ছোট্টো ভাই আর ছোট্টো বোন - জার্মানের রূপকথা

     ছোট্টো ভাই তার ছোট্টো বোনের হাত ধরে বললেন, “মা মারা যাবার পর ঘণ্টাখানেক সময়ও আমাদের আনন্দে কাটে নি। সৎমা রোজ আমাদের মারে। কাছে গেলে লাথি মেরে তাড়ায়। ৰাসি পচা এঁটোকাটা আমাদের খেতে হয়। টেবিলের তলায় কুকুরছানাটাও আমাদের চেয়ে ভালো আছে; কারণ সৎমা তাকে মাঝে-মাঝে ভালো খাবারের টুকরো-টাকরা ছুঁড়ে দেয়। ভগবান আমাদের সহায় হন। চল—আমরা বাড়ি থেকে পালাই।”
     এই-না বলে বোনকে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। মাঠ-ঘাট ঘাসপাথর পেরিয়ে সারা দিন তারা হাঁটল। বৃষ্টি পড়লে ছোট্টো বোনটি বলে, “আকাশও আমাদের দুঃখে কাঁদছে।”
     সন্ধেয় তারা পৌছল গহন এক বনে । এত দূর হেঁটে তারা বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল৷ ক্ষিদের জ্বালায়, মনের দুঃখে একটা গাছের কোটরে সেঁধিয়ে তারা পড়ল ঘুমিয়ে।
     পরদিন ঘুম ভাঙতে তারা দেখে সূর্য আকাশের অনেক উপরে উঠে গেছে। গরম রোদ পড়েছে গাছের মাথায়। ছোট্টো ভাই বলল, “বোনটি, আমার ভারি তেষ্টা পেয়েছে। কোথায় ঝর্না আছে জানলে জল খেয়ে আসতাম। মনে হচ্ছে যেন জলের কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”
     এই-না বলে ছোট্টো বোনের হাত ধরে সে বেরুল ঝর্নার খোঁজে। কিন্তু তাদের শয়তান সৎমা ছিল ডাইনি। ছেলেমেয়েদের পালাতে দেখে তাদের পিছু নিয়ে এসে বনের সব ঝর্নাগুলোর উপর জাদুমন্ত্র সে পড়ে দিয়েছিল। যেতে যেতে তারা দেখে ঝকমকে একটা ঝর্না পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে চলেছে । ছোট্ট ভাই গেল সেটার জল খেতে। কিন্তু ছোট্ট বোন শুনতে পেল কলকল করে ক্রমাগত ঝর্নাটা বলে চলেছে, “যে আমার জল খায়, সে বাঘ হয়ে যায়। যে আমার জল খায়, সে বাঘ হয়ে যায়।”
তাই-না শুনে ছোট্ট বোন চেঁচিয়ে উঠল, “দোহাই দাদা, এটার জল থেয়ো না। খেলে বাঘ হয়ে আমায় তুমি ছিড়ে খুঁড়ে খেয়ে ফেলবে।”
দ্বিতীয় ঝর্নার কাছে পৌছে ছোটো বোন শুনল কলকল করে ক্ৰমাগত সেটা বলে চলেছে, “যে আমার জল খায়, সে নেকড়ে হয়ে যায়। যে আমার জল খায়, সে নেকড়ে হয়ে যায়।”
তাই-না শুনে ছোট্ট বোন আবার চেঁচিয়ে উঠল, “দোহাই দাদা, এটার জল খেয়ো না। খেলে নেকড়ে হয়ে আমায় তুমি খেয়ে ফেলবে।” ছোটো ভাই সেই ঝর্নার জল খেল না । কিন্তু বোনকে বলল, “পরের ঝর্নার জল আমি থাবোই—তুই যাই বলিস-না কেন। তেষ্টায় আমার গলা কাঠ হয়ে গেছে।”
তৃতীয় ঝর্নার কাছে পৌছে ছোট্টো বোন শুনল কলকল করে ক্ৰমাগত সেটা বলে চলেছে, “ষে আমার জল খায়, সে হরিণ হয়ে ষায়। যে আমার জল খায়, সে হরিণ হয়ে যায় ।”
তাই-না শুনে ছোট্ট বোন চেঁচিয়ে উঠল, “দোহাই দাদা, এটার জল খেয়ো না। খেলে হরিণ হয়ে আমার কাছ থেকে তুমি পালিয়ে যাবে।”
