জিবারে ( আফ্রিকা ) একটি আপিস খুলে সেখানে একটি লোক পাঠাতে লেখে। পঞ্চানন পোদ্দারের সঙ্গে আপিসের বড়বাবুর চেনা ছিল ; ধরে কয়ে ছেলের জন্য কাজটি জুটিয়ে দেয়। মাইনে ২০০ টাকা, যাবার ভাড়া আপিস থেকেই দেবে।
     এর পর দুটি দুর্ঘটনা হয়। রামধন চাকরি নেবার কয়েকদিন পরই পঞ্চানন হঠাৎ মারা যায়। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন, হার্ট ফেল করেছে; লোকে বলে এটা ভূতের কাজ। রামধন বাপের শ্রাদ্ধ করে জাঞ্জিবার রওয়ানা হয়ে যাওয়ার ৩৪ দিন পরই খবর এল জাহাজ ডুবি হয়ে রামধনও মারা গেছে। এটাও লোকে ভূতেরই কাজ বলে ধরে নিল।
     পঞ্চানন মারা যাবার পর অনেকেই রামধনকে গুপ্তধনের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। রামধন সকলকেই বলেছিল, “গুপ্তধন যদি থাকবেই তাহলে বিদেশে চাকরী করে মরতে যাব কেন?” বেচারা হয় তো “মরতে যাব” কথাটির অন্য কোন অর্থ করে নি ; কিন্তু লোকে বলে রামধন আগে থেকেই জানত, সে বিদেশে মরতে যাচ্ছে।
     রামধন মারা যাবার পর দু’মাস কেটে গেছে। পঞ্চাননের বাড়ী এখন খালি। তার ভাইপো গঙ্গাধর সেদিন এসে বাড়ী খুলে, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করিয়েছে; কোন কাগজপত্র বা গুপ্তধন পাবার কোন সঙ্কেত সে পায় নি। লোকে বলাবলি করে, রামধনকেই পঞ্চানন নাকি গুপ্তধনের সন্ধান বলে দিয়েছিল; কাজেই এখন আর সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

* * * * * * * * * * * * * * *

     একদিন সন্ধ্যায় সত্যেশ তার বন্ধুদের সঙ্গে বিনয়ের ল্যাবরেটরীতে বসে আছে, এমন সময় পরেশ হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে হাজির৷ তা'র চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠেছে, চুল উস্কো খুস্কো; মুখে কথা নাই। ঘরে ঢুকেই সে ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে বলে উঠল— চু一প”। দরজাটি আস্তে আস্তে বন্ধ করে সে বন্ধুদের পাশে তক্তপোষের উপর বসল। পকেট থেকে একখানা খাম বের করে সে আগে চারিদিক চেয়ে নিল। আমি তাদের আড্ডায় মাঝে মাঝে যেতাম, তখনও উপস্থিত ছিলাম। আমাকে পরেশ বলল,“ভাই, একটু নিরিবিলি কথা এদের সঙ্গে আছে, আজ একটু মাপ করতে হবে দাদা!”—আমি বাইরে যাচ্ছিলাম; পরেশই আমাকে বলল, “একটু তফাতে থাকলেই হবে; বাইরে যাবার কোন দরকার নেই ; তোমাকেও পরে সব কথা বলব।”
     পরেশ যে খামটি বের করেছিল তার ভেতর থেকে সে কয়েক টুকরো লম্বা ফালির মত কাগজ বের করে তক্তপোষের উপর সাজাল; তারপর বন্ধুরা খুব মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখতে আর খুব উৎসাহ করে পরামর্শ করতে লাগল। কথা কিন্তু সকলেই চাপা গলায় ফিস্ ফিস্ করে বলছিল। আমি শুধু একবার শুনলাম, “গুপ্তধন” একবার শুনলাম, “সন্দেহ নাই ;” আর একবার শুনলাম, “বাস্ ! এই রইল !”
