মানুষ-খেকো রাজা - আদিবাসী লোককথা

     অনেকদিন আগে এক মিষ্টিজলের নদীর পাশে ছিল এক রাজার বিরাট প্রাসাদ। প্রাসাদের অন্যদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বন আর বন। সেই প্রাসাদে থাকত এক রাজা। তাকে সবাই খুব ভয় করত। রাজার প্রাসাদের চারিদিক ঘিরে অনেক প্রজা তাদের বাসা বেঁধেছিল। একদিন সন্ধেবেলা উঠোনে রাজার খাবার তৈরি হচ্ছে। ওপরে খোলা আকাশ, চাঁদের আলো এসে পড়েছে ফুটন্ত সব খাবারের ওপরে। প্রায় সব রান্নাই শেষ, শুধু মাংসটাই বাকি আছে। আজকে রাজার জন্য ভেড়ার মাংস করা হচ্ছে।

     মাংস যখন কড়াইতে ফুটছে সেই সময় উড়ে যাচ্ছিল একটা বাজপাখি, পায়ে তার একটুকরো মানুষের মাংস। সে নদীর পাশে পড়ে-থাকা একটা মৃতদেহ থেকে ছোঁ মেরে মাংস নিয়ে বাসার দিকে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ টুপ করে সেটা পড়ে গেল রাজার উঠোনের সেই ফুটন্ত কড়াইয়ের মধ্যে। রান্না যারা করছিল তারা কেউ তেমন খেয়ালই করে নি যে, ওপর থেকে কিছু পড়ল।
     রান্না শেষ হলে রাজার ঘরে সব খাবার দিয়ে এল তারা। সব খেল সেই পেটুক রাজা, কিন্তু আজকে যেন একটুকরো মাংসের কেমন চমৎকার স্বাদ লাগল। তিনি জীবনে এমন সুন্দর মাংস খান নি, তার অবাক লাগল—তিনি তো শুধু এই খেয়েই থাকতে পারেন—যদি পাওয়া যায় এমন সুস্বাদু মাংস।
     যে রান্না করেছে তার ডাক পড়ল। সে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়াল আর জানাল যে, সে রান্না করেছে ভেড়ার মাংস।
     পরের দিন তিনি ভেড়ার মাংস খেলেন, কিন্তু আগের দিনের সেই টুকরোটার সঙ্গে কোন তুলনাই হয় না। তিনি শেষে ছাগল, গোরু, মোষ, এইসবের স্বাদ নিতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই সেইরকম স্বাদ লাগছে না। তারপরে তিনি আদেশ দিলেন, প্রতিদিন বনের নতুন পশু মেরে আনতে। এতদিন তিনি যে সব পশুর মাংস খান নি, তাদের মাংস খেতে লাগলেন। তবু তার লোভ মিটল না—কোথায় পাবেন তিনি সেইদিনকার মতো এক টুকরো মাংস।
     আসলে সেই টুকরোটা ছিল বাজপাখির পা থেকে খসে-পড়া এক টুকরো মানুষের মাংস। তাই যতই তিনি নানা পশু খান না কেন অমন স্বাদ পাবেন কোথা থেকে ?
     সেই রাজার একটা কেনা চাকর ছিল। তিনি চাকরকে যখন কিনেই নিয়েছেন, তখন যা খুশি তাই তিনি করতে পারেন তাকে নিয়ে। একদিন হঠাৎ তার মাথায় খেলে গেল, মানুষের মাংস তো খাওয়া হয় নি? সেইদিন সেই কেনা চাকরকে বলি দেওয়া হল আর তার মাংস দিয়েই সেদিন রাজার খাবার তৈরি হল।
     মাংসের টুকরো মুখে দিয়েই রাজা উঠলেন লাফিয়ে। এতদিন পরে ঠিক মাংসের হদিস পাওয়া গিয়েছে। আজ থেকে নিত্য তার চাই মানুষের মাংস।
      তার পরের দিন থেকে তার প্রাসাদে যারা চাকরি করত তাদের এক একজনকে তিনি বলি দিতে লাগলেন। মনের সুখে জিভের সুখ মেটাতে লাগলেন। জীবনে এতদিনে যেন তিনি বাঁচার সত্যিকার মানে খুঁজে পেলেন। গুন গুন করে গান করেন, প্রাসাদের ছাদে ঘুরে বেড়ান আর খাওয়ার সময়ের জন্য চেয়ে থাকেন।
     এমনি করে প্রাসাদের সব্বাইকে তিনি খেয়ে ফেললেন, এমন কি লোভের নেশায় ছেলে-বউও মারা পড়ল। প্রাসাদ এখন শূন্য, তিনি মাত্র একা, চারিদিকে লোক নেই জন নেই খা খা শ্মশান ।
