রবীন্দ্র জন্মোৎসব ও কুমড়োর চাটনি - পূর্ণেন্দু পত্রী

      সেবারে সত্যি সত্যি বিন্ধ্যপর্বতের মত অটল ছিলাম প্রতিজ্ঞায়। কিন্তু ডোবালো ঐ হাঁদারাম হাবুলটা। ও এমন করে বোঝালে যে জল হয়ে গেলাম। হাবুলটা হাঁদা হোক আর যাই হোক, কথা বলে বেশ গুছিয়ে। বেশ যুক্তিটুক্তি জুড়ে দিতে পারে কথার মধ্যে। ঐ আমাকে বোঝালে—
      শোন, তুই যা ভাবছিস এবারে তা হবে না। এবার আমরা যেটা করছি সেটা অন্য জিনিস। একটা কথা তো সত্যি, নেটুকাকা গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নাম শুনলে, অন্যবারের মত করবে না। তা ছাড়া ধর, ফাংশানে বক্তৃতা দেবার জন্যেও তো নেন্টুকাকাকে দরকার। এমন কি, ভগবান না করুন, আমরা যাঁকে সভাপতি করার কথা ভাবছি, তিনি কোন কারণে পৌছতে না পারলে নেন্টুকাকাকেই তো সভাপতির চেয়ারে বসাতে হবে।
      তখনও আমার পুরো রাগটা জল হয়নি। আমি বললাম— কিন্তু গত বছরের সরস্বতী পুজোর ব্যাপারটা মনে করে দ্যাখ। আমাদের আকাশে উঠিয়ে দিয়ে কী রকম মইটা কেড়ে নিলেন। বার বার ভাল লাগে এসব? মুখেই শুধু বড় বড় বাৎ। আসল জিনিসের বেলায় লবডঙ্কা ।
      আবার হাবলু আমাকে বোঝালে— তুই যা বলছিস সব সত্যি। সব মেনে নিলাম। কিন্তু সব যদি মানি তাহলে তো এই গ্রামে বাস করে কোনদিন কিছু করা যাবে না। নেন্টুকাকার মুখে বড় বড় বুলি, চাঁদার বেলায় পাঁচ সিকে পয়সা, তার কাছে যাব না। হরি জ্যাঠার সেবারে একটা তক্তাপোষ আর রান্নার বাসন-কোষণ দেবার কথা ছিল, দিলেন না। তাহলে তার কাছেও চাঁদা চাওয়া বরণ। মুখুজ্যে বাড়ির বিমলবাবু, আমরা তার গাছের ডাব চুরি করেছি বলে ইস্কুলে গিয়ে হেডস্যারের কাছে নালিশ করেছিলেন, তার কাছেও তাহলে যাওয়া চলে না। এইভাবে যদি আমরা কেবল ভাল লোক বাছতে শুরু করি তাহলে দেখবি কিসু হবে না। দুচারটে ভাল মানুষ যদি বা মেলে, তখন বলবি ওঁর কানে বড় পুঁজের গন্ধ, তার পায়ে দাদ, অমুকবাবু তার বৌকে ঠেঙায়, তমুকবাবু ঘুষখোর, তখন চাঁদার খাতায় জমার ঘরে জিরো
ছাড়া আর কি জমবে বল?
