গল্প এল কোথা থেকে - আদিবাসী লোককথা

     ইঁদুর সব জাযগায় ঘুরে বেড়ায়। সর্দারের শক্ত বাড়ির আনাচে-কানাচে থেকে গরিব মানুষের রান্নাঘর, সব জায়গায় ইঁদুর ঘুরে বেড়ায়। রাতের অন্ধকার, চারিদিকে নিঝুম, শুধু দূরে শেয়ালের ডাক আর বাতাসের শনশন আওয়াজ। কেউ জেগে নেই। শুধু গোলগোল জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে ইঁদুর ঘুরে বেড়ায়। এমন কোন গোপন জায়গা নেই যেখানে ইঁদুর যায় না, এমন কোন দুর্গম দুর্ভেদ্য জায়গা নেই যেখানে তার নরম ছোট্ট শরীর নিয়ে ঘোরাফেরা করতে পারে না। সব গোপন খবর সে শোনে। অনেক লুকোনো জিনিস সে দেখে।
     এ তো সেই অনেক কাল আগের কথা। সেই পুরনো কালে ইঁদুর একটা গল্পের সন্তান তৈরি করল। বরং বলা ভালো, গল্পের সন্তান বুনল, যেমন করে তাঁতে পরনের কাপড় বোনা হয়। সে তো অনেক কিছু দেখেছে। তাই গল্পের সন্তান বুনে তুলতে তার বেশি কষ্ট হল না। এইসব দেখা-শোনা-জানা গল্পকে সে এক এক রকম পোশাক পরিয়ে দিল। তাদের পোশাকের বিচিত্র সব রং। কোনটার লাল, কোনটার নীল, আবার কোনটার কালো। এই গল্পগুলোই হল ইঁদুরের ছেলেমেয়ে। সবসময় তারা অন্ধকার ঘরেই থাকত, ইঁদুরের সব কাজকর্ম করত। ইঁদুরের নিজের তো কোন ছেলেপিলে ছিল না, তাই এই গল্প ছেলেমেয়েরাই তার নিজের হয়ে উঠল।
     সেই পুরনো কালে দূরের এক গায়ে থাকত এক ভেড়া আর এক চিতা। অনেক দিন পরে ভেড়ার হল একটা মেয়ে আর চিতার হল একটা ছেলে।
     এমন সময় সেই এলাকায় দেখা দিল প্রচণ্ড খরা। এক ফোটা বৃষ্টি নেই, জমিজিরেত পুড়ে খাক হয়ে গেল। দেখা দিল ভীষণ দুর্ভিক্ষ। কোথাও খাবার মতো কিছুই নেই।
     একদিন চিতা ভেড়ার কাছে গিয়ে বলল, “বন্ধু, আর তো পারা যায় না! এসো, আমাদের ছেলেমেয়ে দুটোকে মেরে ফেলি, আমাদের খিদে মেটাই।
     ভেড়া মনে মনে ভাবল, এখন যদি চিতার কথায় সায় না দি, তাহলে হয়তো জোর করেই সে আমার মেয়েকে মেরে ফেলবে। আমিও কি বাদ যাব?
