শিমুলতলার মাধবী লজ - ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

     সে বছর ঘন ঘন নিম্নচাপের ফলে বর্ষাকালটায় মানুষ প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একে তো বর্ষার বৃষ্টি হচ্ছেই, তার ওপর যেদিনই একটু ধরনের মতো হয় সেদিনই রেডিও আর খবরের কাগজ ঘোষণা করে ভয়ঙ্কর এক নিম্নচাপের কথা।
     যাই হোক, সারাটা বর্ষা এইভাবে কাটাবার পর শরৎ আসার সঙ্গে-সঙ্গেই ভাবলাম, এবার বুঝি দুর্যোগ কাটল। এক সুন্দর সকালে হঠাৎ দেখি আঙিনায় শিউলি ছড়িয়ে আছে। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশে পুজো-পুজো গন্ধ। আনন্দে নেচে উঠল মনটা ভাবলাম আর ঘরে বসে থাকা নয়, দু-চারদিনের জন্য বরং চট করে কোথাও থেকে ঘুরে আসা যাক। কিন্তু যাব কোথায়? চা খেতে-খেতে টাইম টেবল-এর পাতা ওলটাতে লাগলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল নতুন একটা সাপ্তাহিক নর্থ বিহার এক্সপ্রেস চালু হয়েছে। ট্রেনটি প্রতি শুক্রবার রাত এগারোটায় ছাড়ে। শিমুলতলা পৌছয় সকাল ছটায়। ভাবলাম, অনেক জায়গায় তো গেছি, কিন্তু শিমুলতলায় কখনও যাইনি। অতএব শিমুলতলা থেকেই ঘুরে আসি না কেন?

     এই মনে করে পাজামা আর পাঞ্জাবিটা পরে যখন বেরোতে যাচ্ছি ঠিক তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে সুজয় এসে হাজির হল। সুজয় আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। বলল, “কী ব্যাপার রে! এমন অসময়ে চললি কোথায়? ক'দিন পর একটু হাঁফ ছেড়ে ভাবলাম তোর বাড়ি এসে চুটিয়ে আড্ডা দেব, তা তুই-ই শেষকালে কেটে পড়ছিস ?”
     আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। বললাম, “ভাগ্য ভাল যে, বেরিয়ে পড়িনি। আমি এই বিরক্তিকর আবহাওয়ায় বড় বেশি বোর বোধ করছিলাম নিজেকে। তাই দু-চারদিনের জন্য এই একঘেয়েমির হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছিলাম। সেইজন্যই হাওড়া স্টেশনে যাচ্ছিলাম আজ রাতের গাড়িতে একটা বাৰ্থ রিজার্ভেশনের ধান্দায়।”
     “যাবি কোথায় ?” 
    “শিমুলতলায়। তুই যাবি?” 
    “এত তাড়াতাড়ি কী করে যাব? কোনও প্রস্তুতি নেই, কিছু নেই, একেবারে আজই?” 
   “আরে, এ তো কাশ্মির কিংবা সিমলা নয়, শিমুলতলা। এর আবার প্রস্তুতির কী আছে? তোর কিট ব্যাগে শুধু জামাকাপড়গুলো গুছিয়ে নিবি। খরচ খরচা আমার।”
     সুজয় উৎসাহিত হয়ে বলল, “তা হলে আমি রাজি।” 
     মনের মতো একজন সঙ্গী পেয়ে আনন্দে ভরে উঠল মন। দুজনে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে রাতের গাড়িতে রিজার্ভেশনও করিয়ে আনলাম। রাত এগারোটায় ট্রেন। সুজয়ের সঙ্গে কথা হল ও ন’টার মধ্যেই চলে আসবে আমার কাছে। তারপর আমরা একসঙ্গেই রওনা দেব।
     যাই হোক, বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়ার পর সারাটি দুপুর ধরে গোছগাছ করতে লাগলাম। আসলে এই বর্ষায় অথবা বর্ষার পরে পাহাড়ি অঞ্চলগুলো আমার খুব ভাল লাগে। কেননা বৃষ্টিস্নাত গাছপালা থেকে একটা মিষ্টি সোঁদা গন্ধ বেরোয় ভিজে মাটি থেকে চমৎকার একটা মেঠো সুবাস পাওয়া যায়। তাই নতুন দেশে যাওয়ার উল্লাসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর নিয়ে পরিপাটি করে সুটকেসটি গুছিয়ে ফেললাম।
     কিন্তু এত আনন্দ, এত গোছগাছের মধ্যেও হঠাৎ একসময় দেখি আকাশ কালো করে কী ভয়ানক মেঘ উঠেছে। আবার কি নিম্নচাপ কে জানে? খোলা জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকলাম। একদিকে ভাদ্রের চড়া রোদ, অন্যদিকে আকাশের ঈশানে মহাপ্রলয়ের সূচনা। দেখতে-দেখতে সেই মেঘ আকাশময় ছড়িয়ে পড়ল। তারপর খুব ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল শরীরের ওপর দিয়ে। তারও পরে শুরু হল প্রবল বর্ষণ। কিছু সময়ের মধ্যেই রাস্তায় হাঁটুজল দাঁড়িয়ে গেল। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায় ডুবে গেল সব। সন্ধের মুখে বেগ একটু কমলেও বৃষ্টিপাত সমানে চলতে লাগল। আমার বাড়ি থেকে সুজয়ের বাড়ি অন্তত আধঘণ্টার পথ। এই দুর্যোগে সে কিছুতেই আসতে পারবে না। আমিই বা যাব কী করে? তাই যাওয়ার আশা ত্যাগ করে ঘরে বসে গল্পের বই পড়তে লাগলাম।
     এদিকে রাত ন’টা বাজার সঙ্গে-সঙ্গেই দরজার কড়া নড়ে উঠল। উঠে গিয়ে দরজা খুলেই দেখি সুজয় কালো একটা বর্ষাতি পরে কিট ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, “এই দুর্যোগে কী করে এলি তুই?”