      হাবলুটার যুক্তি ঠিক যেন ছাকনি জালের মত, ঘন ঘন গিট দিয়ে বোনা। পালাবার ফাঁক নেই। পরে ভেবেচিন্তে দেখলাম, হাবলু মন্দ বলে নি কথাগুলো। আমাদের এবারের চাঁদা চাইবার উদ্দেশ্যটা সত্যিই ভিন্ন। শুধু ভিন্ন বললে কম বলা হয়। আমরা প্রায় একটা রেভলিউশনারী কাণ্ড করতে চলেছি খড়গাছির মত একটা অখ্যাত অজ্ঞাত গ্রামে। রবীন্দ্রজন্মোৎসব। তাক লাগিয়ে দেবো এবার সবাইকে। হৈ চৈ পড়ে যাবে আশপাশের সাত গাঁয়ে। এখানকার লোক উৎসব বলতে তো বোঝে শুধু দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো আর কার্তিক পুজো। আর ঐ চত্তির মাসের কটা দিন শিবঠাকুরের গাজনকে নিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং ঢাকের বাদ্যি। কিন্তু ওসবের মধ্যে তো কালচারাল ব্যাপার স্যাপার নেই। এবারে সেটাতেই হাত দিযেছি আমরা। পরীক্ষায় ফেল করি বলে সবাই আমাদের ভাবে ফ্যালনা। এবার আমরা ঐ ফ্যালনা কজন ছেলেই দেখিয়ে দেবো, বিশ্বের সাংস্কৃতিক অগ্রগতি, মানে চেতনার যে অভ্যুদয় চলেছে আজ পৃথিবী জুড়ে অর্থাৎ বিশ্বকবিকে হৃদয়ে বরণ করার মধ্যে দিয়ে, ক্লাবের কালচারাল সেক্রেটারী হিসেবে আমি যে স্পীচটা দেবো সেটা এখনো লেখা হয়ে ওঠে নি। তবে মেজদার ঘরের তাকে একটা ধুমসো রচনার বই আছে। তার মধ্যে ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ’ নামে পাঁচ পাতার একটা প্রবন্ধ, পেজ নাম্বার ১৪২, মনে করে রেখেছি।
      নেন্টুকাকা অন্যদের মত ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেন না। বাড়ি আসেন শনিবার শনিবার। ঠিক হল সামনের রবিবারই যাওয়া হবে নেন্টুকাকার কাছে।
      রবিবার। তখনও মাটির রোদ গাছপালার মাথায় ওঠেনি। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমি, হাবলু, সুঁটে, ঝন্টু আর বাঁটুল। অধিক সন্নেসীতে গাজন নষ্ট হতে পারে এই ভয়ে আমাদের জাগরণী সংঘের অন্যান্য সদস্যদের ডাকা হল না। তাদের অন্য কাজে অন্য জায়গায় যেতে বলা হল।
      মল্লিকদের বাঁশঝাড়ের কাছটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার। আমরা খানিকটা এগিয়েছি। সকলের আগে আগে যাচ্ছিল ঝন্টু। হঠাৎ হেঁই হেঁই করে চেঁচিয়ে উঠল সে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। ঝন্টু আমাদের আঙুল দিয়ে দেখাল, একটা ইয়া বড় সাপ আমাদের ডানদিকে শুকনো বাঁশপাতার ওপর মৃদু খিস খিস শব্দ তুলে যেন সাঁতার কাটতে কাটতে চলে যাচ্ছে। সাপটা দূরের ঝোপের আড়ালে চলে যাবার পর হাবলু হালুম করে চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে।
      দেখলি? দেখলি? 
     কি? সাপ তো? 
     না হে বন্ধু, সাপের কথা বলছি না। বলছি সাপ-এর কথা। ড়ান দিক দিয়ে সাপ গেল। দক্ষিণেতে ভূজঙ্গম। খুব শুভ লক্ষণ। নেন্টুকাকা আজ বধ হবেই হবে।
      হাবলুর উৎসাহে আমাদের গালও গোল হয়ে উঠল টেনিস বলের মত। নেন্টুকাকা তার পুকুরপাড়ে ছাইগাদার কাছে কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা বাগানের মধ্যে বসে খুরপী দিয়ে ঘাস তুলছিলেন। নেন্টুকাকার খুব বাগানুর সখ। ফুলের নয়, শাকসবজির। লাউ, কুমড়ো, বেগুন, ঢেঁড়শ, এসবের। বাড়িতে এলে সকাল সন্ধ্যে ঐ বাগানেই। নেন্টুকাকা ঘাস তুলছিলেন আর দূরে তার প্রিয় চাকর সন্নেসী মাটি কোপাচ্ছিল কোদালে। আমাদের দলবলকে দেখে এক পলকের জন্যে একটু অবাক হবার মত ভঙ্গী ফুটেছিল নেন্টুকাকার মুখে। পরক্ষণেই সেটা ঢাকা পড়ে গেল দরাজ হাসিতে।
      এস, এস। এত সকাল সকাল তোমাদের আবার কি ব্যাপার?