     পরামর্শ হয়ে যাবার পর পরেশ আমাকে বলল, “ভাই, ব্যাপারটা বড় গুরুতর ; পঞ্চাননের গুপ্তধনের সন্ধান বোধ হয় পেয়ে গেলাম। কাউকে কিছু ’লো না ভাই ;–না আঁচালে বিশ্বাস নেই। তবে, একথা নিশ্চয় জেনো যে তোমাকেও কিছু ভাগ দেবো।”
     এই ঘটনার তিনদিন পর সন্ধ্যায় বিনয়ের ল্যাবরেটরীতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি কোদাল গাইতীর ছড়াছড়ি—তাদের নাকি বাগান করার সখ হয়েছে। রাত্রে বাগান করাটা একটা নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার; তার দ্বারা নাকি আশ্চর্য্য ফল পাওয়া গেছে। সেই জন্য তারা অনেকগুলো টর্চলাইটও এনেছে। আমার বেশী সময় ছিল না, তাই রাত্রের বাগান করা দেখা হয়ে উঠল না।
     একদিন সকালে উঠে শুনি কাটনাময় হৈ-হৈ রৈ-রৈ ব্যাপার—- আগের রাত্রে নাকি গ্রামে বাঘ এসেছিল ; সত্যেশ আর তার চার বন্ধুকে বাঘে খেয়েছে! সকলেই সত্যেশদের বাড়ীর দিকে ছুটেছে; সেখানে লোকে লোকারণ্য। আমিও তাড়াতাড়ি সেই দিকে ছুটে গেলাম।
     মনে করেছিলাম, গিয়ে রক্তারক্তি দেখব; কিন্তু, তার কিছুই নাই। বুড়ো হাসান সর্দারকে ডেকে আনা হয়েছে; তার মত বড় শিকারী আর আশেপাশে কোথাও নাই। সে মাটিতে পায়ের দাগ দেখে বলল, “বাঘের খোঁজ করে বুড়ো হলাম, কিন্তু এ রকম অদ্ভূত ব্যাপার জন্মে দেখি নি। বাঘেরা আবার দল বেঁধে গ্রামে শিকার করতে আরম্ভ করল কবে থেকে? পাঁচটা বাঘের পায়ের দাগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অথচ, দাগগুলোও অদ্ভুত গোছের ; এমন চ্যাপ্টা দাগ কখনও দেখি নি ।”
     সকলেই নানারকম জল্পনা কল্পনা করছে, কিন্তু, কাজের কথা কেউ আর বলে না। নরেশবাবু শেষটায় বললেন, “আপনার কেউ তো দেখছি কাজের কথা বলছেন না। এখন উপায়টা কি করা যাবে সে কথা কেউ ভেবেছেন ?”
     কেদারবাবু বললেন, “দক্ষিণে পাটপাড়ার পর যে খাদ আছে তার মধ্যে খোঁজ করা দরকার এখনই। সেখানে জঙ্গলও খুব ঘন, খাদের গভীরতাও খুব বেশী। শুনেছি, সেখানে নাকি অনেক বাঘ থাকে।”
     হাসান সর্দার বলল, “এ মুলুকে বাঘ বড় একটা আসে-টাসে না; তবে, এই ঘটনা যখন ঘটেছে, তখন বাঘের খোঁজ করতে তো হবেই। বাবু যা’ বলেছেন আমারও ঠিক তাই মনে হয় ; এখনই বেরিয়ে পড়া দরকার।”
     ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মস্ত বড় একটি দল পাটপাড়ার দিকে রওয়ানা হয়ে পড়ল। নরেশবাবু, কেদারবাবু, অনুকূলবাবু, মহেন্দ্রবাবু, এরা সব বন্দুক নিয়ে রওয়ানা হলেন; হাসান সর্দারকেও একটা বন্দুক দিলেন। গ্রামের অনেক লোক লাঠি, বল্লম, বর্শা, তীর-ধনুক ইত্যাদি নিয়ে সঙ্গে চলল। সকলকেই বলে দেওয়া হলো, অস্ত্রের ব্যবহার খুব সাবধানে করে যেন, কারণ বাঘের চেয়ে মানুষের খোঁজটাই হলো বেশী দরকারী। যদি এখনও ছেলেদের কেউ বেঁচে থেকে থাকে, তাকে তো উদ্ধার করার চেষ্টাও করতে হবে।