     “না এলে তুই কী ভাবতিস বল?” 
     “কী আর ভাবতাম? এত দুর্যোগে মানুষ বেরোতে পারে? যাক, এসে ভালই করেছিস। রাস্তায় এখন জল কীরকম?”
     “কোনওরকমে যাওয়া যাবে।” 
     “তা হলে আর দেরি নয়, বেরিয়ে পড়ি চল।” 
     আমি তৈরিই ছিলাম। সুটকেসটা হাতে নিয়ে ঘরে তালা দিয়ে বাইরে এসেই একটা টানা রিকশা ধরে সোজা হাওড়া স্টেশনে। আমাদের ট্রেন তখন প্ল্যাটফর্মে এসে গেছে।
     প্রতিদিনের দেখা সেই হাওড়া স্টেশনের আজ একেবারেই অন্যরকম চেহারা। খাঁ-খাঁ করছে স্টেশন চত্বর। মাঝেমধ্যে একটি-দুটি যাত্রিবিহীন লোকাল ট্রেন আসছে। দূরপাল্লার গাড়িগুলো সবই প্রায় ফাঁকা। বহু লোক এই দুর্যোগে আসতেই পারেনি। আমরা যাওয়ার পরই দেখলাম একজন রেলকর্মচারী রিজার্ভেশন চার্ট হাতে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট জায়গায় সেঁটে দিল। কিন্তু চার্টের দিকে তাকিয়েই চক্ষুস্থির। এ তো বৃষ্টির জন্য নয়। দেখলাম এতবড় গাড়িটার একটি বগিতে মাত্র আমাদের দুজনের নাম আছে। আর একটিতে আছে পাঁচজনের। বাদবাকি সবই সাদা। ইংরেজিতে ‘নিল লেখা আছে।
     সুজয় বলল, “কী ব্যাপার বল তো?” 
    একজন কোচ অ্যাটেনডেন্ট বললেন, “ট্রেনটা আসলে নতুন তো! সবে চালু হয়েছে। অনেকেই জানে না। তাই এই অবস্থা। তা ছাড়া ভিড় হয় না বলে এই গাড়িতে সচরাচর কেউ রিজার্ভেশনও করায় না। বিনা রিজার্ভেশনেই এই গাড়িতে সারারাত শুয়ে যাওয়া যায়।”
     কী আর করি? আমরা দুজনে ভয়ে-ভয়েই আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বগিতে ঢুকে বসলাম। সত্যি বলতে কী, এতবড় বগিতে আমরা দুজন, এ যেন ভাবাই যায় না! সুজয় না এলে আমি তো আসতামই না। এলেও যাত্রা বাতিল করতাম।
     বৃষ্টির বেগ হঠাৎ খুব বেড়ে গেল। ট্রেন ছাড়বার সিগন্যালও হয়েছে। এমন সময় দুজন আর. পি. এফ. এসে বললেন, “এই বগিতে কি আপনারা দুজন?”
     “হাঁ।” 
    “তা হলে এক কাজ করুন, পাশের বগিতে পাঁচজন আছেন। আপনারা সেখানে চলে যান। সাধারণ যাত্রীদেরও আমরা ওই বগিতে ঢুকিয়ে নিয়েছি। সেখানে পুলিশ গার্ড থাকবে। প্রত্যেক বগি থেকেই আমরা লোকজন সরিয়ে আনছি।”
     আমি সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “কী করবি রে?” 
     “যা করবার তাড়াতাড়ি করুন। সিগন্যাল হয়ে গেছে। ট্রেন এখনই ছাড়বে।” বলেই ওঁরা নেমে গেলেন।
     এই নিষেধাজ্ঞার পর আর থাকা উচিত নয় ভেবে আমরা পাশের বগিতে যাওয়ার জন্য তৎপর হলাম। সুজয় অবশ্য যাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখাল না। কিন্তু আমরা গেটের কাছে যেতেই ট্রেন ছেড়ে দিল।
     আমি তবুও নামতে যাচ্ছিলাম। সুজয় আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরল, “করছিস কী! এখন কখনও রিস্ক নেয়? সেরকম বুঝলে বর্ধমানে নেমে বগি বদল করে নেব।”
     সেই ভাল। আমরা দরজায় লক এটে ভেতরে এলাম। রাত এগারোটার ট্রেন। সামনে কোনও বাধা নেই। লাইন ক্লিয়ার। তাই ছেড়েই গতি নিল ট্রেন। বৃষ্টিও গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানে ঝরে চলেছে। জানলার কাচ নামানো সত্ত্বেও বাইরের ঝাপটা ভেতরে ঢুকছে।
     সুজয় বলল, “একটা কাজ করলে হয় না?”
     “কী কাজ বল ?” 
     “তা হলে আর কোথাও নামা-ওঠার দরকার হবে না। এই বগিটার চারদিকের দরজা ভেতর থেকে লক করে এর মধ্যে যে লেডিজ কুপেটা আছে আমরা দুজনে সেইখানে শুয়ে থাকলে কেমন হয়? তা হলে আর এতবড় বগিটার শূন্যতা চোখ মেলে দেখতে হবে না। কোনওরকমে দু’ চোখ এক করে ঘুমিয়ে পড়তে পারলে এক ঘুমে সকাল হয়ে যাবে।”
     “চমৎকার আইডিয়া।” 
    বলেই চারদিকের গেটে ছিটকিনি এঁটে কূপের ভেতরেও লক করে দিলাম। এইবার সারারাতের মধ্যে গেট খুলে কাউকেই আর ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছি না। রাত অনেক হয়েছে। সঙ্গের খাবার খেয়ে শেষবারের মতো একবার টয়লেটে গেলাম মুখ-হাত ধুয়ে একটু হালকা হয়ে আসতে। কিন্তু টয়লেটের ভেতরে ঢোকামাত্রই কেমন ‘ম-ম’ করা একটা মিষ্টি গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। সেইসঙ্গে হঠাৎ এক নিদারুণ ভয়ে গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। সে কী দারুণ ভয়। ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবুও ভয়। তাই চট করে বেরিয়ে এলাম।
     আমার হয়ে গেলে সুজয় ঢুকল। সেও বেরিয়ে এসে বলল, “ভারী চমৎকার একটা মিষ্টি গন্ধ, তাই না?”