      আমরা সবাই হাবলুর দিকে তাকালাম। আগে থেকে কথা হয়ে আছে, হাবলুই যা বলার বলবে। কেননা নেন্টুকাকার বাইরেটা যেমনই আটপৌরে হোক, ভেতরটা তো বেশ মাজাঘষা। তার বিদ্যেবুদ্ধির ঝুলি থেকে কখন কী বেরিয়ে পড়বে কে জানে। বিদ্বান লোকেরা সাপুড়ের চুপড়ির সাপের মত। এমনিতে ঠাণ্ডা। ফণা তুললেই সর্বনাশ। ভেবে চিন্তে তাই হাবলুকেই সামনে রাখা। হাবলু অঙ্কে আর ভূগোলে আর সংস্কৃতে ফেল করে বটে, কিন্তু বাংলা আর ইতিহাসে চৌকস। ৬০–৬২ তো বাঁধা।
      হাবলু নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে ওঠার জন্যে খচ্‌খচ্‌ করে নিজের মাথা খানিকটা চুলকে নিয়ে খুব বিনীত ভঙ্গীতে শুরু করলে—
      নেন্টুকাকা-আ-আ ...
      বল, বল।
      আমরা এবারে আপনার কাছে অনেক বড় দাবী নিয়ে এসেছি।
      পায়ের কাছে এক গোছা তোলা ঘাস জমেছিল, সেগুলোকে ছুড়ে দূরে সরিয়ে দিতে দিতে নেন্টুকাকা বললেন—
     সে তো আসবেই। তোমাদের মত যারা সবুজ, তারাই তো চিরকাল বড় বড় দাবী নিয়ে এগিয়ে আসে সকলের আগে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছো? আয়রে সবুজ, আয়রে আমার কাচা। পড়েছো?
      হাবলু এবং তার দেখাদেখি আমরা সকলেই এমনভাবে হাসলাম, যেন পড়েছি। নেন্টুকাকার মুখে রবীন্দ্রনাথের নামটা শোনামাত্রই আমাদের মনে যেন জগঝম্পের বাজনা বেজে উঠল। হাবলুর কথাই ঠিক। রবীন্দ্রনাথ-টাথের ব্যাপারে নেন্টুকাকা আমাদের আগের মত বিট্রে করবেন না। হাবলু আমাদের দিকে এমন একটা মিষ্টি হাসি ছুড়ে দিলে, যেন তার আধখানা যুদ্ধ জেতা হয়ে গেছে অলরেডি।
      হাবলুর গলায় আবার সেই আগের মত বিনীত স্বর—
     নেন্টুকাকা, আপনি যা বললেন মানে যাঁর নাম বললেন, আমরা এবার আমাদের গ্রামে সেই জগৎ-বরেণ্য কবিরই জন্মোৎসব পালন করতে উদ্যোগী হয়েছি। আপনাকে মানে আমরা আপনার কাছে এসেছি অনেকগুলো দাবী নিয়ে।
      তোমরা রবীন্দ্রজন্মোৎসব করছে?
      আজ্ঞে হ্যাঁ।
      বাঃ, বাঃ। তোমাদের বেশ উন্নতি হয়েছে তো। রাত জেগে ইয়ার্কি মেরে, ধেই ধেই করে নেচে, আর কতকগুলো ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে আজকালকার ছেলেরা ঐ যে কেবল দুর্গাপুজো আর সরস্বতী পুজো নিয়ে মাতামতি করে, ওটা দেখলেই আমার রাগ হয়। এই যে রবীন্দ্রজন্মোৎসব করছে, খুব ভাল জিনিস। এতে নিজেদেরও অনেক কিছু শেখা হয়, লোককেও শেখানো যায়। খুব ভাল। তা আমাকে, আমার কাছে তোমাদের কি দাবী আছে, বলে ফেল।
      হাবলুর হাত আবার মাথায় উঠে এসে চুল ঘাটতে লাগল। আমাদের হাতের মুঠোও শক্ত হয়ে উঠল উত্তেজনায়।
     হাবলু বললে—আমাদের একটা হাতের লেখা কাগজ আছে। আমরা তার রবীন্দ্রসংখ্যা বার করবো। তার জন্যে আপনাকে একটা লেখা দিতে হবে। আর জন্মোৎসবের দিন আমরা ঠিক করেছি, আপনিই হবেন আমাদের প্রধান অতিথি। আর ...
      এইবার চাঁদার কথা। আসল ব্যাপার। বলে ফ্যাল হাবলু, সাহস করে বলে ফ্যাল। দশ টাকা। দেরী করিস নে। হাবলুর ঠোঁটের ডগার কাছে আটকে আছে আমাদের জোড়া জোড়া চোখ।
      আর, কাঁকনকে যদি উদ্বোধন সঙ্গীতটা গাইবার পারমিশন দেন... তাহলে খুব ভাল হয়—কেননা আমাদের এখানে তো আর কোন গান জানা মেয়ে নেই ...