     একটু ভেবে ভেড়া বলল, “বেশ তাই হবে। 
     চিতা চলে যেতেই ভেড়া তাড়াতাড়ি তার বাড়িতে ঢুকল। খুব নির্জন গোপন জায়গায় তার মেয়েকে লুকিয়ে রাখল। তারপরে, তার ঘরে যা কিছু জিনিসপত্র ছিল, সব কিছু নিয়ে এক প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করে দিল। এসবের বিনিময়ে প্রতিবেশী তাকে কিছুটা শুকনো মাংস দিল। সেই শুকনো মাংস খুব ভালোভাবে রান্না করল।
     শেষকালে গেল চিতার গুহায়। দুজনে এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করল। এধারে চিতা তো তার ছেলেকে মেরে তার মাংস রান্না করেই রেখেছিল। তারা সব খেল।
     এক বছর পরে আবার ভেড়া আর চিতার একটা করে বাচ্চা হল। এবারেও �তেমনি খরা, তেমনি দুর্ভিক্ষ। সবাই খিদের জ্বালায় ছটফট করছে। কোন পথ নেই বাঁচবার।
     একদিন চিতা এল ভেড়ার কাছে। বলল, “বন্ধু, আর তো পারি না। এবারেও ছেলেগুলোকে মেরে খিদে মেটাই। ভেড়া ভয়ে রাজি হল।
     কিন্তু এবারও সে আগের বারের মতো পরের বাচ্চাটাকেও নির্জন গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখল। দুই বাচ্চা একসঙ্গে রইল। বাচ্চাকে তো বাঁচাল, কিন্তু এখন করে কি? ঘরে যে বিক্রি করার মতো আর কিছুই বাকি নেই। ভেড়া ভিক্ষে করতে বেরুল। ঘুরছে ঘুরছে—কিন্তু কে দেবে ভিক্ষে। মাথার ওপরে প্রখর তাপ, মাটি আগুন ছড়াচ্ছে, কাছে দূরে রোদ্দুর জ্বলছে। তবু ভেড়া বিশ্রাম নিচ্ছে না। শেষকালে একজন তাকে কিছু শুকনো মাংস ভিক্ষে দিল। দৌড়ে এসে রান্না করল সেই মাংস। আগের বারের মতো চলল চিতার গুহায়। দেহ আর চলে না, তবু যেতেই হবে।
     এমনি করে সুখে-দুঃখে কয়েক বছর কেটে গেল। একদিন চিতা এল ভেড়ার কাছে। তাকে দেখেই ভেড়ার মুখ শুকিয়ে গেল, পা-চারটে কাঁপতে লাগল। চিতা হাসিমুখে বলল, ‘বন্ধু, আমার গুহায় আজ তোমার নেমস্তন্ন। সাঁঝের বেলায় আসবে কিন্তু।
     ভেড়া গুহায় গেল। দেখল, কাঠের টেবিলের ওপরে বিরাট শুকনো লাউয়ের এক পাত্র। ঢাকনা খুলতেই চোখে পড়ল, পাত্র-ভরা সুগন্ধি খাবার। আর পাশে রয়েছে তিনটে চামচ।
     ধারালো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে চিতা ভেতরের কপাট খুলে ফেলল। ডাকল, ছোট্ট মেয়ে আমার, বেরিয়ে এসো। এসো, একসঙ্গে খাই ।
     চিতার মেয়ে বেরিয়ে এল। সবাই একসঙ্গে খেতে বসল। খেতে খেতে মা চিতা বলল, ‘সেবার তো ভীষণ দুর্ভিক্ষ। খিদের জ্বালায় আমার প্রথম বাচ্চাটাকে মেরে ফেললাম। কতই না কষ্ট ! কতই না কষ্ট ! কিন্তু একদিন জানতে পারলাম, তুমি তোমার মেয়েকে মেরে ফেলনি, বাঁচিয়ে রেখেছ, লুকিয়ে রেখেছ। আমিও ভাবলাম, পরের বারে আমিও চালাকি করব। তাই, আমার এই মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম! আর ভুল করি নি। চিতা হাসতে লাগল।
     এমনি করে দিন যায়। সুখেই কাটে দিন। ভেড়ার মেয়েদুটো বেশ বড় হয়ে উঠেছে। বেশ মোটাসোটা তারা।
     একদিন চিতা এল ভেড়ার কাছে। চিতা বলল, “আমার মেয়ে বড় একা একা থাকে, তোমার একটা মেয়েকে পাঠিয়ে দাও আমার গুহায়। দুজনে মিলেমিশে আমোদে থাকবে।