ছোট্টো ভাই কিন্তু তার কথা না শুনে ঝর্নার পাশে হাঁটুগেড়ে বসে আঁজলা ভরে সেই ঝর্নার জল খেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে দেখল হরিণ-ছানা হয়ে ঝর্নাটার পাশে সে শুয়ে রয়েছে।
ভাইকে বদলে যেতে দেখে ছোট্টো বোন হাপুস নয়নে কঁদিতে লাগল। হরিণ ছানাও তার পাশে বসে লাগল কাঁদতে। শেষটায় মেয়েটি বলল, “কেঁদো না, ভাই হরিণ। তোমাকে কখনো আমি ছেড়ে যাব না।” নিজের মোজা বাঁধার সোনার ফিতে খুলে হরিণছানার গলায় পরিয়ে বুনো ঘাস ছিড়ে সে বুনল নরম একটা দড়ি । সেই দড়ি দিয়ে হরিণ-ছানাকে বেঁধে তাকে নিয়ে সে চলে গেল বনের গভীর থেকে গভীরে৷ যেতে যেতে যেতে যেতে শেষটায় তারা পৌছল ছোট্টো এক কুটিরে। সেটা খালি দেখে মেয়েটি বলল, “এখানেই আমরা থাকব।”
কচি পাতা আর শ্যাওলা তুলে এনে হরিণ-ছানার জন্য নরম একটা বিছানা সে বানাল। প্রতি সকালে সে যায় নিজের জন্য বাদাম বৈঁচি আর ফলমূল জোগাড় করতে । হরিণ-ছানার জন্য সে নিয়ে আসে কচিকচি ঘাস। তার হাত থেকে সেই ঘাস খেয়ে হরিণ-ছানা মনের আনন্দে তাকে ঘিরে লাফিয়ে-লাফিয়ে বেড়ায়। সন্ধেবেলায় ক্লান্ত হয়ে ঠাকুর-নাম সেরে হরিণ-ছানার পিঠে মাথা রেখে মেয়েটি পড়ে ঘুমিয়ে। ছোট্টো ভাইটির মানুষের চেহারা থাকলে খুব আনন্দেই সেখানে তাদের দিন কাটত।
এইভাবে কিছুদিন একা-একা তাদের সেই বনে কাটল। তার পর একদিন সে-দেশের রাজা দলবল নিয়ে সেখানে এলেন শিকার করতে। চার দিকে শিঙা লাগল বাজতে, শোনা যেতে লাগল। শিকারী-কুকুরদের ডাক আর শিকারীদের প্রাণ-খোলা হৈ-হল্লা । তাই-না শুনে হরিণ-ছানার খুব ইচ্ছে হল সেখানে যেতে। ছোট্ট বোনকে সে বলল, “শিকার দেখতে যেতে দাও। শিকারের বাজনা শুনে আমি আর থাকতে পারছি না।” সে এমন কাকুতি-মিনতি করতে লাগল যে, শেষ পর্যন্ত ছোট্ট বোনকে মত দিতে হল।
সে বলল, “সন্ধেয় কিন্তু বাড়ি ফিরতে ভুলো না। শিকারীদের ভয়ে দরজা আমি বন্ধ করে রাখব। ফিরে এসে দরজায় টোকা দিয়ে বোলো, ছোটো বোন, আমাকে ঢুকতে দাও।” তা হলে বুঝব তুমি ফিরেছ ! কথাগুলো না শুনলে দরজা খুলব না।”
হরিণ-ছানা দৌড়ে বেরিয়ে খোলামেলা জায়গায় গিয়ে ভারি খুশি হল। সেই সুন্দর জন্তটাকে দেখতে পেয়ে রাজা আর শিকারীর দল তাড়া করল । কিন্তু কিছুতেই তার নাগাল তারা পেল না। যখনই তারা ভাবে, এইবার ধরেছি—তখনি সেটা ঝোপঝাড় টপকে অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্ধকার হতে হরিণ-ছানা দৌড়ে বাড়ি ফিরে দরজায় টোকা দিয়ে বলল, “ছোটো বোন, আমাকে ঢুকতে দাও ।” দরজা খুলতে লাফিয়ে ভিতরে এসে সারা রাত সে ঘুমলো তার নরম বিছানায়। পরদিন সকালে আবার শিকার শুরু হল। শিঙার শব্দ আর শিকারীদের চীৎকার শুনে, হরিণ-ছানা অস্থির হয়ে উঠে বলল, "ছোটো বোন, দরজা খোলো । আমাকে বেরুতেই হবে।”