    আমি অতিকষ্টে বললাম, “হ্যাঁ।” 
    “তুই খুব ভয় পেয়েছিস মনে হচ্ছে?” 
    “কই, না তো!” 
     “তোর মুখ দেখেই মনে হচ্ছে।” 
     তারপর একটু হেসে বলল, “আসলে আমার মনে হয় কোনও ব্যাপারী এই বগিতে করে নিশ্চয়ই গোলাপের ঝাঁকা নিয়ে যাচ্ছিল।”
     “তা হবে।” 
     “ঠিক আছে। তোর যদি ভয় করে, আর এদিকে না এলেই হল। এখন আমরা চুপচাপ শুয়ে পড়ি চল। এতবড় বগিতে আমরা মাত্র দু’জন। ভয় হওয়াই স্বাভাবিক।”
     আমরা আর দেরি না করে কুপের মধ্যে দু’জনে দুটাে মিডল বাৰ্থ নিলাম। তার কারণ লোয়ার বার্থে বাইরের জলের ঝাপটা কাচের জানলার বাধা টপকে ভেতরে গড়াচ্ছে। আপার বার্থে ছাদের জল কাঠের ফাঁক দিয়ে চুয়ে-চুয়ে পড়ছে। মাঝের বার্থে সে ঝামেলা নেই।
     শোওয়ামাত্রই ঘুম। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম আমরা। রাত তখন কত কে জানে! বাইরে প্রবল বর্ষণ। ট্রেন দুর্গাপুরে থেমেছে। বেশিক্ষণ নয়। মিনিট-পাঁচেক থামার পরই ছেড়ে দিল ট্রেন। এমন সময় মনে হল, কে যেন ছুটে এসে ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলে পড়েছে। তারপরই দমাদম ধাক্কা দরজায়।
     আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। সুজয় হাত চেপে ধরল আমার। বলল, “একদম খুলবি না। যেই হোক, মরুক ব্যাটা।”
    আবার শব্দ। এবার মেয়েলি গলায় করুণ কষ্ঠে অনুরোধ, “ভেতরে কে আছেন? দয়া করে দরজাটা খুলুন। না হলে আমি আমি পড়ে যাব।”
     আমি বললাম, “সুজয়, প্লিজ।” 
    “না। মরুক ও। এইভাবে ওঠে কেন?” 
     এবার রীতিমতো রেগে গেলাম আমি। বললাম, “এমন অমানুষের মতো ব্যবহার করিস না। একটি অসহায় মেয়ে এই দুর্যোগে চলন্ত ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলবে আর আমরা স্বার্থপরের মতো শুয়ে-শুয়ে ঘুমোব—এ হয় না।”
     “কার মনে কী আছে জানিস তুই?” 
     “এটা জানাজানির ব্যাপার নয়, এখনই একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।” 
     ওদিক থেকে তখন কাতর প্রার্থনা আবার শুরু হয়েছে, “প্লিজ, একবার দরজাটা খুলুন। দোহাই আপনাদের। আমি আর ঝুলতে পারছিনা। আমার এক হাতে ভারী সুটকেস। আমি এখনই হাত ফসকে পড়ে যাব। আপনারা কি চান আমি মরি?”
     এই কথার পর আর আমি থাকতে পারলাম না। সুজয়ের আপত্তি না শুনে নিজেই গিয়ে দরজার লক খুলে ঢুকিয়ে নিলাম মেয়েটিকে।
     অষ্টাদশী তরুণী। অপূর্ব মুখশ্রীর তুলনা মেলা ভার। গায়ের রং চাঁপার মতো ফরসা। বৃষ্টিতে ভিজে সপসপ করছে বেচারি। ভেতরে ঢুকে সুটকেসটি নামিয়ে রেখে বলল, “সত্যি, কী বলে যে ধন্যবাদ জানাব আপনাকে!”
     আমি বললাম,“এইভাবে চলন্ত গাড়িতে কেউ ওঠে?” বলেই দরজাটায় আবার ছিটকিনি এঁটে দিলাম।
     মেয়েটির দু’ চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল, “এ কী! আবার লক করছেন দরজায়? খুলুন, খুলে দিন বলছি। এইভাবে দরজা বন্ধ করে ভেতরে শুয়ে থাকলে রাতদুপুরে লোকজন ওঠানামা করবে কী করে?”
     আমি বললাম, “এই দুর্যোগের রাতে লোকজন কোথায়? তা ছাড়া এই বগিতেও আমরা মাত্র দু’জন। আপনাকে নিয়ে তিন।”
     “সে আপনারা দু’জনই থাকুন আর একজনই থাকুন, দরজায় লক করা কখনওই উচিত নয়। দেখুন তো, কত কষ্ট পেলাম আপনাদের জন্য।”
     সুজয়ও তখন কুপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বলল, “খুব তো জ্ঞান দিচ্ছেন, লাইনের অবস্থা জানেন? এই উদারতার সুযোগে কোনও বদলোক গাড়িতে উঠে যদি রিভলবার দেখায়, তখন কী হবে?”
