ব্যাঙ রাজকুমারী - রাশিয়ার উপকথা

     অনেকদিন আগে এক রাজা ছিলেন। তাঁর তিন ছেলে। সবাই যখন সাবালক হল তখন একদিন রাজা তাদের ডেকে বললেন: ‘দেখো বাছারা, আমি তোমাদের বিয়ে দিয়ে মরবার আগে নাতিনাতনীর মুখ দর্শন করে যেতে চাই।’
     ছেলেরা উত্তর দিল, সে তো ভাল কথা বাবা, আশীর্বাদ করন। বলুন, কাকে বিয়ে করব?”
    ‘তোমরা প্রত্যেকে এক একটি করে তীর নিয়ে খোলা মাঠে গিয়ে ছুড়বে। যার তীর যেখানে পড়বে তার ভাগ্য সেখানে বাঁধা।
     রাজপত্রেরা বাবাকে প্রণাম করে একটি করে তীর নিয়ে খোলা মাঠে চলে গেল। ধনুক টেনে তীর ছুড়ল।
    বড় রাজপুত্রের তীর পড়ল এক আমীরের বাড়ীর উঠোনে। আমীরের মেয়ে সেটি তুলে নিলো। মেজ রাজপুত্রের তীর পড়ল এক সওদাগরের বাড়ীর উঠোনে। সওদাগরের মেয়ে সেটি তুলে নিলো।
     কিন্তু ছোট রাজপত্র ইভানের তীর উঁচুতে উঠে কোথায় যে গেল, কে জানে। তীরের খোঁজে রাজপুত্র চলে আর চলে। যেতে যেতে একটা জলার কাছে এসে দেখে একটা ব্যাঙ তীরটা মুখে করে বসে আছে।
     রাজপুত্র বলল, ‘ব্যাঙ, ও ব্যাঙ, আমার তীর ফিরিয়ে দাও।’ 
    আর ব্যাঙ বলে, ‘আগে বিয়ে করো আমায়! 
    ‘সেকী, একটা ব্যাঙকে বিয়ে করব কী?’ 
    ‘বিয়ে করো, সেই যে তোমার ভাগ্য।’ 
    রাজপুত্রের ভীষণ দুঃখ হল। কিন্তু কী আর করে। ব্যাঙটাকে তুলে বাড়ী নিয়ে এল। রাজা তিনটে বিয়ের উৎসব করলেন: বড়জনের বিয়ে দিলেন আমীরের মেয়ের সঙ্গে, মেজজনের সওদাগরের কন্যার সঙ্গে আর বেচারী রাজপুত্র ইভানের বিয়ে হল একটা ব্যাঙের সঙ্গে।
     একদিন রাজা ছেলেদের ডেকে বললেন: ‘আমি দেখতে চাই, তোমাদের কোন বৌয়ের হাতের কাজ ভালো। কাল সকালের মধ্যেই সবাই একটা করে জামা সেলাই করে দিক।’
     ছেলেরা বাবাকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেল। রাজপুত্র ইভান বাড়ী গিয়ে মাথা হেট করে বসে রইল। ব্যাঙটা থপথপ করে এসে জিজ্ঞেস করে: ‘কী হল রাজপুত্র, মাথা হেট কেন? কোনো বিপদে পড়েছো বুঝি?’ 
     ‘বাবা বলেছেন, তোমায় কাল সকালের মধ্যে একটা জামা সেলাই করে দিতে হবে।’
     ব্যাঙ বলল : ‘ভাবনা নেই, রাজপুত্র ইভান, বরং ঘুমিয়ে নাও, রাত পোয়ালে বুদ্ধি খোলে।’
    রাজপুত্র শুতে গেল। আর ব্যাঙ করল কী, থপথপিয়ে বারান্দায় গিয়ে, ব্যাঙের চামড়া খসিয়ে হয়ে গেল যাদুকরী ভাসিলিসা – রুপবতী সেই, তুলনা তার নেই!
