Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

     পরের দিন ভোর হতেই পড়শি চলল দূর গায়ের পথে। আজ সে আরও তাড়াতাড়ি চলছে। অন্য দিনের চেয়ে সে আগেই পৌঁছে গেল। মেয়ের বাবার বাড়িতে পৌঁছেই ...

একশ গরুর বদলে একটি বউ-২ - আদিবাসী লোককথা

     পরের দিন ভোর হতেই পড়শি চলল দূর গায়ের পথে। আজ সে আরও তাড়াতাড়ি চলছে। অন্য দিনের চেয়ে সে আগেই পৌঁছে গেল। মেয়ের বাবার বাড়িতে পৌঁছেই খবর দিল, ‘হ্যাঁ, ছেলে রাজি হয়েছে। সে একশো গোরুই পণ দেবে। যদিও তার আর কিছুই নেই তবু সে সব দেবে। ছেলে মত দিয়েছে।
     বাবা হাসিমুখে বলল, তাহলে আমিও রাজি। সে আমার মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে পারে।
     তারপরে পড়শি ও বাবা খাওয়া-দাওয়া সেরে খুঁটিনাটি সব আলোচনা করল। অনেক কথা হল। শেষকালে ঠিক হল, সেই গায়ের একজন মাতব্বর ছেলেকে আনতে যাবে। সব কথা পাকা করে নিজের গায়ে ফিরে এল পড়শি।
     যে দিন ঠিক করা ছিল সে দিন মাতব্বর ছেলেটির বাড়ি এল। খুব যত্নআত্তি করে ছেলেটি তাকে সেবা করল। খুব খাওয়া-দাওয়া হল। তারপর বিয়ে নিয়ে নানান কথা হল।
     মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির বিয়ে হয়ে গেল। কথামতো ছেলেটি মেয়ের বাবাকে তার সম্পদ একশোটা গোরু দিয়ে দিল। মেয়েকে বিয়ে করবার পণ হিসেবে। বিয়েতে খুব খাওয়া-দাওয়া হল। পাড়া-পড়শি সবাই প্রাণ খুলে আনন্দ করল। সবাই খুশি।
     ছেলেটি বউকে নিয়ে নিজের গায়ে ফিরে এল। মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে অনেক কিছু খাবার-দাবার এল। সেগুলো মেয়ের বাবাই দিল। চোখের জল মুছে মেয়ে নতুন সংসার পাতল।
     এমনি করে দশদিন কাটল। বাবার পাঠানো খাবার-দাবারে বেশ আনন্দেই দিন কাটল। দুজনেই খুব খুশি।
     দশদিন পরে ছেলেটি চমকে উঠল। সব খাবার শেষ। অন্য কোন উপায় নেই। এখন সে-ই বা কি খাবে আর বউকেই বা কি খেতে দেবে? পেটে দেবার কিছুই যে অবশিষ্ট নেই। এ কি হল?
     ছেলেটি শুকনো মুখে বলল, বউ, আমার তো আর কিছুই নেই। তুমি বাপের বাড়ি থেকে যা এনেছিলে সব ফুরিয়ে গেল। তোমার আমার পেট চলবে কেমন করে? সে একদিন ছিল যখন আমার বাড়িতে প্রচুর দুধ হত। অনেক গোরু। আমি দুধ দোহাতাম, অনেক দুধ। আর বিনিময়ে কত কিছুই পেতাম। কিন্তু সব গোরু তোমার বাবাকে দিতে হল। তোমাকে পাবার জন্য আমি সবই দিযে দিলাম। বউ এখন কি করি?