     বৃষ্টিভেজা মেয়েটি তখন করে কাঁপছে। সুজয়ের কথায় একটু নরম হয়ে বলল,“কিছু মনে করবেন না, আমি অবশ্য বিপদের ওইদকটা চিন্তা করিনি।”
      সুজন বলল,“কাউকে কিছু বলার আগে অনেক কিছুই চিন্তা করবেন। আসুন, ভেতরে আসুন।”
     মেয়েটির আবির্ভাবের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের ঘুমের দফাও শেষ হয়ে গেল। সে কুপের মধ্যে ঢুকেই তার সাটকেসটি আপার বার্থে রেখে নিজে লোয়ার বার্থে কষ্ট করে বসে রইল।
     আমি বললাম, “আপনি এক কাজ করুন, আমরা বাইরে যাচ্ছি। আপনি ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলুন। না হলে এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকলে আপনার শরীর খারাপ করবে।”
      মেয়েটি বলল, “কিছু হবে না আমার।” 
     এমন সময় হঠাৎ গাড়ির আলো নিভে গেল। আমি বললাম, “আমার কথা শুনুন। শাড়িটা বদলে নিন। না হলে নিজেই কষ্ট পাবেন।” 
     “বেশ, যখন আপনি এত করে বলছেন তখন তাই হোক।” বলেই সুটকেস নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল মেয়েটি।
     আবার আলো জ্বলে উঠল। মেয়েটি কুপের বাইরে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে হাসিমুখে আবার এল ভেতরে।
     আমি ওর বসবার সুবিধের জন্য মিডল বার্থটা নামিয়ে দিলাম। সুজয় তখন ওপাশের বার্থে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি মেয়েটিকে বললাম, “আপনি চাইলে আমরা কিন্তু কুপের বাইরে যেতে পারি।”
     “কোনও দরকার নেই। তা ছাড়া আমাকে কাছাকাছিই নেমে যেতে হবে। যদি ঘুমিয়ে পড়ি তো মুশকিল হয়ে যাবে।”
     “এইটুকু পথ যাওয়ার জন্য আপনি রাতের গাড়ি ধরলেন কেন? তাযও এইভাবে একা!” মেয়েটি সে-কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “আমার কথা থাক। আপনারা কোথায় যাচ্ছেন বলুন?”
     “আমরা শিমুলতলা যাচ্ছি।” 
    “কেউ আছে বুঝি সেখানে?” 
     “উহুঁ। কেউ নেই, এমনই বেড়াতে যাচ্ছি।” 
     “কোথায় উঠবেন ঠিক করেছেন ?” 
     “আমাদের এক বন্ধু বলে দিয়েছেন রানিকুঠিতে উঠতে।” 
     “ওখানে যদি জায়গা না পান ?” 
     “তা হলে অন্য কোথাও উঠব।” 
    “আপনারা মাধবী লজে উঠবেন।” 
    “আপনি কখনও উঠেছিলেন ওই লজে ?” 
    “না, না। ওখানে মানে শিমুলতলায় আমার মেজো মাসি থাকেন। আমি প্রায়ই যাই। খুব ভাল জায়গা। আমার তো গেলে আসতে ইচ্ছে করে না।”
     “তা হলে চলুন না আমাদের সঙ্গে? আপনি থাকলে খুব ভাল হবে। আপনার সাহায্য নিয়ে চারদিক বেশ ভালভাবে ঘুরে দেখে নিতে পারব। আপনিও এই সুযোগে আর-একবার আপনার মাসির বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারবেন।”
     মেয়েটি বলল, “যেতে খুবই ইচ্ছে করছে। তবে এখন আমার যাওয়ার কোনও উপায় নেই।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিছু যদি মনে না করেন, আপনাকে একটা দামি জিনিস দেব, সেটা দয়া করে আমার মাসির বাড়িতে পৌছে দেবেন?”
     “নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু আমরা আপনার সম্পূর্ণ অপরিচিত। আপনি বিশ্বাস করে দামি জিনিসটা আমাদের হাতে দেবেন? ধরুন, যদি আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করি?” 
     মেয়েটি হাসল। বলল, “তা আপনারা করবেন না। আমি মানুষ চিনি।” 
     “বেশ, দেবেন। কিন্তু সেই দামি জিনিসটা কী?” 
     “যখন দেব তখনই দেখতে পাবেন। আমার যাওয়ার উপায় থাকলে আমিই গিয়ে দিয়ে আসতাম।”
     “উপায় নেই কেন ?” 
     “কী হবে জেনে? আপনি বড় সেন্টিমেন্টাল। শুনে আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনার ওই বন্ধুটি তো দরজাই খুলতে দিচ্ছিলেন না আপনাকে। আপনি জোর করে খুলে দিলেন, তাই। সত্যি, সবাই যদি আপনার মতো হত !”
     “আমার বন্ধুটি দরজা খুলতে দিচ্ছিলেন না সে-কথা আপনি কী করে জানলেন?” 
     মেয়েটি হেসে বলল, “আমি সব জানতে পারি।” 
     “তা জানুন। কিন্তু আমিও আপনার সব কথা জানতে চাই।” 
     মেয়েটি স্নান মুখে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “শুনবেন?” বলেই উঠে দাঁড়াল। 
     “কোথায় যাচ্ছেন?” 
     “একবার টয়লেট থেকে আসি, এসে বলছি।” মেয়েটি দরজার লক খুলে টয়লেটের দিকে গেল। ও বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই কুপের ভেতরটা সেই ঝাঁঝালো গোলাপি গন্ধে ভরে উঠল। সেইসঙ্গে হু হু করে বাতাস ঢুকতে লাগল কামরার মধ্যে। অমনই শোনা গেল গেটের পাল্লার দড়াম-দড়াম শব্দ। সর্বনাশ, মেয়েটি লকগুলো খুলে দিয়েছে নাকি?
সুজয় তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। আমি ওকে ডেকে তুললাম। বললাম, “তোর কথা না শুনে খুব ভুল করেছি রে ভাই! মেয়েটি নিশ্চয়ই কোনও দুষ্টচক্রের সঙ্গে জড়িত। টয়লেটে যাওয়ার নাম করে দরজার লকগুলো খুলে দিয়েছে। পরের স্টেশনে নির্ঘাত ডাকাত পড়বে।”
     সুজয় লাফিয়ে নামল বার্থ থেকে, “বলিস কী রে!” 
    “হ্যাঁ। ওই দ্যাখ দরজাটা খোলা।” 
     সুজয় রেগে বলল, “দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা। আমার সঙ্গে চালাকি? আমি জানতুম বলেই বারণ করেছিলাম। কই, চল তো দেখি কোথায় গেল ?”
