ছিঃ কি লজ্জা - আদিবাসী লোককথা

     গ্রামের মানুষ খুব বিপদে পড়েছে। বিপদ বলে বিপদ, এক মহাবিপদ। তালের গাছ থেকে ফলের সব শাস কে যেন চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এত তালগাছ গায়ে, কিন্তু সব শাস চুরি যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের কষ্টের সীমা নেই। এই শাঁস থেকে তারা তেল তৈরি করে। সেই তেল দিয়ে রান্না করে, তরিতরকারি বানায়, মাংস রাঁধে। তেল নেই, রান্না করা যচ্ছে না, যাও বা রান্না হয়, মুখে রোচে না। বড় কষ্ট তাদের। এমনিতে কত কষ্ট, কত বিপদ-আপদ, তার ওপরে আর এক নতুন বিপদ।
     তারা অনেক চষ্টা করল, বাবার চেষ্টা করল, অনেক কায়দা করল, বহু ধরনের বুদ্ধি খাটাল— কিন্তু চোর আর ধরা পড়ে না। যতরকম কৌশল করে, বৃথা যায়। চোর অনেক চালাক, বারবার সে তাদের বোকা বানাতে লাগল। তাদের মাথায় হাত। চোর ধরা পড়ল না ।
     শেষকালে তারা সবাই মিলে সন্ধেবেলা সর্দারের বাড়ির উঠোনে পরামর্শ করতে বসল। নানা রকমের কথা উঠল, নানা ধরনের বুদ্ধি এল, কথা কাটাকাটি চলল। শেষে একজন বুড়োমতন লোক বলল, “আমি অনেক দেখেছি, অনেক শুনেছি। আসলে বাপু, দেবতা রাগ করেছেন। তিনি রাগ করলে ওসব চোর-টোর ধরা যায় না। অন্য ব্যবস্থা দেখ। সবাই মেনে নিল বুড়োর কথা, সায় দিল তার পরামর্শে।
     তারা দেবতার থানে ভক্তিভরে ছাগল বলি দিল, ভেড়া বলি দিল, মুরগির ছানা বলি দিল। যার যেরকম সামর্থ্য তাই দিয়ে দেবতার পুজো করল। সবাই দিনে-রাতে দেবতার থানে আর্জি জানাল,--হে দয়াল দেবতা, আমাদের সাহায্য করুন, আমাদের বাঁচান, আমরা বড় গরিব।
     দিন যায়, রাত যায়। আবার ফিরে আসে দিন, ফিরে আসে রাত। চোর কিন্তু ধরা পড়ে না। কে যে চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছে কেউ তা বুঝতে পারল না। সবার মনে ভয়, সবার মনে চিন্তা।
     চোর আর কেউ নয়, একটা কচ্ছপ। গভীর রাত, কালো কুকুরের গায়ের মতো কালো আঁধার চারিদিকে, কোন সাড়াশব্দ নেই কোথাও, বাইরে ঘুরছে কেবল বুনো জানোয়ার। সেই সময় কচ্ছপ হামাগুড়ি দিয়ে তার বাড়ি থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ে, চলার সময় পায়ে কোন শব্দ হয় না। হাতে থাকে একটা ধারালো ছুরি আর একটা বস্তা, বস্তার মধ্যে এক টুকরো শক্ত দড়ি। দড়ি পায়ে জড়িয়ে কচ্ছপ তরতর করে তাল গাছে উঠে পড়ে, ছুরি দিয়ে তালের শাস কাটে— তারপরে সেগুলো বস্তায় ভরে। নেমে আসে গাছ থেকে। আবার ওঠে অন্য গাছে। রাতের অনেকক্ষণ ধরে তার এই কাজ চলে। তারপরে পুব দিকে লাল থালাটা উঠবার অনেক আগেই নিঃশব্দ পায়ে গুটি-গুটি ফিরে চলে নিজের বাড়িতে। সব রাতেই একভাবে কাজ করে চলে কচ্ছপ।
      সকালের দিকে ঘুমটা তার ভালোই জমে। কেনই বা জমবে না।
     এমনি করে চলে রাতের পর রাত। এক রাতে কচ্ছপ ছুরি বস্তা দড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরুতে যাবে,– এমন সময় বউ বলল, ‘আজ ঘরে থাকো, আজ আর যেও না। সত্যি যেও না ।