     বউ কোন কথা বলল না। চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। স্বামীর মুখের দিকেও তাকাল না। ছেলেটি কেমন যেন ভেঙে পড়েছে।
     কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি আবার বলল, বউ, এক কাজ করি । তোমার হয়তো খারাপ লাগবে। কিন্তু উপায় কি বল? আমার গাযে অনেক পড়শির গোরু মোষ আছে। আমি তাদের দুধ দোহাবার কাজ নি। তাতে দিন-মজুরি পাব। তাতেই পেট চালাতে হবে। অন্য উপায় তো দেখি না বউ।
     বউ আস্তে আস্তে বলল, আমি তোমার বউ, তুমি যা বলবে তাই হবে। তুমি তাই কর।
     ছেলেটি তো এখন আর ছোট নেই। সে পুরো যুবক হয়ে উঠেছে। অনেক কিছু ভাবতে শিখেছে, অভিজ্ঞতাও বেড়েছে। একদিন তার কত কি ছিল, আজ তার কিছু নেই। তার মনে খুব কষ্ট হল। বিয়ের পর দশদিন যেতে না যেতেই তাকে এমন অবস্থায় পড়তে হল। কিন্তু কি আর করে। পড়শিদের গোরু-মোষের দুধ দুইতে গেল। আর সেদিন থেকে এই গোরু দোহাবার দিন-মজুরিই হল তার পেশা। প্রতিদিন এই কাজে সে সক্কাল বেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত। ফিরত দুপুর বেলা, আকাশ যখন আগুন ছড়ায়।
     এমনি করে কষ্টে দিন যায়। তারা দিন আনে দিন খায়। স্বামী যতক্ষণ না ফেরে বউয়ের তেমন কোন কাজ নেই। সে এলে তবেই রান্না শুরু হয়। খেতে খেতে প্রতিদিনই অনেক দেরি হয়ে যায়।
     একদিন দুপুরবেলা। বউ দোরের সামনে চুপচাপ বসে রয়েছে। গালে হাত দিয়ে নানান কথা ভাবছে। ছেলেবেলার কথা, পুরনো দিনের কথা। এমন সময় সামনের পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক যুবক। অপূর্ব সুন্দর দেখতে। যুবক তাকিয়ে দেখে একটি মেয়ে চুপ করে বসে রয়েছে। মেয়েটি খুব সুন্দরী। যুবকটি ভাবল, একে বিয়ে করতে পারলে খুব ভালো হয়। এমন সুন্দরী মেয়ে। কিন্তু মেয়েটি তো অন্যের বউ, সে কি তাকে বিয়ে করবে? দেখাই যাক না।
     সে একজন ঘটক ঠিক করল। মেয়েটিকে খুব সুখে রাখবে তাও জানাল। ঘটক একদিন এসে মেয়েটিকে যুবকটির মনের কথা জানাল।
     বউ বলল, “বনের দেবতা, থানের দেবতা শুনলেন তুমি কি প্রস্তাব দিলে। তুমি যা বললে তা দেবতাও শুনেছেন, আমিও শুনলাম। কিন্তু যে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে তাকে যে কিছদিন অপেক্ষা করতে হবে। এখনও আমার মত নেই। আমার মত হলেই তোমাকে জানাব, তুমি যুবকটিকে তখন খবর দিও। আমি একটু চিন্তা করে নি। এক্ষুনি আমি কিছু বলতে পারব না।
     ঘটক আশা নিয়ে ফিরে গেল। বউয়ের সব কথা যুবককে জানাল। আরও তিন মাস কেটে গেল। একইভাবে দিন কেটে যাচ্ছে। হঠাৎ তাদের বাড়িতে বউয়ের বাবা এল। অনেকদিন মেয়ের কোন খোঁজখবর পায় না। কেমন আছে মেয়ে জামাই? এইসব ভেবেই বাবা জামাই-এর গায়ে এল। গায়ে পৌঁছে পড়শিদের জিজ্ঞেস করে মেয়ের বাড়ি পৌছল। মেয়ে তখন ভেতরে শুয়ে রয়েছে। কাজ নেই, স্বামী বাইরে। সে আর কি করে? তাই শুয়ে ছিল। দরজায় শব্দ হতেই মেয়ে বলল, 'কে' ?
