অনেক সয়েছে সে - আদিবাসী লোককথা

      এখন আমরা যেমন দেখতে পাই, সেই অনেক কাল আগে কিন্তু অন্যরকম ছিল। তখন পাহাড়ের ওই উঁচুতে থাকত যত রাজ্যের শেয়াল আর পাহাড়ের একেবারে নীচের দিকে থাকত যত রাজ্যের বাঘ। শেয়ালরা পাহাড় থেকে নামত না, বাঘরা পাহাড়ে উঠত না।
      একদিন, কেন জানি না, তাদের মধ্যে ঠিক হল, তারা নিজেদের এলাকা বদলাবে। একের এলাকায় চলে যাবে অন্যে। শেয়াল আসবে পাহাড়ের নীচের বনভূমিতে, আর বাঘ যাবে পাহাড়ের ওই উঁচু বনভূমিতে। সব ঠিক হয়ে গেল। রাতও ঠিক হয়ে গেল।
      দল বেঁধে বাঘেরা চলেছে পাহাড়ের চুড়োর দিকে, দল বেঁধে শেয়ালের নামছে পাহাড়ের চুড়ো থেকে। বাঘেরা উঠছে যে পথে, শেয়ালেরা নামছে সেই পথেই। ওপর থেকে নীচে ভালোভাবে সব কিছু দেখা যায়। বেশ দূর পথ থেকেই শেয়ালরা দেখতে পেল, সারি সারি বাঘের পাল উঠে আসছে। এত বাঘ? তারা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ওরা যদি তাদের আক্রমণ করে? এক এক থাবায় তো অনেক শেয়াল মরে যাবে। তাদের মেরে বাঘেরা যদি খেয়ে ফেলে? সবারই চার পা কাঁপতে লাগল। একই পথে উঠে আসছে অনেক বাঘ ।
      কিন্তু তারা শেয়াল। এত সহজে দমবার পাত্র তারা নয়। দারুণ তাদের উপস্থিত বুদ্ধি । জোয়ানমতো একটা শেয়াল এদিক-ওদিক চাইতে লাগল। হঠাৎ তার চোখের কোণে ঝিলিক খেলে গেল। পাশেই রয়েছে একটা বিরাট লম্বা গাছ । আর তার তলায় মরে পড়ে রয়েছে একটা বিরাট হাতি। যেন পাহাড়ের একটা মস্ত কালো পাথর। জোয়ান শেয়াল সময় নষ্ট না করে দৌড়ে গেল হাতির কাছে। লাফিয়ে উঠে পড়ল শোয়ানো হাতির পেটের ওপর। অন্য শেয়ালদের কাছে ডাকল, হাতির চারপাশে ঘিরে দাঁড়াতে বলল। বন্ধুর কথায় বন্ধুরা তাই করল।
      চুপ করে রয়েছে জোয়ান শেয়াল। চুপ করে রয়েছে চারপাশের অনেক শেয়াল। বাঘেরা সারি বেঁধে ওপরে উঠছে। আরও ওপরে। তাদের প্রায় কাছাকাছি।
      হঠাৎ হাতির ওপরে দাঁড়িয়ে-থাকা জোয়ান শেয়াল পেছনের দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সামনের দুপা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল, এই হাতি আমিই মেরেছি। খুব সহজে মেরেছি। বাঘেরা তখন একেবারে কাছে চলে এসেছে। শেয়াল চিৎকার করে বলল, "হাতি তো মারলাম। এখন, নিয়ে এস আমার পাথরের অস্ত্র। প্রথম যে বাঘ আসবে তার মাথার খুলি একেবারে গুড়িয়ে দেব। আমি তৈরি।
      বাঘের পাল শুনতে পেল শেয়ালের কথা। দেখতে পেল, মস্ত হাতির ওপরে শেয়াল দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর ওই বিশাল হাতি ওই শেয়ালই মেরেছে। আশ্চর্য! বাঘেরা বেশ ভয় পেয়ে গেল। বাঘেদের জটলা বেঁধে গেল। পেছনের বাঘ সামনের বাঘকে ঠেলে, সামনের বাঘ পেছনে ঢুকতে চায় । ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেল। ধাক্কাধাকি শুরু হল। কেউ আগে যেতে চায় না, কেউ সামনের সারিতে থাকতে চায় না। ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি থেকে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। পেছন থেকে যারা ঠেলছে তারা কথা বলছে কম, কিন্তু একেবারে সামনে রয়েছে যারা ভীষণ চিৎকার করতে লাগল। প্রচণ্ড গর্জন। পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সে আওয়াজ শতগুণ হচ্ছে। বাঘেরা সেই একই জায়গায় রয়েছে।
      এবার হাতির ওপরে দাঁড়িয়ে-থাকা শেয়াল হাসতে হাসতে বলল, ‘ও আমার বাঘ ভাই, তোমরা আমাদের ভয় পেয়ো না, আমাদের দেখে ভয় পাওয়ার কি আছে? আমরা সবাই ভাই ভাই, আমরা সবাই বন্ধু। তাই না? আর তা যদি না হয়, তবে এখন থেকে বন্ধু হতে দোষ কি?