     যাদুকরী ভাসিলিসা হাততালি দিয়ে ডেকে বললে: ‘দাসীবাদীরা জাগো, কোমর বেঁধে লাগো ! কাল সকালের মধ্যেই আমায় একটা জামা সেলাই করে দেওয়া চাই, ঠিক যেমনটি আমার বাবা পরতেন।’
     পরদিন সকালে রাজপুত্র ইভান উঠে দেখে, ব্যাঙ থপথপ করে ঘরে বেড়াচ্ছে। আর টেবিলের ওপর তোয়ালে মোড়া একটি জামা। রাজপুত্রের আর আনন্দ ধরে না। জামাটা নিয়ে সোজা গেল বাপের কাছে। রাজা তখন অন্য ছেলেদের উপহার নিচ্ছেন। বড় ছেলের জামাটা নিয়ে রাজা বললেন:‘এ জামা পরে দীন দরিদ্রে।’
     মেজ রাজপত্রে জামা মেলে ধরতে রাজা বললেন: ‘এটা পরে বাইরে যাওয়া চলে না।’ 
    এবার রাজপত্র ইভান তার জামাটা মেলে ধরল। সে জামায় সোনায় রুপোয় চমৎকার নক্সা তোলা। চোখ পড়তেই রাজা বললেন: ‘একেই বলে জামা ! পালপাবর্ণে পরার মতো।’
     বড় দু’ভাই বাড়ী যেতে যেতে বলাবলি করে: ব্যাঙ নয় ও, মায়াবিনী ...’
     আবার রাজা তিন ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। তোমাদের বৌদের বলো কাল সকালের মধ্যে আমায় রুটি বানিয়ে দিতে হবে। কে সবচেয়ে ভাল রাঁধে দেখব।’
     আবার ছোট রাজপত্রে ইভান মাথা হেট করে বাড়ী ফিরে এল। ব্যাঙ বললে: ‘রাজপুত্র, এত মনভার কেন?
    ‘রাজামশাই বলেছেন কাল সকালের মধ্যে রুটি বানিয়ে দিতে হবে।’ 
    ‘ভাবনা করো না, রাজপত্র। শুতে যাও, রাত পোয়ালে বুদ্ধি খোলে।’ 
    অন্য বৌরা ব্যাঙকে নিয়ে আগে হাসাহাসি করেছে। এবার কিন্তু একটা বুড়ী দাসীকে পাঠিয়ে দিল দেখে আসতে, কী করে ব্যাঙ রুটি বানায়।
     ব্যাঙ কিন্তু ভারি চালাক। টের পেয়ে গেল ওদের মতলব। তাই ময়দা মেখে লেচি তৈরী করে নিয়ে চুল্লির উপরটা ভেঙে সবটা লেচি সেই গতে ঢেলে দিল। বড়ী দাসী দৌড়ে গিয়ে রাজবধুদের খবর দিলে। বৌরাও ঠিক তাই করতে
লাগল।
     তারপর ব্যাঙ কিন্তু ওদিকে লাফিয়ে বাইরে গিয়ে যাদুকরী ভাসিলিসা হয়ে গেল। হাততালি দিয়ে ডেকে বলল: ‘দাসীবাদীরা জাগো, কোমর বেঁধে লাগো! সকালের মধ্যেই আমায় একটা সাদা ধবধবে নরম রুটি বানিয়ে দিতে হবে, ঠিক যেমনটি আমি বাড়ীতে খেতাম।’
     পরদিন সকালে রাজপুত্র উঠে দেখে টেবিলের ওপরে এক রুটি, গায়ে তার নানা রকম নক্সা: চারিপাশে কত শত মতি, উপরে নগর আর তোরণ।
     রাজপুত্র ভারি খুশী। তোয়ালে মুড়ে রুটি নিয়ে গেল বাবার কাছে। রাজা তখন বড় ছেলেদের রুটি নিচ্ছিলেন। বুড়ী দাসীর কথা মতো বড় দুই ভাইয়ের বৌ ময়দাটা সোজা চুল্লির ভিতর ফেলে দিয়েছিল। ফলে যা হল সে এক পোড়াধরা এক একটা তাল। রাজা বড় ছেলের হাত থেকে রুটিটা নিয়ে দেখেই পাঠিয়ে দিলেন নোকর মহলে। মেজ রাজপুত্রের রুটিরও সেই একই দশা হল। আর ছোট রাজপুত্র ইভান রাজার হাতে রত্নটি দিতেই রাজা বলে উঠলেন: একেই বলে রুটি! এই হল পালপাবর্ণে খাওয়ার মতো।’ 
     রাজা তার পরদিন তিন ছেলেকে বৌ নিয়ে নেমন্তন্নে আসতে বললেন। রাজপুত্র ইভান আবার মুখভার করে বাড়ী ফিরল, দুঃখে মাথা হেট করল। ব্যাঙ থপথপ করে লাফায়: ‘গ্যাঙর গ্যাঙ, গ্যাঙর গ্যাঙ। 
     রাজপুত্র, মন খারাপ কেন তোমার? বাবা বুঝি কিছু মন্দ কথা বলেছেন!’