     প্রথমে বাঘের পায়ের চিহ্ন দেখে চেষ্টা করা হলো। সত্যেশদের বাড়ী থেকে কিছুদূর গিয়েই বালির উপর পায়ের চিহ্নগুলি মিলিয়ে গেছে; তা’র পর আর সে চিহ্ন খুজেই পাওয়া গেল না ; আশে-পাশে কোথাও একটিও চিহ্ন নাই। কাজেই আর বুঝতে বাকি রইল না যে বাঘেরা বালির উপর দিয়েই পাটপাড়ার জঙ্গলে পৌছিয়েছে। আসলে সেটাই ছিল “শর্টকাট”—সোজা রাস্তা । সকলে সেই রাস্ত দিয়েই রওয়ানা হলো ।
     সারাদিন জঙ্গলে পাতি-পাতি করে খুজে বাঘের নাম-গন্ধও পাওয়া গেল না। কোন রকমে বাঘের লক্ষণ দেখা তো গেলই না, বরং হরিণ ইত্যাদির অবাধে চরা দেখে স্পষ্টই বোঝা গেল যে দু’চার দিনের মধ্যে সেই রাজ্যি দিয়ে কোন বাঘ চলা-ফেরা করে নি। আশে-পাশের জঙ্গলও খুঁজতে বাকি রইল না, কিন্তু কোথাও বাঘের চিহ্ন পাওয়া গেল না। সন্ধার পর সকলেই নিরাশ হয়ে ফিরে এল ।
     ব্যাপারটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। বাঘেরা যদি দল বেঁধে এসে থাকে তা’ হলে তারা গেল কোন পথ দিয়ে? সত্যেশদের কি কোন হুস ছিল না যে বাঘ তাদের ধরে নিয়ে গেল, অথচ কোন ধস্তাধস্তি বা রক্তের চিহ্ন রইল না? হয়তো বা তারা ভয়ে আড়ষ্ট হয়েছিল। সকালে যখন জানা গেল সত্যেশরা নিরুদেশ, তখন সত্যেশদের বসবার ঘরের বাইরের শিকলটা লাগান ছিল। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তারা যখন বাইরে বেরিয়েছিল তখন বাঘ তাদের ধরেছে। তার ছুটে পালালেই পারত? কেন পালায় নি তারাই জানে। বাইরে বেরিয়ে কেন তারা দরজায় শিকল দিয়েছিল? হয়তে তারা একটু বেড়াতে যাবার ইচ্ছা করেছিল ।
      আমার মনে হচ্ছিল, হয়তো বা গুপ্তধনের সন্ধান পাবার দরুণ কোনও অভিশাপে তাদের এই রকম রহস্যময় শাস্তি হয়েছে। পঞ্চানন, রামধন এদেরও তো মৃত্যু সন্দেহজনক অবস্থায় ঘটেছে। কথাটা কিন্তু কারো কাছে ফাঁস করবার সাহস হলো না আমার। গুপ্তধনের কথা আর কেউ জানে কিনা তা’ও আমি জানতাম না।
      রাত্রে সত্যেশদের চাকর রামা আমার কাছে চুপিচুপি এল। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “দাদাবাবু, আপনি কি গুপ্তধনের কথা কিছু শুনেছিলেন? আমাদের দাদাবাবুকে পরেশদাদাবাবু কি যেন বলছিলেন, গুপ্তধন আনতে হবে। আমার তো মনে হয়, তারই শাপে কিছু ঘটেছে।" আমি বললাম, “আমারও তাই মনে হয়।” রামা বলল, “কিন্তু দাদাবাবু, একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না। পাশের ঘরে আমি রাত্রে শুয়েছিলাম; আমি তো একটুও আওয়াজ শুনতে পাই নি। দাদাবাবুর রাজ্যির জিনিষপত্র ঘরে জড় করেছিলেন, সেগুলোই বা গেল কোথায়? ভূতুড়ে কাণ্ড কিছু বুঝবার জো নেই।”
