একশ গরুর বিনিময়ে একটি বউ-৩ - আদিবাসী লোককথা

     স্বামী তো আর অচেনা লোকটার মনের কথা কিছুই জানে না, তাই বন্ধুর মতো আলাপ করতে লাগল। সে তো জানে না, এই লোকটিই তার বউকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেতে চায়। সব পাকা করে ফেলেছে। তারা তিনজন আলাপ-আলোচনা কথাবার্তা বলতে লাগল। বউয়ের বাবা, বউয়ের স্বামী আর অসাধু জানোয়ার—এই তিনজন। এই জানোয়ার তাদের ঘরের শান্তি নষ্ট করতে চায়। তারা গরিব তবু শান্তিতে রয়েছে। তারা গরিব তাই শান্তি নষ্ট করা সহজ। সেই সুযোগই নিচ্ছে জানোয়ারটা। পাশাপাশি বসে তারা গল্প-গুজব করছে। কতই না বন্ধুত্ব। হায়!
     বউ বারকোশে মাংস নিয়ে ঘরে ঢুকল। তাকিয়ে দেখে তিনজন পাশাপাশি বসে গল্প-গুজব করছে। ছোট ছোট তিনটে বারকোশে মাংস ঢেলে সে এগিয়ে দিল তাদের দিকে। তিনজন যখন হাত বাড়িয়ে খাবার নিতে গেল, তখন বউ বলল, “এখন তিন বোকা মিলে খাওয়া শুরু কর।
     বাবা অবাক চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল, “আমি বোকা? বোকামির কি কাজ করলাম?
     মেয়ের চোখ ছলছল করে উঠল। আস্তে আস্তে বলল, “বাবা, আগে তোমরা খেয়ে নাও। পরে বলব তোমরা তিনজনেই কি বোকামি করেছ।
     বাবা রেগে গেল। বলল, “আমি কিছুতেই খাব না। এক টুকরোও মুখে দেব না।
      আগে তোমায় বলতে হবে কেন তুমি আমায় বোকা বললে? তারপরে তোমার বাড়িতে আমি খাব। নইলে নয়।
     মেয়ে আর কি করে! তাকে বলতে হল। সে বলল, “বাবা, তুমি এক মহামূল্য জিনিস খুব সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছ। মানে, অতি সামান্য জিনিসের বদলে খুব দামি জিনিস বিক্রি করেছ।
     বাবা অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,‘আমি? দামি জিনিস সস্তায় বিক্রি করেছি? মনে পড়ছে না তো ! কোন জিনিস ?
     মেয়ে মাথা নামিয়ে বলল, সে জিনিস আমি। তুমি আমাকে বড় সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছ।
     বাবা আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন করে? 
    মেয়ে এবার সোজা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “বাবা আমি ছাড়া তোমার আর কোন মেয়ে নেই। এমন কি আমার আর কোন ভাইও নেই। আমি তোমার একমাত্র সন্তান। সেই তুমি একশোটা গোরুর বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করে দিলে। অথচ তোমার নিজেরই ছয় হাজার গোরু-মোষ রয়েছে। একশোটা গোরু তোমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান হল,—আমার চেয়েও বেশি। তুমি বেশি দামি জিনিসের মূল্য বুঝলে না, তাকে এইভাবে বিকিয়ে দিলে। তাই তোমাকে বলেছি, তুমি মহামূল্য জিনিস খুব সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছ। ঠিক না?
     বাবা মাথা নামিয়ে চুপ করে বসে রইল। অল্পক্ষণ পরে বলল, “ঠিক কথা। আগে কোনদিন ভাবিনি। তুমি ঠিক ধরেছ। এ আমি কি করেছি? সত্যি আমি বোকা।
     তারপর বউয়ের স্বামী ভয়ে ভয়ে বলল,‘আমি কেন বোকা? আমি কিরকম বোকামি করেছি।
     বউ বলল, “তুমি আরও বেশি বোকা। বাবার চেয়েও বেশি।
     স্বামী বলল, “কেমন করে ?
