অমাবস্যার অন্ধকারে - সুবিনয় রায়চৌধুরী

     অমাবস্যার রাত, চারিদিকে ঘোর অন্ধকার । ছাতে বসে আমি আর অরুণ গল্প করছি, এমন সময় ‘ভ —র—র--র করে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। প্রথমে খুব দূরে আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল; ক্রমে আওয়াজটা ঠিক মাথার উপরে এল। খানিকক্ষণ ঐ ভাবে থেকে আবার আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। দু'তিন বার এই ভাবে আওয়াজ এল আর মিলিয়ে গেল। আকাশ এত অন্ধকারে ঢাকা ছিল যে ব্যাপারখানা কিছুই বোঝা গেল না।
     আমাদের বাড়ীটা ছিল ছোট গলির মধ্যে; সেখানে রাস্তার আলোও টিম টম ক’রে জ্বলে। গলির বাড়ীগুলোর প্রায় কোনটাতেই তখনও ইলেক্‌টিক লাইট হয় নি। দু একটি বাড়ীতে গ্যাসের আলো জ্বলে; অন্যগলিতে কেরোসিনের লণ্ঠন, ল্যাম্প, কিম্বা কুপির ব্যবস্থা। কাজেই অমাবস্যার মেঘাচ্ছন্ন রাতে সে পাড়ায় কি রকম অন্ধকার থাকে বুঝতেই পার। যাক –
     আমরা তো আওয়াজের মর্ম কিছুই বুঝতে পারলাম না ; মনে কৌতুহল থেকেই গেল। তখনও এরোপ্লেনের দিন আসে নি; কাজেই, এরোপ্লেনের কথা মনে হ’লো না।
     এই সময় আর একটি ঘটনা ঘটল, তাতে আমাদের কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। যে রাত্রে আমরা ঐ অদ্ভূত আওয়াজ শুনলাম সেই রাত্রেই মিত্তিরদের রান্নাঘর থেকে এক হাড়ি রান্না মাংস হাড়িশুদ্ধ চুরি গেল, আর তার পাশের বাড়ুয্যেদের বাড়ী থেকে এক হাড়ি পোলাও উধাও হলো। দুই বাড়ীতেই মিষ্টি মিঠাই কিছু কিছু কেনা ছিল ; তাও চুরি গেল। অথচ, চুরিটা বড় অদ্ভুত রকমে ঘটল। মিত্তিরদের রান্নাঘরের বাইরের দরজা বন্ধ ছিল; দরজা খোলা হয় নি, অথচ জিনিষ চুরি গেছে। ভেতর দিক্‌ দিয়ে চুরি করতে হলে শোবার ঘরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়; সে ঘরে স্বয়ং মেজবাবু তার তিন চারটি ছেলেপিলে নিয়ে গল্পগাছা করছিলেন। সেখান দিয়ে যায় কার সাধ্যি? ইঁদুর গেলেও ধরা পড়ে যেতো। বাড়ুয্যেদের বাড়ীতেও চুরি করা বেশ একটু মুস্কিল। অথচ দুই দুই জায়গায় চোখে ধূলো দিয়ে চোর নিৰ্ব্বিবাদে রান্নাঘর থেকে খাবার জিনিষ নিয়ে চম্পট দিল !
     পুলিশে খবর দিয়ে কোন লাভ হ’লে না। দারোগা বাবু তো কোনই কিনারা করতে পারলেন না। সেই অদ্ভুত আওয়াজের কথা বলাতে তিনি হে হে ক’রে হেসে উঠে বললেন, “তোমারই কান বোধ হয় তখন ভোঁ ভোঁ করছিল, তাই ও রকম আওয়াজ শুনেছিলে।” আমি চুপ করে রইলাম। প্রতিবাদ করে তো আর কোন লাভ নেই! অরুণ আমার কানে কানে বলল, “চালিয়াতের কাছে ওসব কথা বলে কি হবে? ওর কি মুরদ আছে চোর ধরার? চেহারাটা দেখ না; যেন একটা আস্ত ইডিয়ট্‌ !”—আমরা আস্তে আস্তে বাড়ী ফিরে এলাম।
     তারপর প্রায় মাস খানেক হয়ে গেছে; চুরির কথা আমরা ভুলেই গেছি। সেদিনও অমাবস্যার রাতে আমরা দু'জন ছাতে বসে গল্প করছি, এমন সময় সেই ভ-র-র-র আওয়াজটা শোনা গেল। আমি আর অরুণ তখনই তড়াক ক’রে লাফিয়ে উঠলাম আর আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে দেখতে লাগলাম। অরুণ একটু বাদেই চেঁচিয়ে উঠল, “ঐ-ঐ—ঐ দেখ একটা পাখীর মত কি যেন জিনিষ আকাশে উড়ছে।” চেয়ে দেখলাম, বাস্তবিকই একটা মস্ত বড় জিনিষ আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে । অন্ধকারে তার আকারটা ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না।
     জিনিষটাকে দেখতে দেখতে সেটা আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে লাগল ; তারপর একটা চুড়াওয়ালা বাড়ীর ছাতে নেমে পড়ল। ছাতে আলো ছিল, তাই বাড়ীটা চিনতে পারা গেল।
     আমি আর অরুণ তাড়াতাড়ি ছাত থেকে নেমে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। চূড়াওয়াল বাড়ীটা আমাদের চেনা ছিল। সে বাড়ীটাতে থাকতে এক হিন্দুস্থানী—নাম রামভজন পাড়ে। লোকটি বেজায় কুঁড়ে, তাই দিন দিন মোটাই হচ্ছিল। কারো সঙ্গে তার বিশেষ আলাপ ছিল না; শুধু দু’একটি ছোট ছেলে সেখানে যাতায়াত করত। আমরা রাস্তায় বেরিয়ে সেই বাড়ীর দিকেই রওয়ান হলাম। হঠাৎ অরুণ উপরের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “দেখ ! চেয়ে দেখি, ছোট্ট একটি ছেলে আকাশে ঝুলছে আর তিড়িং তিড়িং লাফাচ্ছে। একবার ঘোষেদের বাড়ীর পাঁচিলে; সে নেমে পড়ল, আবার দেখতে দেখতে আকাশে উঠে পড়ল।
     সেই “ভ-র-র-র” আওয়াজটা তখনও শোনা যাচ্ছে। ব্যাপারটা কিছু বোঝা গেল না।
     আমরা উদ্ধশ্বার্সে সেই চূড়াওয়ালা বাড়ীর দিকে ছুটে চললাম। পথে রমেশ আর বিনয়ের সঙ্গে দেখা হলো ; তাদেরও সঙ্গে নিয়ে চললাম। যেতে যেতে সংক্ষেপে তাদের সব কথা বলে দিলাম। তারাও উৎসাহের সঙ্গে আমাদের দলে জুটুল।
     সেই বাড়ীটাতে পৌছে দেখি নীচটা ঘুটুঘুটে অন্ধকার; সিঁড়িতে একটা পিদিম টিম-টিম করে জ্বলছে। সদর দরজা ভেজান ছিল; আমরা পা টিপে টিপে ঢুকে পড়লাম। একটু একটু ভয়ও করছিল; কিন্তু কেউ আর পিছ-পা হ’লাম না। বাড়ীর ছাতে আলো ছিল তা আমরা আগেই দেখেছিলাম; কাজেই বুঝতে বাকি রইল না যে ছাতে লোক আছে।
     আস্তে আস্তে উঠান পার হয়ে দোতালার সিঁড়িতে উঠতে আরম্ভ করলাম। উঠছি আর চারিদিকে তাকিয়ে দেখছি—পাছে কেউ পেছন থেকে বা সামনে থেকে আক্রমণ করে বসে !
     দোতালায় উঠে একবার চারিদিক দেখে নিলাম—কেউ আছে বলে মনে হ’লে না। কাজেই, আস্তে আস্তে তেতালায় উঠতে আরম্ভ করলাম। তেতালার চিলের ছাতের নীচে পৌঁছে দেখলাম ছাতের দরজা অর্ধেক ভেজান। দরজার ফাঁক দিয়ে অল্প অল্প আলো আসছে। ধরা পড়বার ভয়ে আমরা দরজার আড়ালে রইলাম; শুধু অরুণ আস্তে আস্তে মাথাটা বের করে একবার ছাতে উঁকি মেরে দেখল।
     তারপর আমাদের হাত দিয়ে ইসারা করে একেবারে ছাতে উঠে পড়ল। সকলেই তার পিছন পিছন ছাতে পৌঁছে গেলাম।
     গিয়ে যা দেখলাম তাতে আর হাসি চাপা গেল না। দেখি মোটক রামভজন স্বয়ং একটি অতিকায় লাটাই হাতে একটা ধাউস ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। ঘুড়ির সুতো প্রায় দড়ির মত মোটা। সুতো থেকে একটি ছোট ছেলে ঝুলছে; তা’র ঝুলবার জন্য একটি কপি-কল গোছের ব্যবস্থা। ইচ্ছা করলে সে সুতোর সাহায্যে কয়েক হাত ওঠা-নামা করতে পারে। ছেলেটি তখন ছাতের কাছে পৌছে গেছে— পাঁড়ে মশাইও লাটাই-এর সুতো গুটাচ্ছেন। ছেলের হাতে একটি হাঁড়ি; সেটি রমেশদের বাড়ীর। সেদিন রমেশদের বাড়ীতে মাংস রাধা হচ্ছিল।
     আমাদের দেখে পাঁড়েজি যা চমকালেন, কি আর বলব! তাড়াতাড়ি লাটাইএর সুতা গুটিয়ে ঘুড়িটা নামিয়ে ফেললেন ; ছেলেটিও হাড়িটা রেখে দুই পকেট ভক্তি সন্দেশ বের করতে লাগল। তখন আর কারো বুঝতে বাকি রইল না, সেই ভ—র—র—র আওয়াজটাই বা কিসের, আর খাবার চুরিই বা হ’তো কি ক’রে। পাঁড়েজি আমাদের কাছে অনেক মাপ চেয়ে নির্ব্বিবাদে রমেশদের হাড়িটা মাংসশুদ্ধ ফেরৎ দিলেন। বেচারার মুখ এত কাঁচু-মাচু হয়েছিল যে, আমরা আর কিছু বলতে না পেরে অনেক কষ্টে হাসি চেপে বাড়ী রওয়ানা হলাম।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য