      কাঁকন নেন্টুকাকার বড় মেয়ে। বছর এগার বারো বয়েস। বাড়িতে মাষ্টার এসে গান শিখিয়ে যায়। হাবলুর বুদ্ধি আছে বটে। এটা আমাদের কারো মাথায় আগে আসেনি। বুঝেছি, নেন্টুকাকার মনটাকে ও ভিজিয়ে ফেলতে চাইছে। তা বেশ,কিন্তু চাঁদার কথাটা বল এবার !
      হাবলু থামতেই নেটুকাকা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সন্নেসীর দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন—
      সন্নেসী, একটু তামাক সেজে নিয়ে আয় তো, বাবা। 
      সন্নেসী মাটি কোপানো থামিয়ে চলে গেল। নেন্টুকাকা পিঠটাকে সোজা করে নিয়ে আবার অন্য একটা জায়গায় গিয়ে বসলেন, ঘাস তুলতে। বসতে বসতেই প্রশ্ন করলেন-—তোমাদের প্রোগ্রামটা কি সেদিন?
      প্রোগ্রাম? প্রোগ্রাম একটা মোটামুটি ভেবেছি। এই প্রথমে উদ্বোধন সঙ্গীত। তারপর সভাপতি আর প্রধান অতিথি বরণ, তারপর দুটো একটা গান আর বক্তৃতা। ঝন্টু আর বাঁটুল ওরা দুজনে মিলে একটা কমিক করবে। এর পর ক্লাবের সেক্রেটারী কিছু বলবে। তারপর নাটক।
      কি নাটক? 
     কবিগুরুর মুকুট। 
     সন্নেসী তামাক সেজে নিয়ে এল হুঁকোয়। নেন্টুকাকা হুঁকোয় পর পর কয়েকটা টান দিয়ে গলগল করে কিছু ধোঁয়া উড়িয়ে আমাদের দিকে তাকালেন—
      তোমাদের বেশ উৎসাহ আছে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এ্যমবিশন নেই। যাঁর জন্মদিন পালন করছে, তার লেখাটেখা একেবারেই পড়ে দেখনি মনে হচ্ছে। “দুর্ভাগাদেশ' কবিতাটা পড়েছে রবীন্দ্রনাথের? পড়েছো?
      আজ্ঞে হ্যাঁ। কি আছে লেখা কবিতায়? ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, ভাগ করে খেতে হবে তাহাদের সাথে অন্নপান।’ এই যে এত বড় একটা কথা, এটাকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী করার কোন মানেই হয় না। শুধু খানিকটা নাচ গান আর বক্তৃতা করলেই কি শ্রদ্ধা জানানো হয়ে যাবে অতবড় একটা ওয়ার্ল্ড ফেমাস পোয়েটকে? তোমরা যদি আমার সাজেশান শুনতে চাও তাহলে বলি।
      আমরা প্রায় সকলেই একসঙ্গে বলে উঠলুম—কেন শুনবো না কাকু? নিশ্চয়ই শুনবো। নেন্টুকাকা কি যেন বলতে যাওয়ার মুখেই থেমে গেলেন। ‘মেজবাবু’ বলে তার সামনে এসে দাঁড়াল ও পাড়ার জগদীশ। নেন্টুকাকার চাষবাস সব ঐ জগদীশই দেখাশোনা করে।
      কে? জগদীশ এসে গেছে? একটু দাঁড়াও। 
     নেন্টুকাকা এবার হাবলুর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন—উৎসবটা শুরু হবে সকাল থেকে। সকাল বেলায় শুধু প্রভাত ফেরী। রবীন্দ্রনাথেরই একটা গান গেয়ে তোমরা গ্রামটা ঘুরলে। তারপর দুপুর বেলায় কাঙালী ভোজন। খুব বেশী আইটেম করার দরকার নেই। খিচুড়ী হবে। তার সঙ্গে আলু ভাজা, বেগুন ভাজা, কুমড়োর চাটনী আর যদি পারো একটু করে পাপর ভাজা। কত আর লোক হবে। পাচ-ছশোর ৰেশী তো হবে না। এমন কিছু নয়। আসলে খাওয়াটা এখানে বড় কথা নয়। ঐ যে কাঙালী ভোজন, তাতে কোন জাত বেজাতের বিচার থাকবে না। বামুন-কায়েত, শূদ্র ভদ্র, হিন্দু মুসলমান সবাইকে একসঙ্গে এক পংক্তিতে বসিয়ে খাওয়ানোটাই হল আসল কথা। এইটেই রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের সাধনা ছিল, জানতো ?