   বউ করুণভাবে হাসল। বলল, “তোমার ছিল একশোটা গোরু। এগুলো তুমি তোমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারী হিসেবে পেয়েছিলে। তুমি জানতে, তোমার গোরুগুলোর কোন বাচা-কাচ্চা নেই, শুধুই একশো গোরু। আমাকে বিয়ে করার লোভে তুমি জ্ঞান হারালে। আমার বিনিময়ে সব গোরু কনেপণ হিসেবে দিয়ে দিলে। তোমার তো আর কিছুই নেই। তোমার গায়ে কত মেয়ে রয়েছে। তাদের কনেপণ ছিল দশটা কি বিশটা গোরু। তুমি তোমার অবস্থা বুঝলে না। তাদের বিয়ে করলে তোমার আরও অনেক গোরু থাকত। শুধু তুমি আমাকেই বিয়ে করতে গেলে। বিয়ের পর তুমি কি খাবে, বউকে কি খেতে দেবে—এসব মোটেই চিন্তা করলে না। বিয়ের দশদিন পরেই সব ফুরিয়ে গেল। আমাদের দুজনের খাওয়ার মতো কিছুই রইল না। তোমার অনেক ছিল, বুদ্ধির দোষে তুমি আজ দিনমজুর। অন্যের দয়ায়, অন্যের অপমান সহ্য করে তোমার দিন চালাতে হয়। অথচ তোমার তো এমন হবার কথা নয়। অন্যদের গোরুর দুধ দুইয়ে তোমার পেট চালাতে হয়। অথচ তোমার অনেক গোরু ছিল। তুমি যদি অর্ধেক গোরু কনেপণ দিয়েও তোমার গায়ের কোন মেয়েকে বিয়ে করতে, তবে আরও অর্ধেক গোরু তোমার থাকত। খাওয়ার চিত্তা করতে হত না। তাই মনে করে দেখ, তুমি আরও বেশি বোকা কিনা।
     হতচ্ছাড়া জানোয়ার যুবকটি কর্কশভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘খুব তো বড় বড় কথা হচ্ছে। তা, আমি বোকা কিসে? আমি তো কোন বোকামি করি নি। এবার বল।
     বউ বলল, “বাবা আর স্বমীর চেয়ে তুমি আরও বেশি বোকা। তিনজনের মধ্যে তোমার বোকামি সবচেয়ে বেশি।
     যুবকটি বলল, “কেমন করে? 
     বউ ঠোঁটের ফাঁকে একটু হেসে উত্তর দিল, “তুমি আমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলে। তুমি আমাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে। কিসের বিনিময়ে? কিছুটা গোরুর মাংসের বিনিময়ে। হায় কপাল! তুমি আমাকে কিছুটা মাংসের বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিলে। সেই আমি যাকে একশোটা গোরুর বিনিময়ে কিনতে হয়েছে। তাই মনে করে দেখ, তুমি কি এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বোকা নাও?
     অসাধু জানোয়ার বসার চৌকি থেকে এক লাফে নেমেই দৌড় দিল। একবারও পেছনে তাকাল না, বনের পথে সে মিলিয়ে গেল।
     বাবা মেয়ে-জামাই-এর সঙ্গে আরও দুদিন থাকল। তৃতীয় দিনে যাওয়ার জন্য তৈরি হল। মেয়ে জলভরা চোখে বাবাকে বিদায় দিল। বাবার চলে যাওয়ার পথের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়ে। বাবাকে আর দেখা যাচ্ছেনা। পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল।
     বাবা গাঁয়ে ফিরে এসে জামাইয়ের একশোটা গোরুকে এক জায়গায় আনল। নিজের গোরু-মোষ থেকে আরও দুশোটা গোরু-মোষ তার সঙ্গে রাখল। একজন কিষানকে সঙ্গে দিল। কিষান তিনশো গোরু-মোষ নিয়ে মেয়ে-জামাইয়ের গায়ের দিকে রওনা দিল।
মেয়ে-জামাইয়ের আর কোন অভাব রইল না। তারা সুখে শাস্তিতে নিজেদের গাঁয়ে বাস করতে লাগল।

***সমাপ্ত***
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য