ছোটো বোন দরজা খুলে বলল, “সন্ধেয় ফিরতে কিন্তু ভুলো না । ফিরে দরজায় টোকা দিয়ে ঐ কথাগুলো বলবে।”
রাজা আর শিকারীর দল গলায় সোনার পাত জড়ানো সেই হরিণ‘ছানাকে আবার দেখতে পেয়ে তাড়া করল। কিন্তু কিছুতেই তার নাগাল পেল না। সারাদিন তাড়া করার পর সন্ধের মুখে শিকারীর দল তাকে ঘিরে ফেলল৷ এক শিকারীর তীরে তার পা সামান্য আহত হওয়ায় আগের মতো জোরে সে আর ছুটতে পারল না। ধীরে ধীরে ছুটে সে বাড়ি ফিরল। এক শিকারী পিছু নিয়ে সেই পর্যন্ত এসে হরিণ-ছানাকে বলতে শুনল, “ছোটো বোন, আমাকে ঢুকতে "দাও।” আর দেখল দরজাটা খুলে বন্ধ হয়ে যেতে।
রাজার কাছে ফিরে যা দেখেছে, যা শুনেছে—সব কথা সেই শিকারী জানাল। শুনে রাজা বললেন, “কাল আবার আমরা "হরিণ-ছানাকে তাড়া করব।”
হরিণ-ছানাকে আহত দেখে ছোট্ট বোন গেল দারুণ ঘাবড়ে। পায়ের রক্ত ধুয়ে তার উপর শিকড়-বাকড়ের ওষুধ লাগিয়ে সে বলল, “তোমার বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম কর, লক্ষী হরিণ-ভাই তা হলেই  সেরে উঠবে।”
হরিণ-ছানার পা সামান্যই কেটেছিল। তাই পরদিন সকালে ব্যথাট্যথা সে টের পেল না। বনে আবার শিকারের হৈচৈ শুনে সে বলল, “বাড়িতে কিছুতেই টিকতে পারছি না। আমাকে ওখানে যেতেই হবে। লক্ষ্য রাখব কেউ যাতে আবার কাছে আসতে না পারে।
তাই শুনে ছোট্ট বোন কাঁদতে কাঁদতে বলল,“এবার ওরা তোমায় নিশ্চয়ই মেরে ফেলবে। পৃথিবীতে আপনার বলতে কেউ আমার থাকবে না। কিছুতেই তোমায় আমি বেরুতে দেব না।”
ছোট্টহরিণ-ছানা বলল, “তা হলে মনের দুঃখে আমি মরে যাব।
শিকারের শিঙার আওয়াজ শুনলে মনে হয় আমার পাগুলো যেন পুড়ে যাচ্ছে।”
ছোট্টো বোন তার কাকুতি-মিনতি ঠেলতে পারল না। দুরুদুরু বুকে দরজা সে খুলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে বেজায় খুশি হয়ে লাফাতে জাফাতে হরিণ-ছানা চলে গেল বনে।
তাকে দেখে রাজা শিকারীদের বললেন, “সন্ধে পর্যন্ত ওকে তাড়া করে যাও । কিন্তু কেউ ওর কোনো ক্ষতি করবে না ।”
সূর্য ডোবার পর সেই শিকারীকে রাজা বললেন, “যে বাড়িটার কথা বলেছিলে, আমাকে সেখানে নিয়ে চলো৷”
সেই দরজার কাছে পৌছে টোকা দিয়ে বললেন, “ছোটো বোন, আমাকে ঢুকতে দাও।” দরজা খুলতে ভিতরে গিয়ে রাজা তো অবাক। দেখেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরাপ সুন্দরী একটি মেয়ে। সেরকম সুন্দরী মেয়ে জীবনে কখনো তিনি দেখেন নি ।
হরিণ-ছানার বদলে সোনার মুকুট পরা রাজাকে আসতে দেখে মেয়েটি দারুণ ভয় পেয়ে গেল। রাজা কিন্তু সদয় চোখে তার দিকে তাকিয়ে তার হাত ধরে বললেন, “আমার সঙ্গে রাজপুরীতে এসে আমায় তুমি বিয়ে করতে রাজি?”