      শেয়ালের কথায় বাঘেরা একটু শান্ত হল। তবু পুরো বিশ্বাস করতে পারছে না। হাতির ওপরে দাঁড়িয়ে-থাকা শেয়ালের ভাবভঙ্গি দেখে তারা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছে।
      শেয়াল আবার শুরু করল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের দুই আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে আদান-প্রদান ভাব-ভালোবাসা শুরু হোক। তোমাদের মধ্যে বিবাহযোগ্যা অনেক মেয়ে আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের ছেলেদের বিয়ে-থাওয়া হোক। প্রথমে একজনকে দিয়েই না-হয় শুরু হোক। আমিই প্রথম বিয়ের চলন শুরু করি। কি রাজি তো?
      বাঘেরা বুঝল, এ প্রস্তাবে রাজি না হলে সর্বনাশ, যাক, অল্পের ওপর দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তারা রাজি হল। প্রাণ তো কারও গেল না। সেই ভালো।
      সেই মুহুর্তে এক বাঘিনীর সঙ্গে সেই শেয়ালের বিয়ে হয়ে গেল। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মীয়তা গড়ে উঠল। তারা বন্ধু হল। বাঘের দল পাহাড়ের ওপরের জঙ্গলে চলে এল, শেয়ালের দল নেমে এল পাহাড়ের নীচের জঙ্গলে। শেয়াল নতুন বউকে নিয়ে এক পাহাড়ি গুহায় সংসার পাতল।
      একদিন শেয়াল আর বাঘিনীর খুব খিদে পেয়েছে। ঘরে কিছুই নেই। বাঘিনী বলল, শিকার করা দরকার। চলো, শিকারে যাই । শেয়াল চুপ করে রইল, আপত্তি করল না। দুজনে চলল শিকারে।
      কোথায় বাঘিনী আর কোথায় ক্ষুদে শেয়াল! বনের পথে এক জায়গায় গিয়ে বাঘিনী বলল,"তুমি এই সরু পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাক। আমি ওধার থেকে পশুদের তাড়িয়ে আনছি। এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপরে। শেয়াল রাজি হল।
      একটু পরেই শেয়াল দেখতে পেল, ঘন জঙ্গলের পথ দিয়ে কয়েকটা বড় হরিণ ও পথেই প্রাণভয়ে ছুটে আসছে। এত বড় বড় হরিণ? কি লম্বা ছুঁচলো শিং? বুক কাঁপতে লাগল। শেয়ালের সাহসই হল না, ভয় পেয়ে গেল। কেমন করে সে ঝাঁপিয়ে পড়বে? যদি তার পেট ফেঁসে যায় কিংবা চোখে ঢুকে যায় ছুঁচলো শিং? সে দাঁড়িয়ে রইল। হরিণগুলো বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
      বাঘিনী আসছে আনন্দে। লম্বা জিভে মুখ চাটছে। এল বাঘিনী। অবাক হল সে। একটা হরিণও মরে পড়ে নেই। শেয়াল একা দাঁড়িয়ে আছে। কেন? কি হল? শিকার কই?
      শেয়াল ভীষণ রেগে গিয়েছে। রাগে সে কাঁপছে। বাঘিনীর কানের ওপরে প্রচণ্ড এক থাবার চড় মেরে শেয়াল বলল, “আর কোনদিন যেন এরকম করতে না দেখি। ছিঃ ছিঃ। জন্তুদের ভয় পাইয়ে শিকার করা? এ শিকার কি আমায় সাজে? বেচারা হরিণগুলো ! শিকার করতে হবে বীরের মতো। মনে থাকবে তো ?