     “টয়লেটে গেছে। কিন্তু আমাদের এই কুপের ভেতরটা কেমন ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছে দখেছিস ?”
     “ভরে ওঠাচ্ছি।” বলে এগিয়ে গেল টয়লেটের দিকে। আমিও গেলাম ওর সঙ্গে। প্রথমেই গেটের পাল্লা দুটাে লক করে দিলাম। কিন্তু দিলে কী হবে? সঙ্গে-সঙ্গে সশব্দে আপনা থেকেই খুলে গেল পাল্লা দুটাে। একটা ঠাণ্ড স্রোত শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে গেল যেন!
     সুজয়ের কিন্তু এসবে ভ্রক্ষেপ নেই। সে সোজা এগিয়ে গিয়ে টয়লেটের দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। মুখোমুখি দুটি দরজারই একই অবস্থা। কিন্তু মেয়েটিগেল কোথায়? তাকে আর দেখা যাচ্ছে না কেন ?
     ভয়ে গেল ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম আমি। সুজয়ের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও আসানসোলে গাড়ি থামলে বগি বদল করলাম। মেয়েটির সুটকেস তেমনই পড়ে,ওতে আমরা হাতও দিলাম না।
     সে রাতটা প্রায় জেগেই কাটালাম। পরদিন খুব ভোরে ট্রেন শিমুলতলায় নেমে পড়লাম আমরা। 
     শিমুলতলার আকাশে কোনও মেঘ নেই। শিমুলতলার প্রকৃতি ভোরের আলোয় অপরূপ। আমরা স্টেশনে নেমে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে রানিকুঠির দিকে চললাম। স্টেশনের বা দিক দিয়ে যে পথটি লীলাবরণ ঝরনার দিকে চলে গেছে সেই পথ ধরেই গেলাম আমরা। থানার পাশ দিয়ে অনেকটা হেঁটে যাওয়ার পর দূরের ঝাঁঝার পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তারপর লাল মাটির আঁকাবাঁকা পথে দু-একটি দিঘি-সরোবর পার হতেই চোখে পড়ল মাধবী লজ। আমরা মাধবী লজ ছেড়ে রানিকুঠিতে এলাম। কিন্তু বিধি বাম। এখন সিজন-টাইম নয় বলে রানিকুঠির অধিকাংশ ঘরই মালগুদামে পরিণত হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই মাধবী লজে উঠতে হল।
     মাধবী লজের দরোয়ান কেয়ারটেকার যাই বলো না কেন, সবই ওই গফুর। বেশ লম্বা-চওড়া লোকটি। বয়স ষাট-পয়ষট্টির কাছাকাছি। ব্যবহার ভদ্র। আমরা যেতেই খুব আগ্রহের সঙ্গে একটি ঘর খুলে দিল আমাদের। খুব যে একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর তা নয়। তবে বেশ বড়সড়। বাথরুম লাগোয়া। কল আছে কিন্তু জল নেই। বাইরে একটা ইদারা আছে। সেখান থেকে জল এনে ভরতে হবে। এই ঘরের লাগোয়া আর-একটি ঘর আছে। সেটি আকারে ছোট। তবে বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
     আমরা বললাম, “এই ঘরটাই আমাদের দাও না গফুর। দু'জন তো আমরা। ছোট ঘরই আমাদের পক্ষে ভাল।”
     গফুর বলল, “না বাবু, ও ঘর ভাড়া হয়ে গেছে। একজনের আসবার কথা, না হলে ওটাই আপনাদের দিতাম।”
     দুটি ঘরের মাঝখানে দরজা। দরজার শিকলটা আমাদের দিকে। গফুর দরজায় শিকল তুলে দিল। বলল, “এই দরজা একদম খুলবেন না বাবু ও ঘরেও যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।”
     “ওরা তা হলে যাতায়াত করবে কোথা দিয়ে ?” 
     “ওদিকে আর-একটা দরজা আছে। সে দরজায় তালা দেওয়া। চাবিটা খুঁজে পাচ্ছি না তাই। না হলে ও ঘরে গিয়ে এই দরজায় ছিটকিনি এঁটে দিতাম।”
     আমি বললাম, “গফুর, ওই ঘরটাই আমাদের চাই। ওরা এলে তুমি বরং ওদেরকেই এই ঘরে পাঠিয়ে দিয়ো।”
     “অ্যায়সা কভি নেহি হো সকতা। ওঁরা আমাদের পুরানা আদমি। হরবখত আসেন। তাই ওই ঘরটাই পছন্দ করেন। অ্যাডভান্স রুপিয়া ভি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাজেই ডবল ভাড়া দিলেও ও ঘর আপনাদের আমি দেব না।”
     “বেশ, তোমার অসুবিধে থাকে দিয়ে না। আমরা বরং অন্য কোথাও চলে যাই।” 
     “যো আপকো মর্জি। তবে এই ঘর ছাড়লে কিন্তু ভুল করবেন।” 
     “কেন, এখানে কি আর কোথাও ঘর খালি নেই?” 