      হাবলু আমতা আমতা করে বললে,—ওতো অনেক টাকার ব্যাপার। আমরা অত টাকা ...
     টাকা? শোনো টাকার জন্যে কখনো কোন বড় উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় নি। হুঁকোর আগুনটা নিভে এসেছিল। নেন্টুকাকা জোরে কয়েকটা টান দিয়ে সেটাকে বাগানের বেড়ার গায়ে ঠেকিয়ে রেখে আবার সন্নেসীকে ডাক দিলেন। সন্নেসী মাটি কাটা থামিয়ে নেন্টুকাকার সামনে এসে দাঁড়াল।
      সন্নেসী ! তোমার মাকে গিয়ে বল, ২০টা টাকা দিতে। 
     ২০ টাকা! হাবলু চকিতে ঘুরে তাকাল আমাদের দিকে। তার মুখে দিগ্বিজয়ের হাসি। ঝন্টুর গাল লাল হয়ে উঠেছে আনন্দে। সুটে পটপট করে হাতের আঙুলগুলোকে মটকে নিলে। বাঁটুল এক চক্কর ঘুরিয়ে নিলে নিজেকে। আমারও গালের হাসি গাল ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল।
      হ্যাটস অফ, হাবলু। তুই যাদু জানিস। নেন্টুকাকার কাছ থেকে ২০ টাকা চাঁদা আদায়! যা কিনা শিবের বাপেরও অসাধ্য আজ তুই তাই করলি। ১ টাকা আদায় করতে আমাদের পেটের অন্নপ্রাশনের ভাত হজম হয়ে গেছে। হাবলু, এখান থেকে বেরিয়ে তোর পায়ের ধুলো নেব, মাইরী !
      তোমরা, আজকালকার ছেলেরা—সামান্য কাঙালী ভোজন করাতে ভয় পাচ্ছ? টাকার ভয়ে, তাইতো? আচ্ছা, এবার ঐ রবীন্দ্রনাথের কথাই ভেবে দ্যাখ তো। পকেট ফাঁকা, সিকি পয়সাও ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স নেই। তা সত্ত্বেও ফাঁকা মাঠের মধ্যে অতবড় একটা বিশ্বভারতী গড়ে তুললেন শান্তিনিকেতনে। টাকার জন্যে কাজটা আটকালো কি? আটকায় না। উদ্দেশ্য যদি বড়ো হয়, আটকায় না। পাঁচশো লোকের কি ধর ছশো লোকের জন্যে খিচুড়ী করতে কত খরচ? হিসেব করে বলতে পারবে এক্ষুনি ?
      আমরা সকলেই খানিকটা থতোমতো। পাঁচশো ছশো লোকের খিচুড়ী রাঁধতে কত চাল, কত ডাল ওসব কি আমাদের জানার কথা !
      হাবলু বললে—এখুনি তো বলতে পারব না। আমরা তো আগে কোনদিন কাঙালী ভোজন করাই নি। তবে মুখুজ্যে পাড়ার বন্ধু মেশোমশাইকে জিজ্ঞেস করলেই জেনে যাবো। ওঁর বাবার শ্রাদ্ধে কাঙালী ভোজন হয়েছিল, চার পাঁচ মাস আগে।
      অঙ্কে বোধ হয় তোমরা কেউই ভাল নাও। এ বছর কত পেয়েছ অঙ্কে? নেন্টুকাকা একদম সোজাসুজি আমার দিকেই তাকিয়ে। আমার বুক ধকধক করে উঠল। আমি ! আমাকে বলছেন? আমি সত্যি সত্যি অঙ্কে খুব কাঁচা। কত পেয়েছে, কত, নম্বরটা বল না। আমি, আমি ১৭ পেয়েছিলাম। তা এত ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়ার কি আছে? অঙ্কে কম নম্বর পাওয়াটা এমন কিছু অপরাধ নয়। মন দিয়ে অঙ্ক কষলেই শেখা হয়ে যাবে। এই যে রবীন্দ্রনাথের কথাই ধর না। লেখাপড়ায় কি ভাল ছেলে ছিলেন? ছিলেন না। কতটুকুই বা পড়েছিলেন? বেশী পড়েন নি। তাহলে এত বড় হলেন কি করে? জানো? কারণটা কি? রবীন্দ্রনাথ তোমাদের মত ভীতু বাঙালী ছিলেন না। বাঙালীদের উপর হাড়ে চটা ছিলেন সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ তো করোনি এই কথা কবি অনেক দুঃখ করেই লিখে গেছেন।কেন বলতো? কারণ বাঙালীরা বড্ড বাক্যবাগীশ জাত। কাজে কুঁড়ে। তোমরা রবীন্দ্রজন্মোৎসব করতে চাইছো, অথচ তোমাদের কতকগুলো সাধারণ জ্ঞান নেই। তোমরা যদি ভেবে থাকো, চাল ডাল তেল নুন এসব জিনিষের কি দরদাম, এসব রবীন্দ্রনাথ জানতেন না, তাহলে ভুল করবে। রবীন্দ্রনাথ কবিতাও লিখতেন। আবার জমিদারিও চালাতেন। তোমার নাম কি?