       কি আর করে বাঘিনী ! হাজার হলেও সে স্বামী। বউ হয়ে তার কথার জবাব দেবে কেমন করে? সে খুব ভালো বউ। চড় খেয়েও টু শব্দটি করল না। স্বামীকে মেনে চলাই যে বউয়ের ধর্ম। বাঘিনী সব সহ্য করল।
      তখন তারা গেল একটু দূরে। সেখানে আনমনা হয়ে অনেক হরিণ ঘাস, গাছের পাতা খাচ্ছে। অনেক অনেক হরিণ। শেয়াল ঝোপে লুকিয়ে রইল। পাশে এসেছে নেহাৎ একটা ছোট্ট বাচ্চা হরিণ। তার গলায় দাঁত বসিয়ে দিল শেয়াল। সে বোধহয় তেমন পালাতে শেখেনি। বাঘিনী দেখল। এতটুকু বাচ্চা হরিণ? এতে কি খিদে মিটবে? এ কি? এত বড় বড় হরিণ ছিল। এখন তো তারা পালিয়েছে। কেন? কি হল? বড় শিকার কেন সে মারল না?
      শেয়াল রেগে গিয়ে বাঘিনীকে আর এক কানের গোড়ায় থাবার চড় বসাল। হাজার হলেও স্বামী তো ! বাঘিনী এ অপমান সহ্য করল। সে বড় ভালো বউ।
      তৃতীয় বার। তারা দুজনে গিয়েছে শিকার করতে। বনের মধ্যে এক ফাঁকা জায়গায় অনেক বুনো মোষ ঘাস খাচ্ছে। বাঘিনীর জিভে জল এল। সে স্বামীকে বলল, এবার তাহলে বুনো মোষ শিকার করুক শেয়াল। শেয়ালের বুকের মধ্যে বর্ষাকালের আকাশের মতো আওয়াজ হতে লাগল। কি বিশাল কালো দেহ, কি ভয়াবহ চোখের চাহনি, কি মারাত্মক মাথার ওপরের দুটো শিং, কি বড় পায়ের খুর। শেয়াল এদিক-ওদিক চাইল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাঘিনী অশান্ত হয়ে উঠল। কি হল কে জানে! হাজার হলেও বাঘিনী তো! দেহটা লম্বা করে গলাটা বাড়িয়ে বিদ্যুতের বেগে ছুটে গেল বাঘিনী। মোষের পাল পালাচ্ছে, বুনো মোষের পাল। এক লাফে একটার পিঠে উঠল বাঘিনী। অল্প দূরে গিয়েই মোষটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। পিঠের ওপরে বাঘিনী। মোষের গলা লম্বা হয়ে গেল, ছটফট করছে সে, মাটিতে রক্ত বয়ে যাচ্ছে। বাঘিনী ফিরে তাকাল স্বামীর দিকে, দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে শেয়াল।
      এবার শেয়াল ছুটে এল বাঘিনীর কাছে। চোখে আগুন, পোড়ানো কাঠ-কয়লার মতো লাল। শেয়াল ছুটে এসেই বাঘিনীর পেছনে মারল এক লাথি। রক্ত উঠে এল বাঘিনীর মাথায়। কিন্তু হাজার হলেও সে স্বামী। মাথা নিচু করে বাঘিনী শাস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চেয়ে রইল শেয়ালের দিকে।
      শেয়াল মরা বুনো মোষের দিকে চোখ ফিরিয়ে বসল, এটা কি ধরনের শিকার করা? এক আঘাতে কখনও শিকারকে মেরে ফেলতে হয়? লাফিয়ে পড়লাম পিঠে, দাঁত বসালাম গলার নীচে,—ব্যাস শিকার শেষ। শিকারকে খেলাতে হবে। সে এগিয়ে যাবে, ছোট করে দাঁত বসাবে। শিকার দূরে দাঁড়াবে, ভয় পাবে, একটু তেড়ে আসবে। আবার পালাবে। আবার ছোট্ট করে আঘাত। খেলাতে খেলাতে তাকে ক্লান্ত করে তুলতে হবে। এই তো বীরের মতো শিকার। আমি তাই ভাবছি—আর তুমি ছুটে গেলে? স্বামীকে অমান্য? খবরদার। আর যেন না দেখি।
      বাঘিনী বড় ভালো বউ। সে নিজের ভুল বুঝল। আর হবে না কখনও । শেয়ালের রাগ পড়ল।