     এইসব না দেখে আর রাজার রাক্ষুসেপনা স্বভাবের জন্য প্রাসাদের আশেপাশের লোকজনও নদী ডিঙিয়ে পালাল অনেক দূরে, এমন জায়গায় তারা চলে গেল যেখান থেকে রাজা আর তাদের খুঁজে পাবে না।
     কেউ রইলনা মানুষ-খেকো রাজার কাছে, কিন্তু সন্ধে হলেই তিনি ক্ষেপে যেতেন মানুষের মাংস খাওয়ার জন্য। প্রাসাদের ছাদে ঘোরাফেরা করতেন, ছটফট করে বেড়াতেন, হাতের চামড়ায় কামড় বসাতেন।
     শেষকালে আর থাকতে না পেরে তিনি নিজের হাটুর ওপরের কিছুটা মাংস কেটে রান্না করে তাই খেলেন। অনেক তৃপ্তি পেলেন তিনি। পরের দিন অন্য হাঁটুর ওপরের মাংস কাটলেন। পরের দিন বুকের, অন্যদিন পেটের, আরেকদিন হাতের।
     এমনি করে দিন পনেরো যেতেই তার গায়ে শুধু হাড় ছাড়া আর কিছুই থাকল না। গোটা দেহের হাড়ের ওপরে মাথায় কোঁকড়ানো চুল, দেহে মাংসের একরত্তিও নেই। তিনি যখন চলতেন খটখট করে হাড়ের আওয়াজ হত, কটকট করে পায়ের পাতার হাড়গুলো কথা কয়ে উঠত।
     শেষে তিনি বেরিয়ে পড়লেন প্রাসাদের বাইরে, মানুষের মাংস খোঁজ করতে। তিনি চলেছেন এগিয়ে, নদী ডিঙিয়ে, বন পেরিয়ে, মাঠ ছাড়িয়ে। কিন্তু কোথাও নেই মানুষ, সবাই রাজার কথা শুনে সে মুলুক ছেড়ে একেবারে পালিয়েছে। মানুষ আর তাই কোথায় পাবেন রাজা !
     তবু হাল তিনি ছাড়েন নি। অন্যের মাংস তার চাইই, নিজের দেহে তো একরত্তিও মাংস নেই।
     এমনি করে কয়েকদিন কাটল। না খেয়ে তিনি বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছেন, হাড়গুলো কেমন রোগা রোগা কাঠির মতো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু যে তাকে চলতেই হবে। একসময় খুব ক্লান্ত হয়ে বিরাট মোটা একটা গাছের তলায় তিনি ঠক করে বসে পড়লেন। হাড়গুলোর খটখট আওয়াজ হয়েই থেমে গেল, তিনি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন।
     হঠাৎ গাছের অন্য পাশে তিনজন লোক এসে বিশ্রাম করতে বসল। পোঁটলা খুলে কিছু খেল, গল্পগুজব করল। রাজা গুটিসুটি মেরে এমনভাবে বসে রইলেন যেন তারা তার হাড়-দেহ না দেখতে পায়। তিনি নিঃশ্বাসও চেপে চেপে ছাড়লেন, হাত-পা
একটুও নাড়লেন না, যদি খটখট আওয়াজ হয়।
     বেশ কিছুক্ষণ পরে সেই তিনজন লোক তাদের পোটলা-পুটলি নিয়ে রাস্তা হঁটিতে শুরু করল। তারা কিন্তু এসেছে অনেকদূর থেকে, তাই মানুষ-খেকো রাজার নাম শোনে নি। তারা উঠতেই রাজা তাদের পিছু নিলেন। আস্তে আস্তে তিনি এগোলেন, খেয়াল রাখলেন একজনের ওপর, একটু কায়দামাফিক পেলেই ধরবেন চেপে তার গলা...আর যেন জিভের রসে রাজা আর চিন্তা করতে পারছেন না।
     হঠাৎ একটা মোড় বেঁকতেই খপাৎ করে একেবারে পিছনের লোকটির মুখটা জোরে চেপে ধরলেন তিনি তার হাড়-হাত দিয়ে। অন্য হাতে চেপে ধরলেন গলায় শক্ত মুঠোয়। একে আঘাত, তায় হাড়ের দেহ দেখে লোকটা তক্ষুনি মরে গেল। গড়িয়ে পড়ল তার দেহ। ঘন বনের অন্ধকারে সামনের দুজন ভাবল, বন্ধু বুঝি আসছেই।
     রাজা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। রাস্তা থেকে দেহটা সরানো দরকার। নইলে অন্য কেউ যদি চলে আসে। তিনি প্রাণপণে দেহটাকে টানতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন দেহটার ওপর। এত দুর্বল তিনি হয়ে পড়েছেন না খেয়ে খেয়ে যে পড়েই তিনি মরে গেলেন। তার হাড়ের শরীরের নীচে বলিষ্ঠ লোকটার নরম দেহটি তখনও বেশ গরমই ছিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য