আকাশের সূর্য আকাশের চন্দ্র - আদিবাসী লোককথা

     ঠাকুমা, তাকিয়ে দেখ চাঁদ কত ওপরে উঠে গেল, তবু তুমি গল্প শুরু করলে না। ঠাকুমা, সূর্য কখন দূর আকাশে মিলিয়ে গেল, তবু তুমি গল্প করলে না ! নাতিপুতিদের অভিযোগ শুনে ঠাকুমা বললেন, ‘বেশ, শুরু করছি। চাঁদ-সূর্যের গল্পই বলছি। নাতিপুতি, তোরা কি ভাবছিস সূর্য চিরকাল ওই দূর আকাশেই ছিল? চাঁদও ছিল আকাশে? তা কিন্তু নয়। ওরা চিরকাল ওখানে ছিল না।
     ‘সেই গল্পই বল তাহলে। ডাগর চোখে চেয়ে রইল তারা। ঠাকুমা শুরু করলেন। অনেক অনেক কাল আগে সূর্য আর জল ছিল দুজনের বন্ধু। দুজনের গলায় গলায় ভাব। দুজনেই তখন থাকত পাশাপাশি এই পৃথিবীতে। ওদের ভাব দেখে অন্য অনেকেই খুব হিংসে করত। কিন্তু মুখে কিছু বলত না। ওদের দুজনের দেহেই যে ভীষণ শক্তি। বন্ধু জলের বাড়িতে সূর্য প্রায়ই বেড়াতে যেত। গল্পগুজব করত। দেখা হলেই দুজনে প্রাণ খুলে মনের কথা বলত। এমনিভাবে অনেক কাল কেটে গেল।
     হঠাৎ একদিন সূর্যের মনে হল,—আচ্ছা, আমি তো নিত্যিনিত্যি বন্ধুর বাড়ি যাই। কিন্তু কই, বন্ধু তো একদিনও আমার বাড়ি এল না। আশ্চর্য এ কথা তো আগে কোনদিন মনে হয়নি। আজকে বন্ধুকে এ কথা বলতে হবে।
     সূর্য সেদিনও বন্ধু জলের বাড়ি গেল। সে অভিযোগ জানাল,—বন্ধু কেন একদিনও তার বাড়িতে গেল না? এটা কি তার উচিত কাজ বলতে হবে।
     জল কিন্তু কিছুই ভাবল না। সে হাসতে হাসতে বলল,— এতে মনে করার কি আছে। দুজনের দেখা হওয়াই আসল কথা, বন্ধুত্ব থাকাটাই আসল। দুজন দুজনকে কত ভালোবাসি, কত সুখ-দুঃখের গল্প করি। তাই না?
     সূর্য কিন্তু মনমরা হয়েই রইল। সে অভিযোগ জানাল—সবই ঠিক। তবু জল যদি তার বাড়িতে একবারও না যায় তাহলে কেমন ভালো লাগছে না।
     একদিন অনেকক্ষণ ধরে পীড়াপীড়ি করবার পর শেষকালে জল আস্তে আস্তে বলল, ‘বন্ধু, তুমি কিছু মনে করো না। আমি সব খুলেই বলছি। আমার কি ইচ্ছে করে না যে আমি তোমার বাড়ি যাই। খুব ইচ্ছে করে । কিন্তু কি করব বল। আমিই যে আমার শত্রু। তুমি রাগ করো না বন্ধু। তোমার বাড়ি যে বড়ই ছোট। আমি যদি আমার লোকজন নিয়ে তোমার বাড়িতে যাই, তাহলে তুমি যে ভেসেই যাবে, তোমাকে যে ঘরছাড়া হতে হবে। বন্ধু, সেটা কি আমি চাইতে পারি? জল চুপ করে মাথা নিচু করে সূর্যের দিকে চেয়ে রইল।
     সূর্য তবু তাকে একই কথা বলতে লাগল। জল ভাবল, বন্ধুর মনে আর আঘাত দেব না। বেশ তার বাড়িতে সে যাবে।
জল তখন ছলছল শব্দ তুলে বলল, “বন্ধু, তুমি কিছু চিত্তা করো না। আমি তোমার বাড়িতে যাব। কিন্তু তার আগে তোমায় একটা কাজ করতে হবে ।
     “কি কাজ? বলেই ফেল। সূর্য খুব খুশি হল। বন্ধুর তাহলে মত হয়েছে। বন্ধুকে সে যা ভেবেছিল তা নয়।
     জল বলল, “আমি তোমার বাড়ি যাব। তার আগে তুমি একটা বিশাল উঠোন তৈরি করো, আর তার চারপাশে অনেক উচু করে বাঁধ দাও। মনে রাখবে উঠোনটা যেন বিশাল আকারের হয়। আমার লোকজন কিন্তু অগুনতি। আর চারপাশের বাঁধও করবে খুব শক্ত করে। আমাদের অনেক অনেক জায়গা লাগে আর দেহের শক্তি বড় কম নয়। কি, এখন খুশি তো?