      সারারাত আমার ভাল ক’রে ঘুম হ’লো না। ভোরবেলা উঠেই সত্যেশদের বাড়ীর দিকে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে দেখি একটি চাষা একখানা রুমাল নিয়ে এসেছে, সেটা নাকি সে কাটনার উত্তরে একটি মাঠে কুড়িয়ে পেয়েছে। রুমালে ‘B’ লেখা আছে ;–বিনয়ের রুমাল সেটা। কাজেই উত্তরের দিকে খুঁজবার ব্যবস্থা তখনই করা হয়ে গেল। অন্যান্য দিকেও এক একটি দল রওয়ানা হলো। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে, একটু জল-খাবার খেয়ে উত্তরের দলের সঙ্গে রওয়ানা হয়ে পড়লাম। পথে রামার সঙ্গে দেখা হলো, সে আমাকে কি জানি বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বলল না আর।
      কাটনা থেকে চার মাইল দূরে বাঘপাড়ার ময়দান। কেন তার বাঘপাড়া নাম হলো কেউ বলতে পারে না;–কোনদিন সেখানে বাঘ দেখা যায় নি ; কিন্তু, বাঘের নাম শুনেই আমাদের বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে উঠল। ময়দানটি বিশাল—প্রায় ৫৬ মাইল লম্বা; মাঝে মাঝে দু’চারটি বড় বট অশত্থ গাছ। ময়দানের শেষ দিকে দু’চারটি বড় আমগাছ আছে—সেখানে নাকি ভূত থাকে বলে শোনা যায় ; তাই কেউ যায় না সেখানে। আমরা সেই ময়দানে পৌছালাম। চারিদিকেই ধূ ধূ ময়দান-মাঝে মাঝে গাছের ঝোপ। এক একটি করে সেই সব ঝোপে খোজা বড় সহজ ব্যাপার নয়। সারাদিনে আমরা প্রায় ত্রিশটি ঝোপ খুজলাম; সন্ধ্যা হলে সকলে বাড়ী ফিরে এলাম। অন্যদিকে যারা গিয়েছিল তারাও সন্ধ্যার সময় নিরাশ হয়ে ফিরে এল ।
      পরদিন সকালে আবার আমরা দল বেঁধে রওয়ানা হলাম। এবার ছোট ছোট ঝোপ ছেড়ে একেবারে মাঠের ওপারে আমঝাড়ের দিকে খোঁজ করা হবে ঠিক হলো। সে ঝোপ প্রায় ৯ মাইল দূরে। রোদে গলদঘৰ্ম্ম হয়ে বেলা ১২টার সময় আমরা ময়দান পার হয়ে আমঝাড়ের কাছে উপস্থিত হলাম। ভূতুড়ে আমগাছের কাছে যেতে সকলেই একটু-আধটু ভয় পাচ্ছিল, তাই কিছুক্ষণ পরামর্শ চলল কি করা যায়। আমি বললাম, “ভূতেরা তো দিনের বেলা দেখা দেয় না শুনেছি ; তবে আমাদের কিসের ভয়?” বিনয়ের মামা ভবতোষবাবু বললেন, “ভূত সত্যি-সত্যি ওখানে আছে কিনা কেউ জানে না ; শুধু তো গুজব শুনেই আমরা ভূতের ভয় পাচ্ছি। দিনের বেলা আবার ভয় কিসের? খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা ঐ দিকেই যাই চল। যারা ভয় পাচ্ছে তারা বরং এখানেই থাকুক।” তখন সকলেই যেতে রাজী হলো।
      খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা বেলা প্রায় তিনটার সময় আমঝাড়ের দিকে রওয়ানা হলাম। সেখান থেকে আমঝাড় প্রায় আধঘণ্টার পথ। আগে ভবতোষবাবু আর দুটি ভদ্রলোক চলতে লাগলেন ; আমরা ছেলেমানুষ, তাই পিছনে চললাম!