     বাবা বলল, “আরে খোল। আমি এসেছি, তোর বাবা। মেয়ের তো চোখে জল চলে এল। আনন্দে বুক কাঁপছে। তাড়াতাড়ি উঠেই সে দরজা খুলে দিল। বাবা মেয়েকে কাছে টেনে নিল। তারপরে ঘরে গিয়ে শুধু গল্প আর গল্প। বাবা বলল, তা কেমন আছিস বল ।
     মেয়ে বলল, “বাবা খুব ভালো আছি। তোমার কিছু চিন্তা করতে হবে না। খুব ভালো আছি। তুমি বিশ্রাম কর, আমি আসছি।
     মেয়ে অন্য ঘরে যেতে যেতে শুনতে পেল, বাবা বলছে, ‘আরে, আমার খাবার জন্য তোকে ব্যস্ত হতে হবে না।
    অন্য ঘরে গিয়ে মেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। কান্না চাপতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে। এ কি হল? এতদিন পরে বাবা এসেছে মেয়েকে দেখতে, অথচ মেয়ের ঘরে একরত্তি খাবার নেই। সব শূন্য। বাবাকে সে কি খাওয়াবে? বাবার জন্য কি রাঁধবে। এখন কি করে সে মুখ দেখাবে? ভাবছে আর কাঁদছে। কাঁদছে আর ভাবছে।
     ভাবতে ভাবতে সে পেছনের দরজায় এল। দরজা খুলে উদাস চোখে স্বামীর আসার পথে চেয়ে রইল। হঠাৎ সেই যুবকটিকে সে দেখতে পেল। বুকে বল পেল। বুদ্ধি এল মাথায়। সে যুবকটিকে ডাকল। যুবকটি কাছে এল।
     বউ বলল, “এখানে একা একা কি করছ?
    যুবকটি বলল, “বেশ কয়েক মাস আগে তোমার কাছে একজন ঘটক পাঠিয়েছিলাম। তোমায় আমি বিয়ে করতে চাই। তা তখন তুমি রাজি হও নি। এখনও কি তোমার মত পালটায় নি? আমি যে দিনেরাতে তোমাকেই স্বপ্ন দেখছি। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে না? আমার বাড়ি যাবে না?
     বউ বলল, “তুমি যা বললে বনের দেবতা, থানের দেবতা তা শুনলেন। আমি যা শুনলাম দেবতারাও তা শুনলেন। আমি আর তোমাকে অপদস্থ করব না। তুমি যদি সত্যিই আমাকে চাও, আমি দেরি না করে এক্ষুনি তোমার সঙ্গে যাব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। আমার বাড়িতে একজন অতিথি এসেছে। তার জন্য কিছুটা মাংস চাই। তাকে রান্না করে খাওয়াতে হবে। রান্না-খাওয়া হলেই আমি তোমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব, তোমার বাড়ি যাব। কথা বলে উত্তেজনায় বউ হাঁপাচ্ছিল।
     ‘অতিথিটি কে? কোথা থেকে এসেছে? যুবকটি জিজ্ঞেস করল। 
     বউ বলল, “আমার বাবা। দূর গা থেকে আমার বাড়িতে এসেছে। সে-ই অতিথি।
     যুবকটি বলল,‘কোন চিন্তা নেই তোমার। একটু দাঁড়াও, আমি এক্ষুণি মাংস নিয়ে আসছি।’
    আনন্দে যুবক চলে গেল। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল বউ। আবার চোখ বেয়ে জল পড়ছে, বুক ফুলে উঠছে। এমন সময় যুবক ফিরে এল। তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে ফেলল বউ। যুবক কাছে এল, তার হাতে পাতায় জড়ানো কিছুটা গোরুর মাংস। বউয়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
     মাংস বউয়ের হাতে দিয়ে যুবক বলল, তুমি চেয়েছিলে, তাই এনে দিলাম। বেশিক্ষণ দেরি কর না। কতক্ষণ অপেক্ষা করব?
     বউ বলল, “বনের দেবতা থানের দেবতা তোমার কথা শুনলেন। আমিও শুনলাম। তোমায় আর বেশি দেরি করতে হবে না।
     যুবকের হাত থেকে মাংস নিয়ে বউ উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। তাড়াতাড়ি উনুন ধরিয়ে মাংস রান্না করতে বসে গেল বউ।
     যে তাকে মাংস দিয়েছিল সেই যুবক বউয়ের বাড়ি থেকে বেশি দূরে গেল না। আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। সেও উত্তেজনায় কোথাও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না। গাছতলায় বসে আবার উঠে পড়ে, আবার অন্য গাছের নীচে বসে। মেয়েটি আসবে তো ? না শুধুই মুখের কথা।
     মাটির হাঁড়িতে মাংস ফুটছে। পাশে গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছে বউ। মনে নানা চিন্তা। এমন সময় দিন-মজুরির কাজ শেষ করে তার স্বামী ঘরে ফিরল। ঘরে ঢুকেই দেখে বউয়ের বাবা বসে রয়েছে। তাকে দেখেই সে অাঁৎকে উঠল, মুখে ছলাৎ করে রক্ত উঠে এল। এমন অবস্থা যে, কোন কথা তার মুখে এল না। তাকে দেখে বউয়ের বাবা খুব খুশি হল।      হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে ডাকল। কেমন আছে, সংসার কেমন চলছে—অনেক কিছু জানতে চাইল। কোনরকমে মাথা নেড়ে উত্তর দিয়ে সে চলে এল বউয়ের কাছে। এসে দেখে বউ কি যেন রান্না করছে।
     বউকে জিজ্ঞেস করল, “বউ, কি রাঁধছ? 