      আর একবার তারা দুজনে গিয়েছে একটা পাহাড়ি নদীর পাশে। নদীটা পার হতে হবে। বাঘিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে। দেহ জলের তলায়, মাথাটা জলের ওপরে। সহজেই পার হয়ে গেল সে। শেয়াল জলে নামল না। কি স্রোত ! সে ভয় পেল। বাঘিনী তখন পারে উঠে পড়েছে। ওপাশ থেকে চিৎকার করে শেয়াল বউকে ডাকল। বাঘিনী এ পারে আসুক, তারপরে স্বামীকে নিয়ে নদীর ওপারে যাক। বাঘিনী তক্ষুনি জলে নেমে পড়ল। পাহাড়ি নদীতে স্রোত ঠেলে এপারে উঠল। পারে দাঁড়িয়ে রয়েছে শেয়াল। পারে উঠে আসামাত্র শেয়াল বাঘিনীকে একটা লাথি মেরে বলল, “আমি তখনও তোমাকে অনুমতি দিই নি, আমার অনুমতি ছাড়াই তুমি নেমে পড়লে? এতবড় স্পর্ধা? স্বামীকে অমান্য করা? আর যেন কখনও না দেখি ।
      হাজার হলেও বাঘিনীর স্বামী! সে তো বড় ভালো বউ। লাথি খেয়েও চুপ করে গেল। অন্যায় হয়ে গিয়েছে। আর হবে না। শেয়াল খুশি হল। এরকম বউ না হলে কি সংসার চলে?
      আর একবার। আর একটা পাহাড়ি নদী পেরোতে হবে। বাঘিনী আর শেয়াল পারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জলে নামল শেয়াল। জলে নামল বাঘিনী। জলের ওপর মাথা তুলে বাঘিনী সোজা সাঁতার দিয়ে চলেছে। স্রোতের মধ্যে চলেছে বাঘিনী, সে অনায়াসে এগিয়ে যাচ্ছে। শেয়াল জলে নেমেই বুঝল মস্ত ভুল করেছে। একে পাহাড়ি নদী, তার ওপরে কিছুক্ষণ আগে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। জলের গতি প্রচণ্ড। শেয়াল যত দেহকে সোজা রাখতে চাইল, শ্ৰোত তত বেঁকিয়ে দিচ্ছে দেহকে। একটু পরেই শেয়াল বুঝল সোজাসুজি নদী পার হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সে কি ডুবে মরবে? দু-একবার চেষ্টা করতে গিয়ে জল খেল, নাকে জল ঢুকল। কিন্তু সে তো হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। সে দেহ এলিয়ে দিল। কোন চেষ্টা করল না। শেয়ালের দেহ স্রোতের টানে ভেসে চলল। গা ছেড়ে দিয়েছে শেয়াল। এমনি করেই যাওয়া যাক।
      বাঘিনী সোজা পার হয়ে গিয়েছে, সোজা পার হয়ে গিয়েছে পাহাড়ি নদী। পারে এসে তাকিয়ে দেখে, নীচের দিকে ভেসে চলেছে তার স্বামী। নদীর তীর বেয়ে ছোট ছোট পাথরের ওপর দিয়ে নীচের দিকে হাটতে লাগল বাঘিনী। ওই দিকে চলেছে শেয়াল ।
      অনেক নীচে গিয়ে শেয়াল তীরে উঠল। হাঁপিয়ে গিয়েছে সে। শুয়ে পড়ে বিশ্রাম নিতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাঘিনী এল শেয়ালের কাছে। তাকে দেখেই শেয়াল চিৎকার করে উঠল, তাকে প্রচণ্ড বকুনি দিতে লাগল। বাঘিনী তার বউ, তার পেছনে পেছনে সে আসবে, না একা একা পার হল? এ কি বউয়ের মতো কাজ? বড্ড বেড়ে গিয়েছে বউ। শেয়াল এগিয়ে গেল বাঘিনীর দিকে। কি হল কে জানে ! হাজার হলেও বাঘিনী তো? একটা থাবা এসে পড়ল শেয়ালের মুখে। দূরে ছিটকে পড়ল শেয়াল। ঠিক যেন একটা পাথর। পাথরটা ওখানে পড়ল,—নড়ল না, এপাশ ওপাশ গড়াল না, পড়েই থেমে গেল। শেয়াল লম্বা হয়ে পড়ে রইল। নিথর, এক খণ্ড নরম তুলতুলে পাথর।
      বাঘিনী শেয়ালের বউ। কিন্তু অনেক সয়েছে সে। হাজার হলেও বাঘিনী তো !
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য