      আমঝাড়ে পৌছে সকলের মনে কেমন যেন একটা ভয়ের ভাব এল। চারিদিক নিঝুম নিস্তব্ধ, চারিদিকেই গাছের ছায়া পড়েছে। শুধু ঝিঁঝিঁপোকার ঝিঁঝি’ ডাক আর থেকে থেকে “পূত” “পুত” কুক্কোপাখীর ডাক শোনা যাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে আমরা চারিদিকে দেখছি—উপরের দিকে আর কারে দৃষ্টি যাচ্ছে না। হঠাৎ ভবতোষবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন— “ঐ—ঐ”—সকলের বুক ছ্যাঁৎ  করে উঠল।
      আঙ্গুল দিয়ে ডাইনে দেখিয়ে ভবতোষবাবু হন হন করে এগিয়ে গেলেন; আমরাও সকলে তার পিছনে চললাম। একটু এগিয়ে দেখি, প্রকাণ্ড এক আমগাছের গোড়ায় পাঁচটি লোক পড়ে আছে—তাদের জামা-কাপড় ছেড়া, চুল উস্কো-খুস্কো, গায়ে কাদামাটি লেগে। একটু কাছে গিয়ে দেখি, এযে সত্যেশ, বিনয়, হেমেন্দ্র, পরেশ আর অবিনাশ।
      ভবতোষবাবু নাড়ী দেখতে জানতেন ; তিনি সকলের নাড়ী পরীক্ষা করে বললেন, “নাড়ী বেশ তাজা আছে; বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে এরা !”
      তখনই মুখে জল ছিটান, বাতাস দেওয়া, কড়া “স্মেলিং সলট” শোকান আরম্ভ হলো আর দেখতে দেখতে পাঁচ জনেই চোখ মেলে চাইল। সকলেরই যেন ঢুলু ঢুলু ভাব আর কেমন যেন অন্যমনস্ক।
      তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে ; কাজেই এক মুহূৰ্ত্ত দেরি না করে তাদের নিয়ে রওয়ান হবার ব্যবস্থা করা হলো। তারা সকলেই বলল যে হেঁটেই যেতে পারবে, কিন্তু ভবতোষবাবু কিছুতেই দিলেন না। দুজনে কাঁধে করে এক এক জনকে নিয়ে রওয়ানা হলো। মাঠের হাওয়ায় সকলেই অল্পদুর গিয়ে তাজা হয়ে উঠল আর হেঁটে যাবার জন্য দোহাই-দস্তুর করতে লাগল। তখন সকলেরই কাঁধ ব্যথা হয়ে গিয়েছিল তাই আপত্তি আর হলো না। পথে যাবার সময় তাদের যত প্রশ্ন করা হলো একটার ও উত্তর পাওয়া গেল না। সকলেই বলল, “মাথা ঘুরছে এখন ; বাড়ী গিয়ে সব কথা বলব।”
      রাত নয়টার সময় আমরা কাটন পৌছালাম। দু’চার জন লোক ফিরেছিল; আগেই তার সকলকে খবর দিয়েছে। কাজেই, আমরা পথেই অনেক লোকের ভিড় পেলাম। রাত্রে আর অন্য কোন কথা হলো না। বাড়ী ফিরেই সকলে ক্লান্তশরীরে বিছানায় শুলাম আর ভোরবেলা উঠলাম ; গা-হাত পায় তখনও ব্যথা করছে সকলের ।