     ব্যাঙ বৌ, ব্যাঙ বৌ, মন খারাপ না হয়ে করি কী? বাবা চান তোমাকে নিয়ে আমি নেমন্তন্নে যাই। কিন্তু লোকজনের সামনে তোমায় দেখাই কী করে?’
     ব্যাঙ বলে : রাজপুত্র, ভাবনা করো না; একাই যেও নেমন্তন্নে, আমি পরে যাব। খটখট দমদাম শব্দ হলে ভয় পেও না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলো, “ও আমার ব্যাঙ বৌ আসছে কোঁটোয় চড়ে।’
     রাজপুত্র ইভান তাই একাই গেল। বড় দুই ভাই গেল গাড়ী হাঁকিয়ে, বৌ জাঁকিয়ে। কত বেশ, কত ভূষা, গালে রঙ, চোখে কাজল। সবাই ছোট রাজপত্রকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল।
     ‘সেকী, তোর বৌকে আনলি না যে? একটা রুমালে করেও তো আনতে পারতিস, সত্যি, রুপসীকে জোটালি কোথা থেকে? কোন খাল বিল তল্লাশ করে?’
     তিন ছেলে নিয়ে, ছেলের বৌ নিয়ে, অতিথি অভ্যাগত নিয়ে রাজামশাই বসলেন এক জাজিম ঢাকা ওক কাঠের টেবিলে। ভোজ শুরু হবে। হঠাৎ শুরু হল খটখট দমদম আওয়াজ। সে আওয়াজে সারা রাজপুরী কোঁপে উঠল থরথরিয়ে, অতিথিরা ভয়ে লাফিয়ে উঠল। কিন্তু রাজপুত্র ইভান বললে: ‘অতিথ সজ্জন, ভয় নেই, আমার ব্যাঙ বৌ এল কোঁটোয় চড়ে।’ 
     ছ’টা সাদা ঘোড়ায় টানা সোনা মোড়া এক জুড়ি গাড়ী এসে থামল রাজপুরীর অলিন্দে। গাড়ী থেকে নেমে এল যাদুকরী ভাসিলিসা, আকাশী নীল পোষাকে তার ঝলমলে তারা, মাথায় জলজ্বলে বাঁকা চাঁদ; সে কী রূপে, জানার নয়, বোঝার নয়, রুপকথাতেই পরিচয়। রাজপুত্রের হাত ধরে নিয়ে গেল জাজিম ঢাকা ওক কাঠের টেবিলে।
     শুরু হল পানভোজন, ফুর্তি। যাদুকরী ভাসিলিসা করল কি, গেলাশ থেকে পান করে বাকিটুকু ঢেলে দিলে বা হাতার মধ্যে। মরালীর মাংসে কামড় দিয়ে হাড়গুলো রেখে দিল ডান হাতার মধ্যে। দেখাদেখি বড় বৌ দু’জনও তাই করল।
     খাওয়া হল, দাওয়া হল, শুরু হল নাচ। যাদুকরী ভাসিলিসা রাজপুত্র ইভানের হাত ধরে এগিয়ে গেল। তালে তালে নাচে, ঘরে ঘরে নাচে! সবাই একেবারে অবাক। নাচতে নাচতে বাঁ হাত দোলালে ভাসিলিসা আর হয়ে গেল একটা সরোবর। ডান হাত দোলালে, অমনি সাদা সাদা মরালী জেগে উঠল। রাজা আর অতিথি অভ্যাগতেরা সবাই বিস্ময়ে হতবাক।
     তারপর অন্য বৌরাও নাচতে উঠল। ওরাও এক হাত দোলাল, অতিথিদের গা ভিজল শুধু। অন্য হাত দোলাল, ছড়িয়ে পড়ল শুধু হাড়। একটা হাড় গিয়ে লাগল একেবারে রাজার চোখে । রাজা ভয়ানক রেগে তক্ষুণি দুই বৌকে বের করে দিলেন।
     ইতিমধ্যে রাজপত্র ইভান করেছে কি, লুকিয়ে লুকিয়ে দৌড়ে বাড়ী গিয়ে ব্যাঙের চামড়াটা সোজা একেবারে উনুনে।
     যাদুকরী ভাসিলিসা বাড়ী এসে ব্যাঙের চামড়া আর খুঁজে পায় না! মনের দুঃখে একটা বেঞ্চে বসে রাজপত্রকে বলল:
"এ কি করলে রাজপুত্র! আর যদি তিনদিন অপেক্ষা করতে তবে আমি চিরদিনের মতো তোমার হয়ে যেতাম। কিন্তু এখন বিদায়। তিন নয়ের দেশ পেরিয়ে তিন দশের রাজ্যে যেখানে অমর-কাশ্চেইই থাকে, সেখানে আমার খোঁজ করো...’