      নেন্টুকাকা প্রশ্নটা করলেন ঝন্টুর দিকে তাকিয়ে।
      আমার নাম? ঝন্টু।
      ঝন্টুতো ডাক নাম। ভাল নাম কি?
      সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
      কার ছেলে বলতো তুমি?
      আমার বাবা হলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।
      ওঃ, তুমি ক্ষীরোদকাকার ছেলে? বাঃ। বাড়িতে অম্বল খাও?
      অম্বল? অম্বল তো খাই।
      কিসের অম্বল? পেঁপের, না কুমড়োর, না ঢেঁড়শের। না কুঁচো চিংড়ীর?
      সব রকমই হয়।
      বেশী হয় কোনটা ?
      বেশী হয় কুমড়োর।
      কুমড়োর কত করে সের, জানো ?
      আজ্ঞে না ।
    তাহলেই দ্যাখ কুমড়োর অম্বল রোজ খাচ্ছ, অথচ জিনিসটা বাজারে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, খবর রাখো না। রবীন্দ্রনাথের মত অত বড় একটা বিশ্ব প্রতিভার কতটুকু খবর রাখো তোমরা বুঝতেই পারছি। তোমরা তো এখনো যোগ্যই হয়ে ওঠেনি। .
      আমাদের যে গালগুলো হাসি খুশীতে পাকা আমের মত লাল টুস টুসে হয়ে উঠেছিলো একটু আগে, চুপসে আমসত্ত্বের মত কালো হয়ে যেতে লাগলো। কুমড়োর দামটা জানিনা বলেই বোধ হয় চাঁদার করকরে কুড়িটা টাকা আর পাওয়া গেল না। কুমড়ো জিনিসটা গোল জানতাম। তার ভিতরে যে এত গণ্ডগোল জানতাম কি হাই! তীরে এসে সব কিছু ভরাডুবি হয়ে যেতে বসেছে দেখে মনের মধ্যেটা হায় হায় করে উঠলো।
      আর ঠিক সেই সময়েই হাবলু যেন থিয়েটারে পার্ট বলছে, এমনি নাটকীয় ভঙ্গীতে সজোরে বলে উঠল—নেন্টুকাকা, ৩০৫ টাকা লাগবে।
      ৩০৫ টাকা? কি করে হিসেবটা কষলে?
     আজ্ঞে, আমাদের পাড়ার দাশু হালদারের হোটেল আছে বাগনান স্টেশনে। সেখানে শুধু ডাল ভাত আর তরকারি খেতে ১২ আনা পড়ে। দাশুকাকা বলেছিলেন এই ১২ আনায় তার ৪ আনা লাভ থাকে। তাহলে পার হেড ৮ আনা করেই পড়ে এক একজনের। আমরা যদি ৬০০ জন লোককে খাওয়াই খরচ পড়বে, ৩০০ টাকা। আর যে হালুইকর রাঁধবে, তাকে ৫ টাকা মজুরী দিতে হবে।
      বাঃ। এই তো। দেখ, তোমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলে। হাবলু ভয় না পেয়ে চেষ্টা করল বলেই উত্তরটা পেয়ে গেল। কোন কিছুতে চট্‌ করে ভয় পেতে নেই। রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়। সব সময় মনে রাখবে কথাটা। এই তো হয়ে গেল। মোটামুটি কত খরচ হবে তার একটা হিসেব তোমরা পেয়ে গেলে। এবার কাজে নেমে পড়, কথা না বলে।
      আজ্ঞে হ্যা। কিন্তু ...