     ভেড়া রাজি হল। রাজি না হয়ে উপায় কি? চিতা যে সাংঘাতিক হিংস্ৰ ! এখন হয়েছে কি, ভেড়ার দুটো মেয়েই ছিল মিশমিশে কালো, মায়ের মতোই তাদের গায়ের রঙ। ঘরের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য ভেড়ার কয়েকটা ছাগল ছিল। তারা ছিল ভেড়ার ক্রীতদাস। এই ছাগলগুলো ছিল ভেড়ার অনুগত। এই ছাগলগুলো ছিল একবারে ধবধবে সাদা। মেয়েকে চিতার গুহায় পাঠাবার আগে ভেড়া নিজের মেয়ের সারা গায়ে ভালো করে সাদা রং করে দিল। দেহের কোথাও এতটুকু কালো আর রইল না। আর �ক্রীতদাস এক ছাগলকে কালো রঙ করে দিল। তার সারা দেহে আর কোথাও সাদা রং রইল না। তারপরে তাদের দুজনকে একসঙ্গে চিতার গুহায় পাঠিয়ে দিল।
     তিনজনে খেলাধূলা করতে লাগল। রাত হল। অন্ধকারে চুপিচুপি এল চিতা। থাবার এক আঘাতেই হত্যা করল ছাগলকে। সেই মাংস রান্না করে নিজের মেয়েকে খেতে দিল। চিতা ভাবল,—'খুব হয়েছে, ভেড়ার মেয়েকে কেমন করে মেরে ফেললাম। আমার সঙ্গে চালাকি ।
     পরের দিন চিতা আবার গেল ভেড়ার বাড়ি। হাসি হাসি মুখে বলল, “তোমার অন্য মেয়েটাকেও আমার সঙ্গে যেতে দাও। তাহলে আমাদের তিন মেয়েই বেশ আনন্দে থাকবে, খেলাধুলো করবে।
     ভেড়া রাজি হল। কিন্তু যাবার আগে সে মেয়েকে শিখিয়ে দিল গুহায় গিয়ে তাকে কি কি করতে হবে। খুব সাবধানে সব বলল।
     ভেড়ার সেই মেয়ে চিতার গুহায় পৌছল। তিনজনকে একসঙ্গে দেখে চিতা বাইরে কোথায় চলে গেল। চিতা চলে যাওয়ার পরে ভেড়ার দ্বিতীয় মেয়ে চিতার মেয়েকে সরবতের মতো মিষ্টি পানীয় খেতে দিল। বলল, “ আমার মা তোমাকে এই উপহার পাঠিয়েছে। সরবত ছিল খুব মিষ্টি, খেতে অপূর্ব। ঢকটক করে চিতার মেয়ে তা খেয়ে নিল। আসলে সেটা ছিল গাছের রস থেকে তৈরি একরকমের মিষ্টি পানীয়। এটা খেলে ভীষণ ঘুম পায়, চোখ ভারী হয়ে বন্ধ হয়ে আসে। কথা বলতে বলতেই চিতার মেয়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেল। ভেড়ার মেয়েদুটো জেগে রইল।
     তারপর, যখন চিতার মেয়ে ঘুমে একেবারে কাতর তখন দুজনে তাকে ধরে তাদের জন্য তৈরি বিছানায় শুইয়ে দিল। আর চিতার জন্য যে বিছানা তাতে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল।
     রাতের অন্ধকার। গুহার ভেতর আরও অন্ধকার। চোখে কিছুই ঠাহর করা যায় না। চিতা চুপিসারে গুহায় ঢুকল। ভুল করে সে তার মেয়েকে এক আঘাতে মেরে ফেলল। সে তো আর জানে না, ভেড়ার মেয়ের বিছানায় শুয়ে রয়েছে তারই মেয়ে। মনে মনে ভাবল, “ভেড়া চালাকি করে তার মেয়ে দুটোকে বাঁচিয়েছিল, এবার দুটোকেই শেষ করতে পারলাম। আহ কি আনন্দ ।
     পরের দিন কাকভোরে চিতা বনে গেল। কাঠকুটো নিয়ে আসতে। ভেড়ার মেয়ের মাংস বেশ জুত করে রান্না করতে হবে। যেই না চিতা বনের পথে এগিয়ে গেল, অমনি ভেড়ার দুই মেয়ে দৌড় দিল বনের অন্য পথে। একজন চলে গেল তার মায়ের বাড়ি, আর আরেকজন একটু ঘুরপথে চিতার পেছন পেছন গেল। চিতা তখন কাঠকুটাে কুড়োচ্ছে, দূর থেকে চিতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ভেড়ার মেয়ে চিৎকার করে বলল, ‘কেমন চিতা, বেশ হয়েছে। কাল রাতে তুমি আমাকে মারতে চেয়েছিলে। তার বদলে মেরেছ নিজের মেয়েকে। তারও আগে মারতে চেয়েছিলে আমার বোনকে, মেরেছ আমাদের ছাগলকে। কেমন মজা !