     এই বলে যাদুকরী ভাসিলিসা একটা ধূসর রঙের কোকিল হয়ে উড়ে গেল জানলা দিয়ে। রাজপুত্র কাঁদে কাঁদে, তারপর উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে প্রণাম করে চলে গেল যেদিকে দুচোখ যায়: যাদুকরী ভাসিলিসাকে খুঁজে বার করবে। গেল অনেক দূর, নাকি অল্প দূর, অনেক দিন, নাকি অল্প দিন কে জানে; বুটের গোড়ালি ক্ষয়ে গেল, কাফতানের কনুই ছিঁড়ে গেল, টুপি হল ফাড়া ফাড়া। যেতে যেতে এক থুড়থুড়ে ক্ষুদে বুড়োর সঙ্গে দেখা।
     ‘কুশল হোক কুমার, কিসের খোঁজে নেমেছ, কোন পথে চলেছ?’
    রাজপত্র বুড়োকে তার বিপদের কথা খালে বলল। ক্ষুদে বুড়ো বলল: ‘হায়, হায়, ব্যাঙের চামড়াটা পোড়াতে গেলে কেন, রাজপুত্র? ওটা তোমার পরার নয়, ওটা তোমার খোলারও নয়। যাদুকরী ভাসিলিসা তার বাবার চেয়েও বেশী যাদু জ্ঞান নিয়ে জন্মেছিল। তাই ওর বাবা শাপ দিয়ে তিনবছরের জন্যে ওকে ব্যাঙ করে দিয়েছিলেন। যাক, এখন তো আর কোনো উপায় নেই। এই সুতোর গোলা নাও। এটা যেদিকে গড়াবে সেদিকে যেও, ভয় পেয়ো না।’
     রাজপুত্র ইভান বুড়োকে ধন্যবাদ দিয়ে সুতোর গোলার পেছন পেছন চলল। সুতোর গোলা আগে আগে গড়িয়ে চলে, আর রাজপুত্র পেছন পেছন যায়। একদিন এক খোলা মাঠে এক ভালুকের সঙ্গে দেখা। রাজপুত্র লক্ষ্যস্থির করে মারতে যাবে, হঠাৎ মানুষের গলায় কথা কয়ে উঠল ভালুক:
     ‘মেরো না রাজপুত্র, কোনদিন হয়ত আমি তোমার কাজে লাগতে পারি।’
    রাজপুত্র ভালুককে আর মারল না, এগিয়ে চলল। হঠাৎ দেখে একটা হাঁস মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। রাজপুত্র লক্ষ্যস্থির করতেই হাঁসটা মানুষের গলায় বলে উঠল: "আমায় মেরো না, রাজপুত্র, কোনদিন হয়ত আমি তোমার কাজে লাগতে পারি।’
     রাজপত্র হাঁসটাকে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ একটা খরগোস দৌড়ে বেরিয়ে এল। রাজপুত্র ধনুক তুলে মারতে যাবে; খরগোসটা মানুষের মতো গলায় বলে উঠল: ‘আমায় মেরো না রাজপুত্র, কোনদিন হয়ত আমি তোমার কাজে লাগতে পারি।’
     রাজপুত্র খরগোসটাকে আর মারল না, এগিয়ে চলল। হাঁটতে হাঁটতে রাজপুত্র নীল সমুদ্রের ধারে এসে দেখে, একটা মাছ ডাঙার বালিতে পড়ে খাবি খাচ্ছে।
     ‘রাজপুত্র ইভান, দয়া করো আমায়, নীল সমুদ্রে ছেড়ে দাও!”
     রাজপুত্র মাছটা জলে ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে লাগল কতদিন কে জানে, সুতোর গোলা গড়াতে গড়াতে এল এক বনের কাছে। সেখানে রাজপুত্র দেখে মুরগীর পায়ের উপর একটা কুড়েঘর ক্রমাগত ঘুরে চলেছে।
     ‘কুড়েঘর, ও কুড়েঘর, বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াও !’