     সূর্য মহাখুশি। সে রাজি হল জলের কথায়। হ্যাঁ, সূর্য তৈরি করবে বিশাল উঠোন, শক্তিশালী বাঁধ। সে গড়াতে গড়াতে আনন্দে বাড়ি ফিরে গেল। বাড়িতে পৌঁছেই চাঁদকে সুসংবাদ দিল চাঁদও খুশি । চাঁদ তো সূর্যের বউ। সেও মনে মনে খুশি হল। তারপর দরজা বন্ধ করে দুজনে পরামর্শ করতে বসল। ঠিক হল, কাল থেকেই কাজ শরু করতে হবে। বন্ধুকে সে কথা দিয়ে এসেছে। তাই স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই যাতে মুখ থাকে তা তো দুজনকেই দেখতে হবে। দুজনে একমত হল।
     বেশ কিছুদিন সূর্য আর চাঁদ একেবারে সময় পাচ্ছে না। রাতদিন উঠোন আর বাঁধ তৈরির কাজ করছে। নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ। বন্ধুর খাতিরে এসব তারা ভুলেই গিয়েছে। বন্ধু আসবে তাদের বাড়িতে এই আনন্দেই তারা আত্মহারা।
     শেষকালে একদিন উঠোন তৈরি শেষ হল, বাঁধ তৈরি শেষ হল। দুজনে উঠোনের মাঝখানে বসল, চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখল। হ্যাঁ, বন্ধুর উপযুক্ত জায়গাই হয়েছে বটে। অপূর্ব। নিজেরা বেশ খুশি হল। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুম হল সেদিন।
পরের দিন সূর্য চলল জলের বাড়ি। বেশ জোরে জোরে গড়াচ্ছে। মনে ফুর্তি। জলের বাড়ি পৌঁছতেই জলের মহা আনন্দ। বন্ধু অনেকদিন তার বাড়িতে আসেনি। সূর্যের মুখে শুনল—কি করেই বা আসবে? তারা দুজনে মিলে যে উঠোন আর বাঁধ তৈরি করছিল। বন্ধুর যে নেমস্তন্ন ! সব ঠিকঠাক তৈরি হয়ে গিয়েছে। এবার জল চলুক সূর্যের বাড়ি। জলও রাজি।
জল তবুও শেষবারের মতো জানতে চাইল, বন্ধু সূর্য, তুমি কিন্তু কিছু মনে করো না। তুমি খুব বড় উঠোন বানিয়েছে তো, আর খুব শক্তিশালী বাঁধ। বুঝতেই পারছ আমার লোকজন অনেক।
     সূর্য তো নিশ্চিত্ত হয়েই আছে। তাই এবারে জলের কথায় সে মোটেই রাগ করল না। বরং খুশি হয়ে বলল, সব ঠিকঠাক আছে। তোমার কোন ভাবনা নেই। এবার চল।
     সামনে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলল সূর্য। পেছনে চলেছে জল,—আর তার পেছনে আশেপাশে চলেছে নানা জাতের মাছ, কুমির, তিমি, হাঙর, আরও কত জলচর প্রাণী। এগোতে এগোতে তারা এসে পৌঁছল উঠোনের কাছে। নাঃ উঠোন বেশ বড়ই, বাঁধ বেশ মজবুত।
     জল ঢুকে পড়ল উঠোনের মধ্যে। জলে কিলবিল করছে অগুনতি মাছ। দেখতে দেখতে জল হাঁটু পর্যন্ত উঠল। এখন জলে অল্প অল্প ঢেউ।
      জল বলল, “বন্ধু, তোমার বাঁধ বেশ নিরাপদ তো! আসব, না এবার ফিরে যাব? 
    সূর্য মাথা নেড়ে জানাল, ‘কোন ভাবনার কারণ নেই। বড়, খুব মজবুত। আরও জল ঢুকল। জলের আরও ঢেউ, মাছের হুটোপুটি আরও বেশি। জল চিন্তিত হল। জিজ্ঞেস করল, ‘বন্ধু, তুমি কি চাও আমার আরও লোকজন তোমার বাড়িতে ঢুকুক? অনেক বাকি।’
     সূর্য আর তার বউ একসঙ্গে বলে উঠল, “নিশ্চয়ই। কেন ঢুকবে না ? তোমরা যে বন্ধু, তোমরা যে অতিথি।
   এবার প্রবল গতিতে জল ঢুকতে শুরু করল, তিরতিরিয়ে ঢুকে পড়ল অসংখ্য নাম না-জানা মাছ, আগে না-দেখা অসংখ্য জলের প্রাণী। এবার ঢেউ উত্তাল হল, শব্দ প্রবল হল।
     এই অবস্থা দেখে সূর্য ও চাঁদ বাঁধের ওপের উঠে বসল। নীচে দাঁড়ানো অসম্ভব, জল থৈ থৈ করছে। জল সব বুঝতে পারল। সে ভাবল—আর নয়। এবার বন্ধু বিপদে পড়বে। কিন্তু সে তো বন্ধুকে বিপদে ফেলতে চায় না।
     তাই জল বলল, বন্ধু, তোমার বাড়িতে তো এলাম। এবার যাই। কি বল? আমার আরও লোকজন আছে, তা থাক। কিন্তু এবার বোধহয় ফেরা উচিত।
     সূর্য ব্যথা পেল। বলল, সে কি? বন্ধু তোমার আর লোকজন বাইরে থাকবে। সে কি হয়? না, না। তোমায় আসতেই হবে।
     কি আর করে জল। ঢুকছে, সঙ্গে তার লোকজন। দেখতে দেখতে জল বাঁধের মাথায় পৌছল। মাথা ছাড়িয়ে উপচে পড়ল চারিদিকে। এখন আর বাঁধকে দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকেই জল, আর জল। আসছে, জল বাড়ছে, জলের প্রাণীরা আসছেই আসছেই, জল আরও বাড়ছে –ছড়িয়ে পড়ছে এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে সেদিক ।
     সূর্য আর কি করে। চাঁদ আর কি করে ! কোথাও যে দাঁড়াবার ঠাই নেই। এ কি হল? সব জায়গায় জল থই থই করছে। শেষকালে, সূর্য চাঁদ আকাশে উঠে গেল। সেখানেই তারা রইল। আর কোনদিন পৃথিবীতে নেমে এল না। তবু পৃথিবীকে ভুলতে পারে না। কতদিন ছিল এই পৃথিবীতে ! তাই আজও বারবার প্রতিদিন প্রতিরাত তারা পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। দিনে ঘোরে সূর্য, রাতে ঘোরে চন্দ্র।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য