মেয়েটি বলল, “খুব রাজি । কিন্তু হরিণ-ছানাকেও নিয়ে যেতে হবে। তাকে আমি কিছুতেই ফেলে যাব না।”
রাজা বললেন, “আজীবন সে তোমার সঙ্গে থাকবে। কোনো কিছুর অভাব তার হবে না।”
রাজার কথার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ঘরে এল হরিণ-ছানা। ছোটো বোন সেই ঘাসের দড়ি দিয়ে তাকে বেঁধে, হাতে দড়ি নিয়ে বনের সেই ছোটো কুটির ছেড়ে হরিণ-ছানাকে নিয়ে রাজার সঙ্গে চলে গেল রাজপুরীতে।
মহা ধুমধাম করে রাজার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল। ছোট্ট বোন হয়ে উঠল রাজরানী। তার পর অনেকদিন তারা কাটাল সুখেস্বচ্ছন্দে । হরিণ-ছানাও রইল খুব আদর-যত্নে । রাজপুরীর বাগানে সে বেড়ায় দৌড়ঝাপ করে।
এদিকে সেই যে শয়তান সৎমা, যার জ্বালায় ছেলেমেয়েদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়—সে ভেবেছিল, বনের জন্তু-জানোয়ার ছোট্টো বোনকে ছিড়ে খুঁড়ে শেষ করে ফেলেছে আর হরিণ-ছানা-রূপী ছোট্টো ভাইকে গুলি করে মেরেছে শিকারীরা । তাই যখন শুনল তারা খুব সুখে আছে তখন হিংসেয় সে জ্বলতে-পুড়তে লাগল। তার মাথায় তখম একমাত্র চিন্তা–কী করে তাদের সর্বনাশ করা যায়। তার নিজের মেয়ে কালো কুচ্ছিত। একটা চোখ তার কানা। দাত ঘিঁচিয়ে নিজের মাকে কেবলই সে বলে, “রানী হবার কথা তো আমারই।”
সেই বুড়ি ডাইনি তাকে শান্ত করার জন্য বলল, “একটু ধৈর্য ধর। সময় হলেই আমি ব্যবস্থা করছি।”
সময় কাটে । রানী হয়ে উঠল একটি ফুটফুটে ছেলের মা । রাজা তখন বেরিয়েছেন শিকারে। সেই বুড়ি ডাইনি দাসীর বেশে রানীর শোবার ঘরে এসে বলল, “আসুন রানীমা, আপনার চানের গরম জল তৈরি। চান করলে নতুন করে বল পাবেন, দেরি করলে জল জুড়িয়ে যাবে ।” ডাইনির সঙ্গে ছিল তার মেয়ে। তারা দুজন ধরাধরি করে রানীকে স্নানের ঘরে নিয়ে গিয়ে টবে শুইয়ে স্নানের ঘরের দরজায় কুলুপ দিয়ে পালাল। সেই স্নানের ঘরে চুল্লির মতো আগুন তারা ধরিয়েছিল । ভেবেছিল দেখতে দেখতে দম বন্ধ হয়ে রানী মরবে ।
তার পর সেই ডাইনি করল কি—নিজের মেয়ের মাথায় রাত-টুপি পরিয়ে রানীর জায়গায় তাকে শোয়াল। জাদুমন্ত্রে তার চেহারা করে দিল রানীর মতো । কিন্তু মেয়ের কানা-চোখটা সে বদলাতে পারলে না। রাজার যাতে চোখে না পড়ে তার জন্য সেদিকে কানা-চোখ, বালিশের উপর মুখের সেদিকটা ফিরিয়ে তাকে সে শোয়াল।
সন্ধেয় বাড়ি ফিরে রাজা শুনলেন তার একটি ফুটফুটে ছেলে জন্মেছে। শুনে তিনি তো ভারি খুশি। রানী কেমন আছে দেখার জন্য তক্ষুনি তিনি যেতে চাইলেন রানীর শোবার ঘরে। বুড়ি ডাইনি সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “দোহাই রাজামশাই, পর্দা তুলবেন না। রানীমাকে এখন অন্ধকারে রাখা দরকার” তাই শুনে রাজা চলে গেলেন। মিথ্যে রানী সেজে বিছানায় কেউ শুয়ে বলে তার একটিবারও সন্দেহ হল না।