      পরের দিন নরেশবাবুর বৈঠকখানায় মস্ত সভা বসল। গ্রামের গণ্যমান্য সব লোক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সত্যেশ আর তার চার বন্ধু তখন ঘুম থেকে ওঠে নি। বিনয় আগের রাত্রে তার মামাকে বলেছিল, “কি যে ঘটেছিল, ভাল করে বলতে পারব না। অমাবস্যার অন্ধকার রাত্রে আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে বাগান করবার জন্য ঘর থেকে বেরুলাম । হঠাৎ বাঘে না কিসে যেন কি করল, সব যেন ঘুলিয়ে গেল।”
      কেদারবাবু বললেন, “ছেলেগুলো যে বেঁচেছে, এই ঢের। এবার এক চোট ইনজেকশন দিতে হবে এদের ; না হলে শেষটায় ধনুষ্টঙ্কার হতে পারে।”
      ভূষণবাবু ভাল শিকারী ; তিনি বললেন, “বাঘগুলো যে কোন চুলোয় গেল ;–একবার দেখা পেলে হতো।”
      অনুকুলবাবু বললেন, “সব ব্যাপারটা বেজায় হেঁয়ালি গোছের ঠেকছে। যেন একটা ভূতুড়ে কাণ্ড! ”
     বিনয়ের ঘরে বসেছিলাম ; হঠাৎ রামা চাকরটা এসে বলল, “আমিই মাঝখান থেকে ফাঁক পড়লাম। মাত্র দুটাে টাকা।”
      আমি বললাম, “কিরে ! দুটে টাকা’ কিসের?” রামা বলল, “দেখ না দাদাবাবু। পরেশদাদা আমাকে বলেছিল, কাউকে যদি কিছু না বলিস তোকে দুটাকা বকসিস দেবো। গুপ্তধন যদি পাই তা হলে বেশ মোট টাকা পাবি।’ গুপ্তধনও মিলল না, আমিও ঠকে গেলাম।” আমি শুধু আস্তে বললাম, “আমিও—” এমন সময় পরেশ এসে হাজির ।
      রামাকে তাড়িয়ে দিয়ে পরেশ দরজাটা ভেজিয়ে ধপাস করে তক্তপোষের উপর বসে পড়ল। পকেট থেকে সেই সেদিনের খামখানা বের করে, তার মধ্যের কাগজের টুকরোগুলো তক্তপোষে সাজিয়ে আমাকে বলল—“পড়।” আমি পড়ে দেখলাম তাতে
লেখা আছে—
* * * গুপ্তধন  * * *  যদি চাও * * * 
* * * কাটনা থেকে * * * * উত্তরে * * * 
* * * শেষে মাঠে * * * * তারপর * * *
* * * অাম গাছ * * * * গোড়ায় * * * 
* * * মাটি খোঁড়া * * * * গভীর * * * 
* * * তলার মাটি * * * * শুকুনা লাল * * * 
* * * কাঠের সিন্দুকে * * * * ফুলের কাজ * * * 
* * * খুলে দেখবে * * *  সোণার হীরা * * *
* * * রয়েছে * * * * * * * * * * *  * *  
      চিঠির যে অংশ পাওয়া গেছে তা থেকে এইটুকু পাওয়া যায় ; বাকিটা কি আছে জানি না।
     পরেশ বলল, “এর থেকে কি বুঝবে? গুপ্তধন সম্বন্ধে এর চেয়ে পরিষ্কার খবর আর কি পাওয়া যেতে পারে ?” চিঠিটা রামধনকে লেখা হয়েছিল ; হাতের লেখাও পঞ্চাননের ।
      আমার বড় কৌতুহল হ’লো। আমি শুধু বললাম, “তারপর?”