     ‘কেন?—লম্বা গলা আরও লম্বা করে কচ্ছপ তাকাল। বিরক্ত হয়ে কথা বলল । কচ্ছপ-বউ ভয়ে ভয়ে বলল, দেখো, বাইরে কী ভীষণ অন্ধকার। কালো চুলের মতো। যদি তোমার কিছু হয়। বড্ড ভয় করছে।
     কচ্ছপ ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, “বউ, অাঁধার রাতই তো ভালো। বড় পছন্দ করি আঁধার রাত। কিছু ভয় নেই। আমি ঠিকাঠক ফিরে আসব।
     বউ জলভরা চোখে বলল, 'না, তুমি যেও না। অন্তত আজকের রাতটুকু ঘরে থাকো। কেন যেন বড় ভয় করছে।
    কিন্তু কাজ হল না। কচ্ছপের লোভ খুব বেড়ে গিয়েছে। অনেক দিন ধরে চুরি করছে, একদিনও ধরা পড়েনি। সাহসও তাই সীমা ছাড়িয়েছে। লোভ ও সাহস তাকে রাতে ঘরে থাকতে দেয় না। আরও তালের শাঁস চাই, আরও আরও। ঘরের দোরের কাছে গিয়ে কচ্ছপ বলল, “বউ, আজ বড় কালো আঁধার রাত। আজকে আমায় যেতেই হবে। ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ কালকে আমি ঘরে থাকব, কালকে বাইরে যাব না। আজকে আমায় যেতেই হবে ?
     ‘হায় কপাল । বউ কাঁদতে কাঁদতে ঘরের বাইরে এল। কচ্ছপ অন্ধকার বনে মিলিয়ে গেল। কিন্তু আজকে যেন খুব বেশি অন্ধকার। অন্ধকারে চলতে-ফিরতে কচ্ছপ খুব পারে, অনেক দিন ধরে তার এই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। কোনই অসুবিধা হয় না। কিন্তু তারও আজ কষ্ট হতে লাগল। দু-একবার হোঁচট খেল, মাথাটা গিয়ে লাগল গাছের গুড়িতে। এত অসুবিধে তো আগে কখনও হয়নি। ভাবল নাঃ, আজকে নাহয় বাড়ি ফিরেই যাই। আর বউ যখন অমন করে বারবার বলল। বউ পেছন থেকে একবার ডাকলেই সে ফিরে যেত। কিন্তু বউ তখন কাঁদছে। কচ্ছপ ফিরল না। এগিয়ে চলল গুটি গুটি।
     কিন্তু এগোনো আজ বড় কঠিন। বেশ ব্যথা পেল কয়েকবার। একবার উলটে এক গর্তে গেল পড়ে। পায়ে কাটার খোঁচা লাগল, "না, আজ বেরিয়ে ভালো কাজ করিনি। ঘরে থাকলেই হত। আজ কাজে যাওয়া ঠিক হয়নি। বেশ বেগতিকে পড়লাম।
     ভাবতে ভাবতেই এক মস্ত শক্ত গাছের গুড়িতে তার মাথা প্রায় থেতলে গেল। ঝিম ঝিম্ করে উঠল মাথাটা। চোখ অন্ধকার হয়ে এল। হঠাৎ চোখ মেলে কচ্ছপ দেখল— গাছটা এদিক ওদিক দুলছে আর হাসছে, দুলছে আর হাসছে। কচ্ছপ এক মুহূর্ত ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। কি অবাক কাণ্ড। তারপরে ঘুরেই দৌড় লাগাল বাড়ির দিকে। ভয়ে পা সেঁদিয়ে যাচ্ছে, তবু সে ছুটছে। মাথার ব্যথার কথা একেবারেই ভুলে গেল। শেষকালে থামল তার বাড়ির দরজায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি এসেছি বউ, দরজা খোল। বউ খুব খুশি হল। তার কথায় কচ্ছপ শেষকালে ফিরে এসেছে। আবার অবাকও হল। তাকিয়ে রইল তার দিকে। কিন্তু কচ্ছপ কোন কথাই বলল না। যা ঘটেছে তার কথাও কিছু বলল না।
      দিন হল। দিন শেষ হল। আবার রাত এল। আবার অন্ধকারে গুটিগুটি এগিয়ে চলল কচ্ছপ। আজ সে বেশ আস্তে আস্তে হাঁটছে। কচ্ছপ তালগাছে উঠল, শাস কেটে বস্তায় ভরল, নেমে এল। সে জানে না। সেই গাছ সব কিছু দেখল। যে গাছ আগের রাতে দুলছিল হাসছিল,— সে সব দেখল। কচ্ছপ ফিরে চলল বাড়িতে। না আজ কিছু অঘটন ঘটে নি। সে খুশি।
     যে গাছটি হেসেছিল, সে হল আলুমো—সে হল হাসির রাজা। আলুমো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে পাশের গাছগুলোকে কচ্ছপ চোরের কথা বলল। তারাও ভয় পেয়ে গেল ।