তখন মাঝ রাত। সবাই অসাড়ে ঘুমুচ্ছে। বাচ্চা যে-ঘরে দোলনায় শুয়ে সে ঘরে জেগে বসেছিল দাই । দরজা খুলে যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে আসল রানীকে ঘরে আসতে সে দেখলে। দোলনা থেকে শিশুকে নিজের বুকে চেপে সেই আসল রানী. তাকে অনেক আদর করল । তার পর শিশুর বালিশ ঠিকঠাক করে, দোলনায় তাকে শুইয়ে, তার গায়ে সে চাদর ঢাকা দিয়ে দিল। হরিণ-ছানার কথাও সে ভুলল না। যেখানে হরিণ-ছানা শুয়েছিল সেখানে গিয়ে তার পিঠে হাত বোলাল তার পর চুপচাপ বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। পরদিন সকালে প্রহরীদের দাই প্রশ্ন করল—রাতে রাজপুরীতে কেউ এসেছিল কি না। তারা বলল, “না, কাউকে তো আমরা দেখি নি ।” এইভাবে আসল রানী রাতের পর রাত আসতে লাগল । কিন্তু কোনো কথা সে বলে না , প্রতিবারই দাই তাকে দেখে । কিন্তু কথাটা কাউকে বলতে তার সাহস হয় না।
কিছুদিন পর রাতে আসল রানী কথা বলতে শুরু করল । সে বললে:

কেমন আমার ছেলে, কেমন হরিণ-ছানা ? 
একটিবার আসব কিন্তু আর আসব না ।” 

দাই তার কথার উত্তর দিল না । কিন্তু রানী আদশ্য হবার পর রাজার কাছে গিয়ে সব কথা জানাল ।
রাজা বললেন, “কী সবনাশ । এ-সবের মানে কী ? কাল রাতে, নিজে আমি ছেলের ঘর পাহারা দেব।”
সন্ধেয় তিনি গেলেন ছেলের শোবার ঘরে। মাঝরাতে আবার: এসে আসল রানী বলল:

“কেমন আমার ছেলে, কেমন হরিণ-ছানা ? 
একটিবার অাসব কিন্তু আর আসব না।” 

তার পর যথারীতি ছেলেকে চুমু খেয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। রানীকে বাঁধা দেবার সাহস হল না রাজার । কিন্তু পরের রাতেও পাহারা দিতে গিয়ে রানীকে বলতে শুনলেন রাজা:

“কেমন আমার ছেলে, কেমন হরিণ-ছানা? 
একটিবার আসব কিন্তু আর আসব না।” 

শুনে রাজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না । দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরে তিনি বললেন, “তুমিই যে আসল রানী তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।”
আসল রানী বলল, “হ্যাঁ রাজা, আমিই আসল রানী।” রাজা তাকে চিনতে পারলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই ডাইনির মোহজাল ছিড়ে গেল। আর রাজার সামনে সুস্থ জীবন্ত চেহারায় দাঁড়িয়ে রইল সেই ছোট্ট বোন, আসল যে রানী। সেই শয়তান ডাইনি আর. হতকুচ্ছিত মেয়ের সব কথা রাজাকে সে বলল।
বিচার করে রাজা তাদের দিলেন প্রাণদণ্ড। ডাইনির মেয়েকে বনে ছেড়ে দেওয়া হল। আর ছাড়বার পরেই বুনো জানোয়ারের দল তাকে ফেলল টুকরো-টুকরো করে। বুড়ো ডাইনিটাকে ফেলা হল এক চুল্লিতে । সেখানে দগ্ধে-দগ্ধে মরল সে। আর সে মরে পুড়ে ছাই হবার সঙ্গে সঙ্গে ছোট্টো ভাই-এর উপর ডাইনিটার জাদুর প্রভাব মিলিয়ে গেল! আবার ফিরে পেল সে মানুষের দেহ। আর তার পর থেকে সুখে-স্বচ্ছন্দে রইল সেই ছোটো বোন আর সেই ছোট্টো ভাইটি ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য