     কিন্তু কি বল? কাঙালী ভোজনের তো অনেক খরচা। সবাই যদি একটু বেশী বেশী করে চাঁদা না দেন ... 
    তা তো বটেই। এ তো আর ১টাকা ২ টাকার ব্যাপার নয়। গ্রামে তোমরা একটা ভাল জিনিস করছো। সবাইকে সাহায্য করতে হবে বৈকি। তোমরা ছেলেমানুষ, কি করে করবে নইলে!
      এই সময় সন্নেসীকে দেখা গেল আসতে। দুটো দশ টাকার নোট হাতে। হাবুলকে আমি ইসারা করলাম হাতের তিনটে আঙুল দেখিয়ে। অর্থাৎ এ সময় আরেকবার কথাটা তুলে ২০ কে ৩০ করে নে।
      হাবলুপকেট থেকে চাঁদার বই আর ফাউণ্টেন পেলটা বের করে ফেললে। 
     তাহলে নেন্টুকাকা, আপনার নামে আমরা ...
     দাঁড়াও বলছি। 
    সন্নেসী এসে ১০ টাকার নোট দুটো নেন্টুকাকার হাতে দিতেই, তিনি জগদীশকে ডাকলেন। জগদীশ কঞ্চির বেড়ার উপর দিয়ে তার লম্বা হাতটা বাড়িয়ে দিলে।
      আজ ২০ টাকা দিচ্ছি। বাকী টাকাটা সামনের সপ্তাহে এসে নিয়ে যেও, কেমন? আজ্ঞে হ্যাঁ, বলে জগদীশ ১০ টাকার নোট দুটো নিয়ে চলে গেল। নেটুকাকা আমাদের দিকে ঘুরে তাকালেন।
      হ্যাঁ, কি বলছিলে? 
     আজ্ঞে, চাঁদা ... 
     চাঁদা? চাঁদা আমি দেবো না। বুঝলে? ১ টাকা ২ টাকা চাঁদা দিলে অত বড় ব্যাপার তোমরা সামলাতে পারবে না। তোমরা বরং একটা কাজ কর।
      হাবলুর গলার স্বর তখন ১৮ দিনের জ্বরের রুগীর মত চিনচিনে। মুখখানাও লম্বা হয়ে ঝুলে এসেছে নীচের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অপমান নিজে সামলাবার চেষ্টা করছে সে প্রাণপণে। তবুও গলায় আগের মতই বিনীত ভঙ্গী ফুটিয়ে বললে—আজ্ঞে হ্যাঁ, বলুন।
      কাঙালী ভোজনের জন্যে কুমড়োর চাটনীটা তো হচ্ছে। তোমাদের আর বাজার থেকে কুমড়ো কেনার দরকার নেই। যে কটা কুমড়ো লাগবে, আমার বাড়ি থেকে নিয়ে যেও। আর ম্যাগাজীনের জন্যে যে লেখাটা চেয়েছ, সেটা সামনের রবিবারে এসে নিয়ে যেও। কবি রবীন্দ্রনাথকে সবাই চেনে। কর্মযোগী রবীন্দ্রনাথকে অনেকেই চেনে না। ঐ বিষয়েই তোমাদের একটা বড় প্রবন্ধ লিখে দেবো।
      বাইরে বেরিয়ে এসে আমার ইচ্ছে করছিল, বশিষ্ঠ কিংবা বিশ্বামিত্র মুনির মত অভিশাপ দিয়ে হাবলুকে শেষ করে দি। ওর জন্যেই সকালটা নষ্ট। আর গাল বাড়িয়ে চড় খাওয়া।
      ঝন্টু বললে—আমি জানতাম।
      কি? 
    হাবলু তখন বললে না যে, ডান দিকে সাপ পড়া খুব ভাল। আসলে তো সাপটা ছিল বাঁদিকে। বাদিক থেকে ডানদিকে চলে গিয়েছিল।
      তখনই বললি না কেন রে রাসকেল? দিনটা মাটি হোত না। আহা, তখন বললে তো তোরা আর যেতিস না। আর না গেলে নেন্টুকাকার রবীন্দ্র-প্রতিভা কি জানা হোত কোনদিন?
      সে বছর আর রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করিনি আমরা কুমড়োর চাটনীর ভয়ে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য