     'চোর!’ নারকেল গাছ অবাক হল। 
     ‘তাহলে সে তো খুব শয়তান!’ আমগাছ বলল।
     ‘কিন্তু কিছু তো করা দরকার।’ পেয়ারা গাছ বলল। 
     ‘তাহলে? তাহলে আমরা কি করতে পারি?’ শিরীষ গাছ জিজ্ঞেস করল। 
    ‘ওকে শাস্তি পেতেই হবে। ওসব ছাড়াছাড়ি নেই।’ পিপুল গাছ বলে উঠল। 
    ‘কি শাস্তি তাকে দেওয়া হবে?’ লেবু গাছ মাথা নেড়ে বলল। 
     অন্য গাছগুলো একসঙ্গে গলা মিলিয়ে চিংকার করে উঠল, 'গায়ের লোকজন কি মরে যাবে? ওদের সাহায্য করতেই হবে।
     সবাই সায় দিল। তারপরে তাকাল আলুমোর দিকে। আলুমো বলল, ‘ওকে এমন ভয় পাইয়ে দিতে হবে যে জীবনে না ভোলে। তাহলেই ও জব্দ হবে?
     সব গাছ বলে উঠল, ‘খুব ভালো কথা, ভালো কথা। ঠিক বলেছে আলুমো! আলুমে একটু চুপ করে রইল। তারপরে আস্তে আস্তে বলল, “কি করতে হবে পরে আমি তোমাদের বলে দেব। চোর যখন আসবে তখন বুঝিয়ে বলব।
     পরের রাতে কচ্ছপ আবার রাতের অাঁধারে বের হল। আজ তার ভয় একটু কম। গত রাতে তো কিছুই অঘটন ঘটেনি। সে হেলেদুলে গুটিগুটি এগিয়ে চলল। তাকে দেখতে পেয়েই আলুমো হাসতে লাগল। সে হাসছেই, হাসছেই।
     অশেপাশের গাছগুলো হাসি শুনে জিজ্ঞেস করল, ও আলুমো, আলুমো— তুমি এমনভাবে হাসছ কেন? কি হয়েছে বলই না, তুমি তো হাসির রাজা, আলুমো, এমন করে হাসছ কেন?’
     আলুমো তখন হাসি থামিয়ে একটা গান গেয়ে উঠল। তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে সব গাছ গেয়ে উঠল:

চলে কচ্ছপ গুটিগুটি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো,
রাতের আঁধার পড়ে লুটি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
ডান হাতে তার ছুরি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
বাম হাতে তার দড়ি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
পেছনেতে বস্তা ধরি। 
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো। 

     হঠাৎ তারা গান থামিয়ে দিল। চারিদিকে নিস্তব্ধ। গানের পরে আরও আরও নিস্তদ্ধ মনে হল। পাতার শব্দও যেন নেই, সব চুপচাপ।
     গাছগুলোর তলা দিয়ে কচ্ছপ এগোচ্ছে। হঠাৎ গাছগুলো তাকে টিটকিরি দিতে শুরু করল, নানাধরনের মজার মজার নামে কচ্ছপকে ডাকতে লাগল। এবার কচ্ছপ সত্যি সত্যি খুব ভয় পেয়ে গেল, চুপ করে দাঁড়িয়ে চারিদিকে দেখতে লাগল। তবু গাছেরা থামে না। কচ্ছপ আর সহ্য করতে পারল না। ভয়ে পেছন ফিরে দৌড় দিল। পথে কোথাও থামল না।
     কচ্ছপ শেষকালে বাড়ি পৌছল। এবার সে ভীষণ রেগে গিয়েছে। তার সবকিছু ভেস্তে গেল। আজ রাতে শাঁস চুরি করা হল না। তার ওপরে এমন টিটকিরি। এমন আজেবাজে নামে ডাকা। বাড়িতে এসে বউয়ের সঙ্গে সে একটিও কথা বলল না। কিছু খেল না। সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম কি আসে।
     এখন হয়েছে কি, সেই রাতে যখন এসব কাণ্ড চলছে তখন সেই পথে গাঁয়ে ফিরছিল এক কিষান। সে সব কিছু শুনল, সব কিছু দেখল। একটু ভয় পেল, খুব অবাক হল। আবার নতুন কিছু জেনে ফেলার আনন্দও আছে। সে সোজা ছুটে এল গাঁয়ে। গায়ে এসেই গোষ্ঠীপতির ঘরে গেল। গোষ্ঠীর সর্দারকে সব কিছু খুলে বলল।