     “নেহি। এই সময় এখানে কোনও লোক আসে না।” 
    “কিন্তু তোমার এখানে বাথরুমে তো জলাভাব।” 
    “সেজন্য আমি আছি। আমি ইদারা থেকে পানি তুলে এনে দেব আপনাদের। যাওয়ার সময় দু-পাঁচ টাকা বকশিশ দিয়ে দিবেন।”
     আমরা আর কী করি, মাধবী লজেই রয়ে গেলাম। ঘরে জিনিসপত্র রেখে দরজায় তালা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম শিমুলতলার পথে পথে। চারদিকে ভিজে লাল মাটি আর সবুজের সমারোহ। এখনও এত গাছপালার ঘনত্ব খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। পায়ে-পায়ে আমরা লাটু পাহাড়ের দিকে এগোলাম। জায়গাটা বেশ নির্জন এবং এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য বেশ চমৎকার। আমরা অনেকক্ষণ ধরে লাটু পাহাড়ে বেড়িয়ে আবার যখন ঘরে ফিরলাম তখন চড়া রো্দ্দুরে চারদিক ঝাঁঝাঁ করছে। আমরা এসে ইদারার জলে স্নান করে মোড়ের মাথায় গিয়ে একটা দোকানে দুটো ডাল-ভাত খেয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।
     এ-ঘরে পাশাপাশি দুটো খাট পাতা। একটাতে আমি, অন্যটিতে সুজয়। শুয়ে-শুয়ে আমরা গতরাতের সেই রহস্যময়ীর ব্যাপারে আলোচনা করতে লাগলাম।
     সুজয় অবশ্য একটু গম্ভীর। কাল রাত থেকেই ও যেন কীরকম হয়ে গেছে। আমি বললাম, “মেয়েটার ব্যাপারে আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিই বল তো? ওইভাবে দুমদাম দরজা খুলে যাওয়া, টয়লেট থেকে অদৃশ্য হওয়া, আর ওই গোলাপ ফুলের গন্ধ, এর থেকে আমরা কী ধারণা করতে পারি?”
     সুজয় গম্ভীর স্বরেই বলল, “যা করবার। অর্থাৎ কিনা আমরা ভূতের পাল্লায় পড়েছিলাম। ভূত ছাড়া কিছুই নয়, ওটা একটা প্রেতিনী।”
     “ভাগ্যে বুদ্ধি করে কামরাটা বদল করেছিলাম, না হলে কী যে হত। তবে মেয়েটি খুবই ভাল,ভুত-প্রেতিনি যেই হোক না কেন, আমাদের সঙ্গে কিন্তু কোনওরকম দুর্ব্যবহার করেনি।”
     “কিরেনি বলেলেই হল? ওইভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, দুমদাম করে দরজা খুলে দেওয়া, এগুলো বুঝি ভদ্র ব্যবহারের নমুনা?”
     “তা হয়তো নয়, তবে আমার মনে হয়, ওইসবের মধ্য দিয়ে ও নিশ্চয়ই ওর অস্তিত্বের অলৌকিকত্বটা বোঝাতে চেয়েছিল। ওর মনে কোনও বদ মতলব থাকলে ও নিশ্চয়ই অন্য কোনওভাবে ভয় দেখাত আমাদের।”
     এইভাবে কথা বলতে বলতে দুপুর গড়িয়ে দিলাম আমরা। বিকেলে আবার বেড়াতে বেরিয়ে দূরের ঝাঁঝার পাহাড়গুলো দেখতে-দেখতে অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। সন্ধে উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও আমরা সেই নির্জন প্রকৃতির লীলাভূমিতে বিচরণ করে আবার যখন মাধবী লজে ফিরে এলাম, তখন দেখি, আমাদের পাশের ঘরে আলো জ্বলছে। খুটখাট শব্দও শোনা যাচ্ছে। তার মানে যাদের আসবার কথা ছিল, তারা এসে গেছে।
     আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। একবার ভাবলাম, আমাদের এদিকে দরজায় শিকল তো দেওয়া আছে, ঝনঝন করে নাড়া দিয়ে ওদের ডাকি এবং দু ঘরের দরজা খোলা রেখে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করি। আবার ভাবলাম, কী দরকার। যদি ওঁরা অন কিছু মনে করেন। তাই মনে-মনে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিজেদের মধ্যেই নানা বিষয়ের আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগলাম।
     সুজয় বলল, “এই সময় গফুরটাকে পাওয়া গেলে খুব ভাল হত।” 
   “ও থাকলে কী করত ?” 
    “ওকেই বলতাম ওদের সঙ্গে একটু পরিচয় করিয়ে দিতে।” 
    “ঠিক বলেছিস। ডাকব গফুরকে?” 
     “ডাক।” আমি বাগানে এসে অনেক হাঁকডাক করলাম। কিন্তু কোথায় গফুর? তার কোনও সাড়াশব্দও পেলাম না। এমন সময় হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। কী নিদারুণ অন্ধকার চারদিকে। পাশের ঘর থেকে স্ত্রীলোকের গলার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল।
     সুজয় বলল, “এই সুযোগ। এইবার বরং শিকল নেড়ে ওদের ডাকা যেতে পারে।” 
    “সেটা কিন্তু আরও খারাপ হবে।” 
    “খারাপ হবে কেন? আমরা চালাকি করে একটা দেশলাই চাইব। অন্ধকারে যে কেউ যাকে ইচ্ছা দেশলাই চাইতে পারে। তা ছাড়া সত্যিই তো আমাদের কোনও বদ মতলব নেই। শুধু এই প্রেতপুরীর মতো ভয়ানক নির্জনতায় একটু মানুষের সান্নিধ্য চাই।” এই বলে সুজয় এগিয়ে গিয়ে দরজার শিকল খুলে একবার ঝনঝন শব্দ করল। মুখে বলল, “যদি কিছু মনে না করেন তো দরজাটা খুলবেন একবার?”
     বলার সঙ্গে-সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। সেইসঙ্গে গতরাতে ট্রেনের মধ্যে যে মিষ্টি গোলাপের গন্ধটা পেয়েছিলাম, সেই গন্ধে ভরে উঠল ঘর। আমার সারা শরীর হিম হয়ে গেছে তখন। হবে নাই-বা কেন ? এই মিষ্টি গন্ধের সঙ্গেই তো সেই অশুভ আবির্ভাব হয়। তবে? তবে কি আবার আমরা সেই প্রেতিনীর পাল্লায় পড়লাম? কিন্তু না, এই অন্ধকার ঘরে কেউ কোথাও নেই।
     সুজয় বলল, “এ-ঘরে কে আছেন? অনুগ্রহ করে একটা দেশলাই ধার দেবেন আমাদের ?”
    আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম, “এ-ঘরে কেউ নেই সুজয়, চলে আয়।” ও তবুও ঘরে ঢুকল। আর ঢোকামাত্রই সেই অন্ধকারে একটি হাত এগিয়ে এল, “এই নিন দেশলাই।”
     বলা বাহুল্য, সে হাত একটি মেয়ের। সুজয় তার থেকে দেশলাইটা নিতে যেতেই হো হো করে হেসে উঠল সে। আমি সভয়ে পিছিয়ে এলাম। এইবার একটু-একটু করে অন্ধকারে তার ছায়াশরীর স্পষ্ট হল। তাকে দেখেই চমকে উঠলাম। এ আর কেউ নয়, কাল রাতের সেই রহস্যময়ী।
     আমি তখন এক লাফে বাইরে এসেই একেবারে রাস্তার মোড়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগলাম, “গফুর, গফুর!”
     আমার চিৎকার শুনে মোড়ের মাথা থেকে গফুর এবং আরও কয়েকজন ছুটে এল, “কী হল বাবুজি ? মনে হচ্ছে খুব ভয় পেয়েছেন?”
     “হ্যাঁ। তোমরা সবাই এসো, গিয়ে দেখবে চলো কী অঘটন ঘটে গেছে।”
     “কী হয়েছে?” 
     “গেলেই দেখতে পাবে। দেরি কোরো না, তা হলে আমার বন্ধুকে বাঁচাতে পারব না।” এই কথায় সবাই একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর গফুরের ডাকে অন্তত জনাদশেক লোক ছুটে এল হইহই করে।
     গফুর বলল,“আমি বারবার মানা করেছিলাম পাশের ঘরের দরজা খুলতে। নিশ্চয়ই খুলেছিলেন আপনারা ?”
    আমি নতমস্তকে বললাম, “হ্যাঁ।” 
    “কেন খুলেছিলেন?” ততক্ষণে আলো এসে গেছে। আমরা ঘরের ভেতরে গিয়ে যা দেখলাম, তা বড়ই মর্মান্তিক। ঘরের মধ্যে সুজয়ের দেহটা ঝুলছে। সে ছাড়া সেই ঘরে আর কারও অস্তিত্বই নেই। আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল।
সেই রাতেই আমি মাধবী লজ ত্যাগ করে স্টেশনের কাছে এক বাঙালির বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ওদের মুখেই শুনলাম, কিছুদিন আগে মাধবী লজের ওই ঘরটিতে এক যুবক আত্মহত্যা করেন, তারপর থেকে ওই ঘরটি বন্ধই থাকে। কাউকে ভাড়া দেওয়া হয় না।
     ভদ্রলোকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে সেই রাতেই আমি সুজয়ের বাবাকে টেলিগ্রাম করলাম। টেলিগ্রাম করতে গিয়ে এমনই এক সংবাদ পেলাম, যাতে আমার চিত্ত দারুণভাবে বিচলিত হল। সংবাদটি হল, মর্গে নিয়ে যাওয়ার সময় ভ্যান থেকেই নাকি সুজয়ের লাশটি উধাও হয়ে যায়। কাল ওর বাড়ির লোকেরা এলে কীভাবে যে কী কৈফিয়ত দেব তা ভেবে পেলাম না। বেশ তো একা আমি আসছিলাম। কেন যে জড়াতে গেলাম ওকে, তা ভেবেই মনখারাপ হয়ে গেল। তবুও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
     ফিরে আসতেই আর-এক চমক। যে বাড়িতে উঠেছিলাম সেই বাড়ির ভদ্রলোক বললেন, “ভাগ্যের কী পরিহাস দেখুন, একদিকে দু বন্ধুতে বেড়াতে এসে একজনকে হারিয়ে বসলেন। অন্যদিকে ট্রেনের কামরায় হারিয়ে যাওয়া জিনিস ঘরে বসেই ফেরত পেলেন।”
     আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “ট্রেনের কামরায় হারিয়ে যাওয়া জিনিস মানে ? আমার তো কিছুই হারায়নি।”
     “সে কী! না হারালে এটা তা হলে কার?” আমার দু’ চোখ কপালে উঠে গেছে তখন। এ যে ট্রেনের কামরায় ফেলে-আসা মেয়েটির সুটকেস। বললাম, “এ আপনি কোথায় পেলেন ?”
     “একটু আগে একটি মেয়ে এসে দিয়ে গেছে আপনাকে।” 
     ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল আমার। বুকের ভেতরও টিপঢিপ করতে লাগল। এবার কি আমি ওর গ্রাস? বললাম, “কিছু কি বলে গেছে?”
     “বলেছে, আপনারা নাকি একই ট্রেনে আসছিলেন। ভুল করে সে আপনার সুটকেসটি নিয়ে যায়। তাই এটি ফেরত দিয়ে গেছে। আর বলে গেছে, অম্বিকা কুণ্ডুর বাড়িতে আপনাকে একবার দেখা করতে।”
     কে অম্বিকা কুণ্ডু, তা জানি না। কোথায় থাকেন, জানি না তাও। তবে আমি আর এক মুহুৰ্তও সেখানে অপেক্ষা না করে সুটকেসটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে।
     ভদ্রলোক বললেন, “করেন কী, করেন কী মশাই? এই রাতদুপুরে কোথায় চললেন? একে এইরকম একটা ব্যাপার ঘটে গেল, তার ওপর অচেনা জায়গায় কার খপ্পরে পড়বেন তার ঠিক কী ?” -
     কিন্তু আমার মনের মধ্যে তখন আর আমি কি আছি? কী এক অদৃশ্য শক্তি ভর করে আমাকে যেন হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে চলল। কোথা দিয়ে কীভাবে যে গেলাম তা এখনও আমি মনে করতে পারি না। তবে একটা প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে এসে দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে সাড়া এল, “কে?”
     “এটা কি অম্বিকা কুণ্ডুর বাড়ি?”
     “হ্যাঁ। একটু দাঁড়ান।”
     আমি দাঁড়িয়েই আছি। এমন সময় দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক সুবেশ তরুণী। তাঁকে দেখেই আমার হাত থেকে সুটকেসটা পড়ে গেল। আমি অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে জ্ঞান হারালাম।
     পরদিন সকালে জ্ঞান যখন ফিরল, তখন দেখি অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে আমার চারপাশে। সবাই বলল, “কী ব্যাপার! কাল হঠাৎ কী হল আপনার ? কাকে দেখে অমন ভয় পেলেন?”
