পোষা পশুপাখির বিশ্বাসঘাতকতা - আদিবাসী লোককথা

     সেকালের কথা সবাই ভুলে গিয়েছে। সেই ভুলে যাওয়া পুরনো কালে সব পশুপাখি মিলেমিশে আকাশে বাস করত। তাদের মধ্যে খুব ভাব ছিল, কেউ কাউকে হিংসে করত না। মনের সুখে তাদের দিন কাটত। বিপদে-আপদে সবাই সবাইকে দেখাশোনা করত |
     এমনি করে দিন কাটে, রাত কাটে। একদিন শুরু হল বৃষ্টি। বৃষ্টি আর থামে না, অঝোরে জল পড়েই চলেছে। এমন বৃষ্টি তারা দেখেনি। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া আর হাওয়ার দাপটে তারা শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। এমন কাঁপুনি যে মনে হল তারা বুঝি মরেই যাবে। আর কতক্ষণ সহ্য করা যায় এমন শীত।
     কাঁপতে কাঁপতে পাখিরা বলল, “ভাই কুকুর। তুমি তো খুব জোরে ছুটতে পার, তোমার তো শীতও কম লাগে, তুমি নীচে পৃথিবীতে দৌড়ে যাও। কিছুটা আগুন নিয়ে এসো। আগুনে আমরা শরীর গরম করি। নইলে যে সবাই মারা পড়ি।"
     কুকুর সব শুনল। বন্ধুদের জন্য আগুন আনতে সে দৌড় দিল। প্রচণ্ড তার গতি, দুর্বার তার বেগ। কিছুক্ষণ পরেই সে পৃথিবীতে পৌঁছে গেল। তাকে যে আগুন নিয়ে যেতে হবে, বন্ধুরা যে শীতে কাঁপছে। আগুনের খোঁজ করতেই কুকুরের চোখে পড়ল,—মাঠের মধ্যে মাংসের কয়েকটা হাড় আর কতকগুলো মাছ পড়ে রয়েছে। লোভে তার জিভ বেরিয়ে এল। জিভ থেকে জল গড়াতে লাগল। ভুলে গেল আগুনের কথা, ভুলে গেল বন্ধুদের কাঁপুনির কথা, ভুলে গেল কেন সে এখানে এসেছিল। সব ভুলে কুকুর হাড় আর মাছ চিবোতে লাগল। খাওয়ার আনন্দে আধবোজা চোখে সে শুধু হাড়ই চিবোতে লাগল।
     আকাশে পশুপাখিরা কাঁপতে কাঁপতে চেয়ে আছে কুকুরের ফেরার আশায়। এই বুঝি কুকুর আসে, মুখে তার জ্বলন্ত আগুন। আহ! সেই আগুনে গরম হবে শরীর, শীত পালাবে দূরে, তাকিয়েই থাকে তারা, বন্ধু কুকুর কিন্তু আসে না।
     অনেক সময় কেটে যায়, তবু কুকুর ফেরে না। কি আর করে! উপায় না দেখে পশুপাখি সবাই মিলে মোরগকে বলল, “ভাই মোরগ ! কুকুর তো এল না, এদিকে আমরা যে শীতে মরি। তুমি তো ধনুকের তীরের মতো নীচে নেমে যেতে পার। তুমিই পৃথিবীতে গিয়ে তাড়াতাড়ি কিছু আগুন নিয়ে এসো। তুমি গেলেই তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে।"
     মোরগ সব বুঝল। কুকুরের ব্যবহারে মোরগ বেশ রেগে গেছে। রাগের চোটে লাল-ঝুটি নেড়ে মোরগ ধনুকের তীরের মতো ছুটল পৃথিবীর পথে। পশু-পাখি ওপর থেকে দেখল, পা দুটো সোজা রেখে ঝুটি লম্বা করে উচিয়ে মোরগ নেমে চলেছে, নেমেই চলেছে। পৃথিবীর পথে আরও এগিয়ে চলল মোরগ, ওপর থেকে মেঘের ধোঁয়ায় আর তাকে দেখা গেল না। কিছুক্ষণ পরেই মোরগ পৌঁছে গেল পৃথিবীতে। তাকে যে আগুন নিয়ে যেতে হবে, বন্ধুরা যে শীতে কাঁপছে।
     আগুনের খোজ করতেই মোরগ দেখল এক গাছের তলায় অনেক শস্যদানা, অনেক গম আর ছোট ছোট ফল ছড়িয়ে রয়েছে। লোভে মোরগের গলা থেকে অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে এল। লম্বা লম্বা পায়ে ঝুটি নামিয়ে এগিয়ে গেল খাবারের দিকে। শক্ত ঠোঁটে ঠুকে ঠুকে মুখে পুরতে লাগল সেইসব শস্যদানা। ভুলে গেল আগুনের কথা, ভুলে গেল বন্ধুদের কাঁপুনির কথা, ভুলে গেল কেন সে এখানে এসেছিল। সব ভুলে মোরগ খাওয়ার আনন্দে গাছের তলা চষে ফেলতে লাগল। মোরগ কুকুরের কোন খোঁজ নিল না, নিজেও আগুন বয়ে নিয়ে যেতে ভুলে গেল।
     তুমি যদি সন্ধ্যার সময় কান পেতে শোনো, তবে শুনতে পাবে গাছের ডালে ডালে পাখিরা গান গাইছে, কিচির-মিচির করছে। এ কিন্তু পাখিদের গান নয়, এ পাখিদের কিচির-মিচির নয়। তারা এই শব্দের মধ্যে বলে চলেছে—“কুকুর লোভে পড়ে ক্রীতদাস হয়ে গেল, মোরগ লোভে পড়ে ক্রীতদাস হয়ে গেল, হায়! হায় !"
     তাই তোমরা দেখতে পাবে, সব পাখি কুকুর আর মোরগদের দেখলেই তাদের ভাষায় গালাগাল দেয়, তাদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে। পাখিরা গালাগাল দেয়, বিদ্রুপ করে —কেননা, তারা আজও ভুলতে পারেনি সেই কথা। কুকুর আর মোরগ বন্ধুদের কথা ভুলে গিয়ে, তাদের আকাশে ছেড়ে এসে নিজেদের দেহ গরম করেছে, নিজেরা পেটপুরে খেয়েছে— তখন তাদেরই বন্ধু সমস্ত পশুপাখি শীতে কেঁপেছে, হাওয়ার দাপটে মরে যেতে বসেছে, আগুনের অভাবে তাকিয়ে থেকেছে পৃথিবীর পথে— যে পথে তাদের বন্ধু দুজন গিয়েছে কিন্তু আর কখনও ফেরেনি।
     কুকুর ও মোরগ সেইদিন থেকে ঘরের পোষা পশু ও পাখি হয়ে গেল। তারা হল গৃহপালিত।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য