     সর্দার বলল, ‘খুব ভালো। আজ তো অনেক রাত হল। তুমিও ছেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। বাড়িতে গিয়ে ঘুমোও। কাল সকালে আমার কাছে চলে আসবে।
     কিষানের কি আর রাতে ঘুম হয়। বারবার মনে পড়তে লাগল কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। সকাল হতেই সে ছুটে গেল সর্দারের বাড়িতে। গিয়ে দেখে এর মধ্যে আরও কয়েকজন গাঁও-বুড়ো সেখানে হাজির। সবাই মিলে পরামর্শ করতে বসল।
     একজন গাঁও-বুড়ো বলল, এতদিন পরে দেবতা তাহলে মুখ তুলে তাকালেন। আমাদের প্রার্থনা জানানো ঠিক হয়েছে। বলিতে দেবতা সন্তুষ্ট হয়েছেন। যাইহোক, আমরা এই কজনা ছাড়া ব্যাপারটা যেন আর কেউ না জানে। খুব সাবধান। আগে চোর ধরি, তারপরে সব বলা যাবে।
     অল্পবয়সি কিষান বলল, কখনই না, আমি আর কাউকে কিছুই বলব না। অনেক আলোচনার পর ঠিক হল, রাতের বেলা কিষান ছেলের সঙ্গে দুজন গাঁওবুড়ো সেই গাছের কাছে যাবে। যেই কচ্ছপ তালের শাস চুরি করতে আসবে, অমনি
তারা চেপে ধরবে তাকে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেল।
     পরপর তিন রাত তারা সেই গাছের কাছে গিয়ে লুকিয়ে থাকল। কিন্তু কিছুই ঘটল না—না হাসি, না গান, না কচ্ছপের দেখা। দুজন গাঁও-বুড়ো ভীষণ রেগে গেল। তাদের ধৈর্য আর কত রাত থাকবে? আসলে, কচ্ছপ সেই যে ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল এই তিন রাত আর বেরোয় নি। তাই ঘটেও নি কিছু।
     একজন বুড়ো বলল, “কাল রাতে যদি কিছু না ঘটে আমি আর এমুখে হচ্ছি না আর ভালো লাগে না।
    ‘আমিও আসব না’। অন্যজন বলল । 
    কিষান আস্তে আস্তে মুখ নিচু করে বলল, ‘একটু ধৈর্য তো ধরতেই হবে। চোর ধরা তো সহজ কাজ নয়! চোরেরও বুদ্ধি কম নয়। তাছাড়া, একটা কথা তো বুঝতেই হবে। সেদিনের ব্যাপারে কচ্ছপ নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছে। তাই কয়েকটা দিন তো সে আর বাইরে বেরুবেই না, ঘরেই থাকবে। যা ভয় পেয়েছে। তারপরে একটু সাহস ফিরে এলে তবেই না আবার চুরি করতে আসবে! একটু অপেক্ষা করতেই হবে। তবে আমি বলছি, সে আসবেই আজ হোক কাল হোক, তাকে আসতেই হবে। আমরা তাকে ধরবই।
     একজন বুড়ো বলে উঠল, "সবই তো বুঝলাম। কিন্তু আর যে পারি না। তুমি নাহয় এখন অল্পবয়সি, সে কাল আমাদের অনেকদিন আগে চলে গিয়েছে। আমরা তো বুড়ো হয়েছি। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে থাকি কি করে বল? পারি না। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখ কট্‌ কট্‌ করে। কি করি বল।
     ‘আমিও পারি না। অন্য বুড়ো বলল। অনেক কষ্টে সে চোখ খুলে রেখেছে। 
     পরের রাত। চারিদিকে আঁধার। আবার তারা তিনজনে গাছের নীচে এল। অনেকক্ষণ কেটে গেল। কিছু শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ তারা শুনতে পেল, মনে হল হাসির শব্দ। কান খাড়া করে তারা শুনতে চেষ্টা করল।
     একজন বুড়ো বলল, ‘মনে হচ্ছে হাসির শব্দ আসছে? 