    বউ বলল, ‘মাংস। অবাক হল স্বামী। সে জিজ্ঞেস করল, ‘মাংস? কোথায় পেলে বউ? একটু চুপ করে থেকে বউ বলল, ‘পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে এনেছি। পড়শির বউ দিয়েছে।
     একথা শুনে তার স্বামী একেবারে চুপ করে গেল। কোন কথা বলল না। হয়। সে এত গরিব। আজ অন্যের কাছে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। হায় ! এমন অবস্থা তার।
     তারপরে অস্তে আস্তে স্বামী বলল, “বউ, আমরা এখন কি করব? আমাদের দুজনেরই খাবার জোটে না, তার ওপরে একজন অতিথি। কি হবে?
     বউ ধরা গলায় বলল, “আমি কি বলব বল? কেমন করে চলবে তাই-বা বলি কেমন করে? আমি জানি না।
    স্বামী বলল, “আমি যাদের যাদের বাড়ি কাজ করি মানে গোরু দোহাই, তারা তো বেশ ধনী। তাদের কাছে গিয়ে বলি,—আমার বাড়িতে অতিথি এসেছে। তার জন্য আমায় যা-হোক কিছু দাও, তাকে রান্না করে খাওয়াতে হবে তো! আমি বেশি খেটে সেগুলো শোধ দিয়ে দেব। নাহয় আরও বেশিক্ষণ খাটব। কি বল বউ?
     বউ কোন কথা বলল না। স্বামী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার মালিকদের গিয়ে সব বলল। আসলে এই লোকটি খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। তাই মালিকরা সবাই তাকে ভালোবাসে। তার দুদিনে তারা তাকে কিছু কিছু জিনিস সাহায্য করল। তাকে তারা মাংস দিল, দুধ দিল, জোয়ার-বাজরা দিল, সে রওনা দিল বাড়ির পথে।
     বউয়ের মাংস রান্না শেষ হয়েছে। এমন সময় স্বামী ফিরে এল। বউয়ের হাতে মাংস-দুধ জোয়ার-বাজরা দিল। বউ সেগুলো রান্নাঘরের একপাশে গুছিয়ে রাখল। স্বামী হাতমুখ ধুতে উঠোনে গেল। হাড়ি থেকে মাংস ঢেলে বউ সেটা বারকোশে রাখল। বাবাকে খেতে দেবে।
     এদিকে যে মাংস দিয়েছিল সেই যুবক বাড়ির আশেপাশেই ঘুরছিল। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, বউ তো এল না? সে ব্যস্ত হল। সাতপাঁচ ভেবে সে বাড়ির খুব কাছে এল। সামনের দিকের দরজা খোলা দেখে সে দাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে উকি মারল। হয়তো বউকে দেখা যাবে। দেখল, ভেতরে বসে একজন বুড়ো-মতন লোক ও বউয়ের স্বামী পাশাপাশি গল্প-গুজব করছে। চোখাচোখি হতেই যুবক মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল, বউয়ের স্বামীও মাথা নোয়াল। স্বামী ছেলেটিকে চেনে না, কিন্তু অভিবাদন যখন করেছে, তখন ভেতরে ডাকাই উচিত। তার ওপরে ভর-দুপুরে একজনকে কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা যায়? স্বামী তাকে হাত নেড়ে ডাকল। সঙ্গে সঙ্গে যুবকটি দাওয়া পেরিয়ে ভেতরে এসে ঢুকল আর স্বামীর পাশে বসল।

0 coment�rios: