জাদু আয়নাও সুন্দরী মেয়ে -২ - আদিবাসী লোককথা

     প্রাসাদে মা দিন কাটায়। বেশ আনন্দে-ফুর্তিতে। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার কেন যেন সন্দেহ হল, মনটা কেমন করে উঠল। যদি মেয়ে বেঁচে থাকে। সৈন্যরা কি সত্যিই তাকে মেরে ফেলেছে? যদি না মেরে থাকে? তবে? তার কথা হয়তো সৈন্যরা রাখেনি। তাহলে? মেয়ে তবে বেঁচে আছে? সন্দেহ হল কেন? মন এমন করছে কেন? তাহলে নিশ্চয়ই মেয়ে মরেনি, ঠিক বেঁচে আছে। কি করবে মা তা ভেবে নিল। মায়ের এক দাসী ছিল। সে খুব বিশ্বাসী। সেই ছেলেবেলা থেকে তার কাছে আছে। এখন সে বুড়ি। কিন্তু তাকে না হলে মায়ের চলে না। নিজের ঘরে ডেকে এনে মা সেদিন তাকে সব খুলে বলল। সন্দেহের কথা জানাল। এখন কি করতে হবে তাও মা বলে দিল।
     মা চুপচুপ করে বলল, ‘বুড়িমা, তুমি এক কাজ করো। তুমিই পারবে। নানা গাঁয়ে তুমি খোজ করো। যেখানে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে তুমি দেখবে, বুঝবে সেই আমার মেয়ে। তারপরে যেমন করে হোক তাকে তুমি মেরে ফেলবে। আমার জন্য এ কাজ তোমাকে করতেই হবে।
     বুড়ি বলল, ‘ওমা, তুমি বলছ আর এ কাজ আমি করব না ? দেখনা আমি ফিরে এলাম বলে। এই কথা বলে বুড়ি রওনা দিল।
     ঘুরতে ঘুরতে বুড়ি এল ডাকাতদের বাড়িতে। কাউকে সে দেখতে পেল না। ঘরে ঢুকল। ঢুকেই দেখে অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ঘরের কাজ করছে। দেখেই বুঝতে পারল—এ মেয়ে কে! এই মেয়েকেই তো সে খুঁজছে। যাক, তাহলে সব কাজই ঠিকঠাক করা যাবে। বুড়িকে দেখেই মেয়ের খুব আনন্দ হল। তাকে আদর করে বসতে দিল। খেতে দিল। বুড়ি তখন বলল, ‘মেয়ে, কি সুন্দরী তুমি! এমন রূপ আগে দেখিনি। তা তুমি কে? তোমার বাড়ি কোথায়? তোমার মায়ের নাম কি? মেয়ে কিছুই সন্দেহ করল না। সব খুলে বলল। বুড়ি ঠোঁটের ফাঁকে হাসতে লাগল।
      বুড়ি বলল, ‘আহা, তোমাকে দেখাশোনার কেউ নেই। এমন রূপ, অথচ চুলগুলো কি এলোমেলো। দাও, ভালোভাবে চুল বেঁধে দি। কাছে এসো। মেয়ে রাজি হল। কেউ তো কোনদিন এমন করে আদর করেনি। পেছন ফিরে সে বুড়ির সামনে বসে পড়ল। বুড়ি আদর করে তার চুল আঁচড়িয়ে বেঁধে দিতে লাগল। বুড়ি তার পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল একটা লম্বা ধারালো কাটা। চুল বাঁধা শেষ হয়ে এসেছে, বুড়ি হঠাৎ মেয়ের ঘন চুলের মধ্যে কাটা ঢুকিয়ে দিল। ধারালো কাটা মাথায় ঢুকে গেল। ঢলে পড়ল মেয়ে। নিথর হয়ে গেল তার দেহ। মনে হল সে সত্যি মরে গিয়েছে। নিস্তেজ দেহটার দিকে তাকিয়ে বুড়ি হাসতে হাসতে বলল, যাক। ঠিকঠাক কাজ হয়েছে, কথা রেখেছি। দেহ সেখানেই পড়ে রইল, বুড়ি রওনা দিল বাড়ির পথে। বুড়ির কাছে সব কথা শুনে মা নিশ্চিন্ত হল। বুড়িমা তো আর তাকে ঠকাবে না। যাক আপদ বিদায় হল।
     ডাকতরা ফিরে এসে দেখে তাদের আদরের বোন কাটা গাছের মতো পড়ে রয়েছে। তাদের চোখ ছলছল করে উঠল। এ কি হল? কেন এমন হল? তারা খুব যত্নে দেহটি পরীক্ষা করল, কোন আঘাতের চিহ্নই দেখতে পেল না। বোন মরে গিয়েছে, কিন্তু দেহ তো এখনও শক্ত কাঠ হয়ে যায়নি। কেমন যেন নিস্তেজ ভাব। বোনের কপালে আর গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখটা ফুলের মতো তাজা আর সুন্দর। তারা বলল, “আমরা এমন সুন্দর মুখের বোনকে মাটিতে পুততে পারব না। কিছুতেই না। তাই তারা সকলে মিলে একটা সুন্দর শবাধার তৈরি করল। শবাধারের ওপরে সোনা-হীরে-মুক্তো দিয়ে সাজাল আর তাদের যত সোনার গহনা ছিল সব পরিয়ে দিল আদরের বোনের দেহে। শবাধারের ঢাকনা কাঁটা দিয়ে আটকাল না, আলগোছে ঢাকনা বন্ধ করল। আর হাওয়া-বাতাস ঢোকবার জন্য কয়েকটা ফুটো রাখল। বোনের দেহ যাতে পচে না যায় তাই শবাধার বাইরে আলো হাওয়ায় রেখে দিল। বুনো জন্তুরা যাতে বোনকে স্পর্শ না করতে পারে তাই বুনো লতার সঙ্গে বেঁধে তাকে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখল। লতাটা ঢিলে করলেই শবাধার নেমে আসবে। সব কাজ শেষ করে তারা চুপ করে গাছের নীচে বসে রইল। গাল-বুক ভিজে যাচ্ছে, আজ তাদের বোন আর বেঁচে নেই। দিন দশেক তারা বাড়িতেই রইল, কাজে গেল না।
     তারপরে কাজে যেতে হল। প্রতিদিন যাওয়ার সময় ও বাড়ি ফিরবার পরে তারা শবাধারটাকে নামাত আর বোনকে দেখত। সদ্য-ফোটা ফুলের মতো সতেজ রয়েছে তাদের বোনের মুখ। জীবন্ত মুখ। ঘুমিয়ে রয়েছে আদরের বোন। এমনি করে দিন কাটে। এখন হয়েছে কি, একদিন ডাকাতরা সকালে কাজে বেরিয়ে গিয়েছে। এমন সময় সেখানে এল একজন লোক। সে গাঁয়ের কথক। নানা জায়গায় সে গল্প শুনিয়ে বেড়ায়। তার ঝুলিতে অনেক অনেক গল্প। তার নাম এসেরেনগিলা। আর তার মনিবের নাম ওগুলা। ডাকাতদের ডেরায় এসে কথক কাউকে দেখতে পেল না। এধার-ওধার তাকাতেই তার চোখে পড়ল সোনালি শবাধারটি। এমন সুন্দর আধার সে আগে দেখেনি। কত জায়গায় সে ঘুরে বেড়ায়। এসেরেনগিলা ছুটে গেল মনিবের কাছে। বলল, এক্ষুনি চলো আমার সঙ্গে। এমন জিনিস আগে দেখিনি। কেউ নেই সেখানে। ওটাকে নিয়ে আসতেই হবে। কথক উত্তেজনায় হাফাচ্ছে। ওগুলাও অবাক হল।
      দুজনে সেখানে গেল। লতা ঢ়িল করে কথক শবাধারটি নামাল। কেউ নেই, তবু এসে পড়ে যদি। তাড়াতাড়ি করে দুজনে মাথায় তুলে শবাধার নিয়ে চলল। তারা জানেও না। ভেতরে কি রয়েছে। শেষকালে ওগুলার বাড়ি পৌঁছে গেল। একটা ছোট ঘরে শবাধারটিকে রেখে দিল।
     কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন ওগুলা ভাবল, আজ দেখব ওর মধ্যে কি আছে। ঢাকনা তো কাঁটা দিয়ে আটকানো ছিল না, আলগা করে বন্ধ ছিল। ঢাকনা খুলতেই ওগুলা অবাক হয়ে গেল। একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। কিন্তু মনে হচ্ছে সে বেঁচে নেই। কিন্তু মৃতদেহের গা থেকে যেরকম গন্ধ বের হয় তা তো হচ্ছে না? মানুষ মারা গেলে যেরকম দেখতে হয়, সেরকমও তো মনে হচ্ছে না। কোন রোগে মারা গিয়েছে বলেও তো মনে হচ্ছে না। তবে? সে ভালোভাবে মেয়ের দেহ পরীক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কিছুই পেল না। কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু আপনমনে বলল, এমন ফুটফুটে মেয়ে। কিসে তার মৃত্যু হল? আশ্চর্য।
     ওগুলা ঢাকনা বন্ধ করল। ভালোভাবে দরজা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু থাকতে পারল না। আবার ঘরে ঢুকল। আবার ঢাকনা খুলে দেখল। মনে মনে বলল, “বোধহয় এ মরেনি। আহা। যদি বেঁচে থাকে। আমার মেয়েরও তো এইরকমই বয়েস। আহা। বেঁচে থাকলে দুজনে কেমন ভাব হত, একসঙ্গে খেলত। দরজা বন্ধ করে আবার সে বাইরে এল। নিজের মেয়েকে বলল, ও ঘরে যেও না কিন্তু। কক্ষনো যেও না। মেয়ে বলল, “আচ্ছা। প্রতিদিন বহুবার করে ওগুলা ঘরে যায় ঢাকনা খোলে, মৃত মেয়েকে দেখে।
     অনেক দিন কেটে গেল। ওগুলার মেয়ের কেমন কৌতুহল হয়। তাকে ঢুকতে দেয় না, অথচ, বাবা বারবার ঢোকে। তারও ইচ্ছে হয়, দেখি না কি আছে ও ঘরে।
     একদিন ওগুলা বাইরে গিয়েছে। মেয়ে বলল, “খালি খালি বারণ করা। কেন ও ঘরে ঢুকব না? ঢুকলে কি হয় ? আজ দেখব ও ঘরে কি আছে। ঘরে ঢুকেই ওগুলার মেয়ে অবাক হয়ে গেল, কি সুন্দর একটা কাঠের আধার। দেখি না ভেতরে কি আছে! কি হয় দেখলে?
     ওগুলার মেয়ে আস্তে আস্তে ঢাকনা তুলে ধরল। একটি মেযের মাথা দেখা যাচ্ছে, মাথায় ভর্তি কালো চুল আর সোনার গয়না। পুরো ঢাকনাটি খুলে ফেলল। একটি সুন্দর মেয়ে শুয়ে রয়েছে। তারই বয়সি কি সুন্দর মেয়ে। এত গয়না গায়ে। কি সুন্দর মুখ আর মাথার চুল। সে বুঝতে পারল না, মেয়েটি কেন এর মধ্যে এভাবে ঘুমিয়ে আছে। আপনমনে বলল, "আহা! ও যদি কথা বলত। কেমন বন্ধু হতাম আমরা। কত গল্প করতাম। ও যদি কথা বলত। মুখের কাছে মুখ এনে সে ডাকল, "এমবোলো ! এমবোলো ! যেমন করে অপরিচিত কাউকে তারা ডাকে। কোন সাড়া পাওয়া গেল না। আবার ডাকল। জলভরা চোখে বলল, ‘এমন করে ডাকছি, তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন? এমবোলো। এমবোলো। ঢাকনা বন্ধ করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
     ওগুলা ফিরে এল। এমন করে দরজা বন্ধ কেন? মেয়েকে বলল, “তুমি কি ওই ঘরে ঢুকেছিলে? মেয়ে বলল, না তো। তুমি তো আমায় ঢুকতে দাও না। আমি তো যাইনি।
      পরের দিন ওগুলা কাজে বেরিয়ে গেল। মেয়েও ঢুকল ওই ঘরে। না ঢুকে থাকতে পারছে না। ঘরে ঢুকে ঢাকনা খুলে ফেলল। ডাকল, "এমবোলো, এমবোলো! কোন সাড়া নেই। মেয়ে ঘুমিয়েই আছে। ‘আমি তোমাকে বার বার ডাকছি। তুমি কোন সাড়া দিচ্ছ না। তোমার সাথে খেলতে ইচ্ছে করছে। তোমার চুলগুলো ঠিক করে দেব? মাথায় আদর করব? তোমার চুলের উকুন বেছে দেব? তবু সাড়া নেই। ওগুলার মেয়ে ঘুমিয়ে-থাকা মেয়ের মাথায় হাত দিল। আঙুল ঢুকিয়ে দিল ঘন চুলের মধ্যে। কি যেন শক্ত মতো হাতে ঠেকল? কোন গয়না বুঝি? চুল ফাঁক করে মেয়ে দেখল একটা লম্বা ধারালো কাটা মাথায় ফোটানো রয়েছে। "ইস ওর মাথায় কাটা বাঁধা? আমি ওটাকে তুলতে চেষ্টা করি। আহা! ওর যেন না লাগে। কাঁটাটা টেনে বের করতেই ঘুমন্ত মেয়ে বেঁচে উঠল একবার, চোখ খুলল, বড় বড় চোখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল, চারিদিকে দেখল। আস্তে আস্তে আধারের মধ্যে উঠে বসল। মিষ্টি গলায় বলল, ‘ওঃ ! কতদিন যে ঘুমিয়ে ছিলাম।
ওগুলার মেয়ের গলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চোখ ছলছল করছে। সে সামলে নিয়ে বলল, শুধুই ঘুমিয়েছিলে?
     মেয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।
    ওগুলার মেয়ে বলল, "এমবোলো।
    সুন্দরী মেয়ে বলল, “আই এমবোলো ।
    এবার মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমি কোথায়? এটা কোন জায়গা?
    অন্য মেয়ে উত্তর দিল, ‘তুমি আমার বাবার বাড়িতে আছ। কেন ? এটা তো আমার বাবার বাড়ি।
   মেয়ে বলল, কিন্তু আমাকে এখানে কে আনল? কেমন করে শবাধার দেখতে পেল, কীভাবে ওগুলাকে খবর দিল, কীভাবে তারা সোনালি আধার নিয়ে এল। সব বলল তাকে। তক্ষুনি দুজন দুজনকে খুব ভালোবেসে ফেলল। যেন আপন দুই বোন। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল, আদর করল, খেলল, গল্পগুজব করল। অনেকক্ষণ কেটে গেল।
     মেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বলল, “বোন, তুমি আমার মাথায় আবার কাটাটা ঢুকিয়ে দাও, আমি একটু ঘুমিয়ে থাকি। ওগুলার মেয়ে তাই করল। মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঢাকনা বন্ধ করে মেয়ে ফিরে এল। ঘুমিয়ে-থাকা মেয়ে আবার মৃতের মতো নিস্তেজ হয়ে গেল। এখন তার মাথায় যে ধারালো কাটা বেঁধা রয়েছে !
     ওগুলার মেয়ে এখন আর বাইরে অন্য সখীদের সঙ্গে খেলতে যায় না। বাড়ির বাইরে যেতে আর এতটুকু ভালো লাগে না। বন্ধুরা অভিযোগ করে, সে নানা অজুহাত দেখায়। কোনভাবেই তাকে আর তারা পায় না। কেমন করে পাবে? একটি ঘর আর একটি নতুন সাখী তাকে আটকে দিয়েছে। অন্য আর কিছুই তার ভালো লাগে না। যখনই তার বাবা বাইরে যায়, তক্ষুনি সে ঘরে ঢুকে আধারের ঢাকনা খোলে, ঘন চুলের মাঝ থেকে ধারালো কাটা টেনে বের করে। মেয়ে জেগে ওঠে, চোখ মেলে। তারা গল্প করে, খেলা করে, কতই আনন্দ। এমনি করে সুখে দিন কাটে। অনেক দিন একটানা ঘুমিয়ে মেয়ে কাহিল হয়ে গিয়েছিল, রোগ হয়ে গিয়েছিল। এখন বৰু প্রতিদিন খাবার আনে। মেয়ে আর রোগাটে রইল না। আরও সুন্দরী হয়ে উঠল।
      এমনি করে অনেক দিন কেটে গেল। ওগুলা কিছুই জানতে পারল না। কিন্তু একদিন তারা ধরা পড়ে গেল। অনেকক্ষণ গল্প করছে, খেলায় মেতে রয়েছে। সময়ের খেয়াল নেই। বাবার আসার সময়ের কথা ভুলে গিয়েছে। খেলছে তো খেলছেই। গল্প করছে তো করছেই। হঠাৎ বাবা ফিরে এল। দরজা ভেজানো রয়েছে। হাত দিতেই খুলে গেল। ওগুলা অবাক হয়ে দেখল দুটি মেয়ে গল্প করছে, মাথা-হাত নেড়ে শুধুই বকবক করে চলেছে। ওগুলাকে দেখে তো মেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। বাবা কিন্তু তাকে বকুনি দিল না। নরম গলায় বলল, ভয় পাওয়ার কি আছে? তা, তুমি কেমন করে এ মেয়ের জীবন ফিরিয়ে আনলে? এর ঘুম ভাঙালে কেমন করে? তুমি কি করলে বল তো?
     মেয়ে বাবাকে সব খুলে বলল। লম্বা ধারালো কাঁটাটার কথা খুব ভালোভাবে বলল। ওগুলা তখন অপরূপ সুন্দরী মিষ্টি মেয়ের পাশে বসে পড়ল। তার সব কথা জানতে চাইল। মেয়েও মন খুলে সব কিছু বলল। তার জীবনের করুণ কাহিনি।
     কিছুক্ষণ তিনজনেই চুপ করে রইল। তারপর ওগুলা বলল, “আমি এক বিরাট এলাকার সর্দার, আমি গোষ্ঠীপতি। তোমার মা যেখানে থাকে সেটাও আমার এলাকা। মা হয়ে এমন কাজ? রূপের গর্ব এত? আমার এলাকাতে বাস করে মেয়েকে মেরে ফেলার চক্রান্ত? ঠিক আছে, কালকে এসব নিয়ে খোঁজখবর করব। কালকে হবে এলাকার ‘ওজাজা—সবাইকে ডেকে এনে এক সভা হবে। সবাইকে সেখানে থাকতে হবে। তুমিও থাকবে। কেননা, তুমি হবে আমার বউ। বড় আদরের বউ। একথা শুনে সুন্দরী মেয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল।
     সেদিনই চারিদিকে খবর চলে গেল। কাল সকালে হবে এলাকার ‘ওজাজা’। সেই বিরাট জমায়েতে সবাই এল। নিষ্ঠুর মা, সৈন্যরা, বুড়িমা সবাই এল। এল না শুধু সেই কয়জন ডাকাত। তারা এই সভার কোন খবর পায়নি। তারা যে গভীর বনে লুকিয়ে থাকে, তাদের বাড়ির খবর কেই বা রাখে? সবাই যার যার কথা বলল। এখানে তো মন খুলে কথা বলতেই আসা।
     শেষকালে সভায় এল সেই সুন্দরী মিষ্টি মেয়ে। ওগুলার মেয়ের হাত ধরে আস্তে আস্তে সে সভার মাঝে এল। চারিদিক আলো করে।
     যেই না মা সেই মেয়েকে দেখেছে, অমনি লাফিয়ে উঠল সে। রাগে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। পাশে-বসা বুড়িমার চুল ধরে টেনে জিজ্ঞেস করল, “ওই তো আমার মেয়ে। ও-তো বেঁচে আছে। মরেনি। তুমি যে বললে তাকে মেরে ফেলেছ? বুড়িমা খুব অবাক হয়ে গিয়েছে। মরা মেয়ে বেঁচে ফিরল কি করে? সত্যি কি সেই মেয়ে? বলল, “হাঁ, আমি তো তাকে মেরেই ফেলেছিলাম। কিন্তু... ?
     মেয়েটা একটা উঁচু পাথরে বসল। ওগুলা বলল, সবাই এখানে রয়েছে। তোমার জীবনের কথা তুমি বল।
    মেয়ে আরম্ভ করল। তার ছেলেবেলা থেকে শুরু করল। নিঃসঙ্গ জীবনের কথা, মায়ের নিষেধ, তার কৌতুহল, জাদু আয়না, সৈন্যদের কথা, মরে যাওয়ার কথা, বেঁচে ওঠার কথা—আর শেষকালে ওগুলার বাড়ির কথা। সব বলল সে। মাঝে মাঝে সব ঝাপসা হয়ে উঠছে, চোখের জল বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে মেয়ে যখন ডাকাতদের কথা বলছে তখন তার কি কান্না। কোথায় হারিয়ে গেল তারা। আর কি কোনদিন দেখা হবে? মেয়ে থামল। মাথাটা নুয়ে রয়েছে।
     সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। এমন নিষ্ঠুর মা। মেয়েকে মেরে ফেলতে চায়? আর এমন মিষ্টি মেয়েকে? শাস্তি চাই, শাস্তি চাই। প্রতিশোধ চাই। ডাইনি কোথাকার। ওকে পুড়িয়ে মারা উচিত। আর সেই বুড়িটাকেও।
     এইরকম যখন চিৎকার হট্টগোল হচ্ছে তখন মা আর বুড়িমা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। মেয়ে যদি এক্ষুনি তাদের চিনিয়ে দেয়? তাহলে? ডাইনির শাস্তি? ভিড়ের মধ্যে তারা পেছন দিকে চলে গেল। সভা ছেড়ে পালাল। বনের পথ ধরল। আরও গভীর বন। তারপরে দূর এক দেশে চলে গেল। আর কখনও ফিরল না, কোথায় হারিয়ে গেল দুজনে।
     সবার সামনে ওগুলার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হল। সবাই খুশি। গায়ের লোক, ওগুলা, মেয়ে— সবাই। সবার চেয়ে খুশি হল ওগুলার মেয়ে। এমন খেলার সাথী। এখন থেকে তারই কাছে থাকবে।
     আর ডাকাতরা? তারা সেই গভীর বনে নির্জন বাড়িতে থাকে। তারা ‘ওজাজার কথা শোনেনি। সেখানে যায়ওনি। সবই তাদের রয়েছে, শুধু নেই আদরের বোন।
     শবাধারে মেয়ে ছিল, হোক সে ঘুমন্ত, তবুতো বোনকে প্রতিদিন দেখতে পেত। তাও নেই। তারা ডাকাত। আরও কোন বড় ডাকাত তাদের বোনকে বোধহয় ডাকাতি করে নিয়ে গিয়েছে। তারা প্রতিদিন চোখের জল ফেলে। কাজ করে, সব করে তবু বোনকে ভুলতে পারে না। কি হল তাদের বোনের? কোথায় রয়েছে সে? কোন দূর দেশে কোথায় গেল তাদের আদরের বোন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য