     কিষান বলল, ‘হ্যাঁ, হাসির শব্দ। উত্তেজনায় তার বুক কাঁপছে, চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে।
     হঠাৎ আলুমোর হাসির শব্দ শোনা গেল, হাসি ছড়িয়ে পড়েছে নির্জন রাতে : হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ হোঃ হোঃ ।
     অন্য সব গাছ এক সুরে বলে উঠল। আলুমো ও আলুমো, তুমি অমন করে দুলছ কেন? অমনভাবে হাসছ কেন? হলটা কি ?
     আলুমো গান গেয়ে উঠল, সব গাছ গলা মেলাল। রাতের বনভূমি সরব হয়ে উঠল। তারাও শুনল সে গান:


চলে কচ্ছপ গুটিগুটি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো,
রাতের আঁধার পড়ে লুটি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
ডান হাতে তার ছুরি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
বাম হাতে তার দড়ি,
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো, 
পেছনেতে বস্তা ধরি। 
আলুমো, হাসির রাজা, আলুমো। 

     গান থেমে গেল। চারিদিক আবার নিস্তদ্ধ। কচ্ছপ সাহসে ভর করে এগিয়ে চলেছে। লোক তিনজন তার পেছনে পেছনে চুপচাপ এগোচ্ছে। তারা হাঁটছে যেন কচ্ছপ মোটেই টের না পায় । চোরকে আজ ধরতেই হবে।
     একটা তালগাছের নীচে এসে কচ্ছপ থামল। উপরে তাকিয়ে দেখল গাছভর্তি তাল। বস্তাটাকে গাছের তলায় রেখে দিল। পায়ে জড়িয়ে নিল দড়িটা, ডানহাতে ছুরিটাকে বাগিয়ে ধরে সাবধানে গাছে উঠতে শুরু করল। উঠতে উঠতে দু-একবার নীচে ও আশেপাশে তাকাল। হঠাৎ দুমদাম তাল শাস পড়ার শব্দ হল। পড়ছেই, পড়ছেই। এখন আর চারিদিকে চুপচাপ নেই।
     হঠাৎ সেই তিনজন গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তাড়াতাড়ি তিনজনে মিলে বস্তাটাকে তুলে নিল। ছয় হাতে সেটাকে বিছিয়ে ধরল। তারপরে চিৎকার করে উঠল, “এইবার কচ্ছপ কোথায় যাবে? কচ্ছপ মানুষের গলা শুনে ভয় পেয়ে নীচে তাকাল, লোকদের দেখে তার হাত-পা আলগা হয়ে গেল। ঝুপ করে পাকা তালের মতো বস্তায় এসে পড়ল। মাটিতে পড়লে তো সে চৌচির হয়ে যেত।
     তাকে ধরে নিয়ে তারা গাঁয়ে ফিরল। আঃ কি আনন্দ। চোর ধরা পড়েছে। আর অনেককাল পরে।
     সর্দারের বাড়ির উঠোনে বিচার-সভা বসল। তার বিচার হল। তাকে কয়কমাস গাঁয়ের খোয়াড়ে রাখার ব্যবস্থা হল। কচ্ছপ কিছু বলল না। সে যে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
     খোয়াড়ের মেয়াদ শেষ হল। কচ্ছপ ছাড়া পেল। মাথা নিচু করে সে গা থেকে বেরিয়ে এল। ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা । তারপর থেকে কাউকে দেখতে পেলে সে দেহের খোলের মধ্যে তার মুখ লুকিয়ে ফেলে। সে যে চোর, ধরা পড়েছিল। মুখ দেখাবে কেমন করে? তাই আজও কাউকে সামনে দেখলেই সব কচ্ছপ অমন করে খোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে নেয়। মনে মনে বলে, ছিঃ কি লজ্জা।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য