     পরেশ বলল, “তার পর আর ক ? ঐ চিঠির জোরেই আমরা গুপ্তধনের সন্ধানে তোড়-জোড় নিয়ে বাঘপাড়ার মাঠের শেষে আম গাছের গোড়া খুঁড়তে যাই। রাত্রে বাগান করার সরঞ্জাম, টর্চ-লাইট সবই সঙ্গে নিয়েছিলাম। পাছে কেউ টের পায় তাই অমাবস্যার গভীর রাত্রে রওয়ান হয়েছিলাম। বিনয় বলেছিল, ‘সাবধানের মার নাই ; আমরা সব বাঘের পায়ের ছাপওয়াল রবার-সোল জুতো পরে রওয়ানা হব ; তারপর বালির উপর গিয়ে জুতো খুলে হেঁটে রওয়ানা দেবো । অবিনাশ পাঁচ জোড়া রবার-সোল খুদে সুন্দর বাঘের পাঁড়ার নকল করেছিল ; সেই সোলের জুতো বানিয়ে তাই পরে রওয়ান হ’লাম। আমরা ভয় ’রেছিলাম অন্য কোন লোক টের পেলে গুপ্তধন কেড়ে নিতে পারে ; তাই এত সাবধানী। সেখানে গিয়ে আমরা দু’দিন ধরে খুঁড়েও যখন গুপ্তধনের কোন চিহ্ন বা লক্ষণ দেখলাম না, তখন হঠাৎ আমার মনে পড়ল, আরেকটা খামে কয়েকটা কাগজের টুকরো ছিল যার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় নি। সেটা নিয়ে তার কাগজগুলো এর সঙ্গে মিলালে হয়তো আরো কিছু অর্থ হতে পারে। তখনই আমি রওয়ানা হয়ে পড়লাম আর রাতারাতি বিনয়ের ঘর থেকে চুপচাপ কাগজ নিয়ে ফিরলাম। বিনয়ের ঘরের সামনে রামার সঙ্গে দেখা। সে বেচারা চমকে একেবারে চিৎপাৎ। আমি তাকে চুপ করিয়ে বললাম, দুটাকা বকসিস দেবো ; খবরদার কাউকে বলিস্ নে। আমরা মরি নি। গুপ্তধন পেলে তোকে বেশ মোটা বকসিস দেবো। আমাদের খোঁজের কি ব্যবস্থা হয়েছিল, বাঘে খাওয়ার ব্যাপার নিয়ে কি জল্পনা-কল্পনা হয়েছে, সবই রাম আমাকে বলেছিল। আমি দেখলাম, সেদিন যদি গুপ্তধন না পাই তা হলে সবই মাটি হবে। তখনই আমগাছ-তলায় ফিরে, আগের কাগজের সঙ্গে পরের কাগজ মিলিয়ে যা দেখলাম তাতে আমাদের চক্ষু স্থির । চিঠিটা শেষটায় এই দাঁড়াল :
      ‘অনন্ত গুপ্ত ধনঞ্জয় গুপ্তের ছেলে। যদি চাও তো তার কাছে কাটন থেকে চিঠি লিখে দেবো। উত্তরের অপেক্ষায় থাকলে শেষে মাঠে মারা যাবে কাজটা । তারপর, আমাদের সেই আম গাছ সম্বন্ধে মোকদ্দমার গোড়ায় অন্যপক্ষ সেদিন যে মাটি গোড়া দেখিয়ে বলেছিল, গভীর খুঁড়ে তারা দেখাবে তলার মাটি অনেকটা শুকনা ও লাল, সেটার কি হলো? কাঠের সিন্দুকে ছুতার মিস্ত্রীকে ফুলের কাজ করতে দিয়েছি, সেটাকে খুলে দেখবে ঢাকনির নীচে সোণা- হীরা দু’ভায়ের নাম খোদাই রয়েছে কি না । * * *’
      “আসলে দুটাে খামে একই চিঠির কয়েকটি ক’রে টুকরো ছিল। গোড়ায় ভাল করে মিলিয়ে দেখলেই গোল চুকে যেত। কি আর করা যায়? গুপ্তধন তো গেল চুলোয়, এখন শেষরক্ষা হয় কেমন করে? হেমেন্দ্র বলল, “এখন বাঘে ধরাটা সত্যি হওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখি না। তখনই পরামর্শ করে ঠিক ’লো, পরের দিন সেখানে লোক খুঁজতে আসবার আগেই আমরা জামা-কাপড় ছিড়ে, কাদা-মাটি মেখে প্রস্তুত থাকব; একজন গাছে চড়ে দেখতে থাকবে কেউ খুঁজতে আসছে কিনা। যেই সে সঙ্কেত করবে অমনি আমরা ‘অজ্ঞান’ হয়ে শুয়ে পড়ব ।—তারপর যা ঘটেছে তা তো জানই ভাই; বেশী বাড়িয়ে আর কাজ কি? আমার সাইকেলটা আর যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সবই সেখানে পড়ে আছে। একদিন লুকিয়ে গিয়ে সেগুলো নিয়ে আসতে হবে।”
      পরের দিন নাকি কাটনায় একটি “সার্বজনীন শাৰ্দ্দূল-সংহারিণী সমিতি” গঠিত হয়েছিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য