     যেই না এ কথা শোনা চিতা লাফ মেরে ভেড়ার মেয়ের পিছু ধাওয়া করল। ভেড়ার মেয়েও তৈরি ছিল, সেও দিল দৌড়। বনের এক জায়গায় এসে ভেড়ার মেয়ে দেখল �অনেকগুলো সরু মেঠো পথ এদিক ওদিক চলে গিয়েছে। কয়েকবার ঘুরপাক খেয়ে একটা পথ বেয়ে ভেড়ার মেয়ে তিরিং বিরিং করে লাফিয়ে লাফিয়ে দূরে চলে গেল। সেখানে এসে চিতা ভাবল, কোনদিকে যাব। তারপরে ভুল পথে উলটাে দিকে দৌড় দিল চিতা। ভাবল, ঠিক পথেই চলেছি।
     অনেক দূর গিয়ে পথে ভেড়ার সঙ্গে দেখা হল এক বুড়ির। বুড়ির কোমরে ঝুলছে জুজু দেবতার মূর্তি। বুড়ি খুব ক্লান্ত, বহু দূর থেকে সে হেঁটে হেঁটে আসছে। দেহ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বুড়ি হাঁটছে।
     ভেড়ার মেয়ে মিষ্টি গলায় বলল, ‘বুড়ি মা, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। দাও, জুজুকে আমি বয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
     বুড়ি তক্ষুনি রাজি। শেষকালে তারা বুড়ির বাড়ি এল। বুড়ি এসেই উঠোনে বসে পড়ল। সে হাঁপাচ্ছে।
     ভেড়ার মেয়ে বলল, “বুড়ি মা, তুমি বরং জিরিয়ে নাও, ততক্ষণে আমি ডোবা থেকে জল আর বাগান থেকে আগুন ধরাবার কাঠকুটো নিয়ে আসি ।
     বুড়ি তো খুব খুশি। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বুড়ি ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পরের দিন অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল বুড়ির। সারা গায়ে তখন তার ব্যথা। ভেড়ার মেয়েকে বলল, “বাছা, থানের ওপরে যে গাছ-গাছড়ার ওষুধ আছে, আমাকে একটু এনে দেবে?
     ভেড়ার মেয়ে বলল, ‘হায় কপাল, তুমি কি ভুলেই গেলে? ওই ওষুধ থেকেই তো কাল রাতে আমার জন্ম হল। আর ওষুধ থাকবে কি করে ?
     বুড়ি গেল বেজায় রেগে। মুখ ঝামটা দিয়ে সে লাফিয়ে উঠল। তাড়া করল ভেড়ার মেয়েকে। বেগতিক দেখে ভেড়ার মেয়েও দৌড় দিল। এলো-মেলো ছুটে চলেছে ভেড়ার মেয়ে। তার ওপরে সে পথ চেনে না। ছুটতে ছুটতে একটা গাছের গুড়িতে এসে সে ধাক্কা খেল। ধাক্কা লেগে গাছের বাকল খসে গেল। আসলে সেটা ছিল সেই ইঁদুরের বাড়ি। বাকলটা ছিল দরজার মতো আটা। অনেক পুরনো হয়েছে দরজা। ভেড়ার মেয়ের ধাক্কা সে সহ্য করবে কেমন করে? আলো এসে ঢুকল সেই গাছের ফোকরে। গল্পের ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
     বাইরে সূর্যের অপরূপ আলো, বনভূমির সবুজ বিস্তার, মাঠের সবুজ ঘাস, গাছের পাতার শনশন। গল্পের ছেলেমেয়ে আলোয় এল, তারা আর কখনও ইঁদুরের গাছের ফোকরে ফিরে গেল না।
     সেদিন থেকে সব গল্প, সব ইতিহাস দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ল। যা ছিল ইঁদুরের একান্ত, তা সবার মাঝে ছড়িয়ে গেল। সেইসব গল্প আর ইতিহাস সেদিন থেকে দুনিয়ার এক দিক থেকে অন্যদিকে মুখে মুখে সবার জানা হয়ে গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য