    কুড়েঘরটা বনের দিকে পিঠ রেখে রাজপুত্রের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। রাজপুত্র ঘরে ঢুকে দেখে, চিমনীর কাছে ন’থাক ইটের ওপর শায়ে আছে ডাইনী, বাবা-ইয়াগা, তার খেংরাকাঠি পা, দাঁত নেমেছে হেথা, নাক উঠেছে হোথা ! রাজপুত্রকে দেখে ডাইনীটা বলে উঠল, “তা আমার কাছে কেন, সজ্জন কুমার? কাজ আছে কি করার, নাকি কাজের ভয়ে ফেরার?’
     ‘ওরে পাজী বুড়ী থুবড়ী, আগে খাওয়া দে, দাওয়া দে, চানের জন্যে জল দে, তারপর শুধোস।”
     বাবা-ইয়াগা রাজপুত্রকে গরম জলে চান করালে, খাওয়ালে দাওয়ালে, বিছানা পেতে শোয়ালে। রাজপুত্র ইভান তখন বাবা-ইয়াগাকে বলল যে সে তার বৌ যাদুকরী ভাসিলিসাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
     ডাইনী বলল, ‘জানি, জানি! তোমার বৌ এখন অমর-কাশেচই’এর কবলে। ওকে ফিরে পাওয়া বাপু মুশকিল। কাশ্চেই’এর সঙ্গে এটে ওঠা সহজ নয়। ওর প্রাণ আছে এক ছুঁচের ডগায়, ছুঁচ আছে এক ডিমের ভিতর, ডিম আছে এক হাঁসের পেটে, হাঁস আছে এক খরগোসের পেটে, খরগোস আছে এক পাথরের সিন্দুকে, সিন্দকে আছে এক লম্বা ওক গাছের মাথায় আর ঐ গাছটা অমর কাশ্চেই’এর চোখের মণি, কড়া পাহারা সেখানে।’
     রাজপুত্র রাত্তিরটা বাবা-ইয়াগার বাড়ীতেই কাটাল। পরদিন সকালে বুড়ী তাকে সেই লম্বা ওক গাছে যাবার পথটা দেখিয়ে দিল। অনেক পথ, নাকি অল্প পথ, কতদূর রাজপুত্র গেল কে জানে; দেখে, দাঁড়িয়ে আছে এক লম্বা ওক গাছ। শনশন করছে তার পাতা, সেই গাছের মাথায় একটা পাথরের সিন্দুক। কিন্তু তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব।
     হঠাৎ কোথা থেকে সেই ভালুকটা এসে করল কি, শেকড়শুদ্ধ উপড়ে দিলে গাছটাকে। সিন্দকুটা দুম করে মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে চৌচির। অমনি সিন্দুক থেকে একটা খরগোস বেরিয়ে যত জোর পারে দৌড়ে পালাতে গেল। কিন্তু সেই আগের খরগোসটা ওকে তাড়া করে ধরে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলল। অমনি খরগোসটার পেট থেকে একটা হাঁস বেরিয়ে সাঁ করে আকাশে উঠে গেল।
      তখন দেখতে না দেখতে সেই আগের হাঁসটা তাকে ধাওয়া করে ঝাপটা মারতেই ডিম পাড়ল হাঁসটা, আর ডিম পড়ল নীল সমুদ্রে।
     রাজপুত্র তখন ভীষণ কাঁদতে লাগল। সমুদ্র থেকে কী করে এখন ডিম খুজে পাবে! হঠাৎ দেখে, সেই মাছটা সাঁতার কেটে পারের দিকে আসছে, মুখে সেই হাঁসের ডিমটা। রাজপুত্র ডিমটা নিয়ে ভেঙ্গে ফেলল। তারপর ভাঙতে লাগল ছুঁচের ডগা। রাজপুত্র ভাঙে আর উথালপাথাল করে অমর-কাশ্চেই, দাপাদাপি করে। কিন্তু যতই করুক অমর-কাশেচই, ছুঁচের ডগাটি ভেঙে ফেলল রাজপুত্র, মরতে হল অমর-কাশ্চেইকে।
     রাজপুত্র তখন চলল কাশ্চেই’এর শ্বেতপাথরের পুরীতে। যাদুকরী ভাসিলিসা ছুটে এল রাজপুত্রের কাছে, চুমো খেল তার মধুঢালা মুখে। তারপর যাদুকরী ভাসিলিসা আর রাজপুত্র ইভান দুজনে নিজেদের দেশে ফিরে গেল। সেখানে তারা সুখে স্বাচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে লাগল অনেক বুড়ো বয়স অবধি।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য