     আমি তখনও সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছি। কেননা মেয়েটি আমার পাশেই বসে ছিল। আমি ভয়ে-ভয়ে বললাম, “ও কে? ওকে চলে যেতে বলুন। ওকে দেখেই আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
     সরে যাওয়া দূরের কথা, ও আমার আরও কাছে এগিয়ে এসে বলল, “কেন, চলে যাব কেন? আমি কি ভূত না পেতনি? তা ছাড়া আপনি আমাদের যা উপকার করেছেন তা ভোলবার নয়। ওই সুটকেসের ভেতরে দশ ভরির মতো সোনার গয়না আর পঞ্চাশ হাজার টাকা ছিল। ও জিনিস হাতে পেয়ে কেউ ছেড়ে দেয় না। আপনি মহানুভব তাই ফেরত দিতে এসেছেন।”
     আমি বললাম, “দেখুন, আমার যেন কীরকম সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আপনি কে?”
     “আমি চন্দনা। কিন্তু ওই সুটকেস আপনার হাতে এল কী করে?” 
     “কেন, আপনিই তো দিয়েছেন।” 
     “আমি দিয়েছি? একটু মনে করে দেখুন তো কীভাবে কী হল। মনে হচ্ছে অলৌকিক ব্যাপার কিছু ঘটে গেছে।”
     আমি এবার সাহস পেয়ে উঠে বসলাম। আগাগোড়া সমস্ত ঘটনার কথা খুলে বললাম ওঁদের। সব শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ওঁরা। তারপর ওঁদের মুখে যা শুনলাম তা আরও মর্মান্তিক:
     চন্দনারা দু’ বোন। বন্দনা ও চন্দনা। যমজ বোন ওরা। বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্গাপুরে থাকে। এটা ওদের মাসির বাড়ি। একবার বন্দনা পরিচিত একটি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে বাড়িতে প্রচণ্ড আপত্তি ওঠে। বন্দনা তাই এক রাতে ওরই বিয়ের জন্য রাখা গয়না ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। হয়তো সে মাসির বাড়িতেই আসত। কিন্তু দৈবে তার সে ইচ্ছা পূর্ণ হয় না। সেও ছিল এক দুর্যোগের রাত। স্টেশনের কিছু লোক ওকে মধ্যরাতে সাপ্তাহিক নর্থ-বিহার এক্সেপ্রেসের চলন্ত গাড়িতে উঠতে দ্যাখে। কম্পার্টমেন্টের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় সম্ভবত ভেতরে ঢুকতে পারে না বেচারি। পরে কিছুদুর যাওয়ার পর দেহের ভারসাম্য রাখতে না পেরে হাত ফসকে পড়ে যায়। পরদিন ওর ডেডবডি পাওয়া গেলেও এই সুটকেসের সন্ধান কেউ দিতে পারে না।
     আমি বললাম, “আশ্চর্য, যদি ওর প্রেতাত্মাই আমাকে দেখা দিয়ে থাকে তা হলে বারবার ও ট্রেনের টয়লেটের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল কেন?”
     “সেটা তো আমাদের পক্ষেও বলা শক্ত। তবে মাধবী লজের যে ঘরে কাল রাতে ওই মর্মাস্তিক ঘটনাটি ঘটে, সেই ঘরে এক যুবক বন্দনার দুর্ঘটনার খবর কাগজে বেরনোর পরই আত্মহত্যা করে। হয়তো এমনও হতে পারে, ওই ছেলেটিই বন্দনার পরিচিত সেই ছেলে।” যাই হোক, পরিচয়-পর্ব সেরে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় চমকের পর চমক। হঠাৎ দেখি মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সুজয় এসে হাজির। নেহাত দিনের বেলা তাই, না হলে হার্টফেল করতাম। তবুও আমার শরীরের সমস্ত রক্ত তখন মুখে এসে জমাট বেঁধেছে। কোনওরকমে বললাম,“সুজয় তু-তু-তুই!”
     “হ্যাঁ আমি। কীসব উলটোপালটা টেলিগ্রাম করেছিস? তোকে কি ভূতে পেয়েছে না মাথাখারাপ হয়েছে তোর ? আমি তোর সঙ্গে এলাম কখন যে, আত্মহত্যা করব ?”
     “এলাম কখন মানে? মাধবী লজে একবার চল তো, সবাই সাক্ষী দেবে তুই এসেছিলি কিনা ?”
     “কী আশ্চর্য! তুই বিশ্বাস কর, সে রাতে ওই প্রচণ্ড বৃষ্টির জন্য ঘর থেকে বেরোতেই পারিনি। আমি ধরে নিয়েছিলাম তুইও বোধ হয় যাওয়া ক্যানসেল করেছিস। কিন্তু তুই যে কার সঙ্গে এসেছিস তা ভগবানই জানেন। কাল তোর টেলিগ্রাম পেয়েই মাথা ঘুরে গেছে আমার। ভাবলাম, আমি না যাওয়ায় রসিকতা করে টেলিগ্রাম করেছিস। কিন্তু এটা যখন বাবাকে, তখন কেন জানি না মনে হল কোথাও একটু গোলমাল হয়েছে। তাই মা-বাবা দু’জনকেই নিয়ে এসে হাজির করেছি।”
     সুজয়ের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এবং আমার যে মাথাখারাপ হয়নি তার প্রমাণস্বরূপ মাধবী লজের গফুর থেকে স্থানীয় সকলেই অকপট বিবৃতি দিলেন। এমনকী মর্গে নিয়ে যাওয়ার পথে লাশ উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাও গোপন রাখলেন না কেউ। ভৌতিক ঘটনার এমন রোমাঞ্চকর নাটকীয়তা আমাদের সকলকেই বিস্মিত করল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য